আসাদের কবিতায় প্রস্ফুটিত সূর্যোদয়


১৭ জুলাই ২০২৫ ১৩:৫১

॥ আফসার নিজাম ॥
প্রতিদিন আমরা কত কবিতা পাঠ করি। কারো কবিতা বেশ গতিশীল, আবার কারো কবিতা বেশ ধীরগতির। মানুষ মূলত আলাদা সত্তা। তার চিন্তা-চেতনা ভিন্ন। একই সময়ে লেখক বসবাস করে ঘাত-প্রতিঘাতের সম্মুখীন হলেও তাদের আবেগ-অনুভূতির ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। তাদের লেখনীর ভাষায় বাঙময় হয় অন্য কিছু। আমরা প্রায়ই যে কোনো লেখকের লেখাকে আলোচনা করতে যাই, তখনই তাদের লেখনীকে প্রতিষ্ঠিত কবির সাথে তুলনা প্রতি তুলনা করে থাকি। বস্তুতপক্ষে সৃজনক্রিয়া একজনের মতো অন্যজন হতে পারে না। এটা সৃষ্টিতত্ত্বের বিপরীত কর্ম। একই জনের মতো যদি হয়ে যায়, তাহলে অন্যজন লেখার কোনো হেতু থাকে না। যার ফলে আমরা দেখতে পাই একজন লেখকের ভাষা, স্বর, বিষয় ও চিন্তার ফারাগ।
আমরা আশির দশক থেকে একজন কবিকে পাঠ করে আসছি। তার কবিতা, গল্প, উপন্যাস, অনুবাদ পাঠ করে আবিষ্কার করি তিনি ভিন্ন একজন। তার সমসাময়িক লেখক বন্ধুদের সাথে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করেন। তিনি যেমন তীর্যক লেখক, তেমনি তীর্যক মানুষও বটে। তিনি আসাদ বিন হাফিজ। আজ তার কবিতা নিয়ে আলাপ করবো। আসাদকে পাঠ করে আমি তার নিজস্ব কথন ভঙ্গিমা খেয়াল করি। তার কবিতা বা ছড়ায় এ ভঙ্গিটি বেশ জোরালোভাবে পাঠকের সামনে হাজির হয়।
তাকে আলোচনা করতে গিয়ে আমি যে বললাম তার কথনে ভঙ্গিটা আলাদা। শান্ত পুকুরে একটি ঢিল নিক্ষেপ করলে যেমন অনুরণন তৈরি হয়। নিচু ও শান্ত এক পুকুরে ঢেউয়ের পরে যে ঢেউ খেলে যায়, তেমনি তার কবিতা। তার স্বরটি উঁচু কিন্তু পেলব। দ্রোহযুক্ত কিন্তু বল্গাহীন নয়। ব্যক্তি জীবনের যে ফিস ফিস আলাপন তার থেকে দূরে থাকে তার কবিতা। তার কবিতার বৈশিষ্ট্যটির বিশিষ্ট হয়ে আছে সামষ্টিকতার মধ্য দিয়ে। জাতিগত জীবনের মধ্যে ফুটে থাকে তার বলার ভঙ্গিমা। ব্যক্তিগত চিন্তার কবিতা যেমন অনেক সময় অউপলব্ধি থেকে যায়, কিন্তু সামষ্টিক চিন্তার কবিতা সবসময়ই সর্বজনীনতা লাভ করে। আর এ সর্বজীননতাই তাকে আলাদা করেছে তার সমসাময়িক লেখকদের থেকে। পাঠকের মগজে তাই তার কবিতা অনুরণন তুলে সামষ্টিক মুক্তির প্রয়াসে। ব্যক্তি জীবনেও আসাদ সামষ্টিক মানুষ ছিলেন। তার প্রকাশনীতে গেলেই ধরা পড়তো। আড্ডা দিচ্ছে কবি। তার আশপাশে লেখক, শিল্পী, অনুবাদক, প্রকাশকরা। সকলের মাঝে গল্প করছেন আর কমম্পিটারের কীবোর্ডে এক আঙুলে টিপে টিপে লিখে যাচ্ছে কবি।
আসাদ রোমান্টিক চিন্তার মধ্য দিয়ে কবিতা রচনা করতেন। তার কবিতার মধ্যে যে রোমান্টিসিজমের দেখা মেলে, তা ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক একটি রাষ্ট্রকাঠামো। এই রাষ্ট্রকাঠামোটি তৈরি করার জন্য তার বেশিরভাগ লেখা দেখতে পাই। অন্য কবির যেখানে কোনো এক গোপন হাহাকারে নিমজ্জিত হয়, সেখানে আসাদ তার বিপ্লবের বয়ান তুলে ধরেন। পাঠক তার লেখা পাঠ করতে করতে সেই বিপ্লবের মধ্যে ঢুকে যান। আর একটি রোমান্টিকতা বা কল্পনার মধ্য দিয়ে ইনসাফভিত্তিক লড়াই করতে উদ্বুদ্ধ হয়। সেখানে পাঠকের কোনো বেদনা খেলা করে না। কেবলি আত্মসমর্পণ করে যায় সেই কল্পনাময় জীবনব্যবস্থা কায়েমের জন্য। ‘অনিবার্য বিপ্লবের ইশতেহার’ কবিতায় দেখি সেই দৃশ্য-
‘‘অন্ধকার যত ঘনীভূত হয় ততই উজ্জ্বল হয় বিপ্লবের সম্ভাবনা
একটি কৃষ্ণ অন্ধকার মানেই
সামনে অপেক্ষমাণ একটি প্রস্ফুটিত সূর্যোদয়,
একটি আরক্ত সন্ধ্যা মানেই,
বেগবান বোররাক চেপে ধেয়ে আসছে কোন কুসুম সকাল
একটি কৃষ্ণ মধ্যরাত মানেই
তার উল্টো পিঠে বসে আছে কোন মৌমাছি দুপুর
একটি মিথ্যা মানেই,
তাকে ধাওয়া করছে কোন দ্রুতগামী সত্যাস্ত্র
একটি অবাধ্য সমাজ মানেই
সামনে নূহের প্লাবন, অনাগত ধ্বংস
আরেকটি নতুন সভ্যতার আমূল উদ্বোধন।’’
সমাজ ও রাষ্ট্রের বেইনসাফি দেখে কবির হৃদয় কতটা ক্ষত-বিক্ষত হলে এমন এক শপথের মধ্য দিয়ে প্রচলিত শাসন ব্যবস্থাকে বিনাশ করে ইনসাফ কায়েম করতে বিপ্লবের পথ বেছে নেন। এমনি এক কাব্যভাষা তিনি নির্মাণ করেন যেখানে বিপ্লব মানুষকে ইনসাফ কায়েম করতে মোহাবিষ্ট করে। জুলুম দেখে বেদনাদীর্ণ হয়। তাকে করে তোলে দ্রোহী সত্তা। কেউ এ দ্রোহকে আত্মস্থ করে মিছিলে হাঁটেন, কেউ তীব্র স্বরে চিৎকার করেন। আসাদ এখানে সফল, তিনি ব্যক্তি জীবনের সফলতার পথে হাঁটেননি। হেঁটেছেন বলিষ্ঠ ও ঋজু পদভারে।
আসাদের কবিতাগুলো যেন সাজানো আছে সেনাবাহিনীর সৈনিকদের মতো। তাদের কুচকাওয়াজের মতোই সারিবদ্ধ, সুশৃঙ্খল। কবিতার লেফ-রাইট একই তালে চলতে থাকে। তার কবিতায় মুখ ও মুখোশের আলদা ছবি পরিলক্ষিত হয়। নানা মুখোশের আড়ালে যে ছলনা লুকিয়ে রাখে জালিম শাসক তার তিনি উন্মুচন করে তার লেখনীর মধ্য দিয়ে। সবখানেই তার কবিতার ভাষা হয় ঋজু, প্রবল উচ্ছ্বাসপ্রবণ, একেবারে উঁচু স্বরে ডাক দেন আন্দোলনের। একজন কবি যখন তার জাতিকে ডুবে যাওয়া থেকে তুলে আনার জন্য কবিতা লেখেন, তখন তার স্বর হবে উঁচু। রাখালের পাচনের মতোই তার কলম শব্দ করবে। জাতিকে একটি সুন্দর সমাজ প্রদানের জন্য।
‘‘ইতিহাস পড়ে পড়ে জেনেছি চিরকাল
অবশেষে দেশপ্রেমিকরাই জয়ী হয়।
বুলেট, বেয়নেট, গুম, খুন, হত্যা, সন্ত্রাস,
কারাগার, নির্যাতন-
সেই বিজয়-পথের একেকটি ফলকমাত্র।
কারাগার মানে বিপ্লবের সুতিকাগার।
আসন্ন সংগ্রামের পরিকল্পনা প্রণয়নের
নিরাপদ আবাসস্থল।
জনতার কোলাহল মুক্ত নিরিবিলি পরিবেশ।’’
(অবশেষে দেশপ্রেমিকরাই জয়ী হয়)
বিপ্লবী ও ফ্যাসিস্টদের সম্পর্ক একটি অসুখ। যার মধ্যে চিহ্নিত হয় দুটি চিন্তার বৈপরিত্য। অথচ দুজনেই জানেন। একজন মুক্তির জন্য তার জান কুরবার করতে পারেন। অন্যজন জানে যে কোনো কিছুর বিনিময় রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে রাখা। এই দুয়ের লড়াই কখনো থামে না। যুগ যুগ ধরে চলে আসছে শোষক ও শোসিতে লড়াই। এটাই রাষ্ট্রিক প্যারাডক্স। বিশ্বাস ও চিন্তার মধ্যে সন্দেহ অবিশ্বাস। সমাজতান্ত্রীক ও পুঁজিতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় বেড়ে ওঠা নিঃশেষ হয়ে যায় জীবনের সকল চাওয়া পাওয়া। তার থেকে মুক্তির একটা বন্দোবস্ত হয় বিপ্লবের। এই খায়েশকে জিয়ে রাখে আসাদের কবিতা। সেই তার রোমান্টিসিজ কবিতার মধ্য দিয়ে হাজির থাকে পাঠকের মাঝে। যেখানে ভেঙেপড়া পরিবার কাঠামোয় জোড়া লাগাই বিপ্লবের ঝালাইল। এমন এক জটিল অবস্থানে আসাদ বলেন-
‘‘স্বৈরাচারের ন্যায় ভীতু কোন জন্তু
পৃথিবীতে আর কোনদিন জন্মগ্রহণ করেনি।
সে সবচে বেশি ভয় পায় মানুষকে।
ভয় পায় গণজাগরণ ও গণজোয়ারকে।
আর তাই মানুষ দেখলেই সে তার
পোষা কুকুরগুলোকে লেলিয়ে দেয় মানুষের বিরুদ্ধে।
সাপের মত বিষাক্ত ফণা তুলে ছুটে আসে ছোবল হানতে।
আর বাঁচার জন্য মানুষ তখন বাধ্য হয়
দল বেঁধে স্বৈরাচার ও তার কুকুরদের তাড়া করতে।’’
(সর্পবিষয়ক)
উপরোক্ত চিন্তা মানুষকে ছুঁয়ে যায়। তাকে উদ্বুদ্ধ করে আরো একটি বিপ্লবের মধ্য দিয়ে যেতে। যেখানে সে স্বপনে বিচরণ করে। ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক একটি রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে বসবাস করবে। মানুষের চিন্তার জটিলতম সম্পর্কের মধ্যে সুতায় গেঁথে রাখার এক মুন্সিয়ানা ক্ষমতা আসাদের কবিতায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সে এখানেই গোপন কুঠির থেকে বের করে আনে সঙ্গবদ্ধ শব্দমালা।
‘‘হে মাবুদ, আমরা আমাদের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছি।
আমাদের জান, মাল, সব, সব।
শুধু দীনকে ভালবাসার কারণে অমানুষিক জুলুমের শিকার হয়েছি।
বেধড়ক লাঠিপেটা খেয়েছি। টিয়ারসেল খেয়েছি।
আমাদের ধরে ধরে ঠাণ্ডা মাথায় গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে।
গুম করা হচ্ছে। আমাদের রক্তে রঞ্জিত হচ্ছে রাজপথ।‘’
(নমরুদের ঘিলু)
আসাদকে বুঝতে হলে বুঝতে হবে তার জীবনচিত্র। সে আজীবন একজন বিপ্লবী কর্মী। ছোট সময় থেকে ছাত্র রাজনীতি করে বড় হয়েছেন এবং জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত লড়াই করেছেন একটি সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠার। যেখানে ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক একটি রাষ্ট্র থাকবে। মানুষ একটি সহনশীল জীবনযাপন করবে। তারপর ফিরে যাবে তার রবের কাছে। আমরা তার একটি গদ্যের মাধ্যমে সেটা পাঠ করতে পারি:
‘‘আমি স্বপ্ন দেখি প্রেম আর ভালোবাসায় পরিপূর্ণ এক সমাজের। স্বপ্ন দেখি শোষণহীন এক সভ্যতার। ভালোবাসি সুন্দরকে, ঘৃণা করি অসুন্দর। মানুষের নীচতা আমাকে কষ্ট দেয়। দুঃখ পাই মানুষের ভণ্ডামি দেখলে। ভালো লাগে প্রকৃতির স্নিগ্ধ শ্যামলিমা, সবুজ অরণ্য। ভালো লাগে পাখির কূজন, শীতল ছায়া আর উন্মুক্ত প্রান্তর। সরলতাকে শ্রদ্ধা করি আমি, তবে পছন্দ করি সচেতন মানুষ। বিশ্বাস করি নীতি ও নৈতিকতায়। খুশি হই কাউকে আপন অধিকার আদায়ে সচেষ্ট হতে দেখলে- আরো খুশি হই অন্যের অধিকারের প্রতি উপযুক্ত সম্মান ও শ্রদ্ধা দেখানোয়। মানুষকে ভালোবাসি, ভালোবাসি আল্লাহর সীমাহীন সৃষ্টি। আমার এসব বোধ-বিশ্বাস, আমার এসব ভালোলাগা মন্দলাগা নিয়েই আমার কবিতা, আমার যত সুর আর ছন্দ।’’ (আমার কবিতা)।
লেখক: কবি।