ফিলিস্তিন মুক্ত করার শপথ
১০ এপ্রিল ২০২৫ ১২:৩৭
॥ সৈয়দ খালিদ হোসেন ॥
বিধ্বস্ত ভবনে চাপা পড়ে আছে হাজারো নিরস্ত্র, অসহায়, নিরীহ ও নিপীড়িত ফিলিস্তিনের গাজাবাসী। যাদের উদ্ধারেরও কোনো ব্যবস্থা নেই। স্বাস্থ্যকর্মী, হাসপাতাল, সেবাকর্মী, সংবাদকর্মী; এমনকি জাতিসংঘের গাড়িও রক্ষা পাচ্ছে না সন্ত্রাসী ইসরাইলের বর্বরোচিত নৃশংস হামলা থেকে। এ হামলায় অন্য সবার সঙ্গে প্রাণ হারাচ্ছে শিশুরাও। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন, যুদ্ধবিরতি আইন কিছুই মানছে না ইসরাইল। গাজায় গণহত্যা বন্ধে বিশ্বব্যাপী ‘নো ওয়ার্ক নো স্কুল’ এবং ‘দ্য ওয়ার্ল্ড স্টপস ফর গাজা’ কর্মসূচি পালিত হয়েছে গত ৭ এপ্রিল সোমবার। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, নরওয়ে অ্যায়ারল্যান্ড, ফ্রান্সসহ সারা পৃথিবীতে এ কর্মসূচি পালন করে বিশ্ববাসী। ‘ফিলিস্তিনি ন্যাশনাল অ্যান্ড ইসলামিক ফোর্সের আহ্বানে বাংলাদেশের প্রতিটি বিভাগ জেলা-উপজেলা শহরেও পালিত হয় এ কর্মসূচি। রাজধানী ঢাকা রূপ নেয় প্রতিবাদ বিক্ষোভ ও মিছিলের নগরীতে। সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মিলন ঘটে ঢাকায়, মিছিল-স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে ব্যস্ত এ নগরী। যারা মিছিলে অংশ নিতে পারেননি, তারাও হাত নেড়ে (যানবাহনে কিংবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বসে) সংহতি জানান। স্কুল বন্ধ দিয়ে, কর্মস্থলে না গিয়ে লাখো জনতা মিছিলে শামিল হন নিপীড়িত গাজাবাসীর স্বাধীনতার লক্ষ্যে। মাথায় ফিলিস্তিনের পতাকা হাতে ‘ফ্রি গাজা-ফ্রি প্যালেস্টাইন’ লেখাসংবলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে এ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া রংপুরের কলেজ পড়ুয়া এক শিক্ষার্থীর আক্ষেপ, ‘মন কাঁদে কিন্তু আমরা তো নিরুপায়’ ‘লাশের স্তূপ দেখলে নিজেকে ঠিক রাখতে পারি না। চোখ পানিতে টলমল করে। বুকটা কেঁপে ওঠে। মনে হয় আমিও গাজায় চলে যাই। আমার অসহায়, নিরীহ ও নিপীড়িত মুসলিম ভাই-বোনদের সঙ্গে শহীদ হয়ে যাই।’
গত ৮ এপ্রিল মঙ্গলবার এ প্রতিবেদন লেখার দিনে বার্তা সংস্থা আনাদলু এবং সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে, ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা ভূখণ্ডে ইসরাইলি হামলায় এ দিন কমপক্ষে আরও ৬০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও শতাধিক। এর ফলে অবরুদ্ধ এ উপত্যকায় নিহতের মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬০ হাজার। গত ১৮ মার্চ থেকে গাজায় নতুন করে ইসরাইলি হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে প্রায় ১৪০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
নৃশংসতার সবচেয়ে বড় শিকার শিশুরা
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গাজায় প্রায় ১৯ হাজার শিশু শহীদ হয়েছে। মা-বাবা হারিয়ে এতিম হয়েছে ৩৯ হাজার শিশু। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিষ্ক্রিয়তা ও দায়মুক্তির কারণে ইসরাইলি দখলদাররা ফিলিস্তিনি শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধ করতে আরও উৎসাহী হচ্ছে। এদিকে এক বিবৃতিতে ইসরাইলের অপরাধগুলো তুলে ধরার জন্য মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কাছে আহ্বান জানায় হামাস। গাজার মোট ২৩ লাখ বাসিন্দার ৫১ শতাংশ শিশু। উপত্যকাটিতে ইসরাইলের হামলায় নিহত শিশুদের তথ্য আরও সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরেছে ফিলিস্তিনের কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান ব্যুরো। তাদের তথ্যমতে, গাজায় নিহত শিশুদের মধ্যে ২৭৪টি নবজাতক আর এক বছরের কম বয়সী ৮৭৪ শিশু রয়েছে। হামলার পাশাপাশি উপত্যকাটিতে ঠাণ্ডায় জমে ১৭ এবং ক্ষুধা ও অপুষ্টিতে ৫২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
বর্বরতা থামাচ্ছে না পাষাণ্ড ইসরাইল
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজায় নির্বিচার হামলা শুরু করে ইসরাইল। স্থানীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, তখন থেকে উপত্যকাটিতে অন্তত ৫০ হাজার ৬৬৯ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত ১ লাখ ১৫ হাজার ২২৫ জন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে গত ১৮ মার্চ থেকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের পর নিহত ১ হাজার ২৪৯ জন রয়েছেন। এ সময় আহত হয়েছেন ৩ হাজার ২২ জন। গত ১৮ মার্চ থেকে গাজায় হামলার পাশাপাশি দখলও শুরু করেছে ইসরাইলি বাহিনী। রাফা ও খান ইউনিসে চলছে স্থল অভিযান। গাজা নগরীর শুজাইয়া এলাকায় আকাশ ও স্থলপথে ব্যাপক হামলা হয়। তীব্র গোলাগুলির মধ্যে আটকা পড়েন এলাকাটির বাসিন্দারা। এক বাসিন্দা আল-জাজিরাকে বলেন, ‘ইসরাইলের নির্বিচার তীব্র হামলার কারণে আমরা বাসাবাড়ি ও তাঁবু ছেড়ে যেতে ভয় পাচ্ছি। কামানের গোলার আঘাতে আমাদের বেশিরভাগ তাঁবু ছিড়ে গেছে। ড্রোন থেকেও আমাদের ওপর হামলা হচ্ছে।’ এদিকে গাজায় ইসরাইলের বোমা হামলার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন উপত্যকাটির একজন সাংবাদিক।
যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন, গাজার ৫০ শতাংশ ইসরাইলের দখলে
গত ১৮ মার্চ থেকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে গাজায় হামলা শুরুর পর ক্রমাগত নিজেদের দখলদারিত্ব বাড়িয়ে চলেছে ইসরাইল। এখন পর্যন্ত উপত্যকার ৫০ শতাংশেরও বেশি দখলে নিয়েছে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী (আইডিএফ)। এর ফলে নিজ ভূমিতে অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছেন ফিলিস্তিনিরা। ইসরাইলি সেনা ও মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর মতে, গাজা সীমান্তের আশপাশে সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা সবচেয়ে বড় এলাকায় ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর, কৃষিজমি এবং অবকাঠামো ধ্বংস করে দিয়েছে ইসরাইলি বাহিনী। জিম্মিদের মুক্তি দিতে হামাসকে চাপ দেওয়ার সাময়িক প্রয়োজনের অজুহাতে হামলা অব্যাহত রাখছে ইসরাইল।
ঘরবাড়ি ছাড়ছেন হাজার হাজার মানুষ
গাজায় স্থল অভিযানের সীমানা আরও বিস্তৃত করেছে ইসরাইল। অবরুদ্ধ জনপদে চলমান এ হত্যাকাণ্ডে নতুন করে গৃহহীন হয়েছে লাখ লাখ ফিলিস্তিনি। ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছে হাজার হাজার মানুষ। জাতিসংঘ বলছে, গাজার উপত্যকার অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ জায়গায় এখন আর কোনো ‘নিরাপদ’ অঞ্চল নেই। গত ৪ এপ্রিল এক বিবৃতিতে এ মন্তব্য করে জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয়ের অফিস (ওসিএইচএ)। আল-জাজিরা। রাফাহকে নিরাপদ অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করে ইতোমধ্যে শহরটির দখল নিয়েছে ইসরাইলের সেনাবাহিনী। যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর গাজার বাসিন্দারা ঘরে ফিরতে শুরু করেছিলেন। তবে নতুন করে ইসরাইলের অভিযানের মুখে গাজার বাসিন্দারা স্থায়ীভাবে বাস্তুচ্যুতির আশঙ্কা করছেন। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়, ইসরাইলের নির্বিচার ও নৃশংস হামলার জেরে গাজার হাজার হাজার মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ঘরবাড়ি ও আশ্রয়শিবির ছেড়ে পালাচ্ছেন। এতে গাজায় আবার বিপুলসংখ্যক মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। নতুন করে ‘নিরাপদ অঞ্চল’ ঘোষণা করা রাফাহ শহরকে দখলে নিচ্ছে ইসরাইলি বাহিনী।
গাজায় গমের একটা দানাও ঢুকতে দেবে না ইসরাইল
এক তরফা হামলার শিকার ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় দেখা দিয়েছে তীব্র খাদ্যসংকট। এ বিষয়ে বিশ্বজুড়ে ক্ষোভের সঞ্চার হলেও ইসরাইল বলছে, গাজায় গমের একটা দানাও ঢুকবে না। গত ৭ এপ্রিল এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা আনাদলু। বার্তা সংস্থাটি বলছে, ইসরাইলি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ ৭ এপ্রিল অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ‘গমের একটি দানাও’ প্রবেশ করা রোধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ইসরাইলি দৈনিক ইয়েদিওথ আহরোনোথের প্রকাশিত বিবৃতিতে স্মোট্রিচ বলেছেন, ‘গমের একটি দানাও গাজায় প্রবেশ করবে না।’
দেশে দেশে বিক্ষোভ
ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরাইলের গণহত্যা বন্ধের দাবিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশ হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা অবিলম্বে গাজায় এ বর্বরতা বন্ধ এবং সেখানে ত্রাণ ও মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর প্রক্রিয়া স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছেন। সেইসঙ্গে ইসরাইলকে অব্যাহতভাবে সাহায্য করার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে তুলোধুনো করেছেন বিভিন্ন দেশের আন্দোলনকারীরা। গত ৫ এপ্রিল গাজায় সামরিক অভিযান বন্ধ এবং ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণার দাবিতে যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে বিক্ষোভ করেছেন হাজার হাজার মানুষ। এ বিক্ষোভকারীদের মধ্যে মুসলিম, খ্রিস্টানদের পাশাপাশি অনেক ইহুদি শান্তিকামী সংস্থার প্রতিনিধিরাও ছিলেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর বরাত দিয়ে তুরস্কের রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা আনাদলু এজেন্সি জানিয়েছে, প্যালেস্টাইনিয়ান ইউথ মুভমেন্ট, দ্য পিপল’স ফোরাম, জিউয়িশ ভয়েস ফর পিস, আনসার কোয়ালিশনসহ ৩ শতাধিক সংস্থার উদ্যোগে হয়েছে এ মিছিল। মিছিলটি ওয়াশিংটনের গুরুত্বপূর্ণ সবগুলো সড়ক প্রদক্ষিণ করেছে।
গত ৬ এপ্রিল রোববার রাজধানী আঙ্কারাসহ তুরস্কের বিভিন্ন শহরে একই দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন হাজার হাজার মানুষ। যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে সামরিক ও রাজনৈতিক সহায়তা প্রদান অব্যাহত রাখায় আঙ্কারায় মার্কিন দূতাবাসের সামনেও বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছে। এ সময় তারা ‘জর্ডান নদীর তীর থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত স্বাধীন ফিলিস্তিন চাই’ ‘মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক, ইসরাইলের দখলদারী নিপাত যাক’ ইত্যাদি স্লোগানও দিয়েছেন। সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে মরক্কোয়। উত্তর আফ্রিকার এ দেশটির রাজধানী রাবাতে গত ৬ এপ্রিল গাজায় সামরিক অভিযান বন্ধের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন লক্ষাধিক মানুষ। এ সময় তারা ইসরাইলের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের বিরুদ্ধেও স্লোগান দেন। বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার জন্য কাসাব্লাঙ্কা শহর থেকে রাবাতে এসেছিলেন মোহাম্মদ তৌসি। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, এখন আর এটা যুদ্ধের পর্যায়ে নেই। ইসরাইল গাজাকে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করছে; আর তাদেরকে প্রশ্রয় দিচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন। বিভিন্ন ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড হাতে জার্মানির বার্লিনেও বিক্ষোভ হয়েছে। বিক্ষোভে ইসরাইলের হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে নেতানিয়াহু সরকারের ব্যাপক সমালোচনা করা হয়েছে। এছাড়া বিশ্বের প্রায় সব দেশে বিক্ষোভ হয়েছে।
বিশ্বব্যাপী ধর্মঘট পালিত
গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসনের প্রতিবাদে গত সোমবার (৭ এপ্রিল) বিশ্বব্যাপী সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল ফিলিস্তিনি ন্যাশনাল অ্যান্ড ইসলামিক ফোর্স। এক বিবৃতিতে সংগঠনটি জানায়, গাজায় ইসরাইলি হামলার ফলে সৃষ্ট ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ও মৃত্যুর মিছিল বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতেই এ ধর্মঘট আহ্বান করা হয়। ফিলিস্তিনি ন্যাশনাল অ্যান্ড ইসলামিক ফোর্সের আহ্বান গাজায় ইসরাইলের সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ ও ফিলিস্তিনিদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা পালন করে বিশ্ববাসী।
গণহত্যায় বাংলাদেশের নিন্দা
গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি দখলদার বাহিনীর অব্যাহত গণহত্যা এবং চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। গত ৭ এপ্রিল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে এ নিন্দা জানায়। বিবৃতিতে বলা হয়, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের পর থেকে ইসরাইলি সামরিক হামলায় বহু ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু। এর ফলে গাজায় মানবিক সাহায্য পৌঁছানো বন্ধ হয়ে গেছে, যা বাসিন্দাদের মানবিক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছে। স্পষ্টত ইসরাইল বার বার আন্তর্জাতিক আবেদনের তোয়াক্কা করেনি, বরং ক্রমবর্ধমান হত্যাকাণ্ডে লিপ্ত হয়েছে। বাংলাদেশ নিরস্ত্র ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জাতিগত নির্মূল অভিযান চালানোর উদ্দেশ্যে গাজার ঘনবসতিপূর্ণ বেসামরিক এলাকায় ইসরাইলি দখলদার বাহিনীর নির্বিচার বিমান হামলা ও বোমাবর্ষণের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ইসরাইলকে অবিলম্বে সব সামরিক অভিযান বন্ধ, সর্বাধিক সংযম প্রদর্শন এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের অধীনে তার দায়িত্ব পালন করার আহ্বান জানাচ্ছি।
উত্তাল বাংলাদেশ
‘নো ওয়ার্ক, নো স্কুল’ কর্মসূচির প্রতি পূর্ণ সংহতি জানিয়ে দেশের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই ক্লাস-পরীক্ষা হয়নি। অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ বন্ধ রাখা হয়। গত ৭ এপ্রিল সকাল থেকে বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে সারা দেশ। এর মধ্যে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ মিছিল, বিক্ষোভ সমাবেশ ছিল চোখে পড়ার মতো। ঢাকা, রাজশাহী, জাহাঙ্গীরনগর, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় যেমন প্রতিবাদমুখর ছিল, তেমনই রাস্তায় সরব ছিলেন ব্র্যাক, ইস্ট ওয়েস্ট, কানাডিয়ান, নর্থ সাউথসহ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। রাজপথে প্রতিবাদে ফেটে পড়েন মেডিকেল, মাদরাসা, স্কুল-কলেজ পড়ুয়ারাও। এদিকে গাজায় গণহত্যা বন্ধের দাবিতে ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের পাশে শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষের বিক্ষোভের কারণে মার্কিন দূতাবাসসহ কূটনৈতিক এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। সেখানে কঠোর অবস্থানে রয়েছেন সেনাবাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), পুলিশসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা বাহিনীর সদস্যরা।
বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ওয়ার্ল্ড স্টপস ফর গাজা’ কর্মসূচি
গাজায় গণহত্যার প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ‘ওয়ার্ল্ড স্টপস ফর গাজা’ কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন ও বিক্ষোভ করেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। ‘ওয়ার্ল্ড স্টপ ফর গাজা’ কর্মসূচির প্রতি সমর্থনে উত্তাল হয়ে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাস। বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে বিক্ষোভ থেকে ফিলিস্তিনের মুক্তি ও ইসরাইলের ধ্বংস কামনা করা হয়। গত ৭ এপ্রিল বেলা ১১টা থেকে বিভিন্ন সংগঠন বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে ঢাবির রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে জড়ো হতে থাকে। বিক্ষোভে রাজধানীর বিভিন্ন স্কুল-কলেজ-মাদরাসার শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। তারা ইসরাইলি পণ্য বয়কট ও ফিলিস্তিনকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে সবাইকে লড়াইয়ের ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানান। এ কর্মসূচির প্রতি সংহতি জানিয়ে সকাল ৯টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত ঢাবির অফিস কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়।
বেলা সাড়ে ১১টায় বুয়েটের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন করেন। এতে বক্তব্য দেন ভিসি অধ্যাপক আবু বোরহান মোহাম্মদ বদরুজ্জামান। অন্যদিকে কর্মসূচির সঙ্গে সংহতি জানিয়ে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সব অফিসে কর্মবিরতি পালন করা হয়। এছাড়া গত ৯ এপ্রিল বুধবার বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষা কার্যক্রম স্থগিতের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সকালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারের সামনে সংহতি সমাবেশের আয়োজন করে শিক্ষক সমিতি। এতে ইসরাইলের সব পণ্য বয়কটের আহ্বান জানিয়েছেন ভিসি অধ্যাপক ড. রেজাউল করিম। এদিকে ফিলিস্তিনে গণহত্যার প্রতিবাদে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করেন শিক্ষার্থীরা। বেলা ১১টার দিকে মিছিল-স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। বিকেলে রাজধানীর আফতাবনগরে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির সামনে জড়ো হন শিক্ষার্থীরা। পরে মিছিল নিয়ে রামপুরা ও বাড্ডা এলাকা প্রদক্ষিণ করেন তারা। কর্মসূচি থেকে ইসরাইলের পতাকা পোড়ানো হয়। এতে মধ্য বাড্ডা, বনশ্রী, রামপুরা ও বাড্ডার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা যোগ দেন। কর্মসূচি শেষে সড়কে আসরের নামাজ আদায় করে ফিলিস্তিনিদের মুক্তির জন্য দোয়া করা হয়।
এছাড়া গাজার প্রতি সমর্থন জানিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি, প্রাইম এশিয়া ইউনিভার্সিটি, লিডিং ইউনিভার্সিটি, কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস, ইউনিভার্সিটি অব স্কলারস, ইউনিভার্সিটির অব এশিয়া প্যাসিফিক, পিপলস ইউনিভার্সিটি, ঢাকা স্টেট কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা বিক্ষোভ করেন।
স্লোগানমুখর বায়তুল মোকাররম এলাকা
গত ৭ এপ্রিল সোমবার দুপুরে বায়তুল মোকাররমের উত্তর ফটকে জামায়াতে ইসলামী মহানগর দক্ষিণ, খেলাফত মজলিস ও জাতীয় ওলামা মাশায়েখ আইম্মা পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে কয়েক হাজার মানুষ সমবেত হন। জোহরের নামাজের পর মসজিদ থেকে বেরিয়ে তারা একযোগে বলে ওঠেন ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবর’। পরে তারা মসজিদের উত্তর পাদদেশে সমবেত হন। সেখানে সবাই একসঙ্গে ফিলিস্তিনের পতাকা ওড়াতে শুরু করেন, স্লোগানে আওয়াজ তোলেন। ‘ফিলিস্তিন জিন্দাবাদ’, ‘ফিলিস্তিন জিন্দাবাদ’, ‘ফ্রি ফ্রি ফিলিস্তিন’সহ বিভিন্ন স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে বায়তুল মোকাররম এলাকা। এতে ইসরাইলবিরোধী বিভিন্ন স্লোগান-সংবলিত ব্যানার-ফেস্টুন ও প্ল্যাকার্ড নিয়ে অংশ নেন তারা। অনেকে প্রতীকী লাশ বহন করেন। এ সময় বক্তারা বলেন, ইসরাইলের সন্ত্রাসী কার্যক্রমে সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা করছে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমারা। তাদের বিরুদ্ধেও সোচ্চার হতে হবে। প্রয়োজনে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে। এ সময় তারা ইসরাইলের পণ্য বর্জনের আহ্বান জানান।
সমাবেশে বক্তব্য দেন ইসলামী বক্তা আবু ত্বহা মুহাম্মদ আদনান, মাওলানা গাজী আতাউর রহমান, মুফতি রেজাউল করিম আবরার প্রমুখ। সমাবেশ শেষে শাহবাগ অভিমুখে বিক্ষোভ মিছিল করেন তারা। মিছিলটি বায়তুল মোকাররম মসজিদের সামনে থেকে শুরু করে জাতীয় প্রেস ক্লাব হয়ে শাহবাগ মোড়ে গিয়ে শেষ হয়।
শাহবাগে এনসিপির সমাবেশ
বিকেলে জাতীয় জাদুঘরের সামনে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ঢাকা মহানগরের উদ্যোগে বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছে। এতে পার্টির সদস্য সচিব আখতার হোসেন ভারতের ওয়াক্ফ বিল সংশোধনী বাতিল করে আগের আইনে ফিরে যাওয়া এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি জানান। মিছিলটি জাতীয় জাদুঘর থেকে শুরু হয়ে বাংলামোটর এনসিপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে গিয়ে শেষ হয়। কর্মসূচিতে আখতার হোসেন বলেন, ‘অবিলম্বে প্যালেস্টাইনে যুদ্ধবাজ নেতানিয়াহুসহ প্রত্যেককে যুদ্ধাপরাধের দায়ে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।’
ইসরাইল নৃশংসতার সর্বোচ্চ সীমা অতিক্রম করেছে: লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) প্রেসিডেন্ট ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেছেন, ইসরাইলরা একটি অভিশপ্ত জাতি। যারা নৃশংসতার সর্বোচ্চ সীমা অতিক্রম করেছে। গত ৭ এপ্রিল বিবৃতিতে তিনি এ কথা বলেন।
গাজা মৃত্যু উপত্যকা: দখলদার বাহিনীর নির্বিচার হামলায় গাজা মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন নিরাপদ সড়ক চাই-এর চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন। জাতীয় প্রেস ক্লাব চত্বরে আয়োজিত প্রতিবাদ সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। ‘গণশক্তি সভা’ এ কর্মসূচির আয়োজন করে।
ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বরখাস্ত: গাজা ইস্যুতে শিক্ষার্থীদের ‘ডাবল অ্যাবসেন্ট’-এর হুমকি দেওয়ার অভিযোগে জার্নালিজম, মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের প্রভাষক শিক্ষক তাহমিনা রহমানকে বরখাস্ত করেছে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ডিআইইউ)। গত ৭ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখপাত্র এবং এক্সটার্নাল অ্যাফেয়ার্সের পরিচালক সৈয়দ মিজানুর রহমান রাজু এ তথ্য জানিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ প্রত্যাখ্যান ইবি শিক্ষার্থীর: ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি সংহতি জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফোর্ডহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) জাকির হোসেন নামে এক শিক্ষার্থী। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন টেকনোলজি বিভাগের স্নাতক ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। ফেসবুক স্ট্যাটাসে নিজের এ সিদ্ধান্তের কথা জানান জাকির।
অবিলম্বে গাজায় নারী-শিশু হত্যাসহ ন্যক্কারজনক হামলা বন্ধ করতে হবে। যদি না করা হয়, তাহলে বিশ্ব মুসলিম গাজার দিকে মার্চ করতে বাধ্য হবে। ঐক্যবদ্ধ হয়ে মুসলিম উম্মাহ ইসরাইলকে বিশ্ব মানচিত্র থেকে গুঁড়িয়ে দেবে। গত ৭ এপ্রিল বিকেলে রাজধানী ঢাকায় এক বিক্ষোভ মিছিল শেষে এসব কথা বলেন ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি ড. রেজাউল করিম। তিনি বলেন, সারা পৃথিবীর কাছে কুখ্যাত সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে খ্যাত ইসরাইল ফিলিস্তিনের গাজাবাসী নারী ও শিশুকে হত্যা করে আইয়ামে জাহেলিয়াতের বর্বর যুগের ইতিহাসকে হার মানিয়েছে।
ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভ
ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরাইলের নির্মম আগ্রাসনের প্রতিবাদে রাজধানীর মার্কিন দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভ মিছিল করছেন সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীরা। এ সময় তারা ‘ইসরাইলের দালালেরা, হুঁশিয়ার সাবধান’, ‘নারায়ে তাকবীর’, ‘ফ্রি ফ্রি প্যালেস্টাইন’ ইত্যাদি স্লোগান দিতে থাকেন। গত ৭ এপ্রিল বেলা ১১টা থেকে এ বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়। বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীদের হাতে বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড দেখা যায়। এদিকে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘিরে দূতাবাসের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। দূতাবাসের সামনে অবস্থান নেন সেনা সদস্যরা। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া এক শিক্ষার্থী বলেন, ফিলিস্তিনে গাজার জয় হবেই হবে। যতদিন এ পৃথিবী থাকবে ততদিন ওই ইসলামের ভূমি ধ্বংস করা যাবে না।
বিভিন্ন সংগঠনের বিক্ষোভ
ফিলিস্তিনের গাজা ও রাফায় ইসরাইলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী চলা ‘নো ওয়ার্ক, নো ক্লাস’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে গত ৭ এপ্রিল জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে বিভিন্ন দল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন। এসব সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে, শেখ বোরহানুদ্দীন পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কলেজ, ইসলামী যুব মজলিস, গণশক্তি, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, বাংলাদেশ খেলাফতে যুব মজলিস ঢাকা মহানগর দক্ষিণ।
ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে হাজারো মুসল্লি
ফিলিস্তিনের ওপর ইসরাইলের নির্মম হামলার প্রতিবাদ ও গাজাবাসীরা ঢাকা হরতাল সমর্থনে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের উপস্থিত হন হাজার হাজার মুসল্লি। এ সময় তারা ‘ফিলিস্তিন জিন্দাবাদ, ফিলিস্তিন জিন্দাবাদ’, ‘নারায়ে তাকবির আল্লাহু আকবার’, ‘ইসরাইলের কালো হাত, ভেঙে দাও ভেঙে দাও’ স্লোগান দিতে থাকেন। গত ৭ এপ্রিল দুপুরে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেট থেকে রওনা দেন মিছিলকারীরা।
মার্কিন নাগরিকদের চলাচলে সতর্কতা
ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরাইলি বাহিনীর নির্বিচারে হামলার প্রতিবাদে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ ও সমাবেশ করছেন শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ। তারই পরিপ্রেক্ষিতে চলমান প্রতিবাদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের চলাচলে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে ঢাকার মার্কিন দূতাবাস। গত ৭ এপ্রিল মার্কিন দূতাবাসের ওয়েবসাইটে একসতর্ক বার্তায় এ ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
স্লোগানে মুখর বায়তুল মোকাররম
ফিলিস্তিনের ওপর ইসরাইলের নির্মম হামলার প্রতিবাদ ও গাজাবাসীর ডাকা হরতালের সমর্থনে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে সমবেত হয়েছেন মুসল্লিরা। এ সময় তারা ‘ফিলিস্তিন জিন্দাবাদ’, ‘ফিলিস্তিন জিন্দাবাদ’, ‘ফ্রি ফ্রি ফিলিস্তিন’ প্রভৃতি স্লোগানে মুখর করে তোলেন মসজিদের উত্তর পাদদেশ। গত ৭ এপ্রিল বাদ জোহর বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে মুসল্লিরা স্লোগান দিয়ে ওঠেন ‘নারায়ে তাকবীর, আল্লাহু আকবার’। পরে মসজিদ থেকে বেরিয়ে সবাই সমবেত হন মসজিদের উত্তর পাদদেশে। এখানে সবাই একসঙ্গে ফিলিস্তিনি পতাকা ওড়াতে শুরু করেন। আর স্লোগানে স্লোগানে উত্তাল করে তোলেন মসজিদ প্রাঙ্গণ। এ সময় তারা স্লোগান দেন ‘ইসরাইলের কালো হাত, ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’, ‘ফিলিস্তিন জিন্দাবাদ, ফিলিস্তিন জিন্দাবাদ’।
আরব রাষ্ট্রগুলোর নিষ্ক্রিয়তায় ক্ষোভ
গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান ইসরাইলি বর্বরতার প্রতিবাদে গত ৭ এপ্রিল বিক্ষোভ মিছিল করেছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ব্র্যাকের শিক্ষার্থীরা। এ সময় তারা গাজায় ইসরাইলের ভয়াবহ হামলায় নারী ও শিশুসহ হাজার হাজার মানুষ নিহতের ঘটনা এবং এর বিপরীতে জাতিসংঘ, ইউনিসেফ ও আরব দেশগুলোর নিষ্ক্রিয়তার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। শিক্ষার্থীরা বলেন, ফিলিস্তিনের নারী-শিশুসহ মুসলিমদের ওপর এমন বর্বরতার পরও যারা নীরব দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে, তারা ইসরাইলের এ হত্যাযজ্ঞকে সমর্থন করছে বলে আমরা মনে করি। শিক্ষার্থীরা রাজধানীর বাড্ডায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় গেটের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেন।
সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচি ছাত্রশিবিরের
ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরাইলি নারকীয় গণহত্যা বন্ধ ও স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিতে সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। ৭ এপ্রিল এক যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলাম ও সেক্রেটারি জেনারেল নূরুল ইসলাম সাদ্দাম এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। সপ্তাহব্যাপী ঘোষিত কর্মসূচি হচ্ছে, এক. গত ৭ এপ্রিল ‘গ্লোবাল স্ট্রাইক ফর গাজা’ কর্মসূচির প্রতি সংহতি জানিয়ে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন এবং সর্বস্তরে অফিস-আদালত বন্ধ রাখার আহ্বান। দুই. ৮ এপ্রিল দেশের সব মহানগরে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে সংগঠনটি। তিন. ৯ এপ্রিল গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও ভবনের ছাদে ফিলিস্তিনের পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে ‘সলিডারিটি উইথ প্যালেস্টাইন’ কর্মসূচি পালন করে। চার. ১০ এপ্রিল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন দেশের দূতাবাসে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিতে স্মারকলিপি প্রদান। পাঁচ. ১১ এপ্রিল জেলা পর্যায়ে ‘ম্যাস মুভমেন্ট’ কর্মসূচি পালন। ছয়. ৭ থেকে ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত সপ্তাহব্যাপী অনলাইন ক্যাম্পেইন ‘ইকোস ফর গাজা’ পরিচালনা।
ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার দাবিতে ঢাবিতে বিক্ষোভ
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরাইলের গণহত্যা ও দখলদারিত্বের প্রতিবাদে এবং গ্লোবাল স্ট্রাইক ফর গাজার সমর্থনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ শুরু করেছে সর্বস্তরের ছাত্র-জনতা। বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে বিক্ষোভ থেকে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা ও ইসরাইলের ধ্বংস কামনা করা হয়। গত ৭ এপ্রিল বিভিন্ন সংগঠন বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে জড়ো হতে থাকে। বিক্ষোভে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েটসহ রাজধানীর বিভিন্ন স্কুল-কলেজ, মাদরাসার শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। এ সময় তারা ‘তুমি কে আমি কে, ফিলিস্তিন ফিলিস্তিন’; ‘ইসরাইলের বন্ধুরা হুঁশিয়ার সাবধান’; ‘বয়কট বয়কট, ইসরাইল বয়কট’; ‘ফিলিস্তিন ফিলিস্তিন, জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ’ ইত্যাদি স্লোগান দিতে থাকেন।
বুয়েট শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন
ফিলিস্তিনের গাজা ভূখণ্ডে দখলদার ইসরাইলি বাহিনীর হামলার প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থীরা। একইসঙ্গে জেরুসালেমে ফিলিস্তিনিদের পূর্ণ অধিকার রয়েছে এবং তাদের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম বৈধ ও ন্যায্য বলে জানান তারা। গত ৭ এপ্রিল বুয়েটের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করে বুয়েটের শিক্ষকরাও মানববন্ধনে অংশ নেন। এ সময় তারা ‘ফ্রম দ্য রিভার টু দ্য সি, প্যালেস্টাইন উইল বি ফ্রি’, ‘ইস্ট টু ওয়েস্ট, নো ফ্লো টু জায়নিস্ট’, ‘মেঘনা টু জেরুসালেম, ইনসাফ ইনসাফ’, ‘শেম শেম জায়নিস্ট, মেক ফ্রি প্যালেস্টাইন’, ‘ফিলিস্তিন মুক্তি পাক, ইসরাইল নিপাত যাক’; ‘ইনকিলাব ইনকিলাব, আল আকসা জিন্দাবাদ’ ইত্যাদি স্লোগান দেন।
গণহত্যা বন্ধের দাবি ঢাবি সাদা দলের
ফিলিস্তিনের গাজাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ইসরাইলি বাহিনীর বর্বরোচিত গণহত্যা ও জবরদখল অবিলম্বে বন্ধের দাবি জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দল। একইসঙ্গে ‘নো ওয়ার্ক, নো স্কুল আনটিল জেনোসাইড স্টপস’ কর্মসূচির প্রতি সংহতি জানিয়েছে সংগঠনটি। গত ৭ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাদা দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খান এবং যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. আব্দুস সালাম ও অধ্যাপক ড. আবুল কালাম সরকার স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এ বর্বরোচিত হামলার প্রতিবাদ জানানো হয়।
জবিতে ‘নো ওয়ার্ক’ কর্মসূচি, ক্লাস-পরীক্ষা স্থগিত
ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরাইলি বাহিনীর নৃশংস হামলার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের বিশ্বব্যাপী ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন কর্মসূচির সঙ্গে সংহতি জানিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) শিক্ষকরা ‘নো ওয়ার্ক’ কর্মসূচি এবং শিক্ষার্থীরা ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির কর্মসূচির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে ‘নো ওয়ার্ক’ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে জবি প্রশাসন। গত ৬ এপ্রিল জনসংযোগ দপ্তর থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
‘ইসরাইল একটি অভিশপ্ত দেশ’
ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসনের প্রতিবাদে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা। গত ৭ এপ্রিল মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড মোড়ে ঢাকা স্টেট কলেজের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা বিক্ষোভ মিছিল করেন। এ সময় স্থানীয়রা তাদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন। বিক্ষোভ মিছিলে ঢাকা স্টেট কলেজের শিক্ষক আকতার হোসেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার উদ্দেশে বলেন, মুসলিম প্রধান দেশের নেতা হিসেবে ইসরাইলের বর্বরোচিত হামলার প্রতিবাদ জানানো উচিত। ইসরাইল একটি অভিশপ্ত দেশ, যারা নিরীহ মুসলিমদের ওপর হামলা চালিয়ে আসছে।
ট্রাম্প নেতানিয়াহু বৈঠকে নতুন পরিকল্পনা
গাজায় ইসরাইলের ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যে গত ৭ এপ্রিল হোয়াইট হাউসে উপস্থিত হয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। বৈঠকে গাজায় যুদ্ধবিরতি ও জিম্মি মুক্তির নতুন পরিকল্পনার ইঙ্গিত এসেছে। নেতানিয়াহু হাউসে পৌঁছালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে স্বাগত জানান। আর এ সময় হোয়াইট হাউসের গেটে ফিলিস্তিনপন্থিরা বিক্ষোভ করেন। হাতে পতাকা, মুখে স্লোগান-গাজায় যুদ্ধ বন্ধের দাবিতে সোচ্চার ছিলেন তারা। বৈঠক শেষে নেতানিয়াহু জানান, গাজায় জিম্মিদের মুক্তি নিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে কাজ চলছে। নতুন একটি চুক্তির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, যা সফল হতে পারে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি। ট্রাম্প আরও জানান, গাজাকে পুনর্গঠনের সময় গাজাবাসীকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার যে প্রস্তাব দেয়া হয়েছে সেটিতে বিক্ষোভকারীরা সমর্থন জানান। গাজাবাসীকে নেওয়ার জন্য কিছু দেশের সঙ্গে তাদের ইতিবাচক কথা হয়েছে। তবে দেশগুলোর নাম উল্লেখ করেননি তিনি। ট্রাম্প আবারও ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়ে গাজাকে ফ্রিডম জোন বানানোর পরিকল্পনার কথা বলেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি শান্তিরক্ষী বাহিনী থাকা, গাজাকে নিয়ন্ত্রণ ও এটির মালিকানা থাকা খুব ভালো একটি বিষয় হবে।’