দাদার সাথে স্মৃতি
৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৪:৪৪
॥ পি এম শরিফুল ইসলাম ॥
দাদার সাথে আনন্দমুখর সেই স্মৃতিগুলো আজ খুব মনে পড়ছে। আমার জন্য তিনি অনেক কষ্ট করেছেন। অনেক বেশি সেক্রিফাইস করেছেন। প্রাইমারি ও হাইস্কুলে অধ্যয়নকালীন দাদা টিফিনে নাশতার জন্য টাকা দিতেন। ছোটবেলায় তাঁর হাত ধরেই দোকানে কিংবা হাটবাজারে যেতাম।
অন্তিম মুহূর্তে তাঁর কষ্ট- যন্ত্রণার কথা মনে পড়লে চোখ বেয়ে অশ্রুর ঝর্ণাধারা প্রবাহিত হয় এখনো।
সেদিন ফজর নামাজ পড়ে যখন দাদার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে মোনাজাতে মগ্ন ছিলাম, তখন উপলব্ধি করছিলাম- দাদা আজও আমার পাশে দাঁড়িয়ে পরম আদরে স্নেহের হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন আমার মাথায় ও মুখাবয়বে।
ছোটবেলায় দাদা আমাকে অনেক আদর করতেন। তিনি আমাকে কাঁধে চড়িয়ে মসজিদে, বাজারে, দোকানে নিয়ে যেতেন। বিশেষ করে প্রতি বছর ঈদের আগে গরুর হাটে নিয়ে যেতেন। দোকানে নিয়ে গিয়ে বাটার বান, কেক, বিস্কুট, চা, পরোটা, ডিম, ডালভাজা, চানাচুর, ঝালমুড়ি, বোট, আইসক্রিম, চকলেট, চিপস, জুস কিনে দিতেন। প্রাইমারিতে পড়াকালীন অভাব-অনটন থাকা সত্ত্বেও মাঝেমধ্যে ২-৫ টাকা করে দিতেন কিছু কিনে খাওয়ার জন্য। নিয়মিত আমার পড়াশোনার তদারকি করতেন। নিয়মিত জামাতে সালাত আদায়ের জন্য তাগিদ করতেন এবং আমাকে সাথে করে মসজিদে নিয়ে যেতেন। নামাজ না পড়লে মাঝে মাঝে শাস্তিও দিতেন, পরবর্তীতে যা আমার জন্য পাথেয় হিসেবে কাজ করেছে।
দাদার শাসন-আদরের ভারসাম্যের মধ্যে থাকার কারণে কখনো ভুল কিছু করতে বা বলতে শিখিনি। কখনো কারো সাথে অসদাচরণ, খারাপ ব্যবহার, উচ্ছৃঙ্খল আচরণ বা বেয়াদবি করিনি তেমন।
মনে পড়ে, দাদা ধান কাটা ও রোপণ করার সময় আমাকে ক্ষেতে/মাঠে নিয়ে যেতেন। ধান ছাড়াও তিনি গম, ভুট্টা, আলু, মিষ্টি আলু, ঢ্যাঁড়শ, ফুলকপি, টমেটো, বেগুনসহ বিভিন্ন ধরনের খাদ্যশস্য ও শাকসবজি ফলাতেন। আমি নিয়মিত দাদার এসব কাজে সহযোগিতা করতাম।
শীত মৌসুমে যখন ক্ষেতে গম বপন করতেন, তখন ফজর পড়ে কনকনে শীতের মধ্যে চারদিকে বিস্তৃত কুয়াশার জাল মাড়িয়ে থালা-বাটি নিয়ে মাঠে চলে যেতাম শালিক তাড়াবার জন্য। সাথে অবশ্য শুকনো খাবার নিয়ে যেতাম- মুড়ি, চানাচুর, চিড়া, গুড়, শীতকালীন পিঠা। যখন যেটা থাকতো আরকি! যতক্ষণ না সূর্যের আলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ত এবং শালিক পাখিগুলো নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত থাকত, ততক্ষণ গম ক্ষেতের আইলে বসে থাকতাম আর লাঠি দিয়ে থালা-বাটি বাজিয়ে শালিক তাড়াতাম।
একটু বেলা হলে কখনোবা ঘুড়িও উড়াতাম। কাজে ফাঁকি দিলে দাদার বকুনিও কম খাইনি!
তাছাড়া শীতকালীন শাকসবজি যখন লাগাতেন, তখন রোজ সকাল ও বিকেল বেলা গিয়ে খাল থেকে বালতি দিয়ে গাছের চারায় পানি দিতাম। ধান রোপণের আগে ক্ষেতে পানি দিয়ে মই দেওয়ার সময় আমাকে মইয়ের ওপর চড়াতেন। সাথে অবশ্য খানিকটা দুষ্টুমি ও খুনসুটিও থাকত। সেই স্মৃতিগুলো মনে হলে চোখ দুটি অশ্রুতে ভিজে যায়… কতই না মধুর ছিল সোনালি সেই দিনগুলো!
বর্ষা মৌসুমে দাদার সাথে মাঠে গিয়ে ধান কেটে খাল দিয়ে ভাসিয়ে আনতাম। সাথে শাপলা, শালুক, বিভিন্ন ধরনের শাক (মলচা শাক, কলমিশাক, তিতের ডোগা, ঢেঁকিশাক) এবং মাছও ধরে আনতাম।
বাড়ি ফিরে গোসল করে ছোট মাছ দিয়ে রান্না করা দাদির হাতের সেই তরকারি আর ঘরের চাউলের সুস্বাদু ভাত তৃপ্তি ভরে খেতাম। কখনো হাঁসের ডিম, গৃহপালিত মুরগির ডিমও থাকত। এখনকার মতো তখন খাবারের এতটা বিলাসিতা ছিল না। কিন্তু টাটকা শাকসবজি আর খাল-বিলের ছোট মাছের তরকারির স্বাদ এখন হয়তো পাওয়া যাবে না।
মনে পড়ে, মাঠ থেকে এসে গোসল করে আসার পর দাদি বলতেন,
‘শইলে সরিষা তেল মাখ, না হয় গতর চুলকাবে।’
মাঝে মাঝে এমনও হতো যে ধান নিয়ে খাল বেয়ে আসার সময় খালের নিচে পড়ে থাকা ভাঙা শিশি, কাচের বোতলের টুকরো, ভাঙা আয়না কিংবা ভাঙা ঝিনুক ও শামুকের টুকরোতে পা কেটে যেত।
বাড়িতে এলে দাদি বিশেষ এক ধরনের চিকিৎসা করতেন তখন- পায়ের যে অংশটা কেটে যেত, সেখানে পাটকাঠি দিয়ে কেরোসিন মুখে নিয়ে আগুনের ফোঁটা থেরাপি দিতেন, যা আজও স্মৃতির পাতায় অমলিন হয়ে আছে।
প্রতি রমজানে দাদা ইতিকাফে বসতেন। অসুস্থ (স্ট্রোক করে প্যারালাইজড) হওয়ার পর যখন তিনি ঠিকমতো হাঁটতেও পারতেন না, তখনো সর্বশেষ তিনি ইতিকাফে বসেছিলেন। আমি দাদাকে ভোর রাতে সাহরি এবং সন্ধ্যায় ইফতারি দিয়ে আসতাম।
দাদার হাজারো কথা ও কর্মতৎপরতার স্মৃতি হৃদয়ের স্মৃতিপটে অমলিন হয়ে আছে। তাঁর স্মৃতিচারণ করতে গেলে হাজারো ডায়েরির পৃষ্ঠা ভরে যাবে, তবুও শেষ হবে না।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমার দাদার জীবনের সকল ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে তাকে জান্নাতুল ফেরদাউসের মেহমান হিসেবে কবুল করুন। আমিন।
দাদাকে নিয়ে একটি ছড়া
আল্লাহ তোমায় ভালো রাখুক
ঐ কবরের মাঝে
দাদা তোমার কথা মনে
পড়ে সকাল-সাঁঝে।
দাদা তুমি ছিলে যে সৎ,
সাহসী, নির্ভীক-
তাই তো তোমায় করছে স্মরণ
মানুষ, দিগি¦দিক।
দাদা তুমি ছাড়া আমি
খুবই অসহায়;
তোমার কথা পড়লে মনে
অশ্রু বয়ে যায়।
তুমি ছাড়া গৃহটা আজ
অশান্তিতে ভরা;
সবাই সবার স্বার্থ খুঁজে
সুখ পাতা যে ঝরা।
উল্লেখ, আমার প্রাণাধিক প্রিয় দাদাজান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ডাকে সাড়া দিয়ে পরপারে পাড়ি জমিয়েছিলেন ১৫ জানুয়ারি ২০২০ সালে, সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে তিনি ইন্তেকাল করেন।