ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে
২ অক্টোবর ২০২৫ ১৩:২২
॥ জনি সিদ্দিক ॥
সকাল থেকেই আবহাওয়াটা কেমন গম্ভীর, নীরব ও নিস্তব্ধ হয়ে রয়েছে। যেন ভয়ঙ্কর কিছু ঘটবে! মনে হচ্ছে পৃথিবীটা রাগে ফুলে রয়েছে। সকাল ১০টা। সারা বিশ্বের মন্দির, গির্জা, প্যাগোডাগুলো এবং কিছু কিছু মসজিদ লোকে লোকারণ্য। সবার মুখেই সৃষ্টিকর্তার নাম। জীবনের সকল পাপ-কালিমা ধুয়ে-মুছে পবিত্র করে এই মহাপ্রলয় থেকে রক্ষা করার আবেদন সবার মুখে। কিন্তু আজ হঠাৎ করে বিশ্ববাসীর কি হয়েছে? কীসের মহাপ্রলয়? সবাই হঠাৎ করে একদিনেই এতো ধার্মিক বনে গেলো কেন? যে কুখ্যাত চোর, ত্রাস সৃষ্টিকারী ডাকাত-সন্ত্রাসী; সেও আজ সৃষ্টিকর্তার কাছে কান্নাকাটি করছে! নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে ইহুদি-খ্রিস্টান, হিন্দু-বৌদ্ধ ও অন্য ধর্মাবলম্বীরা তাদের নিজ নিজ উপাসনালয়ে কান্নাকাটি করছে। ঘটনা কী? গড, খোদা, ভগবান, ঈশ্বর ও আল্লাহু আকবার ধ্বনিতে পুরো বিশ্ব আজ প্রকম্পিত! পৃথিবী যেন আজ মন্থর হয়ে গেছে। এদিকে আহলে কিতাবদের দেশসমূহে সবাই যখন মহাপ্রলয়ের ভয়ে সদা ভীত, তখন মুসলিম প্রধান দেশসমূহে ঠিক এর কিছুটা বিপরীত অবস্থা বিরাজমান! আহলে কিতাবরা ও কিছুসংখ্যক মুসলমান বাদে প্রায় সবাই নির্ভীক, নিশ্চিন্ত! কীসের মহাপ্রলয়? কীসের মহাতঙ্ক? তারা প্রতিদিনের মতোই কাজকর্ম করছে। আর মনে মনে আল্লাহর জিকির করছে। তাদের মনে নেই কোনো ভয়, নেই কোনো শঙ্কা! এ কেমন দৃশ্য! এ কেমন অবাক কাণ্ড! এক দেশে, এক গ্রামে, এক পৃথিবীতে দুই চিত্র! একদল মানুষ পৃথিবী ধ্বংসের আতঙ্কে ভয়ে জড়সড়, আর আরেকদল মানুষ নির্ভীক, নিশ্চিন্ত!
মুসলমানদের এই বোকামিতে বিধর্মীরা বারবার ধিক্কার দিচ্ছে আর বলছে- তোরা সেকালেও বোকা একালেও বোকা! তোরা বিজ্ঞানীদের অন্যসব কথায় শুনিস-মানিস, কিন্তু আজ তাদের কথা বিশ্বাস করছিস না? ধিক্কার তোদের শত ধিক্কার! মর আজকে তোরা। ধ্বংস হয়ে যা! অবশ্য ওদের এ কথায় মুসলমানরা কিছু মনে করছে না। বরং তারা আহলে কিতাবদের এই বোকামিতে হাসছে! কারণ ওরা যে শিক্ষিত মূর্খ! ওরা অনেক শিক্ষিত হওয়ার পরেও আল-কুরআনকে বিশ্বাস করে না। ওরা যদি আল-কুরআনকে বিশ্বাস করতো তবে আজ এ অবস্থার সম্মুখীন হতো না। তবে ওদের সঙ্গে দুর্বল ঈমানের কিছু মুসলমানও যোগ দিয়েছে।
আজ ২৯ ফেব্রুয়ারি ৩০০০ সাল। ইয়াওমুল আহাদ বা রবিবার। বিজ্ঞানীদের একটি বিশেষ টিম আন্তর্জাতিক আগাম বিপদ সতর্কতা সংকেত কমিটি নামে একটি সংস্থা খুলেছিলেন আজ থেকে তিন বছর আগে। তারা উদ্ভাবন করেছেন অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি, যা পৃথিবীর কোথায় কোন স্থানে, কখন কোন দুর্যোগ হবে তা দুই দিন আগে বলে দিতে পারে! এমনকি ভূমিকম্পের সংকেতও! অবশ্য কয়েকটি বড় বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগের আগাম সংকেত দিয়ে তারা ইতোমধ্যে সফলও হয়েছেন। তবে আবার ব্যর্থতার পাল্লাও হালকা নয়! আর এই যন্ত্রের সাহায্যেই বিজ্ঞানীগণ জানতে পেরেছেন যে, আজকে সুনামি, প্রথম-দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চেয়েও ধ্বংসাত্মক কিছু একটা ঘটবে! এর লক্ষণ থাকবে যথাক্রমে- ১. সকাল থেকেই আকাশ মেঘাচ্ছন্ন, ২. আবহাওয়া নীরব-নিস্তব্ধ থাকবে, ৩. দুপুরে বৃষ্টি ও প্রচণ্ড বজ্রপাত হবে, ৪. তারপর দুপুর ২টায় মহাপ্রলয় তথা পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে?
এই সংবাদটুকু দুইদিন ধরে সারাবিশ্বে জরুরি ভিত্তিতে সকল মিডিয়ায় প্রচার করা হয়েছে। যারা বিশ্বাস করেছে তারা এ দুই দিন মনে যা ইচ্ছে ছিল তাই করেছে! তবে সুখের খবর কেউ কোনো খারাপ কাজ করেনি! ঠিক যেমনটি সবসময় থাকা উচিত। যাদের টাকা-পয়সা অনেক ছিলো তারা প্রায় সবই গরিব-দুঃখীদের ও নিজ নিজ উপাসনালয়ে দিয়ে দিলো। কিন্তু তারাই বা সেগুলো নিয়ে কী করবে? যদি পৃথিবীই ধ্বংস হয়ে যায়? তবুও তারা তা নিয়ে ইচ্ছামতো সাধ মেটাল! অনেকেরই অনেক কিছুই হলো! সারা বিশ্বের সমস্ত লোকের চোখে-মুখে ভয় আর বিস্ময়! যারা ভেবেছিলো পৃথিবী কোনোদিনও ধ্বংস হবে না, তারা শুধু হায় হায় করছে! কী করতে কী হয়ে গেলো? এখন দুপুর ১টা। আকাশ আরো কালো ও ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে। চারপাশ আলোকিত হয়ে উঠলো। এরপর সবাইকে আরো আতঙ্কিত করতে বিকট শব্দে একটা বাজ পড়লো! দুনিয়াবাসী ভয়ে একেবারে চুপসে গেলো। পরপর আরো কয়েকটি বাজ পড়লো। এতে অনেকেই পরবর্তী অবস্থার কথা চিন্তা করে আতঙ্কে হার্ট অ্যাটাকে মারা গেলো। আর অনেকেই জ্ঞান হারালো! আর যারা তখন পর্যন্ত বিশ্বাস করছিলো না, এখন তারাও তাদের নিজ নিজ উপাসনালয়ে হাজির হতে লাগলো! অনেক মুসলমানও এখন মসজিদে যাচ্ছেন! অবস্থা বেগতিক! মুসলমানরা খ্রিষ্টানদের তামাশার পাত্র হতে যাচ্ছে না তো? চিন্তিত হয়ে পড়েছেন মুসলিম বিশ্বের ইমামবর্গ। মুসলিম বিশ্বের প্রধান ইমাম ড. আহমদ বিন আব্দুল্লাহ দ্রুত বড় আলেমদের তার সভাকক্ষে উপস্থিত করলেন। ভাবলেন কী করা যায়। সবাই মিলে একটা সিদ্ধান্ত নিলেন। এর পনেরো মিনিটের মধ্যে সকল মিডিয়াকে প্রস্তুত করে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালেন। তাদের এই কর্মকাণ্ড সব জায়গায় দেখানোর জন্য প্রজেক্টর স্ক্রিনের ব্যবস্থা করা হলো। প্রতিটা উপাসনালয়েও এই ব্যবস্থা করা হলো। যেন সবাই মুসলমানদের এই তামাশা দেখতে পারে! এখন দুপুর ১টা বেজে পনের মিনিট। ড. আব্দুল্লাহ বিন আহমদ মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে সর্বপ্রথম সূরা তাকভীর ও সূরা ক্বরিয়াহ তেলাওয়াত করলেন। তারপর বললেন- আপনারা নিশ্চিন্ত থাকুন। পৃথিবী ধ্বংস হবে না! উপস্থিত সাংবাদিকগণ সঙ্গে সঙ্গে তাকে প্রশ্ন ছুড়লেন।
-কেন কেন?
তিনি বলতে থাকলেন- এ কথা সত্য যে, কিয়ামত অত্যাসন্ন! কিন্তু তাই বলে আজকে নয়। কারণ, আমাদের সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এই কিয়ামতের কিছু নির্দিষ্ট লক্ষণ বর্ণনা করেছেন আমাদের ধর্মগ্রন্থ আল-কুরআনে। সূরা আত-তাকভীরের এক থেকে ছয় আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন- ১. যখন সূর্যকে গুটিয়ে ফেলা হবে। ২. তারাগুলো ছড়িয়ে পড়বে। ৩. যখন পাহাড়গুলোকে চলমান করা হবে। ৪. যখন দশ মাসের গাভিন উটকে তার নিজের অবস্থায় ছেড়ে দেয়া হবে। ৫. যখন সব বন্যপশুকে একসাথে জমা করা হবে। ৬. যখন সমুদ্রের তলায় আগুন লাগিয়ে দেয়া হবে। অতঃপর মহান আল্লাহ সূরা ক্বরিয়ার এক থেকে সাত নম্বর আয়াতে বলেছেন- ১. মহাপ্রলয়। ২. কী সে মহাপ্রলয়? ৩. আর আপনি কি জানেন, মহাপ্রলয় কী? ৪. সেদিন মানুষগুলো বিক্ষিপ্ত পঙ্গপালের মতো হয়ে যাবে! ৫. আর পাহাড়গুলো ধুনিত রঙিন পশম বা তুলার মতো উড়তে থাকবে! ৬. তারপর যার আমলনামার পাল্লা ভারী হবে, ৭. সে মনের মতো আরামে থাকবে! এই হলো কিয়ামতের লক্ষণ! অতএব তাহলে ভেবে দেখুন। বিজ্ঞানীগণ ঘোষিত আজকের লক্ষণের সঙ্গে পরিপূর্ণ মেলে কিনা? যদি পরিপূর্ণ না মেলে, তাহলে আজ কিয়ামত হবে না। তবে হ্যাঁ, শুনে রাখুন। কিয়ামত অতি নিকটে। আর কিয়ামতের পূর্বে এমন ভয়ঙ্কর অনেক প্রাকৃতিক দুর্যোগ হবে। তাই বলছি, এখনো সময় থাকতে ইসলাম গ্রহণ করে সত্য পথের পথিক হোন। নয়তো তখন কিন্তু হায় হায় করেও কোনো লাভ হবে না! এখন একমাত্র ইসলামই সত্য! আর ইসলামের বাইরের বর্তমানে সব ধর্মই এখন বাতিল। আমার কথা সত্য না মিথ্যা তা আর কিছুক্ষণ পরেই প্রমাণিত হবে, ইনশাআল্লাহ! আপনারা সবাই অপেক্ষা করুন। আল্লাহ হাফেজ।
এখন দুপুর ২টা বেজে পনেরো মিনিট। পৃথিবীর আকাশে বিপদের কোনো চিহ্ন নেই। কিছুক্ষণ আগের সেই ভয়ংকর অবস্থা এখন আর নেই। আকাশ একদম মেঘমুক্ত। একপাশে ঝলমলে রোদ আর অপর পাশে রাত। কিন্তু তবুও মনে হচ্ছে যেন অন্ধকার নেই! কারণ চারদিকে ইসলামের আলো যে ছড়িয়ে পড়েছে! কীসের মহাপ্রলয় কীসের কেয়ামত? কিছুই হয়নি! উপরন্তু ইসলামের সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে। আহলে কিতাবরা আজ ইসলামের সত্যতা বুঝতে পেরেছে। তাই তো সবাই রাতের অন্ধকার আর দুপুরের তপ্ত রোদ উপেক্ষা করে ইসলাম গ্রহণের জন্য মসজিদের ইমামের নিকট পাগলপারা হয়ে ছুটছে! ইসলামের আগমনে দূর হয়ে গেছে অন্ধকারের অমানিশা!