আবু সাঈদ : জুলাই বিপ্লবের প্রথম শহীদ


২৪ জুলাই ২০২৫ ০৯:৪৮

॥ ড. মো. মিনহাজুল ইসলাম ॥
জুলাই বিপ্লবের মহানায়ক বাংলাদেশের জাতীয় বীর শহীদ আবু সাঈদ একটি ইতিহাস, একটি প্রেরণা, একটি আগ্নেয়গিরি। ফ্যাসিস্ট সরকার পতনে একটি স্কাড ক্ষেপণাস্ত্র। আন্দোলন সংগ্রামে বন্দুকের নলের সামনে বুক পেতে দিয়ে প্রাণ বিসর্জন দিতে পারেÑ পৃথিবীর ইতিহাসে এটি একটি বিরোচিত বিরল ঘটনা।
১৬ জুলাই ২০২৪। সকাল বেলা টগবগে যুবক আবু সাঈদ যেন শহীদ হওয়ার ঘ্রাণ আঁচ করতে পেরেছিলেন। তিনি তার সহপাঠী খলিলকে বলেন, বন্ধু শোন, আন্দোলনে আমি যদি মারা যাই, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমার লাশটি তোমরা রাস্তা থেকে তুলব না। খলিল চমকে ওঠে। লাশ… কী বলছিস এসব? আবু সাঈদের বারুদমাখা কণ্ঠ। আমি থামলেই কি থেমে যাবে এ রক্তপ্রবাহ? তারুণ্যের জোয়ার, থেমে যাবি তোরা? আমাদের জিততেই হবে। আমাদের অস্ত্র মেধাবীদের ঐক্য। সারা দেশের মেধাবীরা আজ এক হয়েছে।
আবু সাঈদ ১৫ জুলাই ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে আইয়ুববিরোধী আন্দোলন যখন তুঙ্গে ওঠে; পাকিস্তানের সেনাবাহিনী আন্দোলন দমনে মারমুখি। তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সৈয়দ মোহাম্মদ শামসুজ্জোহা স্যার শিক্ষকদের এক সভায় বলেন, ‘আজ আমি আমার ছাত্রদের রক্তে রঞ্জিত। এরপর কোনো গুলি হলে তা ছাত্রকে না লেগে যেন আমার গায়ে লাগে।’ জোহা স্যারের আবেগময় এ কালজয়ী ভাষণটি সত্যে পরিণত হলো। তাঁর রক্তের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের বিজয় স্মৃতি সৌধ।
আবু সাঈদ সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখেন, “স্যার! এ মুহূর্তে আপনাকে ভীষণ দরকার স্যার। আপনার সমসাময়িক কালে যারা ছিল সবাই তো মরে গেছে, কিন্তু আপনি মরেও অমর। আপনার সমাধি আমাদের প্রেরণা। আপনার চেতনায় আমরা উদ্ভাসিত। এ প্রজন্মে যারা আছেন, আপনারাও প্রকৃতির নিয়মে একসময় মারা যাবেন। কিন্তু যতদিন বেঁচে আছেন মেরুদণ্ড নিয়ে বাঁচুন। ন্যায্য দাবিকে সমর্থন জানান, রাস্তায় নামুন, শিক্ষার্থীদের ঢাল হয়ে দাঁড়ান। প্রকৃত সম্মান ও শ্রদ্ধা পাবেন। মুত্যুর সাথে সাথেই কালের গর্ভে হারিয়ে যাবেন না। আজন্ম বেঁচে থাকবেন শামসুজ্জোহা হয়ে। অন্তত একজন ‘শামসুজ্জোহা’ হয়ে মরে যাওয়াটা অনেক বেশি আনন্দের, সম্মানের আর গর্বের। তার পোস্টে অনুপ্রাণিত হয়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, স্কুল, মাদরাসার শিক্ষকগণ ছাত্রদের আন্দোলনে শরিক হন, তাদের প্রাণ বাঁচাতে এগিয়ে আসেন।”
ফেসবুক স্ট্যাটাসের একদিন পর ১৬ জুলাই আন্দোলনকারীদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষ। পুলিশের রাবার বুলেটের আঘাতে আন্দোলনকারীরা পিছু হটলেও আবু সাঈদ সবার সামনে। পুলিশের গুলির মুখে প্রতিবাদী ভঙ্গিতে বুক টান করে দাঁড়ায়। এ যেন বৈষম্যমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ভরা এক অদম্য সাহসী রণবীর। অটল পদযুগল। প্রসারিত বাহু যেন হিমালয় পর্বত। স্ফীত বক্ষ যেন চীনের প্রাচীর। গায়ে শোকের প্রতীক কালো টি-শার্ট ও কালো প্যান্ট যেন শোকাবহ আবরণের পূর্ব প্রস্তুতি।। কী অসীম দুর্জয় বীর! অদম্য প্রত্যয়। দু’হাত প্রসারিত করে পুলিশের মুখোমুখি। পিছন ফিরে তাকানোর সময় নেই। চারদিকে গুলি, টিয়ার শেল, রাবার বুলেট আর সাউন্ড গ্রেনেডের বিকট শব্দে সবাই সরে গেলেও আবু সাঈদ এক চুল পরিমাণ নড়েনি। কী কঠিন দৃঢ় দীপ্ত পণ! আবু সাঈদ পিছু-পা হলে আন্দোলন পিছুটান দিবে। আবু সাঈদ হারলে বাংলাদেশ হেরে যাবে। স্বসস্ত্র পুলিশ বাহিনী, হেলমেট বাহিনী, ভাড়াটে পেটোয়া বাহিনীর সামনে আবু সাঈদ একাই লড়ে যাচ্ছে ; একাই নেতৃত্ব দিচ্ছে যেন একাই বাংলাদেশ।
ফ্যাসিস্ট সরকারের পোষা বাহিনীর আন্দোলন দমনের কী নিখুঁত নিশানা! প্রথম বুলেটটি লাগে পাঁজরে। আবু সাঈদ নিজেকে সামলে নেয়। মেরুদণ্ড শক্ত করে দাঁড়ায়। আবু সাঈদের মেরুদণ্ড সোজা থাকলে আন্দোলন বেগবান হবে; বাংলাদেশের মেরুদণ্ড সোজা থাকবে। পরপর তিন তিনটি বুলেট নিক্ষেপ। তবে একটিও পিছনে লাগেনি। বুলেটের আঘাতে জর্জরিত হলেও তার ওঠে দাঁড়াবার আপ্রাণ চেষ্টা। কিন্তু না, দেশকে দেয়ার মতো সব শক্তি, তেজ নিমিষেই শেষ হয়ে যায়। আবু সাঈদ মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। প্রকাশ্য দিবালোকে ইন্টারনেটের সাহায্যে কোটি কোটি অশ্রুসিক্ত দর্শকের সামনে আবু সাঈদ শাহাদতের পেয়ালা পান করেন। জুলাই বিপ্লবে তিনিই প্রথম শহীদ।
স্বৈরাচারের বুলেট তার দেহকে ঝাঁঝরা করলেও সে একটুও টলেনি, এক ইঞ্চিও সরেনি। বরং দাঁড়িয়েছিল বুক চিতিয়ে। আবু সাঈদের বুকে ডাইরেক্ট গুলি করার এ ভয়ানক দৃশ্য কোটি কোটি যুবকের বুকে জ¦লে ওঠে দ্রোহের আগ্নেয়গিরি। তারা স্লোগান তোলে ‘বুকের ভিতর দারুণ ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর।’ ফলে আন্দোলন দাবানল আকারে ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে, সারা বিশ্বে! শুরু হয় গণজাগরণ, গণবিস্ফোরণ। তার প্রতিটি রক্তের ফোটায় জন্ম নেয় লাখকোটি আবু সাঈদ। মুহূর্তের মধ্যে আন্দোলন রূপ নেয় গণবিপ্লবে। দেশ পরিণত হয় অগ্নিগর্ভে। পঙ্গপালের ন্যায় রাজপথে ছুটে আসে কোটি কোটি বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা। স্বৈরাচার পতনে দেশের সকল মানুষ একযোগে ফুঁসে ওঠে ইতিহাসে এটাই প্রথম। আন্দোলনের তীব্রতা এতটাই বেগবান হয়ে টর্নেডো আকার ধারন করে, এতই ক্ষিপ্র গতিতে ছুটতে থাকে দিন-ক্ষণ, ঘড়ি-ঘণ্টা কোনো দিকে তাকাবার ফুরসত নেই। টার্গেট একটাই খুনি হাসিনার পতন। বাংলার দিগন্ত জুড়ে শুরু হয় বাংলা বসন্ত; বাংলা ব্লকেড, কমপ্লিট শার্ট ডাউন, ব্লক রেইড, রক্তলাল প্রতীকী ধারণ, মার্চ ফর জাস্টিজ, দ্রোহ যাত্রা, অসহযোগ আন্দোলন, সর্বশেষ মার্চ টু ঢাকা ঘোষণা।
স্বৈরাচার পতনের এক দফা আন্দোলন জুলাইয়ের সীমানা পেরিয়ে আগস্ট এসে পৌঁছে। আবু সাঈদের রক্ত গঙ্গায় মিলিত হয় আরও দু’হাজার সহযোদ্ধার রক্তস্রোত। ত্রিশ হাজার আহত ও পঙ্গুদের মৃত্যু যন্ত্রণার অসহনীয় কাতরানি। নজিরবিহীন এ বিসর্জনের বিনিময়ে ৫ আগস্টে উদিত হয় চূড়ান্ত বিজয়ের রক্তিম সূর্য। জুলাই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ৫ আগস্টকে আন্দোলনকারীরা ৩৬ জুলাই বলে আখ্যায়িত করে। জুলাই বিপ্লবের বিজয় ৩৬ জুলাই পৃথিবীর কোনো দেশের ক্যালেন্ডারে নেই। এ বিরল তারিখের প্রথম আবিষ্কারক বাংলাদেশ।
শহীদ আবু সাঈদ সম্পর্কে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘মহাকাব্যের নায়ক আবু সাঈদ। আবু সাঈদ যেভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, আমাদেরও সেভাবে দাঁড়াতে হবে।’ মিডিয়াজগৎ আবুূ সাঈদকে জাতীয় বীর স্বীকৃতির দাবি জানিয়েছে। বিজ্ঞজনদের দৃষ্টিতে আবু সাঈদের নাম শুধু বাংলাদেশেই নয়, আবু সাঈদ এখন ইন্টারন্যাশনাল ফিগার, সারা পৃথিবীতে আলোচিত। তার দু’হাত প্রসারিত ছবি বিশ্ব ইতিহাস-ঐতিহ্য। আবু সাঈদের আত্মত্যাগের কারণে বিশ্বপরিমণ্ডলে উঠে এসেছে আন্দোলন-সংগ্রামের নগরী রংপুরের নাম।
আবু সাঈদের পিতা মকবুল হোসেন দেশবাসীকে উদ্দেশ করে আবু সাঈদের নামে ভাস্কর্য না বানানোর অনুরোধ জানিয়ে বলেন, ‘ইসলামে ভাস্কর্য নিষিদ্ধ। এর পরিবর্তে জনকল্যাণমূলক কিছু করুন, যার সাওয়াব আবু সাঈদ কবরে পাবে।’ এজন্য সদকায় জারিয়া হিসেবে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়য়ে ‘শহীদ আবু সাঈদ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ’, শহীদ আবু সাঈদ হল, শহীদ আবু সাঈদ মিলনায়তন প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। আবু সাঈদের জন্ম স্থান রংপুর পীরগঞ্জের মদনখালী ইউনিয়নের জাফরপুর গ্রামে বরেন্দ্র অঞ্চলে ‘আবু সাঈদ শিশু সদন’, আবু সাঈদ কুরআন শিক্ষা কেন্দ্র, আবু সাঈদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন করা যেতে পারে। লালমনিরহাটে পুনর্নির্মিতব্য বিমানবন্দরটি ‘শহীদ আবু সাঈদ বিমান বন্দর, লালমনিহাট’ নামে নামকরণ রংপুর টু ঢাকা রুটে শহীদ আবু সাঈদ নামে একটি আন্তঃনগর এক্সপ্রেস টেন চালু এবং শহীদ আবু সাঈদের আত্মত্যাগমূলক জীবনী পাঠ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। শহীদ আবু সাঈদ তরুণ্যের অহংকার ছাত্র আন্দোলনের আইডল, ফ্যাসিবাদবিরোধী গণবিপ্লবের জনক, জাতির ঘাড়ে চেপে বসা একটি জগদ্দল পাথরকে উৎখাত করার স্পিরিট, বাংলাদেশের দ্বিতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম শহীদ এবং আবু সাঈদের বিরল আত্মত্যাগেই ছিল দেশের অভিনব পটপরিবর্তনের মূল টার্নিং পয়েন্ট।
লেখক : গবেষক, অধ্যক্ষ, রাজার ভিটা ইস. ফাজিল মাদরাসা, চিলমারী, কুড়িগ্রাম।