বর্ষবরণে নয় অপসংস্কৃতির চর্চা


১০ এপ্রিল ২০২৫ ১২:২১

॥ সুমাইয়্যা সিদ্দিকা ॥
সংস্কৃতি একটি জাতির দর্পণ। যেখানে প্রতিভাত হয় নিত্যদিনের যাপিত দিনের প্রতিচ্ছবি। ফুটে ওঠে মানুষের বিশ্বাস, ধ্যান-ধারণা, মন ও মানসের পরিচয়। সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান উৎসব। উৎসব মানুষকে সজীব করে। ক্লান্তি-ক্লেশকে দূর করে অন্তরকে নির্মল করে। ইসলাম মানবিক এ চাহিদাকে সামনে রেখেই উৎসবের আয়োজন করেছে দুই ঈদের প্রবর্তনের মাধমে। এবারে আসি পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ উদযাপন বিষয়ে। আমাদের দেশীয় সংস্কৃতির প্রধান উৎসব পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ। ধম-বর্ণ নির্বিশেষে বাংলাদেশের সকল মানুষ বাংলা নববর্ষ পালন করে। কিন্তু বিগত সময়গুলোয় দেশে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের যে পদ্ধতি লক্ষ করা যাচ্ছে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা বিতর্ক। বাংলাদেশের শতকরা নব্বইভাগ জনগোষ্ঠী মুসলিম। স্বাভাবিকভাবেই মুসলিমপ্রধান একটি দেশে জাতীয়ভাবে কোনো উৎসব পালিত হলে নব্বইভাগ জনগোষ্ঠীর বিশ্বাসের প্রতিফলন থাকতে হবে- এটাই যুক্তিযুক্ত। কিন্তু বাংলা নববর্ষ উদযাপনের যে চিত্র আমাদের সামনে আছে তাতে দেখা যাচ্ছে হাজার বছরের ঐতিহ্যের ছিটেফোঁটা তো দূরের বিষয়, বরং অত্যন্ত সুকৌশলে সর্বজনীন উৎসবের নামে ইসলামের কনসেপ্টবিরোধী পৌত্তলিকতা ও শিরকি আচার-আচরণের মহোৎসব চলছে। যেকোনো সচেতন মুসলিমের জন্যই বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগ ও কষ্টের। জাতীয় পর্যায়ে ভিন্ন জাতির কৃষ্টি-কালচার ধারণ ও লালন করা কোনো জাতির জন্য কাম্য হতে পারে না।
এবারে দেখি, পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ পালনে আসলে কি করা হয়ে থাকে। প্রতি বছর রমনা পার্কে ছায়ানটের শিল্পীরা সূর্যোদয়ের আগেই সমবেত হয়। সূর্যোদয়ের সাথে সাথে তারা মঙ্গলিক গান গেয়ে নতুন বছরকে বরণ করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করা হয়। যে শোভাযাত্রাতে বেদ ও পুরাণের অনুকরণে বিভিন্ন পশু-পাখির ডামি, রাক্ষস, ভূত, প্রেত, বাঘ-ভাল্লুক, সাপ, বিচ্ছু, কুমির, পেঁচা, ময়ূর ও বিভিন্ন দেব-দেবীর বড় বড় মূর্তি, ছবি নিয়ে ও মুখোশ পরে অংশগ্রহণকারীরা। গাওয়া হয় হিন্দু ধর্মের দোল উৎসবের গান। মূলত মঙ্গল শোভাযাত্রার নামে প্রকাশ্য দিবালোকে চলে হিন্দু সংস্কৃতির মহড়া।
তবে বড়ই আফসোসের বিষয় হলো, নতুন বছর বরণের গান ও শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারী অধিকাংশই মুসলিম তরুণ-তরুণী। সাংস্কৃতিক স¦াধীনতার নামে ভিন্নধর্মের সংস্কৃতির গড্ডালিকা প্রবাহে ভেসে যাচ্ছে তারা না বুঝেই। জড়িয়ে পড়ছে শিরকি কার্যকলাপে। এছাড়া রয়েছে নারী-পুরুষ একে অপরের হাতে, কপালে, চিবুকে, মুখে, পিঠে উল্কি আঁকা। নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা। লাল-সাদা বা গেরুয়া পোশাকে সজ্জিত হয় সকলে মাটির পাত্রে পান্তা-ইলিশ খাওয়া। সেই সাথে রয়েছে কোম্পানিগুলোর নানা ছাড় ও অফার, রয়েছে পোশাকের ব্যান্ডগুলোর পহেলা বৈশাখের পোশাক বিক্রির হিড়িক। যার মধ্যে অধিকাংশই মুসলিম কৃষ্টি-কালচারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বাংলাদেশের নব্বই ভাগ মুসলমান জনগোষ্ঠী বাদে বাকি যে দশ ভাগ জনগোষ্ঠী রয়েছে, তারা অমুসলিম। যাদের মধ্যে একটি বড় অংশই হিন্দু। সেই হিন্দু ধর্মের আদলে একটি জাতীয় অনুষ্ঠান পালন আসলে কীসের ইঙ্গিত বহন করে- এটা ভাবার মতো বিষয় বটে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা আর অন্য ধর্মের কৃষ্টি-কালচার ধারণের মাঝে যে যোজন যোজন তফাৎ তা জাতীয় নেতৃবৃন্দকে অনুধাবন করা আজ সময়ের দাবি। আজ পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে, যেকোনো উৎসব পালনেই যেন পৌত্তলিকতার ছড়াছড়ি অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে, যা আসলেই আমাদের জাতিসত্তার জন্য দুশ্চিন্তার বিষয়। মাত্র ক’দিন আগেই জাতীয়ভাবে ঈদ উৎসব পালন করা হলো। অত্যন্ত আনন্দের বিষয় এটা। অথচ সেখানেও পৌত্তলিক আদর্শের ছোঁয়া দেখা গেল।
অমুসলিমরা তাদের উৎসব যেভাবেই পালন করুক, সেটা নিয়ে কারো মাথাব্যথার কারণ নেই। উদ্বেগ আর চিন্তার বিষয় হলো, আমরা মুসলিমরা কেন আমাদের আদর্শ ও মূল্যবোধের বিপরীত স্রোতে গা ভাসিয়ে চলছি। আমরা দেখি- রাসূলুল্লাহ (সা.) বা সাহাবীরাও নববর্ষ পালন করেননি। এমনকি হযরত ওমর (রা.)-এর সময়ে যখন ইসলামী খেলাফাত বিস্তৃত হয়, তখন রাষ্ট্রীয় কাজের সুবিধার্থে হিজরী সনের প্রবর্তন করেন। পহেলা মহররম থেকে হিজরী সন গণনা শুরু করেন। কিন্তু তিনি বা তার পরবর্তী খলিফারা নববর্ষ পালনের কোনো উদ্যোগ নেননি। সেদিক থেকে নববর্ষ পালন বিষয়টি ইসলামী সংস্কৃতিতে নেই বললেই চলে। তারপরও যদি কেউ পালন করে থাকেন- তাহলে বর্তমানে যে আদলে পহেলা বৈশাখ পালিত হয়, সেটা কতটুকু ইসলামের সাথে যায়, চলুন একটু দেখে আসি। প্রথমেই আসা যাক, পহেলা বৈশাখে সূর্যোদয়ের সাথে সাথে সম্মিলিত কণ্ঠে গান গেয়ে নতুন বছর তথা নতুন সূর্যকে স¦াগত জানানোর বিষয়ে, যা মূলত সূর্যপূজারিদের অনুকরণ ছাড়া আর কিছ্ইু নয়। আল্লাহ বলেন, “আমি তাকে ও তার জাতিকে দেখেছি, তারা আল্লাহকে ছেড়ে সূর্যকে সিজদা করছে এবং শয়তান তাদের কর্মকাণ্ড তাদের জন্য শোভনীয় করেছে।” [সূরা আন নামল : ২৪]।
এবারে আসি মঙ্গল শোভাযাত্রার বিষয়ে। ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী মুসলমানদের মঙ্গল বা কল্যাণ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা সূরা আন-নাজমের ২৫নং আয়াতে বলেছেন, “পূর্ববর্তী ও পরর্বতী সব মঙ্গলই আল্লাহর হাতে।” এছাড়া রমযানের শেষ দশকে লাইলাতুল কদরের রাতগুলোয় আল্লাহ মুসলমানদের কল্যাণ বা মঙ্গলের জন্য দোয়া করতে, নামায আদায় করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যা কুরআন ও হাদীস কর্তৃক প্রমাণিত। সুতরাং এ জাতীয় পশু, পাখি, দানব, জানোয়ারের প্রতিকৃতি নিয়ে মঙ্গল কামনা মুসলমানদের জন্য স্রেফ আল্লাহর সাথে শিরক করা। আর শিরক সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই যে কেউই আল্লাহর অংশীদার স্থির করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতকে হারাম করে দেবেন, আর তার বাসস্থান হবে জাহান্নাম এবং যালিমদের জন্য কোনো সাহায্যকারী নেই।” [সূরা মায়িদা :৭২]।
এছাড়া উল্কি আঁকার বিষয়ে হাদীসে এসেছে, “যে মহিলা উল্কি আঁকে আর যে এ কাজে সাহায্য করে…, আর এভাবে যারা আল্লাহর সৃষ্টিকে পরিবর্তন করে, তাদের সকলের প্রতি আল্লাহ লা’নত করেছেন।” [(সহীহ আল-বুখারীভ, কিতাবুল লিবাস]।
পহেলা বৈশাখ মানেই নর-নারী একত্রে অবাধ বিচরণ, যা পর্দার সম্পূর্ণ খেলাপ। অথচ সূরা নূরের ৩০-৩১নং আয়াতে মহামহিম আল্লাহ বলেছেন, “মুমিন পুরুষদের বলে দাও তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে ও নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটি তাদের জন্য বিশুদ্ধ নীতি। তারা যা কিছু করে আল্লাহ্ তা জানেন।” “আর মুমিন নারীদের বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। আর যা সাধারণত প্রকাশ পায়, তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য তারা প্রকাশ করবে না। তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে। তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, নিজের ছেলে, স্বামীর ছেলে, ভাই, ভাইয়ের ছেলে, বোনের ছেলে, আপন নারীগণ, নিজের মালিকানাধীন দাস-দাসী, অধীনস্থ যৌনকামনামুক্ত পুরুষ অথবা নারীদের গোপনাঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ বালক ছাড়া কারো কাছে নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। তারা নিজেদের যে সৌন্দর্য লুকিয়ে রেখেছে, তা লোকদের সামনে প্রকাশ করে দেয়ার উদ্দেশ্যে সজোরে পদক্ষেপ না করে। হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই মিলে আল্লাহর কাছে তাওবা করো, আশা করা যায় তোমরা সফলকাম হবে।” পহেলা বৈশাখে নর-নারী সম্মিলিতভাবে গান-বাজনার কনসার্টে অংশগ্রহণ করে থাকে। অশ্লীল-অশালীন গানে মত্ত হয়ে ওঠে সকলে। অথচ ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে নির্লজ্জতা অশ্লীল ও কুৎসিত ভাষা, পাপকাজে উৎসাহ প্রদান, যৌন আবেগ উত্তেজনা সৃষ্টিকারী গান গাওয়া, রচনা সবই হারাম। এমনকি সব ধরনের বাদ্যযন্ত্র বাজানো হারাম। শুধুমাত্র অশ্লীলতাবিবর্জিত গান জায়েজ এবং শুধু দফ বাজানো জায়েজ। আল্লাহ বলেন, “মানুষের মধ্যে কেউ কেউ অজ্ঞ লোকদের আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করার জন্য অসার বাক্য ক্রয় করে নেয় এবং আল্লাহ প্রদর্শিত পথ নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রƒপ করে তাদেরই জন্য রয়েছে অবমাননাকর শাস্তি।” (সূরা লুকমান : ৬)।
তাছাড়া পত্র-পত্রিকা বা ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় বর্ষবরণ উপলক্ষে প্রায়ই দেখা যায় নারী নিগ্রহের মতো ন্যক্কারজনক ঘটনার প্রতিবেদন। ভিড়ের সুযোগে অসৎ লোকের হাতে হেনস্তা হতে শোনা যায় তরুণীদের। এমনকি বিনা অনুমতিতে অনেকের অনেক অসতর্ক মুহূর্তের ছবি ধারণ ও সোশ্যাল মিডিয়ায় সেসব ছড়ানোরও নিউজ পাওয়া যায়। কিন্তু যদি আজ সঠিকভাবে সুন্দর পরিবেশে উৎসব পালন হতো, তাহলে হয়তো বা এসব ন্যক্কারজনক ঘটনার মুখোমুখি হতে হতো না কাউকেই।
তাহলে প্রিয় পাঠক আপনারাই সিদ্ধান্ত নিন, সর্বজনীন উৎসবের নামে আসলে যা চলছে, তা কতটুকু সংস্কৃতির পরিচায়ক বা কোন সংস্কৃতির পরিচয় বহন করছে তথাকথিত এ বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। মুসলিম শাসকদের হাত ধরে যে পহেলা বৈশাখের আগমন। আজ পরিবর্তনের পালাবদলে তাতে নেই ন্যূনতম মুসলিম ঐতিহ্যের প্রকাশ। নেই একটি দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর বিশ্বাসের প্রতিফলন। সাংস্কৃতিক এ দেউলিয়া আমাদের জন্য আসলেই বড়ই ভয়াবহ বিষয়। ঈমানবিধ্বংসী এসব অনুষ্ঠান ব্যক্তি পর্যায় থেকেই প্রতিরোধ সম্ভব নয়। প্রয়োজন জাতীয় ঐক্যের।
দীর্ঘ তিমির রাত পেরিয়ে ছাত্র-জনতার হাত ধরে যে সুবহে সাদিকের আগমন ঘটেছে আমাদের জাতীয় জীবনে। আজ সময় এসেছে অপসংস্কৃতি ও বিজাতীয় ভিনদেশীয় সংস্কৃতির খপ্পর থেকে তরুণ প্রজন্ম থেকে শুরু করে দেশের সকল বয়সী ও শ্রেণির মানুষের জন্য সুষ্ঠু সংস্কৃতিচর্চার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করার। অপসংস্কৃতির সয়লাবে ভেসে যাওয়া জনগোষ্ঠীকে ইসলামী সংস্কৃতির সাথে পরিচিত করে দিতে দেশের আলেম সমাজ, ইমামবৃন্দ ও জাতীয় পর্যায়ের নেতৃবৃন্দকে আরো জোরালো ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে। মুসলিম স্কলারদেরই সর্বাগ্রে এ কাজে এগিয়ে আসতে হবে। পারস্পরিক রেষারেষি আর বিদ্বেষ বাদ দিয়ে দেশ ও উম্মাহর প্রয়োজনে সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে সাংস্কৃতিক বিপ্লবে অংশ নিতে হবে। ইসলামের আলোকে যুগোপযোগী চাহিদার ভিত্তিতে তৈরি করতে হবে শক্তিশালী সাংস্কৃতিক জোয়ার। ইসলাম সম্মত আনন্দ উৎসব পালন ও চিত্তবিনোদনের উপায় বের করে তরুণ প্রজন্মকে আগ্রহী করে তুলতে হবে। যাতে খড়কুটোর মতো ভেসে যায় ভিন দেশের ভিন জাতির সকল অপসংস্কৃতি। দেশের সকল সচেতন মহল এগিয়ে এলেই সম্ভব ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায় পযন্ত শিকড় গেড়ে বসা সকল অপসংস্কৃতির মূলোৎপাটন করা।
লেখক: শিক্ষক ও সাহিত্যিক।