কবি গোলাম মোহাম্মদের ‘হে সুদূর হে নৈকট্য’ শব্দের সৈকতে আধ্যাত্মিক অবগাহন
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:২৪
॥ মুহাম্মদ আবুল হুসাইন ॥
আশির দশকের বাংলা কবিতায় গোলাম মোহাম্মদ (১৯৫৯-২০০২) এক নিভৃতচারী অথচ প্রদীপ্ত নক্ষত্র। তার কাব্যজগৎ কেবল শব্দের কারুকার্য নয়, বরং তাতে রয়েছে কবির অন্তর্জগতের গভীর অভিব্যক্তি। ‘হে সুদূর হে নৈকট্য’ কাব্যগ্রন্থটি কবির আধ্যাত্মিক অভিযাত্রার এক প্রামাণ্য দলিল, যেখানে জীবনের নশ্বরতা, স্রষ্টার প্রতি অকৃত্রিম প্রেম এবং প্রকৃতির মরমী রূপ একাকার হয়ে গেছে।
এই গ্রন্থের কবিতাগুলো একক কোনো সুরে বাঁধা নয়; বরং এগুলো যেন বিভিন্ন মানসিক, দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক অনুভবের সমান্তরাল যাত্রা— কখনো নগরজীবনের সমালোচনা, কখনো গভীর ব্যক্তিগত একাকিত্ব, আবার কখনো আধ্যাত্মিক আত্মসমর্পণ।
বাংলা কবিতার মানচিত্রে আশির দশক ছিল নানা বাঁকবদলের সময়। আধুনিকতার নামে যখন বিজাতীয় অনুকরণ আর নাস্তিক্যবাদের জয়গান বাজছিল, তখন গোলাম মোহাম্মদ অত্যন্ত ধীরলয়ে উচ্চারণ করেছেন বিশ্বাসের অমিয় বাণী। ‘হে সুদূর হে নৈকট্য’ কাব্যগ্রন্থ কবি এখানে কেবল শব্দ সাজাননি, বরং তার হৃদয়ের রক্তক্ষরণ আর স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভের ব্যাকুলতাকে ছন্দবদ্ধ করেছেন। তিনি এমন এক ‘শব্দের সৈকতে’ আমাদের নিয়ে যান, যেখানে নীল চোখের মুগ্ধতা আর রহস্যের বিচিত্র ভ্রমণ আমাদের সাধারণ দৃষ্টিকে অতীন্দ্রিয় জগতের দিকে ধাবিত করে।
১. নাম কবিতার দার্শনিক ব্যঞ্জনা : সুদূর ও নৈকট্যের মিলন
কাব্যগ্রন্থের নাম কবিতাটি মূলত পুরো বইয়ের মূল সুর বা ‘কি-নোট’। এখানে ‘সুদূর’ হলো সেই পরম সত্তা, যিনি ধরাছোঁয়ার বাইরে, অসীম। আর ‘নৈকট্য’ হলো সেই অনুভূতি, যা মুমিনের হৃদস্পন্দনে মিশে থাকে। কবি যখন বলেন— ‘চোখ বুজলেই থেমে যায় আলোর প্রিজম/দিন রাত, রাত দিন সমতল অবসর যেন শিল্পখণ্ড।’
তখন বোঝা যায়, তিনি জাগতিক আলোর চেয়ে অন্তরের আলোর ওপর বেশি আস্থাশীল। কবির দৃষ্টিতে পৃথিবীটা এক ক্ষণস্থায়ী সরাইখানা। তিনি জীবন ও মৃত্যুকে আলাদা করে দেখেননি, বরং বলেছেন, ‘প্রসারিত নিদ্রার মধ্যেই অনন্ত জীবনের শুরু।’
এই পঙক্তিটি কবির মৃত্যু-পরবর্তী জীবনের প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও প্রস্তুতির স্বাক্ষর বহন করে।
২. আধুনিক নগরজীবনের অবক্ষয় ও প্রকৃতিপ্রেম : এই কাব্যগ্রন্থের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আধুনিক নগরজীবনের তীব্র সমালোচনা। তিনি আজকের নগরকে ‘ভোগের নগর’ ও ‘মাতাল নগর’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
প্রকৃতি এই কাব্যগ্রন্থে একটি গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়। ‘রক্তজবা’, ‘আলোর আবাহন’ কিংবা ‘ছোট্ট রাখাল’— এসব কবিতায় প্রকৃতি হয়ে ওঠে শান্তি, সৌন্দর্য ও পুনর্জন্মের প্রতীক। নগরের কৃত্রিমতার বিপরীতে প্রকৃতি এখানে এক নির্মল বিকল্প জগৎ তৈরি করে।
কবি গোলাম মোহাম্মদ নিসর্গকে দেখেছেন স্রষ্টার নিপুণ কারুকাজ হিসেবে। কিন্তু আধুনিক যান্ত্রিক নগর সভ্যতার কৃত্রিমতা তাকে পীড়িত করেছে।
‘মাতাল নগর’ কবিতায় শহরকে কবি দেখেছেন এক নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতীক হিসেবে। মানুষের কৃত্রিম জীবনযাপনের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘ঘুমের বড়ির খোঁজ শিখেছে মানুষ/কৃত্রিম বাঁচার জ্বালা শরীরে ভীষণ।’
ভোগবাদ, বিচ্ছিন্নতা এবং কৃত্রিমতার বিরুদ্ধে তার ক্ষোভ স্পষ্ট— ‘যেটুকু সবুজ ছিল ভালোবাসা ছিল/মানুষে মানুষে ছিল সতেজ বন্ধন/ধোঁয়াহীন বিষহীন শোকহীন ছিল।’
তিনি নগর জীবনকে ‘ঐক্যহীন দায়হীন দেশপ্রেমহীন’ বলেছেন। এই ধরনের উচ্চারণ কেবল আবেগ নয়, বরং এক সামাজিক অবস্থানের প্রকাশ। এখানে কবি একজন প্রত্যক্ষদর্শী, যিনি নগরের ভেতর দাঁড়িয়ে তার ভাঙনকে চিহ্নিত করছেন।
এই যান্ত্রিকতা থেকে মুক্তি পেতে তিনি ফিরে যেতে চান প্রকৃতির কাছে। ‘কেন এত কষ্ট কেন এত সুখ’ কবিতায় কবির প্রকৃতি চেতনা এক অনন্য উচ্চতা লাভ করে। শিউলি তলার ঝরা ফুল, আমন ক্ষেতের রোদ আর নদীর মমতা তাকে বিমুগ্ধ করে। তিনি প্রশ্ন করেন— ‘প্রিয়জনের মুখ কেন বার বার মনে পড়ে/নুয়ে পড়া আমন ক্ষেতে অঘ্রাণের রোদ যেমন আহ্লাদে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।’
৩. মৃত্যুদর্শন : এক শৈল্পিক আলিঙ্গন : গ্রন্থটির একটি শক্তিশালী স্তম্ভ হলো মৃত্যু-চেতনা। সাধারণত মানুষের কাছে মৃত্যু এক বিভীষিকা, কিন্তু গোলাম মোহাম্মদের কবিতায় মৃত্যু এক পরম বন্ধু বা প্রশান্তির ছায়া। ‘মৃত্যুর সাথে’, ‘শোক সংবাদ’ বা ‘নীল মৃত্যুর মুখোমুখি’— এসব কবিতায় মৃত্যু কোনো ভয়াবহ সমাপ্তি নয়; বরং এক অনিবার্য সহচর। ‘মৃত্যুরা আমাদের পিছে পিছে হাঁটছে’— এই উপলব্ধি জীবনের প্রতি এক ধরনের তীক্ষè সচেতনতা তৈরি করে। কবি যেন মৃত্যুর উপস্থিতির মধ্য দিয়েই জীবনের গভীরতর অর্থ খুঁজে পান।
তার কাছে মৃত্যু কোনো সমাপ্তি নয়, বরং মহাজাগতিক ভ্রমণের শুরু। কবির ভাষায় :
‘কবির সোনার কাঠিতে নড়ে ওঠে মৃতজীর্ণ ঘাসহীন/প্রান্তর।… গৃহবধুর ভাঁজ করে রাখা কাপড়ের মত / কবি গুছিয়ে রাখেন নিজের কফিন।’
কফিন গুছিয়ে রাখার এই চিত্রকল্পটি বাংলা সাহিত্যে বিরল। এটি কবির আধ্যাত্মিক পূর্ণতা ও পরকালমুখিতার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। আবার ‘রাত’ কবিতায় তিনি রাতকে কেবল অন্ধকারের আধার হিসেবে দেখেননি, বরং একে ইবাদতের এক অনন্য সুযোগ হিসেবে দেখেছেন— ‘তোমার বিনীত রাত সিজদায় হতে পারে/ঝলমলে আলোক রঙিন।’
৪. মানবিকতা ও নারীত্বের মর্যাদা
গোলাম মোহাম্মদের কবিতায় নারী কোনো সস্তা কামনার বস্তু নয়, বরং তিনি নারীকে দেখেছেন মমতা, পবিত্রতা এবং জান্নাতের সুবাস হিসেবে। ‘রক্তজবা’ কবিতায় একটি ছোট মেয়ে বা কন্যাশিশুর উপস্থিতি যেভাবে তিনি বর্ণনা করেছেন, তা অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী— ‘আমি ভাবতে লাগলাম মেয়ে না থাকলে পৃথিবী কত বর্ণহীন হতো/ফুল না থাকলে বাগান যেমন অর্থহীন লাগে।’
তিনি কন্যাসন্তানকে ‘হুরের মত’ এবং তাদের উপস্থিতিকে ‘বিকেল জান্নাত’ বানিয়ে দেওয়ার সাথে তুলনা করেছেন। এটি ইসলামী মূল্যবোধে নারীর উচ্চাসনেরই এক কাব্যিক বহিঃপ্রকাশ।
৫. স্বদেশপ্রেম ও ইতিহাসের চালচিত্র : কবি গোলাম মোহাম্মদ কেবল আধ্যাত্মিক নন, তিনি ছিলেন একজন সচেতন দেশপ্রেমিক। ‘ভালোবাসার ফটোশপ’ কবিতায় তিনি বাংলাদেশের শেকড় ও ইতিহাসকে তুলে ধরেছেন। বুড়িগঙ্গার তামাটে মানুষ, তিতুমীরের পাগড়ি আর বায়তুল মোকাররমের আজান তার কবিতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি ঘোষণা করেন,
‘তিতুমীরের পাগড়ি আমাদের ভালবাসার ফটোশপ/রজব আলীর লোহাকাঠের মত রুখে দাঁড়ানো/বর্গী তাড়ানোর কাজিয়া এখন আমাদেরা রপ্ত।’
ঢাকার উঁচু মিনার আর স্বাধীনতার গর্বিত ফলককে তিনি এক সুতোয় গেঁথেছেন, যা তার জাতীয়তাবাদী ও ধর্মীয় পরিচয়ের এক সুন্দর সমন্বয়।
৬. মুসলিম উম্মাহর আর্তি ও প্রতিবাদী কণ্ঠ : ‘আনারফুলের গ্রাম’ ও ‘ভালোবাসার ফটোশপ’ কবিতাগুলোয় কবি ব্যক্তিগত অনুভবের গণ্ডি পেরিয়ে বৃহত্তর ইতিহাস ও মানবিক সংকটের দিকে নজর দেন। যুদ্ধ, ধ্বংস, বৈশ্বিক নিপীড়ন— এসব বিষয় তার কবিতায় আবেগঘন ভাষায় উঠে আসে। এখানে তিনি শুধু কবি নন, বরং একজন সময়সচেতন সাক্ষী।
‘আনারফুলের গ্রাম’ কবিতাটি মূলত যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তান বা মুসলিম জনপদের এক করুণ চিত্র। যেখানে ‘কার্পেট বোম্বিং’ আর ‘পরাশক্তির অন্ধ চোখের ক্রুদ্ধ আঘাত’ শান্তি কেড়ে নিয়েছে, সেখানে ঈদের চাঁদ দেখা দেওয়াকে কবি বিড়ম্বনা মনে করেন। তিনি দাম্ভিক বিশ্বের নেতাদের মিথ্যাচারের প্রতি তীব্র ধিক্কার দিয়ে বলেন, ‘সভ্য পৃথিবীর; মিলিত আক্রোশে হারিয়ে গেছে কান্দাহারের চাঁদ/… পৃথিবী! এখনো কি তুমি মানবতার কথা বলো! ধিক তোমার মিথ্যাচারে।’
কিন্তু এই ধ্বংসস্তূপের মাঝেও কবি আশাবাদী। তিনি বিশ্বাস করেন— ‘অল্প সংখ্যক ঈমানদারের কাছে বশ্যতা লিখে দেয় পারস্য ও রোম।’
এই পঙক্তিটি কবির ইতিহাস চেতনা ও ঈমানি দৃঢ়তার পরিচয় দেয়।
৭. শব্দের সৈকতে কবির নিঃসঙ্গতা : ‘শব্দের সৈকতে’ কিংবা ‘কবিতা আমার সঙ্গি’ কবিতাগুলোয় আমরা পাই কবির সৃজনপ্রক্রিয়ার অন্তরঙ্গ রূপ। শব্দ এখানে নিছক প্রকাশের মাধ্যম নয়; এটি হয়ে ওঠে এক আশ্রয়, এক নতুন জগৎ নির্মাণের উপকরণ। কবির কাছে কবিতা এক ধরনের নিয়তি— যেখান থেকে মুক্তি নেই, আবার যেখানেই তার অস্তিত্বের গভীরতম অর্থ নিহিত। এই দিকটি তাকে আধুনিক কবিদের সঙ্গে যুক্ত করলেও তার ভাষা ও অনুভব তাকে আলাদা করে চিহ্নিত করে।
একজন কবি যখন সত্যের পথে চলেন, তখন তিনি প্রায়ই একাকী হয়ে পড়েন। ‘একা’ কবিতায় গোলাম মোহাম্মদ সেই নিঃসঙ্গতাকে বরণ করে নিয়েছেন। তিনি জানেন— ‘মানুষেরা যে আসলেই একা-/একা আসে একা যায়।’
আবার ‘কবিরা’ কবিতায় তিনি আপসহীনতার কথা বলেছেন। সমাজের কৃষ্টিহীন হাতগুলোর ঘৃণা সহ্য করেও তিনি তার আদর্শে অবিচল। কবি নিজেকে ‘ঘরে আটকা পড়া চড়ুই ছানার’ মতো ছটফট করতে দেখলেও সূর্যাস্তের আগেই বিজয়ী হওয়ার সংকল্প করেন।
৮. আধ্যাত্মিক নিবেদন ও প্রার্থনা : এই কাব্যগ্রন্থের সবচেয়ে স্বতন্ত্র দিক হলো এর আধ্যাত্মিক সুর। ‘হে ঘুম’ কিংবা ‘সিজদার আবে জমজম’ কবিতাগুলোয় কবি সরাসরি স্রষ্টার সঙ্গে কথোপকথনে প্রবেশ করেন। এখানে ধর্মীয় অনুভব কেবল আচারনির্ভর নয়; বরং এটি এক গভীর আত্মসমর্পণ ও জাগরণের প্রক্রিয়া। ‘আমাকে জাগতে দাও’— এই প্রার্থনা নিছক ঘুম ভাঙার নয়, বরং চেতনার জাগরণের আহ্বান— ‘নিমগ্ন হতে দাও- জিকিরে জিকিরে/ডুবে যেতে দাও অনন্ত সুরের সাথে।’
-এখানে কবির আধ্যাত্মিক আকুতি চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে। তিনি ৪২ বছরের অসতর্ক ঘুমে অনুতপ্ত হয়ে প্রভুর কাছে মাগফেরাত চান।
তার কাছে প্রতিটি সিজদাহ হলো ‘আবে জমজম’-এর মতো পবিত্র ও তৃষ্ণা নিবারক। তিনি এক পরম সত্যের জন্য পুরো পৃথিবীকেই তুচ্ছজ্ঞান করেছেন— ‘কি আমার ভালোবাসা নগণ্য নিবেদন/সামান্য মূল্যে বেচে ফেলেছি পুরোটা পৃথিবী।’
৯. আঙ্গিক ও ভাষাশৈলী : গোলাম মোহাম্মদের কাব্যভাষা অত্যন্ত স্বচ্ছন্দ ও চিত্রল। তিনি শব্দ চয়নে যেমন আধুনিক, তেমনিভাবে আল কুরআন ও ঐতিহ্যের শব্দমালা ব্যবহারে দক্ষ। তার কবিতায় ‘প্রিজম’, ‘ইলেকট্রন প্রবাহ’, ‘ফটোশপ’-এর মতো আধুনিক বিজ্ঞানের পরিভাষা যেমন এসেছে, তেমনি ‘সিজদাহ’, ‘মাগফিরাত’, ‘হেদায়াত’-এর মতো ধর্মীয় শব্দগুলোও শৈল্পিক মহিমায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। তার রূপক ও উপমাগুলো অত্যন্ত মৌলিক, যেমন— ‘গৃহবধূর ভাঁজ করে রাখা কাপড়ের মতো কফিন গুছিয়ে রাখা’ কিংবা ‘কষ্টের ইলেকট্রন প্রবাহ’।
তবে সমালোচনামূলক দৃষ্টিতে বলতে গেলে, গ্রন্থটির কিছু দুর্বলতাও চোখে পড়ে। কোথাও কোথাও কবি অতিরিক্ত বর্ণনায় ভর করেছেন, ফলে কবিতার সংহতি কিছুটা শিথিল হয়েছে। আবার কিছু ভাব ও চিত্রকল্পের পুনরাবৃত্তিও লক্ষ করা যায়। তবু এই সীমাবদ্ধতাগুলো তার কাব্যিক শক্তিকে পুরোপুরি ম্লান করতে পারে না। সব মিলিয়ে ‘হে সুদূর হে নৈকট্য’ একটি বহুমাত্রিক কাব্যগ্রন্থ— যেখানে একজন কবি নিজেকে, সমাজকে, ইতিহাসকে এবং স্রষ্টাকে একসঙ্গে খুঁজে ফেরেন। এটি শুধু কবিতার সংকলন নয়; বরং এক ধরনের অন্তর্জাগতিক ভ্রমণ, যেখানে প্রতিটি কবিতা একটি নতুন দরজা খুলে দেয়।
উপসংহার : এক অবিনাশী সুরের পথিক গোলাম মোহাম্মদের ‘হে সুদূর হে নৈকট্য’ কেবল একটি কাব্যগ্রন্থ নয়, এটি আত্মিক প্রশান্তির এক তপোবন। তিনি আশির দশকের সেই বিরল কবিদের একজন, যিনি আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসনের যুগেও নিজের শেকড় ও বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরেছিলেন। তার কবিতায় স্রষ্টা ও সৃষ্টি, ইহকাল ও পরকাল, প্রেম ও দ্রোহ এমনভাবে মিশে গেছে যে তা পাঠককে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। নিভৃতচারী এই কবির কাব্যধারা বাংলা সাহিত্যে চিরকাল এক শুদ্ধতম স্রোত হিসেবে প্রবাহিত থাকবে। তিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন, শব্দের সৈকতে দাঁড়িয়ে কীভাবে অনন্তের ডাক শুনতে হয় এবং কীভাবে ‘নীল মৃত্যুর মুখোমুখি’ দাঁড়িয়েও প্রশান্তির হাসি হাসতে হয়।
গোলাম মোহাম্মদের এই কাব্যসম্ভার কেবল আলোচনার বিষয় নয়, বরং তা হৃদয়ে ধারণ করার মতো এক ঐশ্বরিক সম্পদ। তার প্রতিটি পঙ্ক্তি আমাদের মনে করিয়ে দেয়— জীবন ছোট, কিন্তু সত্য ও সুন্দরের পথ অন্তহীন।