তারুণ্যের অবক্ষয়, কিন্তু কেন?
৩১ জুলাই ২০২৫ ১৪:৫৯
মুশিউর রহমান
প্রত্যেকেরই একটা অহংকার থাকে। মানুষের অহংকার তার তারুণ্য। জীবনের এক বিশেষ অধ্যায়ের নাম তারুণ্য। তারুণ্য হলো অসাধারণ অনুপম সুন্দরের স্রষ্টা এবং অসাধ্য সাধনের পারঙ্গম কারিগর। তরুণ্য এক প্রতিবাদী সত্তা, যার কোনো অন্যায়-অনাচার সহ্য হয় না। যেখানে প্রতিকারহীন মানবতা বার বার অশ্রু গড়িয়ে বোবা কান্নায় মুষড়ে পড়ে, সেখানেই সে রূপান্তরিত হয় সিংহ দিল্লির যোদ্ধা পুরুষে। জাতিসংঘ ২৫ বছরব্যাপী সুুন্দর সময়কে তারুণ্য হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সকল অসম্ভবই এ তারুণ্যের দ্বারা সম্ভব।
“ধূসর মরুর ঊষর বুকে
বিশাল যদি শহর গড়ো
একটা জীবন সফল করা
তার চাইতে অনেক বড়।”
ওমর খৈয়ামের কথাটি যেন আজ বাস্তবে পরিণত হচ্ছে। বর্তমান তরুণরা যদিও নিজেদের সফলভাবে, কিন্তু তারা অনেকাংশেই ব্যর্থ। কেননা সফলতার যে একটি অন্যতম দিক নৈতিকতা, সততা, দেশপ্রেম এবং চারিত্রিক মূল্যবোধের সমন্বয়। এই ক্ষেত্রটির সফলতা বর্তমান সময়ের অধিকাংশ তরুণরা অর্জন করতে পারেনি। তারুণ্য আজ আধুনিকতার নামে পাশ্চাত্যের অপসংস্কৃতির নীল ছোবলে হারিয়ে যাচ্ছে সময়ের আবহে। ধ্বংস হতে চলেছে শতাব্দীর কারিগর এ তরুণসমাজ।
কেমন ছিল তারুণ্যের অতীত
ইতিহাসের সকল কল্যাণ, সুন্দর ও ঐতিহ্যের রূপকার তরুণ। তারুণ্যের শক্তিতেই ১০ বছরের প্রত্যয় দীপ্ত বালক আলী পেরেছিল আবু লাহাব, আবু জাহেল, উৎবা, শাইবাদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে প্রিয় নবীজির পাশে দাঁড়াতে। তরুণ সেনাপতি খালেদ পেরেছিলেন মুসলিম জাহানের সীমানাকে বিস্তীর্ণ করার জন্য রোম-পারস্যের বুকে একের পর এক হৃদয় কম্পন সৃষ্টি করতে। ১৭ বছর বয়সের তরুণ মোহাম্মদ বিন কাসেম সক্ষম হয়েছিল সিন্ধু পাড়ি দিয়ে ভারতবর্ষে ইসলামের মশাল জ¦ালতে। বাঙালির অহংকার একুশে ফেব্রুয়ারি। সেদিন ভাষার জন্য অকাতরে জীবন বিলিয়ে দিলেন সালাম, বরকত, রফিক, শফিক, জব্বারের মতো তরুণরা। মুক্তিযুদ্ধেও সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল তরুণরা। ‘গণতন্ত্রের মুক্তি চাই’ স্লোগানে সুসজ্জিত হয়ে মৃত্যুর কাছে আত্মসমর্পণকারী তরুণ নূর হোসেনের স্মৃতি আজ আমাদের কাছে গর্ব। “জান্নাতের সিঁড়িতে দেখা হবে মা” বলে রাজপথে স্লোগানে মেতে ওঠা তরুণ আমির হোসাইন আর তার সঙ্গী হাফেজ আব্দুর রহিম আমাদের অহংকার। মাত্র ১২ বছরের কিশোর আকবর, যুবক বাবর পেরেছিলেন বিশাল ভারতবর্ষে নতুন ইতিহাস রচনা করতে। তারুণ্যদীপ্ত বখতিয়ার পেরেছিলেন ১৭ সাওয়ারি নিয়ে বাংলার মানুষের মুক্তিদাতা হিসেবে আবির্ভূত হতে। ক্রীড়াঙ্গনের রেকর্ড কারা গড়ছে? টেনিস র্যাংকিংয়ের অবিশ্বাস্য রেকর্ড গড়েছে হিঙ্গস, স্টেফি। ক্রিকেটের রেকর্ড করেছে শচীন, আফ্রিদি, আজহার, আকরাম, লারা, জয়সুরিয়াসহ নাম না জানা অসংখ্য তরুণ। মায়ের আঁচলে মুখ লুকিয়ে কেঁদে নয়, বোনের স্নেহের ডোরে বাধা পড়ে নয়, বাবার শক্ত চাহনিতে ঘরের আড়ালে লুকিয়ে নয়, ঘরের বাঁধন কেটে পিছুটান মুক্ত হয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়া তরুণরাই আমাদের শ্রেষ্ঠ সম্পদ।
কেমন আজকের তারুণ
ইতিহাস যখন তারুণ্যের জয়গান বায়, তখনই বর্তমান তরুণসমাজ আমাদের ভাবিয়ে তুলছে। ঘটনা দুর্ঘটনার শিকার কিংবা নায়ক যাই হোক না কেন প্রতিদিনের কাগজের পাতা উল্টালেই তরুণ তরুণীদের ছবি আমাদের আতঙ্কিত করে তোলে। মাত্র বার বছরের তরুণ ঈসা, আঠারো বছরের টগবগে তরুণ তারেক কাসেন, উনিশ বছরের তরুণী ইয়াসমীন, চৌদ্দ বছরের তরুণী ঐশী, ষোড়শি এলিয়েদা, বাইশ বছরের রাসেল কেন ওদের এই ভয়ঙ্কর পরিণতি? চৌদ্দ বছরের ঐশী মা-বাবার উপস্থিতিতেই বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে মেতে উঠে তুমুল আড্ডায় ইন্টারনেট ডিজের বিরাট আয়োজনে হেরে যায় তার কিশোরী মন বন্ধুদের হাতে নির্মমভাবে বিকিয়ে দিতে হয় তার সতীত্ব। অবশেষে মাদকাসক্ত হয়ে খুন করে বসে আপন বাবা মাকে। ষোড়শি এলিয়েদা এক গন্তব্যহীন গাড়িতে গিয়ে হেরোইনসহ ধরা পড়ে বাংলাদেশে। পরে মার্কিন মুল্লুক থেকে উদ্ধারকারী দল এসে তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যায়। বার বছরের ইসা মা-বাবার অনুপস্থিতিতে বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে মেতে উঠে তুমুল আড্ডায়। ডিশ, ইঈজ এর বিরাট আয়োজনের কাছে হেরে যায় ওর কিশোরী মনের কোমলতা। বন্ধুদের হাতে নির্মম, নির্দয়ভাবে প্রাণ হারাতে হয় তাকে। প্রেমের মহড়ায় আবেগাপ্লুত তরুণ রাস্তাঘাট স্কুল কলেজ পার্ক স্ট্রিট সর্বত্র উত্ত্যক্ত করছে নারীকে। প্রত্যাখ্যাত হলে হয় এসিডে দগ্ধ করছে সুন্দর মুখের সেই মেয়েটিকে, না হয় তুলে নিয়ে রাতভর নির্যাতন করে, হাত কেটে, গলা কেটে ফেলে রাখছে রাস্তার ধারে। মডেলিং এর নামে ইচ্ছেমতো ফটোসেশনের ফলে ব্লাকমেইলের শিকার হচ্ছে অনেক সুন্দরীরা। তরুণসমাজ আজ মাদক আসক্ত হয়ে পড়ালেখা লাটে তুলছে। এভাবে ধ্বংস হচ্ছে অসংখ্য তরুণ তরুণী।
কিন্তু কেন এমন হয়:
তরুণদের অবক্ষয়ের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে পাশ্চাত্যমুখী চিন্তা-চেতনা এবং সংস্কৃতি। তারা এমন পাশ্চাত্যকে গ্রহণ যেখানে প্রতি সাতাশ সেকেন্ডে একজন করে মেয়ে ধর্ষিতা হয়, যেখানে তিন দিনের বেশি একটি বিয়ে স্থায়ী হয় না, যেখানে ৪৩ শতাংশ মানুষ জারজ সন্তান, যেখানে সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যা ঘটে। তরুণ প্রজন্মের অবক্ষয়ের আরেকটি কারণ হলো অপরিকল্পিত, অনুপযোগী, অসুন্দর শিক্ষা ব্যবস্থা। পাশাপাশি পিতা-মাতার যথোপযুক্ত প্যারেন্টিং না করার কারণে আমাদের তরুণ প্রজন্মের অবক্ষয় হচ্ছে। তরুণ প্রজন্মের অবক্ষয়ের অনেকগুলো কারণের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণ হলো ধর্মহীনতা। আপনি যেই ধর্মে অনুসারী সেই ধর্মের অনুশাসন যথাযথভাবে পালন করতে হবে। জন হাপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট স্টিভেন মুলার বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অতীব দক্ষ বর্বর তৈরি করছে, কেননা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে কোনো ধর্মীয় শিক্ষা নেই। যদিও তারা ক্রমাগত সেই মূল্যবোধের অনুসন্ধান করে যাচ্ছে।’
সর্বোপরি বলতে চাই- এই ধ্বংস প্রায় তরুণ প্রজন্মকে নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। তাদের মাঝে মেধা, দেশপ্রেম, চারিত্রিক মূল্যবোধ এবং ধর্মীয় অনুশাসনের সমন্বয় ঘটিয়ে তাদের অবক্ষয় থেকে উদ্ধার করতে হবে।
লেখক: শিক্ষার্থী এবং সংগঠক।