ইসলামে মাতৃভাষার মর্যাদা ও গুরুত্ব
২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৫:৫২
॥ অধ্যাপক মু. সহিদুল ইসলাম ॥
‘ভাষা’ সংস্কৃত শব্দ। ভাব, ভাষণ থেকে উৎপত্তি। মানুষ যে শব্দ-সংকেত ও আওয়াজ দিয়ে একে অন্যকে জানে-বোঝে, মনের চাহিদা-আবেগ, ভাব-উচ্ছ্বাস ইত্যাদি প্রকাশ করে, তাই ‘ভাষা’। বর্তমান বিশ্বে ৭৭৮ কোটি মানুষ ২০৬টি রাষ্ট্রে ৭১১১টি ভাষায় কথা বলে। ‘ভাষা’ নদীর স্রোতের মতো প্রবহমান। প্রতিনিয়ত তা ক্ষয়-লয় কিংবা পরিবর্তন হচ্ছে। ভাষা বিজ্ঞানীদের মতে, পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় ২৮৯৫টি ভাষা বিলুপ্তির পথে, যা মোট ভাষার ৪০ শতাংশ। পৃথিবীতে বেশি মানুষ কথা বলে ‘ম্যান্দারিন চাইনিজ’ ভাষায়। ২৯টি দেশে, যার সংখ্যা প্রায় ১২৮ কোটি মানুষ। ৩টি দেশে (বাংলাদেশ ভারত-মিয়ারমার) কথা বলে প্রায় ২৬ কোটি মানুষ।
প্রতিটি মানুষ তার মায়ের ভাষায় কথা বলে, অর্থাৎ মায়ের কোলে ‘মা’ যেভাবে যা শেখায়, শিশু তাই শেখে, সেটাকেই বলা হয় ‘মাতৃভাষা মায়ের ভাষা’। ‘ভাষার’ উৎপত্তি নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে ব্যাপক মতবিরোধ রয়েছে। বলা হয়েছে ৩০ লাখ বছর পূর্বে অঁংঃৎধষড়ঢ়রঃযবপঁং ধভধৎবহংরং- এর-লুসি প্রজাতি থেকে ভাষার উৎপত্তি। কারো মতে, আফ্রিকার জঙ্গলের সেই মানুষগুলো থেকেই ভাষা এসেছে। অনেকে মনে করেন, খ্রিষ্টপূর্ব ৫ হাজার বছর পূর্বে ইন্দো-ইউরোপিয়ান জাতি গোষ্ঠী থেকেই ভাষার সৃষ্টি হয়েছে। ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃবিজ্ঞান ও ভাষাতত্ত্বের প্রফেসর রবার্ট ফোলি গবেষণায় দেখিয়েছেন, ‘পৃথিবীতে যত ভাষা আছে চরিত্র আলাদা হলেও এটাও সম্ভব যে বর্তমানে সব ভাষাই একজন পূর্বপুরুষ থেকে এসেছে।’ অর্থাৎ এক ব্যক্তি থেকেই সকল ভাষার সৃষ্টি।
পবিত্র কুরআন বলে! পৃথিবীর সকল মানুষকে একজন মানুষ থেকেই সৃষ্টি করা হয়েছে। আর সেই মানুষটি হচ্ছেন হযরত আদম (আ.)। যাকে মাটির নির্যাস থেকে পয়দা করা হয়েছে। আল-কুরআনের ৪নং সূরা আন-নিসার প্রথম আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “হে মানুষ সকল! তোমরা সেই প্রভুকে ভয় করো, যিনি একটি আত্মা থেকে তোমাদের সৃষ্টি করেছেন। আর সেখান থেকে সৃষ্টি করেছেন অসংখ্য নারী-পুরুষ”। ভাষা বিজ্ঞানী রোবার্ট ফোলি ‘একজন মানুষ’ বলেছেন, কিন্তু নাম বলেননি। আল-কুরআনে বলেছেন, প্রথম মানুষ হযরত ‘আদম’।
অন্যদিকে বিজ্ঞানীরা মনে করেন, ‘মানুষের প্রথম ভাষা বা শব্দ ছিল ঈগল, চিতা, ইশ, ওয়াও থ্যাঙ্কস (ঞযধহশং) গুডবাই ইত্যাদি। রবার্ট ফোলি বলেছেন একজন মানুষ থেকেই প্রথম ভাষা-শব্দ এসেছে, কুরআন বলেছেÑ ‘ফাতালাক্কা-আদামা মির-রাব্বিহী-কালিমাতিন’। বাকারা : ৩৭। সূরা-বাকারার ৩১নং আয়াতে বলা হয়েছে, “সে সময় আদম তাঁর রবের কাছছ থেকে কয়েকটি কথা লিখেছিল, আমি আদমকে সকল বস্তুর নাম শিক্ষা দিয়েছি।” তাহলে প্রথম শব্দ কোনটি?
সহিহ ইবনে-হিব্বানের ১২৪নং হাদিসে পাওয়া যায় রাসূল (সা.) বলেছেন, “আল্লাহ তায়ালা যখন আদমকে সৃষ্টি করে তাতে ‘রুহ’ আত্মা দান করলেন! তখন আদম হাঁচি দিলেন। ঐ মুহূর্তে আল্লাহ তায়ালা বললেন, হে আদম! তুমি ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলো। হযরত আদম বললেন ‘আলহামদুলিল্লাহ’।” সুতরাং পৃথিবীর প্রথম মানুষের প্রথম শব্দ এটাই-আর রোবার্ট ফোলির গবেষণায় তাই প্রমাণ করে। ‘আলহামদুলিল্লাহ’ এই শব্দটির গুরুত্ব এবং মাহাত্ম্য এতই যে- জার্মানির মেক-হেইম বিশ্ববিদ্যালয় ৬৭৫৬ জন মানুষের মাঝে গবেষণায় দেখিয়েছেন পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ ‘মুসলমান’, যারা সর্বাবস্থায় ‘আলহামদুলিল্লাহ’ উচ্চরণ করে। ৯ জুলাই ২০১৯ দৈনিক ইত্তেফাক এবং ৬ জুলাই ২০১৯ দৈনিক কালের কণ্ঠ ব্রিটেনের ডেইলি মেইল পত্রিকার বরাত দিয়ে তা প্রকাশ করে। সূরা-আরাফের ৪৩নং আয়াতে বলা হয়েছে, জান্নাতের প্রথম শব্দ হবে ‘আলহামদুলিল্লাহ’। সেজন্য কুরআনের প্রথম শব্দ, যে কোনো আনন্দ-হতাশা, বিরহ-বেদনা সর্বাবস্থায় একজন মুমিন বলতে হবে ‘আলহামদুলিল্লাহ’। রাসূল (সা.) বলেছেন, একবার ‘আলহামদুলিল্লাহ’ শব্দটি উচ্চারণ করবে আল্লাহ তায়ালা নেক দিয়ে আসমান-জমিন তার জন্য ভরপুর করে দিবেন (সহিহ-মুসলিম)। সুতরাং কুরআন-হাদিস এবং বিজ্ঞান প্রমাণ করে প্রথম মানুষ হযরত আদম (আ.) এবং প্রথম শব্দ ‘আলহামদুলিল্লাহ’।
মায়ের ক্রোড় এবং মায়ের শেখানো ভাষা মানুষের অমূল্য সম্পদ। সকল নবীরা তাঁদের মাতৃভাষায় দাওয়াত দিয়েছেন। আর নবীদের মাতৃভাষায় আল্লাহ তায়ালা কিতাব নাযিল করেছেন। যেমন যাবুর দাউদ (আ.)-এর নিজ গ্রিক ভাষায় নাজিল করেছেন। তাওরাত মূসা (আ.)-এর হিব্রু ভাষায়, ইঞ্জিল ঈসা (আ.)-এর সুরিয়ানি ভাষায় আর হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি আল-কুরআন নাজিল হয়েছে মক্কাবাসীর মাতৃভাষা আরবিতে। সূরা-ইবরাহিমের ৪নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, “আমি প্রত্যেক নবীকে তার সম্প্রদায়ের প্রতি প্রেরণ করেছি তাদের ‘ভাষা’ দিয়ে।” সূরা-আদ-দুখান এর ৫৮নং আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বর্ণনা করেছেন, “আমি এ কুরআনকে সহজ করে তাদের ভাষায় নাজিল করেছি- যেন তারা উপদেশ নিতে পারে”। তাই মাতৃভাষায় আল্লাহ-তায়ালা সকল কিতাব এবং রাসূল প্রেরণ করেছেন; যাতে সঠিক পথ গ্রহণে সহজবোধ্য হয়।
বর্ণবৈচিত্র্য এবং ভাষাবৈচিত্র্য সবই আল্লাহ তায়ালার বিশেষ নিদর্শন। কে, কোন ভাষায়, কোন দেশে, কোন বর্ণে জন্মগ্রহণ করবে- তা আল্লাহ-তায়ালাই জানেন। “আকাশসমূহ এবং পৃথিবী সৃষ্টি এটা তাঁর বিশেষ নিদর্শন। আর বর্ণবৈচিত্র্য, ভাষাবৈচিত্র্য এগুলো অনন্য নিদর্শন আল্লাহ তায়ালার পক্ষ হতে”। সূরা রুম : ২২।
আল্লাহ তায়ালাই ভাষা-বয়ান এবং কুরআন মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন। ৫৫নং সূরা আর-রহমান এ বলা হয়েছে “তিনিই রহমান যিনি (মানুষকে) কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন। মানুষ সৃষ্টি করেছেন, আর সেই মানুষকে ভাষা-বয়ান শিক্ষা দিয়েছেন।” সূরা-ইউসুফের ২নং আয়াতে বলা হয়েছে, “আমি এ কুরআন আরবি ভাষায় নাজিল করেছি, যেন মানুষ বিবেক খাঁটিয়ে তা বুঝতে পারে।”
আল-কুরআনে সহজ ভাষা, শব্দ চয়ন, মোলায়েম সুর এবং উত্তম কৌশল অবলম্বন করে মানুষকে দাওয়াত দেয়ার কথা নবী রাসূলদের বলা হয়েছে। যেমনÑসূরা-নাহল এর ১২৫নং আয়াতে আল্লাহ বলেন, “(হে নবী) তোমার রবের পথে মানুষকে ডাকো! উত্তম কৌশল এবং সুন্দর আচরণ দিয়ে, আর তর্ক-বিতর্ক করো যথাযথ ভাষার মাধ্যমে।” নবী মুহাম্মদ (সা.) তাই সর্বাবস্থায় সুন্দর শব্দ, উত্তম আচরণ এবং ভালো ব্যবহার দিয়েই মানুষকে আল্লাহর দীনের পথে ডেকেছিলেন।
মূসা (আ.)-কে আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ দিলেন ফেরাউনকে দাওয়াত দেয়ার জন্যে। মূসা (আ.) আরজ করলেন! “হে আল্লাহ! আমার সাথে ভাই হারুনকে দায়িত্ব দিন। কেননা ‘হুয়া আফসাহুমিন্নি’-সে আমার চেয়ে সুন্দর ভাষায় বক্তব্য উপস্থাপন করতে পারে।” সূরা-কাসাস : ২৮। মূসা (আ.) আরো দোয়া করলেন, ‘‘হে আল্লাহ! তুমি আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দাও! আমাকে জ্ঞান দাও এবং আমার ভাষা সুমিষ্টি ও প্রাঞ্জল করে দাও। যেন সাহসিকতার সাথে তোমার বক্তব্যগুলো উপস্থাপন করতে পারি।” সুতরাং বোঝা যায় দাওয়াতের জন্য ভাষা জ্ঞান, শব্দ চয়ন এবং মাতৃভাষা জানা খুবই অপরিহার্য।
আল কুরআন ৭টি আঞ্চলিক ভাষায় নাজিল হয়। রাসূল (সা.) বলেন, “আমার নিকট জিবরাইল একটি ভাষায় কুরআন শোনাতেন কিন্তু আমার পছন্দ আরো কয়েকটি আঞ্চলিক ভাষায় যেন কুরআন নাজিল হয়, শেষ পর্যন্ত ৭টি আঞ্চলিক আরবি ভাষায় কুরআন নাজিল হলো। (বুখারি-৩২১৯)। বোঝা যায়, স্থানীয় কিংবা আঞ্চলিক ভাষার গুরুত্ব আল্লাহ তায়ালার নিকট অপরিসীম, ফলে ৭টি ভাষায় আল কুরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে।
বুখারি শরিফের ৬০২৩নং হাদিসে রয়েছে রাসূল (সা.) বলেন, “তোমরা জাহান্নাম থেকে বাঁচো-যদি একটি খেজুরের বিনিময়েও হয়। আর খেজুর না থাকলে অন্তত “কালিমাতিন ত্বইয়িবাতিন”-সুন্দর কথা দ্বারা অর্থাৎ ভাষার গুরুত্ব এমন যে দান করার কোনো সম্বল না থাকলে ‘সুন্দর ভাষা’ ব্যবহার দিয়েও জাহান্নাম থেকে বেঁচে থাকা যায়।
আবার প্রয়োজনে ভাষা প্রয়োগে কঠোর হওয়া যায়। যেমন- হযরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) বর্ণনা করেন। রাসূল (সা.) বলেন, ‘লোকদের কী হলো? তারা সালাতে আকাশের দিকে তাকায়’- ‘ফাশতাদ্দা কাওলুহু’- এ বাক্যটি কঠোরভাবে ধমকের স্বরে রাসূল (সা.) উচ্চারণ করেছেন। (আবু দাউদ-৯১৩)।
যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলা এবং ভিনজাতীয় কর্মকাণ্ড বোঝার জন্য তাদের ভাষাও শিখতে হবে। হাদিসে রয়েছে রাসূল (সা.) বিশিষ্ট কবি ও সাহিত্যিক হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত (রা.)-কে নির্দেশ দিলেন। ‘তুমি ইহুদিদের ভাষা শেখ। কেননা আমি যা বলি তারা তা হুবহু প্রচার করে বলে মনে হয় না।’ যায়েদ (রা.) বলেন, ১৫ দিনের মধ্যে আমি ইহুদিদের হিব্রুভাষা আয়ত্ত করে ফেললাম। আমি রাসূল (সা.)-কে তাদের ভাষায় চিঠি লিখে এবং তাদের পক্ষ থেকে চিঠি দলিল দস্তাবেজ এলে সেগুলো অনুবাদ করে রাসূল (সা.)-কে শোনাতাম। অর্থাৎ যায়েদ ইবনে সাবেত দোভাষীর দায়িত্ব পালন করতেন।
উপরিউক্ত আলোচনা থেকে বোঝা যায়, ইসলামী শরিয়তে ভাষা, আঞ্চলিক ভাষা, মাতৃভাষা ইত্যাদির গুরুত্ব অপরিসীম। তাই কোনো ভাষাকে মর্যাদাহীন করা অথবা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা ইসলাম সমর্থন করে না।