বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মাহে রমজান
১৩ মার্চ ২০২৫ ১৬:৩০
॥ মুহাম্মদ বশির উল্লাহ ॥
সমগ্র মুসলিম জাহানে রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস মাহে রমজানের কঠোর সিয়াম সাধনা শুরু হয়েছে। দীর্ঘ এক মাস রমজানের কঠোর পরিশ্রম ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে মহান আল্লাহ তায়ালার তাকওয়া অর্জন ও এর সামগ্রিক সুফল সমাজের সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে পারলে বিশ্বব্যাপী মানবতার শান্তি ও সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত হবে। রমজানের রোজা সাধনার মাধ্যমে মানুষের অন্তরের রিপুকে মহান আল্লাহ তায়ালার তাকওয়া অর্জনের মাধ্যমে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে নিশ্চিহ্ন করা হয়। অন্তরের পশু প্রবৃত্তি তথা নফসে আম্মারাকে বশীভূত করে মানুষ নফসে লাওয়্যামা ও নফসে মুতমাইন্নার (সর্বোচ্চ প্রশান্ত আত্মা) পর্যায়ে উপনীত হয়। প্রকৃত রোজাদার তাই এ মাসে আত্মশুদ্ধি ও আত্মসংশোধনের পর্যায় উপনীত হয়। আত্মশুদ্ধি ও আত্মসংশোধনের মাধ্যমে মহান আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য লাভ করে। আর সত্যিকার সিয়াম সাধনার মাধ্যমে সমাজ থেকে সকল অন্যায়, অনাচার, ব্যভিচার ও সন্ত্রাস দূরীভূত হয়। গোটা ব্যক্তি জীবনে নিরাপদ ও নির্বিঘ্নে জীবনযাপনের নিশ্চয়তা লাভ করা যায়। আমাদের আলোচনা মাহে রমজান সম্পর্কে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান কী বলে।
অভিজ্ঞ গবেষক ও চিকিৎসকগণ দেখতে পেয়েছেন, সর্বক্ষণ অনিয়মিত আহার, সীমাতিরিক্ত ভোজন ও দূষিত খাদ্য খাওয়ায় শরীরের কোষে কোষে এক প্রকার বিষাক্ত উপকরণ ও উপাদানের সৃষ্টি হয় এবং তা জৈব বিষ হিসেবে জমা হয়। বার বার প্রতিদিন এমনটা ঘটার কারণে দেহের নির্বাহী ও কর্মসম্পাদন অঙ্গ-প্রতঙ্গগুলো বিষাক্ত উপকরণ ও জৈব বিষ দমনে অক্ষম হয়ে পড়ে। ফলে তখন শরীরে জটিল ও কঠিন রোগের জন্ম হয়। দেহের মধ্যকার এমন বিষাক্ত ও দূষিত উপাদানগুলো অতিদ্রুত নির্মূলকরণের নিমিত্তে পাকস্থলিকে মাঝেমধ্যে বিশ্রামে রাখা একান্ত প্রয়োজন। রোজাই এর একমাত্র সহায়ক, যার বিকল্প কল্পনা করা যায় না।
১৯৬০ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ডা. গোলাম মোয়াজ্জেম কর্তৃক ‘মানব শরীরের ওপর রোজার প্রভাব’ শীর্ষক গবেষণামূলক নিবন্ধ অনুযায়ী জানা যায়, রোজায় শরীরের ওজন সামান্য হ্রাস পায় বটে, তবে তা শরীরের কোনো ক্ষতি করে না, বরং শরীরের মেদ কমাতে রোজা আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের খাদ্য নিয়ন্ত্রণ অপেক্ষা অধিক কার্যকর। তার পরীক্ষা-নিরীক্ষার আলোকে আরও জানা যায়, যারা মনে করেন রোজা রাখলে শূল-বেদনার প্রকোপ বৃদ্ধি পায়, তাদের এ ধারণা সঠিক নয়, বরং ভোজনে তা বৃদ্ধি পায়।
পাকিস্তানের প্রবীণ প্রখ্যাত চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ হোসেনের নিবন্ধ থেকে জানা যায়, যারা নিয়মিত সিয়াম পালন করে সাধারণত তারা বাতরোগে, বহুমূত্র, অজীর্ণ, হৃদরোগ ও রক্তচাপজনিত ব্যাধিতে আক্রান্ত কম হয়।
ডা. ক্লাইভসহ অন্যান্য চিকিৎসাবিজ্ঞানী পর্যন্ত স্বীকার করেছেন, ইসলামের সিয়াম সাধনার বিধান স্বাস্থ্যসম্মত এবং ফলপ্রসূ, আর তাই মুসলিম অধ্যুষিত এলাকার রোগ-ব্যাধি তুলনামূলকভাবে অন্য এলাকার চেয়ে কম দেখা যায়।
প্রিয়নবী সা. কম খাওয়ার জন্য বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। ক্ষুধা লাগলে খেতে বলেছেন এবং ক্ষুধা না লাগলে খাওয়া বন্ধ করার জন্য উপদেশ দিয়েছেন যা চিকিৎসাবিজ্ঞানসম্মত। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের দৃষ্টিতে দীর্ঘজীবন লাভ করার জন্য খুব বেশি খাওয়ার প্রয়োজন নেই। এখন আধুনিক বিজ্ঞান ও কিছু অভিজ্ঞ চিকিৎসকের মতামত উল্লেখ করা হলো।
জার্মানির ডাক্তার ফেডারিক হভম্যান (জন্ম ১৬৬০, মৃত্যু ১৭২৪) বলেছেন, “রোজার মাধ্যমে মৃগীরোগ, গ্যাস্ট্রিক ও আলসারের চিকিৎসা করা যায়।”
ইটালির বিশ্ববিখ্যাত শিল্পী মাইকেল এংলো ভালো স্বাস্থ্যের অধিকারী ছিলেন। ৯০ বছর বয়স পার হওয়া সত্ত্বেও তিনি কর্মক্ষম ও কর্মঠ ছিলেন। তাকে এর রহস্য সম্পর্কে জানতে চাইলে বলেন, আমি বহু দিন আগ থেকেই মাঝে মাঝে রোজা রেখে আসছি। আমি প্রত্যেক বছর এক মাস, প্রত্যেক মাসে এক সপ্তাহ রোজা রাখি এবং দিনে তিন বেলার পরিবর্তে দুই বেলা খাবার খাই।
ক্যামব্রিজের ডাক্তার লেথার জিম। তিনি ছিলেন, ফার্মাকোলজি বিশেষজ্ঞ। সবকিছু গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে তার স্বভাব। তিনি রোজাদার ব্যক্তির খালি পেটের খাদ্যনালির লালা, স্টোমাক সিক্রেশন সংগ্রহ করে ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করেন। এতে তিনি বুঝতে পারলেন, রোজার মাধ্যমে ফুডপার্টিকেলসবিহীন পাকস্থলি দেহের সুস্থতার বাহন। বিশেষত পাকস্থলির রোগের আরোগ্য গ্যারান্টি।
মহাত্মা গান্ধীর ইচ্ছা। মহাত্মা গান্ধীর উপোস থাকার ঘটনা সর্বজনবিদিত। ফিরোজ রাজ লিখিত ‘দাস্তানে গান্ধী’তে লেখা রয়েছে, তিনি রোজা রাখা বা উপবাস পছন্দ করতেন। তিনি বলতেন, মানুষ খাবার খেয়ে নিজের দেহকে ভারী করে ফেলে। এরকম ভারী অলস দেহ দুনিয়ার কোনো কাজে আসে না। তাই তোমরা যদি তোমাদের দেহ কর্মঠ এবং সবল রাখতে চাও, তবে দেহকে কম খাবার দাও। তোমরা উপোস থাকো। সারা দিন জপ-তপ করো আর সন্ধ্যায় বকরির দুধ দিয়ে উপবাস ভঙ্গ করো। (দাস্তানে গান্ধী)।
সিগমন্ডনারায়েড মনস্তত্ত্ব বিজ্ঞানী এর মন্তব্য। তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট মনস্তত্ত্ব বিশারদ। তার আবিষ্কৃত থিওরি মনস্তত্ত্ব ক্ষেত্র পথ নির্দেশকের ভূমিকা পালন করে। তিনিও রোজা এবং উপবাসের একনিষ্ঠ সমর্থক ছিলেন। তিনি বলেন, রোজার মাধ্যমে মস্তিষ্কের এবং মনের যাবতীয় রোগ ভালো হয়। মানুষ শারীরিকভাবে বিভিন্ন ধরনের প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। কিন্তু রোজাদার ব্যক্তির দেহ ক্রমাগত চাপ সহ্য করার যোগ্যতা অর্জন করে। রোজাদার ব্যক্তি খিঁচুনি এবং মানসিক রোগ থেকে মুক্তিলাভ করে। এমনকি কঠিন রোগ থেকে মুক্তিলাভ করে এবং এ রোগের সম্মুখীন হওয়া থেকে বিরত থাকে।
আলেকজান্ডার গ্রেট এবং এরিস্টল। উল্লিখিত দুজনই ছিলেন নামকরা ব্যক্তিত্ব। নিজ নিজ ক্ষেত্রে তারা বিশ্বখ্যাত। তারা মাঝে মাঝে ক্ষুধার্ত বা উপবাস থাকাকে দেহের সুস্থতা ও সবলতার জন্য খুবই উপকারী বলে মনে করেন। আলেকজান্ডার গ্রেট বলেন, আমার জীবনে অনেক ব্যতিক্রমধর্মী অভিজ্ঞতা এবং ঘটনা দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে বলছি, সকাল-সন্ধ্যা যে আহার করে সে রোগ মুক্ত। আমি ভারতে এরকম প্রচণ্ড উষ্ণ এলাকা দেখেছি। যেখানে সবুজ গাছপালা পুড়ে গেছে। কিন্তু সেই তীব্র গরমের মধ্যেও আমি সকালে এবং বিকালে খেয়েছি। সারা দিন কোনো প্রকার পানাহার করিনি। এর ফলে আমি অনুভব করেছি এক নতুন অফুরন্ত প্রাণশক্তি। (আলেক জান্ডার গ্রেট, মাহফুজুর রহমান আখতারী)।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখপাত্র প্রফেসর মোরপান্ড বলেছেন, আমি ইসলাম সম্পর্কে মোটামুটি জানার চেষ্টা করেছি। রোজা অধ্যায় অধ্যয়নের সময় আমি খুবই মুগ্ধ ও অভিভূত হয়েছি। চিন্তা করেছি ইসলাম তার অনুসারীদের জন্য এক মহাফর্মুলা দিয়েছে। ইসলাম যদি তার অনুসারীদের কোনো বিধান না দিয়ে শুধু রোজা দিত, তবুও এর চেয়ে বড় নিয়ামত আর কিছু হতো না। বিষয়টি নিয়ে আমি একটু গভীর চিন্তায় মনোনিবেশ করলাম। তাই বাস্তব অভিজ্ঞতার জন্য আমি মুসলমানদের সাথে রোজা রাখতে শুরু করলাম। দীর্ঘদিন যাবত আমি পাকস্থলি রোগে ভুগছিলাম এবং কিছুদিন পর আমি সুস্থতা বোধ করলাম। দেখলাম রোগ অনেকটাই কমে গেছে। আমি রোজা চালিয়ে গেলাম এতে দেহ আরো উন্নতি পরিবর্তন উপভোগ করলাম। কিছুদিন পর লক্ষ করলাম, আমি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়েছি। এক মাস পর আমি নিজের মাঝে এক অসাধারণ পরিবর্তন অনুভব করলাম। (রসালানঈ দুনিয়া)।
পাকিস্তাানে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সার্ভে রিপোর্ট। রমজান মাসে নাক, কান, গলার অসুখ কম হয়। জার্মানি, ইংল্যান্ড এবং আমেরিকার বিশেষজ্ঞ চিকিৎকদের একটি টিম এ সম্পর্কে গবেষণা করার জন্য এক রমজান মাসে পাকিস্তান আসে। তারা গবেষণা কর্মের জন্য পাকিস্তানের করাচি, লাহোর এবং ফয়সালাবাদ শহরকে মনোনীত করেছেন সার্ভে করার পর তারা যে রিপোর্ট দিলেন তার মূল কথা ছিল নিম্নরূপ। মুসলমানরা নামাজের জন্য যে অজু করে সেই অজুর কারণে নাক, কান গলার অসুখ কম হয়। খাদ্য কম খাওয়ার কারণে পাকস্থলি এবং লিভারের অসুখ কম হয়। রোজার কারণে তারা মস্তিষ্ক এবং হৃদরোগে আক্রান্ত কম হয়।
লেখক: ইসলামী প্রাবন্ধিক মেহেন্দিগঞ্জ, বরিশাল।