১১ দলের সিলেট বিভাগীয় সমাবেশে বিরোধীদলীয় নেতা

বাংলাদেশে আর কোনো ফ্যাসিবাদ আমরা চাই না, হ্যাঁ ভোটের বাস্তবায়ন দেখতে চাই


৩০ জুলাই ২০২৬ ১১:০৬

সিলেট সংবাদদাতা : বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান এমপি বলেছেন, জনগণ পরিবর্তনের জন্য, সংস্কারের জন্য গণভোটে হ্যাঁ বলেছে। গণভোটে ৭০ ভাগ মানুষের হ্যাঁ-কে আমরা অপমান করতে দেব না। হ্যাঁ ভোটের বাস্তবায়ন দেখতে চাই। কোনো ধানাই-পানাই শুনতে চাই না।
তিনি বলেন, সারা বাংলাদেশের মানুষের একই দাবি- গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন করতে হবে। গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন করেই আমাদের আন্দোলন সফলতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছবে। বংলাদেশে আর কোনো ফ্যাসিবাদ আমরা চাই না।
গত ২৫ জুলাই শনিবার বিকেলে সিলেটের ঐতিহাসিক সরকারি আলিয়া মাদরাসা মাঠে ১১ দলের সিলেট বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বিএনপি ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের পথ ধরেই হাঁটা শুরু করেছেন। তারা সকল পর্যায়ে দলীয়করণ করে দুর্নীতিকে জাতীয়করণ করতে যাচ্ছেন। আমরা এটি মানব না। হাসিনাকে তাড়িয়েছি, যদি তারা ফ্যাসিবাদ কায়েম করেন জনগণ তাদেরও তাড়াবে।
গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন বিষয়ে তিনি সরকারকে সতর্ক করে বলেন, ভালোয় ভালোয় মেনে নিন। আমরা আমাদের জুলাইযোদ্ধা, জুলাইশহীদ ও ১৮ কোটি মানুষের সাথে বেঈমানি করব না। আমরা কথা রাখব। জীবন দিয়ে হলেও লড়াই করে কথা রাখব।
সিলেটবাসীকে পরবর্তী আন্দোলনের প্রস্তুতির আহ্বান জানিয়ে আমীরে জামায়াত বলেন, ঢাকার জন্য ডাক আসবে। প্রস্তুতি নিন। ঘরে ঘরে লড়াইয়ের দুর্গ গড়ে তুলতে হবে। দেশ থেকে ফ্যাসিবাদ, চাঁদাবাজ, দুর্নীতিবাজ ও দুঃশাসন দূর না হওয়া পর্যন্ত আমাদের লড়াই তীব্র থেকে তীব্রতর হবে। আমরা থামব না, বলেন তিনি।
সিলেটের বঞ্চনা ও ভোগান্তি তুলে ধরে সরকারের উদ্দেশে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সিলেটের কিছু ন্যায্য দাবি ঝুলে আছে যুগ যুগ ধরে। সিলেট এমএজি ওসমানী বিমানবন্দরকে অবিলম্বে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পরিণত করুন। অবিলম্বে সিলেটের ৬ লেনের রাস্তা সম্পন্ন করে জনগণকে স্বস্তি দেয়া হোক। সিলেটের দীর্ঘ দিনের দাবি, এখানে ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি হবে। কলেজটি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে কেন? এটিকে ইউনিভার্সিটিতে রূপান্তর করে প্রাণ দেয়া হোক। মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় নামে মাত্র একটি ঘর, আর একজন ভিসি। এর বাইরে তেমন কোনো কার্যক্রম পরিলক্ষিত হচ্ছে না। অবিলম্বে এটাকে পূর্ণাঙ্গতা দেয়া হোক, বলেন তিনি।
বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এমপি বলেন, জুলাই বিপ্লব দেশ থেকে দেশে ছড়িয়ে যাচ্ছে। আর আমাদের সরকার উল্টো পথে হাঁটছে। আমরা আশা করেছিলাম, জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে দেশে যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে, সেই সরকার গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন করবে। কিন্তু দুঃখের সাথে দেখতে হচ্ছে, সেই সরকার গণভোটে জনগণের রায়কে অবজ্ঞা করছে। বিএনপি যদি জুলাই, তরুণদের ভুলে যায়, ১৪শ’ শহীদকে ভুলে যায়- তাহলে এর পরিণতি বিএনপিকে বরণ করতে হবে, সতর্ক করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের পর বিএনপি সংস্কারকে ভুলে গেছে। তারা এখন শুধু সংবিধান সংশোধনের কথা বলছে। কিছু দালাল বুদ্ধিজীবীই বলছে সংশোধন প্রয়োজন, সংস্কার প্রয়োজন নেই। নাহিদ সতর্ক করে বলেন, সরকার সংস্কার না করলে জনগণের মাঝে যে আস্থা তৈরি হয়েছিল, তারেক রহমান সেই আস্থা ধরে রাখতে পারবেন না। জুলাই সনদের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার করতে হবে, বলেন নাহিদ।
বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ আরও বলেন, বিএনপি দেশের নির্বাচন কমিশনসহ সকল প্রতিষ্ঠান দলীয়করণ করছে। যার কারণে আমরা যে উন্নতি চেয়েছিলাম, তা হবে না। গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন না করলে এই সরকারকে আর আমাদের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা সম্ভব হবে না। যদি জুলাই সনদ, গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন না করে, তাহলে এই সরকার ৫ বছর মেয়াদ পূর্ণ করতে পারবে না। সেজন্য গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে তারেক রহমানকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। নইলে তাকে তাদের পরিণতি ভোগ করতে হবে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর শাইখুল হাদিস আল্লামা মামুনুল হক বলেন, আমাদের ঐক্যের যাত্রা শুরু হয়েছিল জুলাই বিপ্লবের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য। সরকারি দল বা ১১ দলের মধ্যে ক্ষমতার ভাগ-বাঁটোয়ারার জন্য নয়। যতদিন পর্যন্ত জুলাই বিপ্লবের লক্ষ্য অর্জিত না হবে, ততদিন আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাবো। আমাদের নেতাকর্মীরা দীর্ঘ ১৭ বছর জুলুম নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। নেতাকর্মীরা হত্যা, খুন গুমের শিকার হয়েছে। আমাদের ভাইয়েরা জুলাই বিপ্লব, শাপলায় রক্ত দিয়েছে। অনেক ভাই-বোনেরা চিরদিনের জন্য পঙ্গত্ববরণ ও চোখ হারিয়েছেন।
সরকারকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, আমরা সরকারকে বলতে চাই, আপনারাও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে ছিলেন। আমরা আপনাদের বন্ধু মনে করি। আমরা যেমন দেশের কল্যাণ চাই। যে জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতায় বসেছেন, যদি সেই জুলাই বিপ্লবের সাথে গাদ্দারি করেন, তাহলে আপনাদের ঘাড় ধরে ধাক্কা দিতে আমাদের বাঁধবে না। গণভোটের প্রায় ৭০ ভাগ মানুষের ভোটাধিকার নিয়ে যদি ছিনিমিনি করেন, বিশ্বাসঘাতকতা করেন- তাহলে আপনাদের পরিণাম শেখ হাসিনার মতো হবে।
মামুনুল হক আরও বলেন, গণভোটের গণরায় মেনে নিন, জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করুন। গণভোটের গণরায়ের আলোকে গণপরিষদ গঠন করুন। তা না হলে আন্দোলন করে তা বাস্তবায়নে বাধ্য করা হবে। আমাদের আন্দোলন ৩০ হাজার আহত জুলাইযোদ্ধার অধিকার আদায়ের আন্দোলন।
সভাপতির বক্তব্যে এলডিপির প্রেসিডেন্ট কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রম বলেন, জবাবদিহিমূলক বাংলাদেশ তখনই সম্ভব হবে, যখন দেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, চাঁদাবাজ ও দুর্নীতিমুক্ত করা সম্ভব হবে। তারেক রহমানকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, আপনাকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হতে হবে, বিএনপির না। আপনি দালাল, চাটুকারদের কথা না শুনে নিজের বিবেক দিয়ে বিবেচনা করে সংস্কার বাস্তবায়ন করুন। প্রয়োজনে ১১ দলের নেতাদের সাথে কথা বলেন। জাতিকে মুক্ত করেন।
তিনি বলেন, জনগণ যে সংস্কার চায় সেই সংস্কার করেন। আপনি বাংলাদেশের মানুষের কথা চিন্তা করেন। আপনি চাঁদাবাজি বন্ধ করতে পারেননি। আপনাকে ভুলপথে পরিচালিত করছে। আপনি বাহিরে থাকায় আপনি বাস্তবতা এখনো উপলব্ধি করতে পারছেন না। জনগণের প্রধানমন্ত্রী হতে হলে জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। আমাদের সরকার পতনের এক দফায় ধাক্কা দেবেন না। সংস্কারগুলো সংসদের মাধ্যমে পাস করে দেন। শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রসঙ্গে তিনি জনগণকে ফাঁসির রশি নিয়ে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জনান।
বিভাগীয় সমাবেশে স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সিলেট মহানগরী আমীর মো. ফখরুল ইসলাম। সমাবেশ বক্তব্য দেন এবি পার্টির জেনারেল সেক্রেটারি ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাগপার সহ-সভাপতি ও মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, নেজামে ইসলাম পার্টির সিনিয়র নায়েবে আমীর মাওলানা আবদুল মাজেদ আতহারী, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান এডভোকেট একেএম আনোয়ারুল ইসলাম চান, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমীর মাওলানা রেজাউল করিম জালালী, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল, কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আতাউল্লাহ আমীন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমীর মো. সেলিম উদ্দিন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও সিলেট জেলা আমীর মাওলানা হাবিবুর রহমান, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা ফয়েজ আহমেদ, জাতীয় নাগরিক পার্টির (জাগপা) কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা মহনগরীর সভাপতি জিয়াউল আনোয়ার, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিলেট জেলা সভাপতি জুনায়েদ আহমদ, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সিলেট মহানগরীর সাবেক নায়েবে আমীর হাফিজ আব্দুল হাই হারুন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সিলেট মহানগর শাখার সভাপতি মাওলানা এমরান আলম, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির সিলেট মহানগরীর আমীর মাওলানা মোজ্জামেল হক তালুকদার, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সিলেট জেলা সভাপতি মাওলানা মো. ইকবাল হুসাইন, বাংলাদেশ লেবার পার্টির সিলেট মহানগরীর সভাপতি মাহবুবুর রহমান এবং বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সিলেট মহানগরীর সভাপতি শহিদুল ইসলাম সাজু।