বাংলা ভাষায় নবীপ্রেমের কবিতা ও গান
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:২৯
॥ ইবরাহীম খলিল ॥
বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সা.-এর শানে কবিতা এবং গান নেহাত কম না। নবী সা.-কে নিয়ে বাংলা ভাষায় সাহিত্য রচনা অর্থাৎ কবিতা ও গান লেখায় যারা অগ্রগামী, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তার ক্ষুরধার লেখনী এবং সুরে সবচেয়ে চমৎকার সৌন্দর্য ফুটে উঠে রাসূল সা.-এর প্রসংশা, কৃতিত্ব এবং গুণগান। তিনি রাসূলের সা. প্রেমে অনেক ইসলামী গান ও কবিতা লিখেছেন। তার বিখ্যাত কবিতার মধ্যে রয়েছে ‘ফাতিহা-ই-দোয়াজ্ দহম’ এবং অসংখ্য নাত ও গজল; যেমন— হে মোহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
বলতে গেলে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম মহানবী হযরত মুহাম্মদ সা.-এর প্রেমে অসংখ্য অমর ইসলামী গান, গজল ও কবিতা রচনা করেছেন। বিখ্যাত কিছু গান ও কবিতা— ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মদ এলো রে দুনিয়ায় : এটি রাসূল সা.-এর আগমন উপলক্ষে লেখা তাঁর অন্যতম সেরা ও জনপ্রিয় গান। হে রাসূল! হে হাবিব! নবীজির প্রতি গভীর ভালোবাসা ও আকুলতা প্রকাশ পেয়েছে এই গানে।
কবি কাজী নজরুলের গানে রাসূল সা.-এর সুন্দর চরিত্র, আদর্শ ও মানবতার বাণী ফুটে উঠেছে। আরবি ও ফার্সি শব্দের সুন্দর ব্যবহারের মাধ্যমে তিনি বাংলা ইসলামী গানকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তিনি গেয়ে উঠেছেন, রাসূল সা.-এর পৃথিবীতে আগমনকেন্দ্রিক গানে কবি লিখেছেন,‘তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে/মধু পূর্ণিমারই সেথা চাঁদ দোলে/যেন ঊষার কোলে রাঙা রবি দোলে।’ রাসূলের শানে নজরুল নিবেদন করেছেন তার কবিতার তোহফা, গজলের সুরে সুরে গেয়েছেন রাসূলের মহব্বতের গীতমালা।
এ কথা অকপটেই বলা যায়, কবি কাজী নজরুল আমাদের নবী বিশ্বমানবতার মুক্তিদূত, স্বাধীনতার মুক্তির সনদ হযরত মুহাম্মদ সা.-এর প্রতি যে বর্ণনাতীত ভালোবাসা, প্রেম ও শ্রদ্ধা দেখিয়েছেন, তা আর কোনো বাঙালি সাহিত্যিক দেখিয়ে যাননি। কী তার গান, কী কবিতা সব জায়গায় তিনি রাসূলপ্রেমের এক দ্যুতি ছড়িয়েছেন। তিনি তার সবকিছু নবীপ্রেমে সঁপে দিয়েছেন আর নিজেকে রাসূল সা.-এর প্রেমে। যেমনটি কবি বলেন, ‘সাহারাতে ফুটল রে ফুল/রঙিন গুলে লালা।/সেই ফুলেরই খোশবুতে/আজ দুনিয়া মাতোয়ালা’।
কবির রচনায় এসেছে— ‘জেগে ওঠ তুই রে ভোরের পাখি, নিশি প্রভাতের কবি!/লোহিত সাগরে সিনান করিয়া উদিল আরব-রবি।’ তিনি আরও বলেন, ‘নহে আরবের, নহে এশিয়ার, বিশ্বে সে একদিন,/ধূলির ধরার জ্যোতিতে হ’ল গো বেহেশত জ্যোতিহীন!’ কবি তার অন্য কাব্যগ্রন্থে লেখেন, ‘উঠেছিল রবি আমাদের নবী, সে মহা-সৌরলোকে,/ওমর, একাকী তুমি পেয়েছিলে সে আলো তোমার চোখে!’ রাসূল সা.-কে আল্লাহপাক দুনিয়ার বুকে পাঠিয়েছেন সব ধরনের ভেদাভেদ, হানাহানি-মারামারি ভুলিয়ে মানুষের মাঝে প্রেম-প্রীতি আর ভালোবাসা কায়েম করার জন্য। তিনি এ ধরায় এসে আইয়্যামে জাহেলিয়াতের এক বর্বর যুগের মানুষদের তৈরি করলেন পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে স্বর্ণের মানুষ রূপে। কবি তাই সেই তরুণ নবীর জয়গান গেয়ে বলেন, ‘দেখিতে দেখিতে তরুণ নবীর সাধনা-সেবায়/শত্রু মিত্র সকলে গলিল অজানা মায়ায়।’/‘মুহাম্মদের প্রভাবে সকলে হইল রাজী,/সত্যের নামে চলিবে না আর ফেরেব-বাজী!’
মানবতার কবি কাজী নজরুল ইসলাম মানবের মহান শিক্ষকের কাছ থেকে সওদা নিয়ে পাপমুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন এভাবে— ‘ইসলামের ঐ সওদা লয়ে/এল নবীন সওদাগর/বদনসিব আয়, আয় গুনাহগার/নতুন করে সওদা কর।/জীবন ভরে করলি লোকসান/আজ হিসাব তার খতিয়ে নে/বিনি মূলে দেয় বিলিয়ে সে যে বেহেশতি নজর।’
মুসলিম জাগরণের কবি কাজী নজরুল ইসলামের অসংখ্য গান ও কবিতায় রাসূল সা.-এর প্রতি তার হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা প্রকাশমান। আট বছরের শিশু বয়সে মসজিদে চাকরি নেওয়ার মাধ্যমে রাসূলের প্রতি তার যে দরদের শুরু হয়েছিল বাকরুদ্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত তা চালু ছিল। বিভিন্ন সময়ে মনোভাবে বঞ্চনার শিকার হলেও কবি তার আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি কখনো।
বাংলা ভাষা মহানবী হযরত মুহাম্মদ সা.-এর সিরাত রচনায় কবি গোলাম মোস্তফার কৃতিত্ব অবিস্মরণীয়। তার কবিতা গানের বেশিরভাগ-ই রাসূলপ্রেমে উজ্জীবিত। তার রচিত বিশ্বনবী গদ্য গ্রন্থ যেমন বাঙালি পাঠক সমাজে ব্যাপক সমাদৃত; তেমনি তার রচিত ‘ইয়া নবী সালাম আলাইকা’ কবিতা খানি মুসলিম ঘরে ঘরে ও মিলাদ মাহফিলে বহুল পঠিত। তাছাড়া রাসূল সা.-এর প্রশংসায় তার রচিত ‘নিখিলের চিরসুন্দর সৃষ্টি আমার মুহাম্মদ রাসূল,’ ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মদ রাসূল’ ইত্যাদি গান- কবিতা মুসলিম সমাজে ব্যাপক জনপ্রিয়। সাহিত্য জীবনের শুরুর দিকেই তিনি ‘হযরত মুহাম্মদ’ কবিতা রচনা করেন।
এই ঘোর দুর্দিনে এলো কে গো বিশ্বে,
উজলিয়া দশদিশি, তরাইতে নিঃস্বে!
মুখে তার প্রেমবাণী, করুণা ও সাম্য,
বিশ্বের মুক্তি ও কল্যাণ কাম্য।
ইসলামী ভাবধারার কবি ফররুখ আহমদ রাসূল সা. ও ইসলামের শানে চমৎকার কাব্যিক পঙক্তি রচনা করেছেন। বাংলা ভাষায় ইসলামী সঙ্গীতের ধারাটি খুব বেশি সমৃদ্ধ নয়। বিগত শতকে কবি কাজী নজরুল ইসলামের হাতে প্রথম আধুনিক ইসলামী সঙ্গীতের ধারাটির সূচনা এবং তার হাতেই এর সাফল্যজনক বিকাশ ঘটে। পরবর্তীতে আমাদের প্রখ্যাত কবিদের অনেকেই ইসলামী সঙ্গীত রচনা করেছেন, কিন্তু তা যথেষ্ট নয়। এ প্রেক্ষাপটে ফররুখ আহমদের রচিত ইসলামী গানগুলো আমাদের ইসলামী সঙ্গীতের ধারাকে সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে মূল্যবান অবদান রেখেছে।
বাংলা সাহিত্যে কালজয়ী নাতে রাসূল সা. রচনা করেছেন কবি মতিউর রহমান মল্লিক। তিনি লিখেছেন—
রাসূল আমার ভালোবাসা
রাসূল আমার আলো আশা
রাসূল আমার প্রেম বিরহের মূল আলোচনা
রাসূল আমার কাজে কর্মে অনুপ্রেরণা ॥
রাসূলের প্রেমে মাতোয়ারা কবি রাসূলের নামকে ভালোবেসে তিনি পৃথিবীকে ভালোবেসেছেন। .
‘পাখি তুই কখন এসে বলে গেলি
মুহাম্মদের নাম,
যে নাম শুনে পৃথিবীকে
ভালোবাসিলাম।’
আবার জীবনের সবকিছুর অনুপ্রেরণা হিসেবে রাসূলের সা. কাছে সমর্পণ করলেন নিজের সমস্ত কথা-আলোচনা। ফলে মূলত আল্লাহকে ভালোবাসার নজির দেখিয়েছেন।
আধুনিক কবিদের মধ্যে আসাদ বিন হাফিজসহ অনেক সমসাময়িক কবি রাসূলের সা. গুণকীর্তন করে আধুনিক যুগের উপযোগী সুন্দর কবিতা ও গজল লিখেছেন। কবি আসাদ বিন হাফিজ রাসূলুল্লাহ সা.-এর গুণকীর্তন করে আধুনিক যুগের উপযোগী চমৎকার সব কবিতা ও গজল রচনা করেছেন। তার লেখনীতে মহানবী সা.-এর আদর্শ, মানবতাবোধ এবং বর্তমান অবক্ষয়গ্রস্ত সমাজে তার শিক্ষার প্রাসঙ্গিকতা অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।
কবি উচ্চারণ করলেন, ঝড়ের রাতে পথ হারিয়েছে আধুনিক এই তরণী,
ভোগের আগুনে পুড়ছে দেখ সবারে এই ধরণী।
সভ্যতার এই চকমকি আলোয় চারদিকে শুধু আঁধার,
এই দুনিয়ায় তুমিই হে নবী,
শাশ্বত আলোর মিনার।
কবি গাইলেন—
তুমি এলে তাই দূর হলো সব,
জাহেলিয়াতের ঘোর,
তুমি এলে তাই পুব আকাশে, হাসলো নতুন ভোর।
ইয়া রাসূলুল্লাহ, ইয়া হাবিবাল্লাহ… তোমার আলোয় ধন্য হলো, মক্কা ও মদিনা।
আজকে মানুষ কলকব্জায়,
হারিয়েছে তার মন,
পাথরের মতো হয়ে গেছে আজ,
আপন ও পরজন।
তোমার ক্ষমার পরশ পেলে,
জুড়ায় সবার বুক,
তোমার দেখানো পথেই আছে, চিরকালের সুখ।
ইয়া রাসূলুল্লাহ, ইয়া হাবিবাল্লাহ…
কবি গোলাম মোহাম্মদ (১৯৫৯-২০০২) ইসলামী ও জাতীয় চেতনার এক প্রথিতযশা কবি ও গীতিকার, যিনি মহানবী হযরত মুহাম্মদ সা.-এর শানে বেশকিছু সুন্দর কথা ও গান রচনা করেছেন। তার লেখা ‘রাসূল মানে খোদার হাবীব’ বা বিভিন্ন ইসলামী গান ও কবিতা বেশ জনপ্রিয়।
কবি মোশাররফ হোসেন খান বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত ইসলামী ও ঐতিহ্যবাদী ধারার কবি, যিনি তার বহু কবিতা এবং গানে রাসূলুল্লাহ সা.-এর প্রতি গভীর প্রেম, তার আদর্শ ও সিরাত ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি রাসূল সা.-কে নিয়ে বেশকিছু জনপ্রিয় হামদ, নাত এবং কবিতা রচনা করেছেন।
কবি জাকির আবু জাফর ইসলামিক সাহিত্য, কবিতা ও ইসলামী সংগীতে (হামদ-নাত) এক পরিচিত নাম। রাসূলুল্লাহ সা.-এর শানে লেখা তার কবিতা এবং গানগুলো শ্রোতাদের মাঝে গভীর আবেগ ও ভালোবাসার সৃষ্টি করে।
কবি ও গীতিকার আবু তাহের বেলাল ইসলামী ভাবধারার সাহিত্যচর্চায় এবং রাসূলুল্লাহ সা.-এর শানে নাতে রাসূল বা ইসলামী সংগীত রচনায় একটি সুপরিচিত নাম। আবু তাহের বেলালের রাসূল সা. বিষয়ক লেখার বৈশিষ্ট্যগভীর নবীপ্রেম। তার লেখা গানে ও কবিতায় রাসূলুল্লাহ সা.-এর প্রতি অগাধ ভালোবাসা, শ্রদ্ধা এবং মদিনার প্রতি ব্যাকুলতা প্রকাশ পায়।
কবি ও গীতিকার আমিনুল ইসলাম (অথবা শিল্পী মো. আমিনুল ইসলাম) মূলত তার চমৎকার ইসলামী সঙ্গীত, হামদ ও নাতে রাসূল সা.-এর জন্য বেশ পরিচিত। তিনি বেশ কিছু হৃদয়স্পর্শী নাতে রাসূল বা রাসূলুল্লাহ সা.-এর শানে গান ও গজল লিখেছেন এবং গেয়েছেন।
মদিনার ঐ নূরানী হাওয়া
আমায় তোরা দে না এনে দে না…
যেথায় ঘুমে আছেন আমার
নবীজি কামলীওয়ালা…
লেখক : সিনিয়র রিপোর্টার, দৈনিক সংগাম।