শক্তি প্রয়োগ করে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছিল আলমিরস মুসলিম রাজ্য

ব্রাজিলে মুসলমানদের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে

প্রিন্ট ভার্সন
৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৬:৪৬

মুহাম্মদ আল্-হেলাল

॥ মুহাম্মদ আল-হেলাল ॥
দক্ষিণ আমেরিকার বৃহত্তম দেশ ব্রাজিল। যে দেশটিতে বিভিন্ন সময়ে মুসলিমদের আগমন ঘটে। এভাবেই ১৫০০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে ব্রাজিলে মুসলিম জনসংখ্যা ও শক্তি বৃদ্ধি পায়। একপর্যায়ে মুসলিমরা দেশটির উত্তরাঞ্চলে পর্তুগিজদের জুলুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। ১৬০৫ সালের দিকে মুসলিমরা আলমিরস নামে একটি আলাদা মুসলিম রাজ্য গঠন করে। কিন্তু ব্রাজিলের তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী মুসলিমদের আলাদা রাজ্যকে মেনে নিতে পারেনি। তাই তারা আলমিরস রাজ্য ধ্বংস করতে আক্রমণ শুরু করে। আলমিরস রাজ্য ধ্বংস করতে ব্রাজিলে পর্তুগিজদের এবং মুসলমানদের মধ্যে দীর্ঘকাল সংঘর্ষ চলে। মুসলমানদের দমন করতে না পেরে পর্তুগিজরা তৎকালীন মুসলিম নেতা জানাজা জুম্বাকে সন্ধির প্রস্তাব দেয়। কিন্তু আরেক তরুণ মুসলিম নেতা জুম্বি সন্ধির মধ্যে ষড়যন্ত্র বুঝতে পেরে প্রস্তাব নাকচ করে। ফলে উভয় পক্ষের মধ্যে বেশ কয়েকটি যুদ্ধ হয়। সব শেষে ১৯৯৪ সালে পর্তুগিজরা রাজধানী সাওপাওলো থেকে বিপুল পরিমাণ সামরিক অস্ত্রশস্ত্রের সাহায্যে আলমিরস মুসলিম রাজ্য ধ্বংস করে। বাতিল শক্তির আক্রমণে একশত বছরও টিকতে পারেনি দক্ষিণ আমেরিকার ছোট মুসলিম রাজ্য আলমিরস। ইতিহাস থেকে হারিয়ে যায় দক্ষিণ আমেরিকার একমাত্র মুসলিম রাজ্যটি।
ব্রাজিলের আয়তন ও জনসংখ্যা : ব্রাজিল বিশ্বের একটি শক্তিশালী দেশ- যেটি বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা জাতিসংঘের বিকল্প হিসেবে দাঁড় করানোর জন্য সৃষ্টি ব্রিকসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। আয়তনের দিক থেকে ব্রাজিল বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম দেশ এবং জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম দেশ। দেশটির মোট আয়তন ৮৫ লাখ ১৪ হাজার ৮৭৭ বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যা ২০ কোটির অধিক। দক্ষিণ আমেরিকার একমাত্র ও বিশ্বের সর্ববৃহৎ পর্তুগিজভাষী রাষ্ট্র ব্রাজিল। তবে বিশ্বদরবারে দেশটি তার অধিবাসীদের অনৈতিক স্খলনের জন্য সমালোচিত।
মুসলমানের সংখ্যা : ব্রাজিলে ২০ কোটি লোকসংখ্যার বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর পাশাপাশি মুসলমানদের সংখ্যাও রয়েছে বেশ। যার সংখ্যা প্রায় ১৭ লাখ, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় এক শতাংশ মাত্র। গাণিতিক হিসাবে লাতিনের সর্ববৃহৎ এ দেশটিতে ইসলাম ধর্মের অনুসারীর সংখ্যা কম মনে হলেও আনন্দের সংবাদ হচ্ছে, ব্রাজিলে মুসলমানের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। সাওপাওলোয়ই মাসে গড়ে ছয়জন মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে পাওয়া গেছে। (সূত্র : ‘আল-মুসলিমুনা ফিল ব্রাজিল, ড. খালিদ রিজক তকিউদ্দিন)।
ব্রাজিলে ইসলামের আগমন : ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ব্রাজিলে ইসলামের আগমন আমেরিকা মহাদেশ আবিষ্কারের সূচনালগ্নেই। ১৫০০ খ্রিস্টাব্দের ২২ এপ্রিল বিখ্যাত পর্তুগিজ পরিব্রাজক ও আবিষ্কারক পেড্রো আলভারেস কারব্যাল যখন ব্রাজিল উপকূলে জাহাজ নোঙর করেন, তখন তাঁর সাথে বেশকিছু স্বনামধন্য, দক্ষ, কর্মঠ ও পারদর্শী মুসলিম নাবিক ছিলেন। তন্মধ্যে শিহাবুদ্দিন বিন মাজিদ ও মুসা বিন সাতি অন্যতম। ইতিহাসের বরাত অনুযায়ী তাদের হাত ধরেই ব্রাজিলে ইসলাম ও মুসলমানের আগমন ঘটে। (আল-ইসলাম ওয়াল মুসলিমুন ফিল ব্রাজিল, আল-মুজতামা অনলাইন সংস্করণ-২০১)।
তবে বিখ্যাত ব্রাজিলিয়ান ইতিহাসবিদ জোয়াকিন হেপিরো (Joaquin Hepiro) ব্রাজিলে ইসলামের আগমনের ব্যাপারে ১৯৫৮ সালে একটি লেকচার দেন এবং পরবর্তী সময়ে ব্রাজিলের বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় লেকচারটি প্রকাশ করা হয়। তাতে তিনি অত্যন্ত তাগিদের সঙ্গে উল্লেখ করেন, ১৫০০ খ্রিস্টাব্দে পর্তুগিজদের ব্রাজিল আবিষ্কারের অনেক আগে আরব বণিক ও নাবিকরা ব্রাজিল আবিষ্কার করেন। পর্তুগিজরা মূলত জাহাজ চালনা ও নির্মাণশিল্পে দক্ষ এবং বৈশিষ্ট্যপূর্ণ মুসলিম নাবিকদের সহযোগিতায় ব্রাজিলে আগমন করে। (সূত্র : http://www.alukah. net/world_muslims/0/4306/)।
অন্যদিকে যখন স্পেনে মুসলিম সাম্রাজ্যের পতন হয়, তখন বিপুলসংখ্যক স্প্যানিশ মুসলমান খ্রিস্টানদের নিপীড়ন-নির্যাতন থেকে পালিয়ে ব্রাজিলে হিজরত (আশ্রয় গ্রহণ) করে। ক্রমান্বয়ে ব্রাজিলে স্প্যানিশ মুসলমানের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকলে স্পেনের অনুকরণে ব্রাজিলের তৎকালীন পর্তুগিজ সরকার ব্রাজিলেও ‘অনুসন্ধান-আদালত’ প্রতিষ্ঠা করে এবং অনৈতিক ও মানবিক বিচারের আওতায় এনে বহুসংখ্যক মুসলমানকে জ্বলন্ত আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করে এবং মুসলমানদের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় বিভিন্ন নিদর্শন মুছে ফেলে। (সূত্র : ইসলামওয়েবের বরাতে ‘তারিখুল মুসলিমিন ফি ব্রাজিল’)।
ব্রাজিলে কৃষ্ণাঙ্গ মুসলিমদের প্রথম বহর : বর্তমান সময়ে যারা সভ্য সেজে পৃথিবীর মানুষকে সভ্যতা শেখানোর দায়িত্ব পালন করছে, সেই ইংল্যান্ড, আমেরিকা, পর্তুগাল, স্পেনের অসভ্যতার এক কালো ইতিহাস আছে। তাদের অসভ্যতার ইতিহাসের তালিকায় অন্যতম ‘Atlantic Slave Trade’ বা আটলান্টিক মহাসাগরে দাস বাণিজ্য। এ ধরনের কিডন্যাপিং দাস বাণিজ্য সর্বপ্রথম শুরু করে পর্তুগাল। ব্রাজিল ছিলো তাদের উপনিবেশ। ১৫২৬ সালে পর্তুগিজরা সর্বপ্রথম ‘ট্রান্স-আটলান্টিক দাস বাণিজ্য’ শুরু করে। তাদের দেখে ইউরোপ-আমেরিকার বাকি সব সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো এ ঘৃণ্য, অমানবিক কাজ করতে থাকে। ধারণা করা হয় ৪০০ বছরে ১ কোটি ২০ লাখের বেশি মানুষকে আফ্রিকা থেকে দাস বানিয়ে তারা নিয়ে যায়। শুধুমাত্র ব্রাজিলেই নিয়ে যাওয়া হয় ৩০ লাখের বেশি আফ্রিকান মানুষ।
ব্রাজিলে কৃষ্ণাঙ্গ মুসলিমদের প্রথম বহর আসে ১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দে এবং ৪০ বছর পেরোনোর আগেই ১৪ হাজারের বেশি অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল মুসলমান আফ্রিকা থেকে ব্রাজিলে স্থানান্তরিত হয়। পর্তুগিজরা পরবর্তী সময়ে কয়েক বছরে নিগ্রো মুসলিমদের বেশি হারে নিয়ে আসতে শুরু করে। এমনকি শুধু অ্যাঙ্গোলা থেকেই ছয় লাখ ৪২ হাজার নিগ্রো মুসলিমকে ব্রাজিলে আনা হয়। এছাড়া সুদানের বিভিন্ন অঞ্চল ও পশ্চিম আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে কৃষ্ণাঙ্গ মুসলিমদের ব্রাজিলে আনা হয়।
এসব নিগ্রো মুসলমানকে জোরপূর্বক হাত-পা শিকলে বেঁধে জাহাজের পাটাতনে ফেলে নিয়ে যাওয়া হতো। নির্যাতন-অবহেলা, অনাহারে ও রোগাক্রান্ত হয়ে যেসব মুসলমান মারা যেত, তাদের মাঝপথে সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হতো। (সূত্র : ব্রাজিল জা-রাহাল মুসলিমুনা ওয়াকতাশাফুহা কাবলাল বুর্তুগালিয়িন)।
ব্রাজিলের জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল-দস্তাবেজের মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে জানা যায়, ব্রাজিলে যেসব আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মুসলিম রয়েছে, তাদের পর্তুগিজরা দাস হিসেবে ব্রাজিলে নিয়ে আসে। তারা পুরোপুরি মুসলিম ছিলেন এবং আরবি উচ্চারণে কুরআন তিলাওয়াত করতেন।
কৃষ্ণাঙ্গ মুসলমানদের অবদান : আফ্রিকার যেসব অঞ্চল থেকে মানুষ দাস বানিয়ে নিয়ে যাওয়া হতো, সেসব অঞ্চলের মধ্যে অনেকগুলো ছিলো মুসলিম অধ্যুষিত। সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো আফ্রিকার মুসলিমদের দাস বানিয়ে নিয়ে যায় আমেরিকা মহাদেশে। সবচেয়ে বেশি নিয়ে যায় ব্রাজিলে। সেখানে নিয়ে আখ চাষ করাতো। মুসলিমদের কড়া নজরদারিতে রাখতো, যাতে তারা মাথাচাড়া দিয়ে দাঁড়াতে না পারে। মুসলিমরা তাদের ধর্মচর্চা করতে তো পারতোই না। যদি নামাজ পড়ার সময় ধরা পড়তো, তাহলে তাদের শাস্তি দেয়া হতো।
বিখ্যাত ঐতিহাসিক গিলবার্টো ফেরেইরি (Gilberto Freyre) [১৫ মার্চ ১৯০০-১৮ জুলাই ১৯৮৭] তার প্রসিদ্ধ গ্রন্থ ‘এ নিউ ওয়ার্ল্ড ইন দ্য ট্রপিক্যাল স্ফীয়ারস’ (A New World in the Tropical Spheres) উল্লেখ করেন, কৃষ্ণাঙ্গ মুসলমানরা ব্রাজিলের সামগ্রিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে সক্রিয়তা ও সৃজনশীলতার অন্যতম উপাদান হিসেবে নিজেদের পরিচয়ই দেননি; বরং আমরা অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পারি, সে সময় ব্রাজিলে যারা এসেছিলেন, তাদের মধ্যে এ কৃষ্ণাঙ্গ মুসলমানরাই সর্বাধিক চারিত্রিক মাধুর্যের অধিকারী ছিলেন। যদিও তাদের দাস হিসেবে ব্যবহার করা হতো।
তৎকালীন আফ্রিকান কৃষ্ণাঙ্গ মুসলমানদের প্রযুক্তিগত ও কারিগরি জ্ঞান ব্রাজিলিয়ান ও স্বয়ং পর্তুগিজদের চেয়ে উন্নত ছিল। ব্রাজিলের সভ্যতা ও সমাজ গঠনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে এসব কৃষ্ণাঙ্গ মুসলমানের গুরুত্ব ও অবদান অপরিসীম। মজার কথা হলো, দাস মুসলমানরা অন্যান্য কাজের পাশাপাশি তাদের মূর্খ মালিকদের লিখিত বিভিন্ন কাজকর্মেও আঞ্জাম দিত। এমনকি তাদের অজ্ঞ মালিকরা পর্তুগিজদের সঙ্গে কথা বলত মুসলমান দাসদের দোভাষী বানিয়ে। এছাড়া নিজের মূর্খ আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুর কাছে চিঠি লিখত মুসলমান দাসদের মাধ্যমে এবং সে চিঠিও মূর্খ প্রাপককে পড়ে শোনাত অন্য মুসলমান দাসরা।’ (সূত্র http://www.alraimedia.com/Home/Details?Id)।
আখ-চিনি, কফি, তুলা, বিভিন্ন ধরনের শস্যদানা; এমনকি প্রয়োজনীয় সব ধরনের কৃষি সরঞ্জামাদি কৃষ্ণাঙ্গ মুসলিমরা আফ্রিকা থেকে ব্রাজিলে নিয়ে এসেছিল। মুসলমানদের কাছে ব্রাজিল সব সময় ঋণী।
মুসলিম সাম্রাজ্য আলমিরস ও সংগ্রাম : মুসলিম দাসদের মধ্যে যারা অন্যদের তুলনায় বয়স্ক ও শিক্ষিত ছিল, তারা অন্যদের ওয়াজ-নসিহত করত এবং কুরআন, ফিকহ, আকিদা ও শরিয়তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি শিক্ষা দিত। তারা দাসদের সঙ্গে বসবাসের অযোগ্য কুটিরগুলোয় থাকত।
যখন ক্রমান্বয়ে মুসলমান দাসের সংখ্যা ও শক্তিমত্তা বৃদ্ধি পেল, তখন তারা একটি স্বাধীন রাজ্য গঠনে উদ্যোগ গ্রহন করে। তন্মধ্যে অন্যতম ছিল ১৬০৫ খ্রিস্টাব্দে ব্রাজিলের উত্তরাঞ্চলীয় আলমিরস শহরে মুসলমান দাস বিদ্রোহীদের জড়ো হওয়া। ঐতিহাসিক সুত্র থেকে জানা যায়, সেখানে প্রায় ৩০ হাজার কৃষ্ণাঙ্গ মুসলমান বিদ্রোহে শরিক হয়েছিল এবং তরুণ মুসলিম নেতা জানজা জুম্বার নেতৃত্বে নিপীড়িতদের জন্য একটি আলাদা মুসলিম রাজ্য আলমিরস গঠন করে। দীর্ঘদিন ধরে তারা তাদের মুসলিম রাজ্যটি জানজা জুম্বার ভাই ও পুত্রদের মাধ্যমে টিকিয়ে রেখেছিল। বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্র মোতাবেক বলা হয়ে থাকে, জুম্বা ছিলেন পর্তুগিজদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনাকারী কঙ্গোর রাজার নাতি। যদিও কঙ্গোর রাজা পর্তুগিজদের বিপক্ষে সফল হতে পারেননি।
দীর্ঘ সংঘর্ষের পরও যখন মুসলমানদের দমন করা যায়নি, তখন পর্তুগিজরা জুম্বার সঙ্গে সন্ধি করতে চায়। কিন্তু জুম্বি নামের আরেকজন অল্প বয়সী মুসলিম নেতা পর্তুগিজদের চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের আঁচ করে সন্ধি মানতে নারাজ হন এবং তিনি আমরণ সংগ্রাম চালিয়ে যান। ফলে ১৬৭৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে বীর জুম্বি পর্তুগিজদের বিপক্ষে বেশ কয়েকটি যুদ্ধ পরিচালনা করেন। এবারও অনেক চেষ্টার পর পর্তুগিজরা মুসলমানদের বিদ্রোহ দমন বা কোণঠাসা করতে পারে না।
অবশেষে পর্তুগিজরা রাজধানী সাওপাওলো থেকে বিপুল পরিমাণ সামরিক অস্ত্র-সরঞ্জামাদি নিয়ে আক্রমন চালায়। সর্বাত্মক হামলা চালিয়ে ১৬৯৪ খ্রিস্টাব্দে আলমিরস মুসলিম রাজ্যের পতন ঘটানো হয়। এভাবেই বাতিল শক্তির আক্রমনের হারিয়ে যায় আলমিরস রাজ্য। তাদের হামলায় শত মুসলিম সৈন্য নিহত হয় এবং মুসলিম বিদ্রোহীদের লাশগুলো দীর্ঘদিন ধরে রাস্তার পাশে ও ‘সানসালাত সেলে’ পড়ে পচতে থাকে। (সূত্র : http://howiyapress.com)।
বিদ্রোহ দমনের পর অনেক মুসলমানকে জোরপূর্বক খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত করা হয়। ধর্মান্তরিত হতে রাজি না হওয়ায় অনেককে হত্যা করা হয়। ফলে কিছু মুসলমানের কাছে ব্রাজিলীয় পৌত্তলিকতা আসতে শুরু করে। (সূত্র : আল-মুসলিমুনা ফিল ব্রাজিল : বাইনাল মাদি ওয়াল হাদির)।
‘মালী বিদ্রোহ’: আটলান্টিক দাস বাণিজ্য সর্বশেষ বন্ধ হয় ব্রাজিলে। ১৮৩১ সালে ব্রাজিলে নতুন করে দাস নিয়ে আসার প্রথা আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধের নির্দেশ দেয়া হলেও অবৈধভাবে সেটা চলতে থাকে। তাছাড়া মুসলিমদের ওপর নির্যাতনের মাত্রা বাড়তে থাকে, তাদের ধর্মান্তরিত করার প্রয়াসও কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
সবকিছু মিলিয়ে ব্রাজিলে দাসরা একটি বিদ্রোহ করে। ১৮৩৫ সালের সেই বিদ্রোহের নাম ‘মালী বিদ্রোহ’। এ বিদ্রোহ সংঘটিত হয় বাহিয়ায়। এ বিদ্রোহে অংশগ্রহণকারী মুসলিমদের মধ্যে প্রায় একশো জনকে হত্যা করা হয়। ব্রাজিল থেকে ইসলামের চিহ্ন মুছে দেবার জন্য নানান প্রচেষ্টা চালানো হয়। অনেক মুসলিম সুযোগ পেয়ে আবার আফ্রিকায় ফেরত যান; তাদের পিতৃপুরুষদের দেশে। ইংল্যান্ডের চাপে পড়ে ১৮৮৮ সালে ব্রাজিলে দাসপ্রথা বিলুপ্ত করা হয় এবং ব্রাজিলই সর্বশেষ দেশ, যারা দাসপ্রথা বিলুপ্ত করে। কিন্তু এ দাসপ্রথা বিলুপ্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রায় ১৪ হাজার মুসলমানকে হত্যা করা হয়। ধ্বংস করা হয় অনেক মসজিদ। অনেক মুসলমান খ্রিস্টানদের সঙ্গে মিশে নিজেদের ধর্মবিশ্বাস ও ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলে। তাদের মুসলিম পরিচয়টা পর্যন্ত অবশিষ্ট ছিল না।
খ্রিস্টানরা মুসলমানদের হত্যা ও দমন করে অনেক মসজিদ গির্জায় রূপান্তরিত করে। সঙ্গত কারণেই এলসালভাদর ও বাহিয়ার বেশকিছু গির্জার দেয়ালও কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের নকশায় অলংকৃত। (http://www.alukah.net/world_ muslims/0/4306/)।
হারিয়ে যায় মুসলিম তাহজিব তমুদ্দুন
আস্তে আস্তে আফ্রিকা থেকে দাসত্বের বন্ধনে আবদ্ধ ব্রাজিলের মুসলিমরা তাদের ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলে। নামাজ, রোজাসহ ইবাদাত করতে পারতো না। এক প্রজন্মের পর আরেক প্রজন্মে হারিয়ে যায় তাদের বিশ্বাস, সংস্কৃতি। তারা শুধু জানতো যে, তারা মুসলিম। কিন্তু ধর্মীয় বিধান পালনের কঠোর বিধিনিষেধের ফলে স্বাভাবিকভাবে তারা সেগুলো ভুলে যায়। আরবিতে কথা বললে, আরবি নাম রাখলে তাদের মারধর করতো তাদের মনিবরা। সুকৌশলে তাদেরে বিচ্ছিন্ন করা হয় গোটা মুসলিম সভ্যতা, সংস্কৃতি থেকে। তাছাড়া অনেক মিশনারী এসে তাদের খ্রিস্টধর্ম গ্রহণে প্রলোভন দেখায়, কোনো কোনো মনিব বলপ্রয়োগ করে ব্রাজিলের মুসলিমদের খ্রিস্টধর্ম গ্রহণে বাধ্য করে।
ব্রাজিলের মুসলমানদের বর্তমান অবস্থা : ব্রাজিলের মুসলমানদের জন্য সুদিন আসতে শুরু করে ঊনবিংশ শতাব্দীতে। লেবানন, ফিলিস্তিন, মিশর ও সিরিয়ার মুসলমানরা ব্রাজিল আসতে থাকে আরব-ইসরাইল যুদ্ধ, লেবাননের গৃহযুদ্ধের সময় এবং ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দে ব্রাজিল সম্রাট মিশর, লেবানন ও সিরিয়া সফর করার পর থেকে। রাজা দ্বিতীয় পেড্রোর সঙ্গে চুক্তি হয় লেবাননের। লেবানিজরা ব্যবসা করার জন্য আসতে শুরু করে দেশটিতে।
দ্বিতীয় মাত্রায় ১৮১৪ ও তৃতীয় মাত্রায় ১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দে বিপুলসংখ্যক মুসলমান ব্রাজিলে হিজরত করে। গত শতাব্দীতে ও বর্তমানে ব্রাজিলে হিজরতকারী বেশির ভাগ মুসলমান বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। ব্রাজিলের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে মুসলিম ব্যবসায়ীরা। তবে অন্যান্য পেশার সঙ্গে সরকারি বিভিন্ন কার্যক্রম- চাকরি, ডাক্তারি, ইঞ্জিনিয়ারিং ও খেলাধুলায়ও মুসলমানরা কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখছে। অন্যদিকে আরব বসন্তের পর গত কয়েক বছরে সিরিয়ান ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ থেকে অসংখ্য মুসলিম পরিবার ব্রাজিলে আশ্রয় নিয়েছে।
ব্রাজিলে মসজিদ-মাদরাসা : ২০০০ সালের তুলনায় ব্রাজিলে মসজিদের সংখ্যা এখন চারগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া শিশুদের ইসলামী জ্ঞান শিক্ষা দেওয়ার জন্য রয়েছে মক্তব-মাদরাসা ও ইসলামিক স্কুল। রিও ডি জেনেরিয়োয় রয়েছে বৃহৎ ইসলামিক সেন্টার, ইসলামিক স্কুল, বেশ কয়েকটি বড় মসজিদ। সাওপাওলোয়ও রয়েছে বিশাল মুসলিম কমিউনিটি।
ব্রাজিলের সাওপাওলো, রিও ডি জেনেরিয়ো ও রিগ্রেন্ডে দে সোল তুলনামূলক মুসলিম অধ্যুষিত শহর। এছাড়া পারানা শহরে রয়েছে আরব বংশোদ্ভূত উল্লেখযোগ্য মুসলিম সম্প্রদায়। (সূত্র : http://articles.islamweb.net/media/article&lang57952)।
প্রতি শনিবার ব্রাজিলের বিভিন্ন মসজিদে স্থানীয়দের নিয়ে ইসলামবিষয়ক ক্লাস করানো হয়। পঞ্চাশটির মতো ইসলামী সংস্থা মুসলমানদের পাশাপাশি অমুসলিমদেরও নিরন্তরভাবে দাওয়াত, শিক্ষা ও সহযোগিতা করে আসছে। ইসলাম সম্পর্কে তাদের আগ্রহ ও উৎসাহ ব্যাপক। সাওপাওলোর মসজিদগুলোয় দেখা যায়, প্রতিদিনই ব্রাজিলিয়ান খ্রিস্টান নারীরা ইসলাম সম্পর্কে জানতে আসেন। ব্রাজিলের মাটিকে ইসলাম প্রচারের উর্বর ভূমি মনে করছেন স্থানীয় মুসলমানরা। বিশিষ্ট দার্শনিক ও ইসলামিক রিপাবলিক অব পাকিস্তানের বিচারপতি মুফতি তকি উসমানি বলেন, ব্রাজিলে ১০ জনকে ইসলামের দাওয়াত দিলে আটজনই দাওয়াত গ্রহণ করেন।’ বেশি হারে দাওয়াতের কাজ চালু থাকলেও বিশ্বের অন্য কিছু অমুসলিম দেশের মতো বিভিন্ন অসুবিধা সেখানে আছে। তবে আশা করা যায়, এ ধারা অব্যাহত থাকলে ব্রাজিল মুসলিমপ্রধান দেশ হয়ে উঠতে বেশি দেরি হবে না। (রিসার্চ ফেলো, সেন্টার ফর ইসলামিক থট, বাংলাদেশ)।
ইসলামিক শিক্ষা সম্প্রসারণ : ১৮৬০ সালে বাগদাদের ইমাম আব্দুর রহমান আফেন্দী ব্রাজিলের রিও ডি জেনেরিয়ো সমুদ্র বন্দরে নামেন। এ বন্দরে আসাটা তার পূর্ব-প্ল্যান ছিলো না। সমুদ্রের মধ্যে তার জাহাজ ঝড়ের কবলে পড়ে পথ হারিয়ে ফেলে। পথ হারানো জাহাজ ব্রাজিলের বন্দরে গিয়ে আশ্রয় নেয়। সম্পূর্ন অজানা পরিবেশে মুসলিমদের একটি দল এসেছে। এ বন্দরে কেউ তাদের পরিচিত নেই। ইমাম আব্দুর রহমান আফেন্দী দেখলেন তাদের দেখে কিছু লোক এগিয়ে আসছে। বিপদগ্রস্ত কাফেলা বুঝতে পারছে না স্থানীয় লোকেরা তাদের সাথে কেমন ব্যবহার করবে।
স্থানীয় লোকেরা কাফেলার লোকদের পরনের কাপড়, দাড়ি, পাগড়ি দেখে তাদের বুঝতে বাকি নেই যে, এ বিপদগ্রস্ত কাফেলার লোকেরা মুসলিম। রিও ডি জেনেরিয়োর অধিবাসীরা সালাম দিলো- ‘আসসালামু আলাইকুম’। আব্দুর রহমান আফেন্দীর চক্ষু চড়কগাছ। তিনি যেনো নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। এ অদ্ভুত অজানা জায়গায় এসে যখন দেখতে পেলেন সেখানকার অধিবাসীরা তার মতো একই বিশ্বাস লালন করছে, তখন তার অসম্ভব ভালো লাগা শুরু হলো। তারপর উভয় পক্ষে কথোপকথন হয়-
‘তোমরা তাহলে মুসলমান?’
‘জ্বি, আমরা মুসলমান।’
‘এখানে আরো মুসলমান আছে?’
‘জ্বি, এখানে আরো মুসলমান আছে।’
আব্দুর রহমান আফেন্দী দেখতে পেলেন যে, এখানের অধিবাসীদের মধ্যে অনেকেই মুসলিম হলেও ইসলামের শেকড় থেকে তারা অনেকটাই বিচ্ছিন্ন। তারা নামাজ পড়তে পারে না, রোজা রাখতে জানে না, ইসলামের ফরজ বিধান সম্পর্কে তাদের ধারণা স্পষ্ট না। তারা নামাজের সময় হলে হাত তালির মতো শব্দ করে নামাজ পড়ে, নাচে। কয়েকটি ভাঙা ভাঙা আরবি শব্দ তারা জানে। ‘লা ইলাহা’ বলতে পারে।
আব্দুর রহমান আফেন্দী কারণ অনুসন্ধান করতে লাগলেন। তারা মুসলিম ঐতিহ্য থেকে কীভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লো, কীভাবে তারা ইসলামের প্রাথমিক বিধান ভুলে গেলো সেটা খুঁজতে গিয়ে এক করুণ ইতিহাস চলে এলো। তারা কীভাবে ব্রাজিলে এসেছিলো, সেই ইতিহাস।
আব্দুর রহমান আফেন্দী স্থানীয় লোকদের সাথে থেকে যাবার মনস্থ করলেন। তিনি বললেন, ‘তাদের সাথে থাকা, তাদের ইলম শিক্ষাদান আমার জন্য ওয়াজিব। আল্লাহ এজন্যই হয়তো বাগদাদ থেকে আমাকে এখানে নিয়ে এসেছেন।’
দীর্ঘ ৬ বছর আব্দুর রহমান আফেন্দী ব্রাজিলের মুসলিমদের মাঝে বসবাস করে তাদেরকে তাদের শিকড়ের সন্ধান দেন। তাদের নামাজ, রোজার মতো প্রাথমিক বিধান শিক্ষা দেন। তারপর ফিরে যান স্বদেশে। ব্রাজিলে ৬ টি বসন্ত কাটিয়ে তার এ বিস্ময়কর ভ্রমণের বর্ণনা নিয়ে একটি বই লেখেন। বইয়ের নাম- ‘ব্রাজিলের সফরনামা’।
আজকের ব্রাজিল গঠনে মুসলিমদের অবদান অনস্বীকার্য। সুতরাং মুসলিমদের অবদানের স্বীকৃতি প্রদান করে দেশটির জনগণের মধ্যে যে নৈতিক স্খলন ঘটেছে এবং ধর্মের ভিত্তিতে মুসলিমদের প্রতি ব্রাজিলের অতীত নির্যাতনের পুনরাবৃত্তি সাংবিধানিকভাবে বন্ধ করে সামনে অগ্রসর হলে দেশটির আরো বৃহৎ শক্তি হিসাবে আবির্ভূত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।
লেখক : এমফিল গবেষক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
[email protected]