বন্যায় চট্টগ্রামে ২৫০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি
৩০ জুলাই ২০২৬ ১১:০৫
মুহাম্মদ ইমরান সোহেল, চট্টগ্রাম : টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় চট্টগ্রামের সড়ক যোগাযোগ এবং ঘরবাড়ি, কৃষি, মৎস্য, হাঁস-মুরগি-পশু, ও নলকূপের ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানির তোড়ে তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ ক্ষেতের ফসল, আউশ ধান ও আমনের বীজতলা। ভেসে গেছে হাজার হাজার পুকুর-দিঘী ও মাছের ঘের। একইসঙ্গে বন্যার পানিতে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে আঞ্চলিক ও মহাসড়কের বিভিন্ন অংশ। এতে একদিকে কৃষক ও মৎস্য চাষিরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন; অন্যদিকে ভেঙে পড়া সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।
বন্যায় চট্টগ্রামে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। জাতীয়, আঞ্চলিক ও জেলা মহাসড়কের বিভিন্ন অংশ ভেঙে যাওয়া, সড়ক ধসে পড়া, পিচ ও কার্পেটিং ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, সড়কের ওপর বিভিন্ন স্থানে পানি জমে নষ্ট হয়ে গেছ। এতে যান চলাচল ব্যাহত হওয়ায় দুর্ভোগে পড়েছেন মানুষজন।
সওজ সূত্র জানা যায়, চট্টগ্রাম সড়ক বিভাগের অধীনে মোট ৫০ দশমিক ৫৬ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১৯ দশমিক ৫০ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক, ৬ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়ক এবং ২৪ দশমিক ৭১ কিলোমিটার জেলা মহাসড়ক রয়েছে। এসব সড়ক মেরামতে স্বল্পমেয়াদে প্রায় ৮ কোটি ৩০ লাখ এবং দীর্ঘমেয়াদে ১৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা প্রয়োজন হবে।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগে আওতাধীন সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৬৫ দশমিক ৮৫ কিলোমিটার। এখানে জাতীয় মহাসড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১০ দশমিক ৫৫ কিলোমিটার, আঞ্চলিক মহাসড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৭ দশমিক ৪৭ কিলোমিটার ও জেলা মহাসড়ক ৩৭ দশমিক ৮২ কিলোমিটার বিভিন্ন অংশ বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই বিভাগের জন্য স্বল্পমেয়াদি সংস্কার ব্যয় ধরা হয়েছে পাঁচ কোটি ৭৬ লাখ টাকা এবং দীর্ঘমেয়াদি মেরামতের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪ কোটি ১৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা।
বন্যায় চট্টগ্রামে কৃষি খাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। মাঠে থাকা আউশ ধান, আমন বীজতলা, গ্রীষ্মকালীন সবজি, পানের বরজ, আদা-হলুদ ও উদ্যান ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি আউশ আবাদ আক্রান্ত হয়েছে। ৩০ হাজার ২২ দশমিক ৫ হেক্টর আউশ আবাদের মধ্যে ৯ হাজার ৪৩ দশমিক ৫ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২ হাজার ৭২১ দশমিক ৬৭ হেক্টর আমন বীজতলার মধ্যে ৯৬০ দশমিক ৬৬ হেক্টর বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। ১৭ হাজার ৮২৮ দশমিক ৬৫ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজির মধ্যে ৫ হাজার ৯০৭ হেক্টর আক্রান্ত হয়েছে। এতে প্রায় এক হাজার ২০০ কৃষকের ছয় কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয়েছে।
বন্যায় চট্টগ্রামের ১৫টি উপজেলায় ১৫৩টি ইউনিয়নে ৯ হাজার ৯৩৩টি পুকুর-দিঘী এবং ৩২০টি মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রাথমিক জরিপে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ উঠে এসেছে ৯১ কোটি ৪১ লাখ ৫৩ হাজার টাকা। চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম সাপ্তাহিক সোনার বাংলাকে বলেন, ১৫টি উপজেলায় মৎস্য খাতে বন্যায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। প্রাথমিকভাবে দেখা গেছে ৩ হাজার ২১১ দশমিক ৯২ হেক্টর পুকুর-দিঘী ও ৯০০ হেক্টর ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে মোট ৯১ কোটি ৪১ লাখ ৫৩ হাজার টাকার ক্ষতি হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে।
সৃষ্ট বন্যায় চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলায় প্রাণিসম্পদ খাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। দুর্যোগে চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলার ৪১টি উপজেলা ও ১৮৩টি ইউনিয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় চার লাখ গবাদিপশু আক্রান্ত হয়েছে। এতে মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮০ কোটি টাকা। পাশাপাশি ৩০ লাখ হাঁস-মুরগি আক্রান্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ ১০০ কোটির বেশি। বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দফতর সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দফতরের পরিচালক ডা. মো. আতিয়ার রহমান সাপ্তাহিক সোনার বাংলাকে বলেন, চট্টগ্রাম বিভাগে ক্ষতিগ্রস্ত জেলার মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি। এর মধ্যে চট্টগ্রাম জেলার ১৫টি উপজেলা ও ১০৮টি ইউনিয়ন, কক্সবাজারের ৮টি উপজেলার ৩১টি ইউনিয়ন, বান্দরবানের সাতটি উপজেলার ২৪টি ইউনিয়ন, রাঙামাটির ২টি উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন এবং খাগড়াছড়ির নয়টি উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
দুর্যোগের পরপরই প্রাণিসম্পদ বিভাগ মাঠপর্যায়ে জরুরি কার্যক্রম শুরু করেছে। এ পর্যন্ত ৯ হাজার ৩২১টি গবাদিপশু এবং ১২ হাজার ৪২৭টি হাঁস-মুরগিকে টিকা দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে সাত হাজার ৭৭৫টি গবাদিপশু এবং ৭৩ হাজার ২৬টি হাঁস-মুরগিকে। পাশাপাশি আক্রান্ত এলাকায় রোগ প্রতিরোধ, মৃত পশুপাখি অপসারণ, জীবাণুনাশক প্রয়োগ, খামারিদের পরামর্শ প্রদান এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা অব্যাহত আছে।
তীব্র সংকট নিরাপদ পানির
চট্টগ্রামে বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি। এরমধ্যে ১৫টি উপজেলায় বন্যায় ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে দক্ষিণাঞ্চলের তিনটি উপজেলা সাতকানিয়া, বাঁশখালী ও চন্দনাইশে ঘরবাড়ি, সড়ক, কৃষিজমি ও অবকাঠামোর পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত হয়েছে নিরাপদ সুপেয় পানির ব্যবস্থা। এ তিন উপজেলায় ৮ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি প্রায় ২০ হাজার নলকূপ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৫ হাজার ৬৯৪টি টয়লেট। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর (ডিপিএইচই) এ তথ্য জানিয়েছে।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, বন্যার পানি ও কাদা-মাটি জমে যাওয়া এবং পাহাড় ধসের কারণে হাজার হাজার নলকূপ অকেজো হয়ে পড়েছে। এতে বিশুদ্ধ পানির সংকটে পড়েছেন হাজারো মানুষ। পাশাপাশি এসব উপজেলায় পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিও বেড়ে গেছে।
সাতকানিয়া উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নে বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের প্রভাবে তিন লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ উপজেলায় ৭ হাজার ১২৭টি নলকূপ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৫ হাজার ১৫টি নলকূপ সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া আরও ২ হাজার ১১২টি নলকূপ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় বিশুদ্ধ পানির মারাত্মক সংকট সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি এ উপজেলায় ২ হাজার ১৫৬টি টয়লেট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বাঁশখালী উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নে বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে তিন লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি ৮ হাজার ২৬টি নলকূপ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৪ হাজার ৫২৩টি নলকূপ সম্পূর্ণ এবং ৩ হাজার ৫০৩টি নলকূপ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এছাড়া চন্দনাইশ উপজেলার দুই লাখ মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে উপজেলার ৮টি ইউনিয়নে ৪ হাজার ৮০৮টি নলকূপ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তার মধ্যে ২ হাজার ৫৭২টি সম্পূর্ণ এবং ২ হাজার ২৩৬টি নলকূপ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বন্যার পানি নেমে গেলেও অধিকাংশ নলকূপে এখনো ঘোলা ও দুর্গন্ধযুক্ত পানি উঠছে। ফলে অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে দূরদূরান্ত থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করছে। বন্যায় এ উপজেলায় ১ হাজার ৬৬টি টয়লেট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ চন্দ্র দাস জানান, ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রস্তুত করে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত নলকূপ পুনঃস্থাপন, আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত নলকূপ মেরামত এবং দুর্গত মানুষের মাঝে নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাজ করছে।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম সাপ্তাহিক সোনার বাংলাকে বলেন, বন্যা-পরবর্তী স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। সেই ঝুঁকি মোকাবিলায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উদ্যোগে জরুরি মেডিকেল ক্যাম্প আয়োজন করা হচ্ছে। এই ক্যাম্পে রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি প্রদান করা হয়েছে- ফ্রি ওষুধ, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, স্বাস্থ্যবিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ।