উপমহাদেশে ইসলামের আগমন ও আদর্শ সমাজ বিনির্মাণে ওলামায়ে কেরামের অবদান
১৩ জুন ২০২৫ ০৮:১৭
॥ ড. মুহাম্মদ খলিলুর রহমান মাদানী ॥
পূর্ব প্রকাশের পর
মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী (র.): মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী র. জমিয়ত-ই-উলামায়ে হিন্দের সভাপতি নির্বাচিত হবার পর ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে এর শাখা-প্রশাখা গঠনে উদ্যোগী হন। ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের মতো আসাম প্রদেশেও কংগ্রেসপন্থি জমিয়ত-ই-ওলামায়ে হিন্দের বিকল্প স্বরূপ আসাম প্রাদেশিক জমিয়ত-ই-উলামায়ে হিন্দ গঠিত হয়। মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানীর সভাপতিত্বে কংগ্রেসপন্থি আসাম প্রাদেশিক জমিয়ত-ই-উলামায়ে হিন্দের ষষ্ঠ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। মাদানী সাহেবের মুরীদসহ কয়েক শত আলেম উক্ত সভায় যোগদান করেন।
আলেম সমাজের মধ্যে যারা উত্তর ভারতের দেওবন্দ মাদরাসায় শিক্ষা প্রাপ্ত ছিলেন বা জমিয়ত-ই- ওলামায়ে হিন্দ বা জাতীয়তাবাদী মুসলিম দলের সদস্য বা সমর্থক ছিলেন, তাদের ওপর জমিয়ত-ই-ওলামায়ে হিন্দের তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট ও দেওবন্দ মাদরাসার প্রধান মওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী এবং জাতীয়তাবাদী মুসলিম দলের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান মাওলানা আবুল কালাম আযাদের বিরাট প্রভাব ছিল। প্রধানত এ দুই ব্যক্তির রাজনৈতিক মতবাদের সমর্থনে বাংলার জমিয়ত-ই-ওলামায় হিন্দপন্থি ও জাতীয়তাবাদী আলেমগণ পাকিস্তানবিরোধী ও অখণ্ড ভারতের পক্ষপাতী ছিলেন। তাদের যুক্তি ছিল পাকিস্তান সৃষ্টির ফলে মুসলমানরা বিশেষ একটি অঞ্চলে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে এবং তাতে তারা উপমহাদেশের অন্যান্য অঞ্চলে ইসলাম প্রচারে অসুবিধার সম্মুখীন হবে।
মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর অনুরূপ নিখিল ভারতের অধিবাসীদের এক জাতি মনে করেন। পণ্ডিতজি ইসলামী জাতীয়তার ওপরে আক্রমণ চালিয়ে বলেন যে, তোমাদের আদৌ কোনো জাতীয় সত্তা নেই। শুধুমাত্র ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের একটা চক্রান্ত এবং সাম্রাজ্যবাদের কতিপয় দালালদের প্রচারণার ফলেই তোমাদের মন-মগজে এ ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে যে, তোমরা একটি স্বতন্ত্র জাতি।
মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী যুক্ত জাতীয়তার ওপরে একখানা পুস্তক রচনা করেন। এটি ছিল গান্ধী ও নেহরুর ঙহব হধঃরড়হ ঃযবড়ৎু-এর পক্ষের যুক্তিসংবলিত কিতাব। তিনি তাঁর এ ‘মুত্তাহিদায়ে কওমিয়াত’ (এক জাতিতত্ত্ব) কিতাবে লেখেন- যুক্ত জাতীয়তার বিরোধিতা ও তাকে ধর্মবিরোধী আখ্যায়িত সংক্রান্ত যেসব ভ্রান্ত ধারণা প্রকাশিত হয়েছে ও হচ্ছে, তার নিরসন করা অত্যাবশ্যক বিবেচিত হলো। ১৮৮৫ সাল থেকে কংগ্রেস ভারতের জনগণের কাছে স্বাদেশিকতার ভিত্তিতে জাতিগত ঐক্য গড়ার আবেদন জানিয়ে অব্যাহতভাবে জোরদার সংগ্রাম চালিয়ে আসছে। আর তার বিরোধী শক্তিগুলো সেই আবেদন অগ্রহণযোগ্য; এমনকি অবৈধ ও হারাম সাব্যস্ত করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের জন্য এ জাতিগত ঐক্যের চেয়ে ভয়ংকর আর কিছু নেই। এ কথা সুনিশ্চিত, এ জিনিসটা ময়দানে আজ নতুন আবির্ভূত হয়নি; বরং ১৮৮৭ সালে বা তার পূর্ব থেকে আবির্ভূত। বিভিন্ন শিরোনামে এর ঐশী তাগিদ ভারতীয় জনগণের মন-মগজে কার্যকর করা হয়ে থাকে।
মাওলানা আশরাফ আলী থানবী (র.) : এভাবে যখন জমিয়ত-ই-উলামায়ে হিন্দের কংগ্রেসী চরিত্র প্রকট হয়ে ওঠে, তখন ভারতের বিভিন্ন অংশের ওলামার প্রধান একটি মহলে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। সর্বপ্রথমে দেওবন্দের মাওলানা আশরাফ আলী থানবী দিল্লি জমিয়তের কংগ্রেসী নীতির বিরুদ্ধে মুসলিম লীগের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করেন। ১৯২৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে জমিয়ত-ই-উলামায়ে হিন্দের যে অধিবেশন হয়, তাতে যোগদানের জন্য জমিয়তের সেক্রেটারি মাওলানা আহমদ সাঈদ তাকে আমন্ত্রণ করেছিলেন। এক পত্রে তিনি নিম্ন লিখিত ভাষায় জমিয়তের সেক্রেটারিকে উত্তর দিয়েছিলেন : শরিয়তের দৃষ্টিভঙ্গিতে আমি আমার মত প্রকাশ করছি। ইতোপূর্বে আমি মাওলানা কেফায়েত উল্লাহ সাহেবের সঙ্গে মৌখিক আলোচনা করেছিলাম। এখন আমি বিভিন্ন ঘটনার নিরিখে আমি দৃঢ়ভাবে এ মত পোষণ করছি যে, কংগ্রেসে যোগদান করা মুসলমানের; বিশেষত আলেমদের পক্ষে আমার মতে ধর্মের দিক দিয়ে ধ্বংসাত্মক। বরং কংগ্রেসের প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করা অত্যন্ত জরুরি। আলেম সমাজের উচিত, মুসলমানদের জন্য নিছক ধর্মীয় নীতিভিত্তিক স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান গঠন করা। কংগ্রেসে মুসলমানদের প্রবেশ করা বা করানো আমার মতে তাদের ধর্মীয় মৃত্যুর নামান্তর।
মাওলানা আশরাফ আলী থানবী খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের সময় “মাসআলা-এ-তরকে মাওয়ালাত” শীর্ষক একটি উর্দু পুস্তিকা সারা দেশে প্রচার করেন। এ পুস্তিকায় তিনি খেলাফত আন্দোলন সমর্থন করেন। কিন্তু অসহযোগ আন্দোলনকে শরিয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে অবৈধ এবং রাজনৈতিক দিক থেকে মুসলিম জাতির জন্য ক্ষতিকর বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, অসহযোগ আন্দোলন হিন্দুদের একটি চাল মাত্র। আসলে তারা তুরস্কের খেলাফত বা মুসলমানদের হিত কামনা করে না। তাদের মনের কথা হলো, মুসলমানরা চাকরি-বাকরি ছেড়ে দিক। তাহলে তারা যেন সেগুলো দখল করতে পারে। মুসলমানগণ হিজরত করে এ দেশ থেকে চলে যাক, তাহলে তারা একাই ভারতে বসবাস করতে পারে।
মাওলানা আশরাফ আলী থানবীর মতে কংগ্রেসে যোগদান করা ছিল অসঙ্গত। তিনি মনে করতেন এটা ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার শামিল। মুসলিম লীগে যোগদানকে তিনি মুসলিম জাতির অস্তিত্বের রক্ষা কবচ মনে করতেন। ১৯৩০ সালের মুসলিম লীগের এলাহাবাদ অধিবেশনে ড. ইকবাল উপমহাদেশীয় মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র একটি রাষ্ট্রের পরিকল্পনা পেশ করেন। কিন্তু মাওলানা থানবী তার আগেই ১৯২৮ সালেই মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে পত্রযোগে একটি মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
মাওলানা শিব্বীর আহমদ উসমানী (র.) : পাক-ভারত উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে আলেম সমাজের শিব্বীর আহমদ উসমানী এক তুলনাহীন ব্যক্তিত্ব। মাওলানা শিব্বীর আহমদ উসমানী ১৮৮৮ খ্রিষ্টাব্দে দেওবন্দে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মাওলানা ফজলুর রহমান। উসমানী ১৩১৯- ১৩৩২৫ হিজরী পর্যন্ত দারুল উলুম দেওবন্দে ইসলামী জ্ঞান বিজ্ঞানসহ সিহাহ সিত্তা অধ্যয়ন করেন। তাঁর বিশিষ্ট ওস্তাদ ছিলেন শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদুল হাসান।
দেওবন্দী আলেমগণের অনেকে পাকিস্তান প্রস্তাবের বিরোধিতা না করলেও মাওলানা শিব্বীর আহমদ ছিলেন তার ব্যতিক্রম। তিনি ১৯১৯ থেকে ১৯৪৫খ্রি: পর্যন্ত জমিয়ত-ই-উলামায়ে হিন্দের সাথে ছিলেন। কিন্তু তিনি উলামা-ই-হিন্দপন্থি আলেমদের অখণ্ড ভারত সমর্থন এবং পাকিস্তান প্রস্তাবের বিরোধিতা পছন্দ করতে পারেননি। এ পরিপ্রেক্ষিতে মাওলানা রাগিব হাসানের উদ্যোগে ও শিব্বীর আহমদ উসমানীর সহযোগিতায় ১৯৪৫ সালের ১১ জুলাই কলকাতায় জমিয়ত-ই-উলামায়ে ইসলাম নামক আলেমদের সর্বভারতীয় লীগপন্থি রাজনৈতিক দল গঠিত হয়। এই দলের উদ্বোধনী অধিবেশন কলকাতায় অনুষ্ঠিত হয় ১৯৪৫ সালের ২৬-২৯ অক্টোবর। ২৯ অক্টোবরের অধিবেশনে মাওলানা শিব্বীর আহমদ উসমানী ও মওলানা সৈয়দ কুরাইশ শামসীকে যথাক্রমে জমিয়তের সভাপতি ও সেক্রেটারি নির্বাচিত করা হয়। এই পদ গ্রহণের পূর্বে জমিয়ত-ই-উলামায়ে হিন্দের এক প্রতিনিধিদল অসম্মতি জ্ঞাপনের জন্য তার ওপরে চাপ সৃষ্টি করেন। কিন্তু তিনি সেই বাধা উপেক্ষা করে বলেন, The Muslim leage and Jamiat of Calcatta were on the path of Sariat and were walking for the integrity and independence of the Islamic Millat, whereas Jamiat of Delhi was absolutely on the wrong path and was merely a tool in the hands of the Congress to the detriment and disintegration of the Millat.
আল্লামা উসমানী মুসলমানদের স্বতন্ত্র আবাস ভূমির স্বপক্ষে জোরালো যুক্তি পেশ করতে গিয়ে বলেন, বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির ধারা অনুযায়ী মুসলিম সংখ্যা গরিষ্ঠ প্রদেশসমূহে আমরা এ মহান লক্ষ্য কার্যকর করতে পারবো। আমাদের আকাক্সিক্ষত ভূখণ্ডটির নাম পাকিস্তান কিংবা হুকুমতে ইলাহিয়াহ অথবা অন্য কিছু হোক। তবে এটা নিশ্চিত যে একটি স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে মুসলমানদের অবশ্যই একটি কেন্দ্রের প্রয়োজন। বলাইবাহুল্য সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগুরু জাতিদ্বয়ের যুক্ত শাসনাধীনে এ লক্ষ্য কিছুতেই অর্জিত হতে পারে না। এভাবে মাওলানা ২৬ ডিসেম্বর ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন, “দীর্ঘ দিনের চিন্তাভাবনার পর এ সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম যে, পাকিস্তান অর্জনের জন্য প্রয়োজন হলে রক্ত দেওয়াকেও আমি গৌরবের বিষয় মনে করবো। পাকিস্তান অর্জনের পরে পাকিস্তান সংসদে তিনি আইন প্রস্তাব পাস করান এবং আইন প্রণয়ন কমিটির সভাপতি নিযুক্ত হন। পাকিস্তান সরকার শাসনতন্ত্র রচনার ব্যাপারে যে মূলনীতি কমিটি গঠন করে ছিলেন তিনি তার সদস্য ছিলেন। তিনি মাওলানা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদীর সাহায্য নিয়ে দিবারাত্র পরিশ্রম করে ইসলামী শাসনতন্ত্রের মূলনীতি এবং ধারা উপধারা তথা শাসনতন্ত্রের রূপরেখা তৈরি করেন। পাকিস্তান আন্দোলনের এ মহান সেনানী ১৯৪৯ সালে ইন্তেকাল করেন।
মাওলানা মুফতি মুহম্মদ শফী (রহ.) : বিশ্ববিখ্যাত আলেম মাওলানা মুফতি মুহম্মদ শফী (র.) দেওবন্দে জন্মগ্রহণ করেন। ১৩৩৫ হিজরী সনে দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে আনুষ্ঠানিক লেখাপড়া শেষে তিনি দেওবন্দেই শিক্ষকতা কাজে নিয়োজিত হন।
শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদুল হাসান : মাল্টার বন্দিজীবন থেকে মুক্তি লাভ করে দেওবন্দ প্রত্যাবর্তন করার পর তাঁর হাতে জিহাদের বাইয়াত গ্রহণ করেন। ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবরে কলকাতায় মুহাম্মদ আলী পার্কে নিখিল ভারত উলামা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তাতে উপমহাদেশের বিখ্যাত আলেম-ওলামাদের সাথে মাওলানা মুহাম্মদ শফী উপস্থিত ছিলেন। ১৩৬২ হিজরী সনে পাকিস্তান আন্দোলনে অংশ গ্রহণের উদ্দেশ্যে দারুল উলুমের শিক্ষকতার পদে ইস্তফা দেন।
১৯৩৮ সালের পাটনায় মুসলিম লীগের যে বার্ষিক অধিবেশন হয়, তাতে মুফতি সাহেব শিব্বিীর আহমদ উসমানীর প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। ১৯৪৬ সালে পাকিস্তান আন্দোলন তুঙ্গে পৌঁছার পর মুফতি শফী উপমহাদেশের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত সফর করে মুসলমানদের একটি স্বতন্ত্র ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সাধনায় আত্মনিয়োগ করেন। পাকিস্তান কায়েম হবার পর তিনি দেওবন্দ থেকে করাচিতে হিজরত করেন। পাকিস্তানকে একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী রাষ্টে পরিণত করার লক্ষ্যে মুফতি সাহেব সর্বাত্মক প্রয়াস শুরু করেন। ১৯৫১ সালের ২১ থেকে ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত করাচিতে অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় উলামা সম্মেলনে ইসলামী শাসনতন্ত্রের মূলনীতি প্রণয়নের লক্ষ্যে যে ৩১ জন আলেম অংশ গ্রহণ করেছিলেন মুফতি মুহাম্মদ শফী তাঁদের অন্যতম। উপমহাদেশের এ বিখ্যাত আলেমে দীন পাকিস্তান আন্দোলনের শক্তিশালী নেতা ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দে করাচীতে ইন্তেকাল করেন।
মাওলানা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী (রহ.) : হিজরী ১৩২১ সালের ৩ রজব (ইং ১৯০৩) আওরাংগাবাদ শহরে শিশু মওদূদী জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আহমদ হাসান মওদূদী ছিলেন একজন প্রসিদ্ধ আইন ব্যবসায়ী। মাওলানার ঊর্ধ্বমুখী বংশ পরম্পরা হযরত ইমাম আলী নকীর মাধ্যমে হযরত ইমাম হোসাইন (রা.) পর্যন্ত পৌঁছেছে। হযরত হোসাইন (রা.)-এর নসব নামার ৩৭তম পুরুষ মাওলানা মওদূদী (রহ.)।
খেলাফত আন্দোলনের ব্যর্থতার দরুন যখন ভারতবর্ষের মুসলমানরা শোচনীয় দুর্দশায় নিপতিত, তখন তাদের অবস্থা পরাজিত ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া সেনাবাহিনীর মতো। তাদের মধ্যে অবশিষ্ট যে মুষ্টিমেয় সংখ্যক মুসলমান তখনো কিছুটা তেজোদীপ্ত ছিলেন, হিন্দু সাম্রাজ্যবাদ তাদেরও নিখিল ভারতীয় জাতীয়তাবাদ ও মাতৃভূমির স্বাধীনতার নামে তাদের দলে ভাগিয়ে নেয়ার চেষ্টায় লিপ্ত ছিল। যখন মুসলমানের ভবিষ্যৎ ছিল এক ভয়াল অমানিশার মতো। ঠিক এ সময় ভারতীয় রাজনীতিতে আবির্ভাব ঘটে সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী (রহ.)’র।
ব্রিটিশ আমলে ভারতের মুসলমানরা সবচেয়ে মারাত্মক যে হুমকির সম্মুখীন হয় তা হলো, যুক্ত জাতীয়তার হুমকি। ১৯২৫ সালে খেলাফত আন্দোলন নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়ার পর হুমকি আরও গুরুতর আকার ধারণ করে। মুসলমানদের অবস্থা ছিল খুবই শোচনীয়। এ পরিস্থিতিতে কংগ্রেস মুসলমানদের গ্রাস করতে উদ্যত হয়। এ উদ্দেশ্যে কংগ্রেস যুক্ত জাতীয়তার আন্দোলনকে তীব্রতর করে তাত্ত্বিক ক্ষেত্রে পাশ্চাত্যের গোটা রাজনৈতিক চিন্তাধারার ভিত্তিতে যুক্ত জাতীয়তার ধারণা পেশ করতে থাকে। কংগ্রেস নেতাদের পাশাপাশি জমিয়ত-ই-উলামায়ে হিন্দের নেতাগণ; বিশেষ করে মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী ‘মোত্তাহেদায়ে কওমিয়াত’ (এক জাতি তত্ত্ব) নামে একটি বই লিখে কংগ্রেসি চিন্তাধারাকে মজবুতভাবে মুসলমানদের মাঝে ছড়িয়ে দিচ্ছিলেন। আলেমদের একটি বিরাট অংশ ইংরেজদের বিরুদ্ধাচরণ করতে গিয়ে যুক্ত জাতীয়তার সমর্থনে এগিয়ে এসেছিলেন। এ বিষয়ে মাওলানা আবুল আ’লা মওদূদী সাহেব ‘মাসয়ালায়ে কওমিয়াত’ (ইসলাম ও জাতীয়তাবাদ) শিরোনাম যুক্ত কতিপয় ধারাবাহিক নিবন্ধ লেখেন। অকাট্য যুক্তি ও শক্তিশালী প্রমাণাদি এবং বলিষ্ঠ বর্ণনা ভঙ্গির কারণে তা মুসলমানদের মধ্যে অত্যধিক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। অতি অল্প সময় খুবই দ্রুততার সাথে মুসলিম জনগণের মধ্যে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। এ গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা যুক্ত জাতীয়তার মতবাদে নিদারুণ আঘাত হানে এবং মুসলমানরা একটি আলাদা জাতি এ অনুভূতি দ্রুত প্রসার লাভ করতে থাকে।
জাতীয়তা সংক্রান্ত এ আলোচনা নিছক তাত্ত্বিক আলোচনা ছিল না। কংগ্রেস ও জমিয়ত-ই-ওলামায়ে হিন্দের গোটা নীতি ও আদর্শের ওপর এর আঘাত পড়েছিল। ইসলামী জাতীয়তাতত্ত্ব সম্পর্কিত তাঁর লেখাগুলো মুসলিম লীগ মহলে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। পাকিস্তান আন্দোলনের ভিত্তি ছিল দ্বিজাতিতত্ত্ব। এ মতবাদকে তুলে ধরা মার্জিত করা ও প্রসার ঘটানোর কাজে মাওলানার ‘মাসয়ালায়ে কওমিয়ত’-এর অবদান ছিল সব চাইতে বেশি। মাওলানা আবুল আলা মওদূদী ‘জমিয়ত-এ-উলামায়ে হিন্দ’-এর জাতীয়তাবাদী ধারার কট্টর বিরোধী ছিলেন। কিন্তু অন্যদিকে তিনি জমিয়ত-ই-ওলামায়ে ইসলামের আলেমদের মতো পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য মুসলিম লীগ যে আন্দোলন চালায়, তাতে অংশ গ্রহণ করেননি। বরং তিনি জমিয়ত-ই-উলামায়ে হিন্দ ও জমিয়ত-ই-উলামায়ে ইসলাম সংগঠনে যোগ না দিয়ে জামায়াতে ইসলামী নামক সংগঠন সৃষ্টি করেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য মুসলিম লীগ যে আন্দোলন চালান মাওলানা মওদূদী (রহ.), তাতে অংশগ্রহণ না করার একমাত্র কারণ ছিল এই যে, মুসলিম লীগের কর্মপন্থার সাথে তাঁর মতবিরোধ ছিল। মুসলিম লীগের কর্মপন্থার সাথে ভিন্নমত পোষণের ব্যাপারে মাওলানা বলেন, ‘আপনারা কখনো ধারণা করবেন না যে, আমি কোনো মৌলিক মতপার্থক্যের দরুন এ কাজে অংশ নিতে চাই না। আসলে আমার সমস্যা দাঁড়িয়েছে এই যে, আমি বুঝতেই পারছি না যে, অংশগ্রহণ যদি করি, তবে কীভাবে করবো। অধিকন্তু চেষ্টা-তদবির আমার মন মানসকে মোটেই আকৃষ্ট করে না। জোড়াতালি দিয়ে কার্যসিদ্ধিতে আমার কখনো আগ্রহ ছিল না। আপনাদের লক্ষ্য যদি হতো প্রচলিত গোটা সমাজব্যবস্থাকে সম্পূর্ণরূপে ভেঙে নতুন সমাজব্যবস্থার সঠিক পুনর্নির্মাণ তাহলে আমি তাতে সর্বান্তকরণে যে কোনো খেদমত আঞ্জাম দিতে প্রস্তুত ছিলাম।’
মাওলানা পাকিস্তান আন্দোলনে তাত্ত্বিকভাবে তিনি পাকিস্তানের আদর্শের সমর্থনে অব্যাহতভাবে অবদান রেখে গেছেন। শুধু তাই নয়, তিনি পাকিস্তানের পক্ষে ভোট দেয়ার জন্য জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে গিয়ে বলেন, ‘আমি যদি সীমান্ত প্রদেশের অধিবাসী হতাম, তাহলে গণভোটে আমার ভোট পাকিস্তানের পক্ষে পড়তো। কেননা ভারত যখন ভারত ও মুসলমানদের স্বতন্ত্র জাতীয়তার ভিত্তিতেই বিভক্ত হতে চলেছে, তখন যে অঞ্চলে মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, তার মুসলিম জাতীয়তার সাথেই সংযুক্ত হওয়া উচিত।’ সম্ভবত ১৯৪০ সালে মুসলিম লীগ যখন জনপ্রিয়তার শীর্ষে, তখন ইসলামী রাষ্ট্র পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দাবি জোরদার। এ সময় মুসলিম লীগ নেতারা ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের জন্য নির্ভেজাল ইসলামী চরিত্রের সংবিধান প্রণয়নের জন্য একটি কমিটি গঠন করেন। চার সদস্য কমিটির মধ্যে মাওলানা মওদূদী ছিলেন। অন্যতম। এছাড়া যখন ইউপি মুসলিম লীগ ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার রূপরেখা রচনার জন্য আলেমদের একটি কমিটি গঠন করে, তখন মাওলানা মওদূদী তার সদস্যপদ গ্রহণ করেন। শুধু তাই নয়, পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার পর ১৯৫১ সালে ইসলামী শাসনতন্ত্রের ২২ দফা মূলনীতি প্রণয়নে যে ৩১ জন আলেম অংশগ্রহণ করেন তাঁদের মধ্যে প্রভাবশালী সদস্য ছিলেন মওলানা মওদূদী (রহ.)। এভাবে মাওলানা মওদূদী (রহ.) পরোক্ষ ও তাত্ত্বিকভাবে পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা প্রদান করেন। তাঁর এই মহান খেদমত সম্পর্কে কায়েদে আযম বলেন, ‘মাওলানা মওদূদী যে খেদমত করেছেন, তাতে আমি মুগ্ধ- জামায়াত ও মুসলিম লীগের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই।’
তিনি জামায়াতে ইসলামী নামক একটি ইসলামী রাজনতৈকি দলেরও প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ছিলেন ২০ শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালী মুসলিম স্কলারদের মধ্যে একজন। তিনি ইতিহাসের দ্বিতীয় এবং সর্বশেষ ব্যক্তি, যার গায়েবানা জানাজার নামাজ পবিত্র কাবায় পড়া হয়।
আউয়ুব খানের আমলে রাষ্ট্র পরিচালনায় ইসলামী অনুশাসন কতটুকু বাস্তব? ওলামা নেতৃবৃন্দ একমত হয়ে কোনো নীতিমালা দিতে পারবেন কিনা? এ সকল সংশয় নিরসন করে ইসলামী শাসনতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সকল ইসলামী দল ও ব্যক্তিত্ব ঐক্যবদ্ধভাবে ঐতিহাসিক ২২ দফা প্রণয়ন করেন। এক্ষেত্রে আল্লামা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ. গুরুত্বপূণ ভূমিকা পালন করেন।
আল্লামা মওদূদী দেওবন্দ থেকে প্রকাশতি পত্রিকা ‘আল জামইয়্যাতের’ সম্পাদক হিসেবে দায়ত্বি পালন করে কওমি-আলিয়া সকল শ্রেণির আলেমদের সাথে সমন্বয় সাধন করে দেশ, জনগণ ও ইসলামের পক্ষে ব্যাপক অবদান রাখার সুযোগ পান। ১৯১৮ সালে সাংবাদিক হিসেবে ‘বিজনের’ (Bijnore) পত্রিকায় কাজ শুরু করনে, এরপর জবলপুরে ‘তাজ’ দৈনিক ‘মুসলিম’ পত্রিকার এডিটর হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন, অতঃপর ‘আল জামিয়াহ’ পত্রিকার এডিটর হিসেবে নিয়োগ লাভ শেষে ভারতের হায়দরাবাদ থেকে ‘তরজুমানুল কুরআন’ নামক পত্রকিা প্রকাশ শুরু করেন, লাহোরে ‘জামায়াতে ইসলামী হিন্দ’ নামে একটি ইসলামী রাজনতৈকি দল প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭২ সনে “তাফহীমুল কুরআন” নামক বিশ্ববিখ্যাত তাফসির গ্রন্থটির রচনা সম্পন্ন করনে। লেখক গবেষেণা ও প্রতিষ্ঠিত আন্দোলন অত্র অঞ্চলের মানুষকে সঠিক পথের দিশা দিয়েছে।
১৯৩৫ সালের পর থেকে এ উপমহাদেশের মুসলমান যে রাজনৈতিক ঘূর্ণিপাকের আবর্তে পড়ে দিকভ্রান্ত হয়েছিল, তখন মাওলানার ‘সিয়াসী কাশ্মাকাশ’ শীর্ষক সময়োপযোগী প্রবন্ধগুলো তাদের পথের সন্ধান দিয়েছিল। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাক-ভারতের মুসলমানদের জন্য এক স্মরণীয় দিন। এই দিন ব্রিটিশ ও হিন্দু সাম্রাজ্যবাদের নিগড় থেকে মুসলমানদের আজাদীর সূর্যকিরণ উদিত হয়েছিল। এই দিন মাওলানা মওদূদী গুরুদাসপুর জেলার পাঠানকোটের নিকটবর্তী ‘দারুল ইসলামে’ অবস্থান করছিলেন। পরে মাওলানা দারুল ইসলাম ত্যাগ করে লাহোরে চলে আসেন। লাহোরে স্থানান্তরিত হওয়ার পর মাওলানা ও তাঁর সহকর্মী লোকজনদের জন্য একটি বাড়ি এ্যালট করার পর চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে তা ফেরত নেওয়া হয়। অতঃপর তারা ইসলাম পার্কে তাঁবু করে মাথা গুঁজলেন। পরে তারা ইছরায় ভাড়াটে বাড়িতে চলে আসেন।
এভাবেই ভারতীয় ওলামাদের একটি বিরাট অংশ পাক-ভারত উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে অবিস্মরণীয় ভূমিকা রেখে গেছেন।
(চলবে)