ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ
৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৮:০১
॥ শরীফ আবদুল গোফরান ॥
ছেলেটিকে দেখলে ক্লাসের সবাই ভয় পেতো। কারণ অনেকেই তার হাতে মার খেয়েছে। এজন্য স্যারের কাছে অনেক বিচার যেতো। সে যেমন ছিল ভালো ছাত্র, তেমনি চঞ্চলও। সবাই তাকে আদর করতেন। এজন্য অন্যায় করলে স্যারের কাছে ক্ষমা ছিল না। কঠিন শাস্তি দিতেন। স্যারের শাস্তির ভয়ও ছিল মনে। এজন্য শরীরে কাপড় পেঁচিয়ে কোট গায়ে দিয়ে ক্লাসে আসতেন। মারলেও যাতে গায়ে না লাগে। গরমের দিনে কোট পরে স্কুলে এলে তো এমনিতেই হাসি আসবে। তার ওপর কোটের ভেতর শাড়ি কাপড় পেঁচানো। কী মজার কাণ্ড, তাই না! আচ্ছা বন্ধুরা এ ছেলেটি কে- বলতে পারো? হ্যাঁ, বলছি শোন!
চব্বিশ পরগানা জেলা। এ জেলার বসিরহাট মহকুমার একটি গ্রাম। নাম পেয়ারা গ্রাম। এ গ্রামের একটি মুসলিম পরিবারে জন্ম হয় ছেলেটির। তার পিতার নাম মফিজ উদ্দীন। মাতার নাম হুরুন্নেসা খাতুন। সে দিনটি ছিল ১৮৮৫ সালের ১০ জুলাই। পুত্রসন্তান পেয়ে মা-বাবার আনন্দের সীমা নেই। সময়মতো ঘটা করে আঁকিকাও দেয়া হলো। নাম রাখা হলো ইব্রাহীম। কিন্তু মা এ নামে ডাকতেন না। মা কী বলে ডাকতেন? মা ডাকতেন শহীদুল্লাহ বলে। আবার কেউ কেউ সদানন্দ বলেও ডাকতেন। তোমরা হয়তো প্রশ্ন করতে পারো, ওমা সদানন্দ এ আবার কেমন নাম। হ্যাঁ বন্ধু, সদানন্দ ডাকারও কারণ আছে। কারণ তিনি সবসময় হাসি-খুশি থাকতেন। এ কারণে অন্যরা তাকে সদানন্দ বলে ডাকতেন। আবার তিনি নিজেও তার একটি নাম রেখেছিলেন, সেটি কী? সেটি হলো জ্ঞানানন্দ স্বামী। তার অর্থ হলো জ্ঞান লাভ করে যে আনন্দ পায়।
খুব চঞ্চল ছিলেন বালক শহীদুল্লাহ। হইচই করে গ্রামের পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়াতেন। প্রায়ই বাবার কাছে বিচার আসতো। ফলে বাবা সবসময় অস্থির থাকতেন। তবে ছেলের জ্ঞান-বুদ্ধি দেখে মনকে সান্ত্বনা দিতেন। বাবার ধারণা একদিন এ ছেলে মস্তবড় জ্ঞানী হবে। বাবার কথাই ঠিক হলো। পরবর্তীতে শ্রেষ্ঠ জ্ঞানতাপস মনীষীই হলেন জ্ঞানানন্দ স্বামী ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। বাবা গ্রামের পাঠশালায় ভর্তি করে দিলেন শিশু শহীদুল্লাহকে। নিয়মিত পড়ালেখা চলছে তার। পাশাপাশি দুষ্টুমি তো আছেই। বাবা একজন চাকরিজীবী। তার কর্মস্থল হাওড়ায়। বাবা সবসময় ছেলের জন্য চিন্তিত থাকতেন। ফলে একদিন ছেলেকে নিজের কাছে নিয়ে গেলেন। ভর্তি করে দিলেন হাওড়ার মধ্য স্কুলে। তখন শহীদুল্লাহর বসয় মাত্র দশ বছর। এ দুষ্টু ছেলেটিই একসময় ভালো ফল করলেন। এজন্য স্কুল থেকে তাকে রুপার পদক দেয়া হলো। এতে বাবার মনের সব দুঃখ মুছে গেল। এবার বাবা তাকে নিয়ে ভর্তি করে দিলেন হাওড়া জেলা স্কুলে। এ স্কুল থেকেই ১৯০৪ সালে শহীদুল্লাহ এন্ট্রাস করেন। তারপর গিয়ে ভর্তি হলেন কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে। শুরু হলো শহীদুল্লাহর উচ্চশিক্ষা গ্রহণ। প্রখর স্মৃতিশক্তি তার। একবার যা পড়তেন, তাই মনে গেঁথে ফেলতেন। ১৯০৬ সালে তিনি এফএ পাস করেন। কিন্তু তাকে দুবার বিএ পরীক্ষা দিতে হয়। তারপর সংস্কৃতিতে এমএ পড়ার জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যান। তখন শিক্ষকরা তাকে এ বিষয়ের ওপর পড়ার সুযোগ দিলেন না। তখন তিনি বেছে নিলেন ভাষাতত্ত্ব। এ ভাষাতত্ত্বের ওপর ১৯১২ সালে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ এমএ পাস করেন।
বন্ধুরা এতক্ষণ তোমাদের যে বড় মানুষটির গল্প শুনালাম, এ কিন্তু গল্প নয়। এটা একটা সত্য ঘটনা। যাকে একসময় প্রাচ্যের বিশ্বকোষ বলা হতো। তার পাণ্ডিত্য এক বিশাল সমুদ্রের মতো। তিনি সবসময় পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন, লাইব্রেরিতে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিতেন। লাইব্রেরিতে পড়তে পড়তে কখন যে সন্ধ্যা হয়ে গেছে, টেরই পেতেন না। তাকে যখন জিজ্ঞেস করা হলো- আপনি জীবনে কতগুলো বই পড়েছেন? তিনি জবাবে কী বলেন, জানো? কত বই পড়েছি জানি না, তবে রাস্তায় একটা ছেঁড়া কাগজ পেলেও আমি তা কুড়িয়ে নিয়ে পড়েছি। যে মানুষটি সবসময় জ্ঞান অর্জনে ব্যস্ত, সে মানুষটি কি তোমাদের মতো ছোট্ট বন্ধুদের ভুলতে পারেন? হ্যাঁ, তিনি তোমাদের জন্য অনেক কাজ করে গেছেন। যেমন তোমরা কি কখনো আঙুর ফল খেয়েছ? খুব টসটসে তাই না? বলতেই যেন জিভে পানি চলে আসে। তিনি তোমাদের জন্য প্রকাশ করলেন আঙুর ফলের মতো টসটসে ছোটদের পত্রিকা। তার নাম রাখলেন আঙুর। এ পত্রিকাটি তিনি নিজেই সম্পাদনা করতেন। কি মিষ্টি নাম। টসটসে রসালো লেখায় টইটুম্বুর আঙুরের প্রতিটা পাতা। ১৯২০ সালে তিনি এ পত্রিকাটি প্রকাশ করেন।
ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ তার কর্মময় জীবনের সবটাই শিক্ষকতা করে কাটান। পাশাপাশি তিনি লিখেছেন অসংখ্য লেখা। তখন ইংরেজি, বাংলায় লেখা তার প্রবন্ধ সব পত্রপত্রিকায় ছাপা হতো। এসব প্রবন্ধ নিয়ে প্রকাশিত হয় তার প্রথম প্রবন্ধের বই। নাম ‘ভাষা সাহিত্য’। ১৯৩১ সালে এ বইটি প্রকাশিত হয়। আঞ্চলিক ভাষায় অভিধান, বাংলা সাহিত্যের কথা, বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত প্রভৃতি গবেষণামূলক বই আজো তার কীতি বহন করে।
ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ সহজ-সরলভাবে জীবনযাপন করতেন। তিনি অহেতুক সময় ব্যয় করা পছন্দ করতেন না। তবে খাবার ব্যাপারে তিনি শৌখিন ছিলেন। গরুর গোশত ছিল তার প্রিয় খাবার। তিনি নাশতার সাথে ফলমূল খেতে পছন্দ করতেন। পাকা কলা, পেঁপে, আনারস, কমলালেবু তিনি বেশি খেতেন।
তিনি ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ মানুষ। ওয়াজমাহফিলের কোনো দাওয়াত পেলেই চলে যেতেন। নামাজ-রোজার প্রতি কখনো অবহেলা করতেন না। ১৯৬৫ সালে হজ প্রালন করেন।
অবশেষে ১৯৬৯ সালের ১৩ জুলাই এই বড় মাপের মানুষটি চিরবিদায় নিলেন। তখন তার বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। জুলাই মাসে যে মানুষটি দুনিয়ায় এলেন এ জুলাই মাসেই দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন। আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই। আছে তার স্মৃতি। ইতিহাস আর কর্মময় দিনগুলো।
লেখক : শিশুসাহিত্যিক, কবি।