মুসলিম নারী আফিয়া সিদ্দিকীর জীবনের নির্মম ঘটনা


১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১২:৫৪

॥ মনসুর আহমদ ॥

আল্লাহর পথে চলতে গিয়ে যাদের কঠিন যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছে, তাদের মধ্য থেকে সর্বপ্রথম স্মরণ করতে হয় আসিয়াকে (আসিয়া বিনতে মুজাহিম)। তিনি ছিলেন প্রাচীন মিশরের ফেরাউনের দ্বিতীয় রামেসিসের স্ত্রী। তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট ও নির্যাতন সহ্য করে ন্যায়ের পথে অবিচল ছিলেন। তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন, “প্রভু হে! তুমি জান্নাতে আমার জন্য তোমার কাছে একখানা ঘর বানাও এবং ফেরাউন ও অত্যাচারী কওম থেকে নাজাত দাও।” (সূরা তাহরিম : ১১)।
এরপর স্মরণ করতে হয় হজরত সুমাইয়া (রা.)-কে। সুমাইয়া বিনতে খাব্বাত হলেন ইসলামের ইতিহাসে হিজরতপূর্ব সময়ের প্রথম শহীদ এবং হযরত মুহাম্মদ সা.-এর উম্মতদের মধ্যে প্রথম মহিলা শহীদও বটে। তিনি যখন বার্ধক্যের কারণে দুর্বল হয়ে পড়েন, তখন মক্কায় ইসলামের দাওয়াতের সূচনা হয়। তিনি প্রথম ভাগেই স্বামী ইয়াসির ও ছেলে আম্মার ইবনে ইয়াসিরসহ গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং কিছুদিন পরই প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দেন। ফলে তার পরিবার কুরাইশদের রোষানলে পড়ে। কিন্তু তাদের ওপর কুরাইশদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে সাহায্য করার মতো কেউই ছিল না। আবু জেহেল ও তার সঙ্গী কুরাইশরা সকাল থেকে শুরু করে সন্ধ্যা পর্যন্ত অত্যাচার করতো। একপর্যায়ে তিনি আবু জেহেলের হাতে শাহাদাতবরণ করেন।
রিসালাতের যুগ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বহু মুসলিম নারী ইসলামের জন্য দুঃখ কষ্ট সহ্য করে গেছেন এবং বর্তমানেও যারা করছেন, তাদের মধ্যে আফিয়া সিদ্দিকী সকলের শীর্ষে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। ড. আফিয়া সিদ্দিকী, যিনি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিখ্যাত একজন মুসলিম স্নায়ুবিজ্ঞানী।
আফিয়া পাকিস্তানের এক সুন্নি পরিবারে ২ মার্চ ১৯৭২ সালে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৯০ সাল থেকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে অধ্যয়ন করেন এবং ম্যাসেচুয়েটস ইনিস্টিটিউট অব টেকনোলজি থেকে বায়োলজিতে বি.এস ডিগ্রি লাভ করেন এবং ব্রান্ডিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০০১ সালে নিউরোসায়েন্সে চয.উ পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই ২০০৩ সালে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় আল কায়েদার সাথে যোগাযোগ থাকার অভিযোগে করাচির রাস্তা থেকে তিন সন্তানসহ গ্রেফতার করে এবং এফবিআই কর্তৃক জেরার সম্মুখীন করা হয়। যখন তাকে কয়েদবাসে রাখা হয়, তখন তাকে দৃঢ়ভাবে বলা হয় যে, তিনি তথ্য গোপন করছেন, কিন্তু পরে তার সাক্ষ্য অস্বীকার করে বলা হয় যে, তাকে জোরপূর্বক অপহরণ করা হয়েছে এবং জেলবন্দি করা হয়েছে। তার পক্ষভুক্ত লোকেরা বলে থাকেন যে, তাকে বাগরাম এয়ারফোর্স বেসে (Ghost detainee) রূপে কারারুদ্ধ করে রাখা হয় এবং ট.ঝ. ইউএস গভর্নমেন্ট একটি অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে। বন্দি অবস্থার দ্বিতীয় দিনে দেখতে আসা ট.ঝ. ঋইও ইউএস-এফবিআই-এর দিকে তিনি প্রচণ্ড গতিতে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। এ সময় জিজ্ঞাসাবাদকারীদের মধ্য থেকে একজন সৈনিক কর্মকর্তা তার প্রতি গ৪ এমফোর বন্দুক দ্বারা গুলি ছুড়ে তাকে জমিনে ফেলে দেয়। একজন ওয়ারেন্ট অফিসার তার মস্তকে গুলি ছুড়লে তিনি ভীষণভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হন। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা প্রদান করে ইউএস কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তাকে গজনীর পুলিশ স্টেশনে ইউএস সেনা হত্যার প্রচেষ্টা এবং প্রচণ্ড আক্রমণের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হলে তিনি তার সম্পর্কের এসব অভিযোগ সত্য নয় বলে প্রতাখ্যান করেন। পরে প্রচলিত আইনের আওতায় না এনে পাকিস্তানের করাগারে গ্রেফতার না রেখেই তাকে আফগানিস্তানের সামরিক ঘাঁটিতে ৫ বছর বন্দি করে রাখা হয়। মার্কিন আদালত তাকে ২০১০ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি ৮৬ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করে।
বন্দি অবস্থায় তার ওপর ব্যাপক অমানবিক নির্যাতনের অভিযোগ আছে। সম্প্রতি ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের একটি ইহুদি সিনাগণের ভেতর ৪ ইহুদিকে পণবন্দী করে যুক্তরাজ্যের নাগরিক ফয়সল আকরাম। তার দাবি ছিল কারাগারে বন্দি ড. আফিয়া সিদ্দিকীর মুক্তি।
তার এ মামলাকে পাকিস্তানি-আমেরিকান মানসিক চাপের ‘Flashpoint’ ফ্লাশ পয়েন্ট বলে অভিহিত করা হয় এবং এটি ছিল সর্বাধিক রহস্যজনক গোপন যুদ্ধের এক নিবিড় রহস্য।
পাকিস্তানে তার বন্দিকরণ এবং শাস্তি প্রদান জনগণ ‘ইসলাম ও মুসলমান’-এর বিরুদ্ধে আক্রমণ রূপে দেখেছিল এবং এর বিরুদ্ধে গোটা দেশে বিরাট প্রতিবাদ মিছিল বের হয়েছিল।
যখন ‘কিছু লোকদের আমেরিকার অবস্থা পরিবর্তনের ক্ষমতা রয়েছে এমন ব্যক্তিদের সাথে আল-কায়েদা যুক্ত রয়েছে এবং বিজ্ঞান বিশারদগণের পক্ষেও একটি সূক্ষ্ম আক্রমণ সম্পাদন করতে সক্ষম ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা অসম্ভব ছিল, তখন যুক্তরাষ্ট্রের কিছু লোক তাকে আল-কায়েদার কয়েকজনের একজন বিবেচনা করছিল। কিছুসংখ্যক প্রচার মিডিয়া ইসলামী ব্যক্তিদের সাথে তার গভীর সম্পর্কের কারণে তাকে ‘লেডি আল-কায়েদা’ বলে প্রচার করতো।
ইসলামিক স্টেট তার কয়েদিদের দুটি উপলক্ষে সুযোগ দেয়, জেমস ফোলির জন্য একবার এবং কাইলা মুলারের জন্য আরেকবার। পাকিস্তানি সংবাদ সংস্থা এ বিচারকে প্রহসন বলে অভিহিত করে। পাকিস্তানিদের অপর একটি অংশ এটিকে ‘পাকিস্তানি জাতির নতজানু নীতি’ বলে অভিহিত করে। তদানীন্তন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানী এবং বিরোধীদলীয় নেতা নওয়াজ শরীফ তার মুক্তির জন্য প্রচেষ্টা চালাবেন বলে ওয়াদা করেন।
পরিবার এবং প্রাথমিক জীবন
আফিয়া সিদ্দিকী পাকিস্তানের করাচিতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম সালেহ সিদ্দিকী, তিনি ছিলেন ব্রিটিশ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নিউরো সার্জন এবং মা ইসমত ছিলেন ইসলামী শিক্ষক, সমাজকর্মী ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানের স্বেচ্ছাসেবিকা। তিনি ছিলেন করাচির দেওবন্দী সম্প্রদায়ের উর্দু ভাষাভাষী মোহাজির অন্তর্ভুক্ত নারী। তিনি ধর্মীয় অনুশাসন পালনে অভ্যস্ত মুসলিম পরিবারে বড় হয়েছিলেন, তা সত্ত্বেও তার পিতা-মাতা প্রচলিত চিন্তাধারার সাথে আধুনিক এবং বিজ্ঞানের পারিভাষিক ব্যাখ্যা সংযুক্ত করেছিলেন।
ইসমত সিদ্দিকী রাজনীতি ও ধর্মীয় পরিমণ্ডল, ইসলামের ওপর শিক্ষা প্রদানসহ যেথায় তিনি অবস্থান করতেন সর্বস্থানে বিখ্যাত ছিলেন। তিনি একটি ‘ইউনাইটেড ইসলামী অর্গানাইজেশন’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং পাকিস্তান পার্লামেন্টে সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। স্ত্রী-পুুরুষের সমঅধিকার বিষয়ক মতবাদীদের ‘হুদুদ’ বিষয়ে বিরোধিতার মোকাবিলায় ইসলামের অনমনীয় ও অপরিবর্তনীয় নীতির তিনি গোড়া সমর্থক ছিলেন। তার এ দৃঢ়তা জেনারেল জিয়াউল হকের দৃষ্টি কেড়ে নেয় এবং তিনি ইসমত সিদ্দিকীকে জাকাত কাউন্সিলে অন্তর্ভুক্ত করেন।
তিন ভাই-বোনের মধ্যে আফিয়া ছিলেন সবার ছোট। তার ভাই মুহাম্মদ টেক্সাসের হাউস্টনে আর্কিটেকচারের ওপর অধ্যয়ন করেছিলেন। তার বোন ফওজিয়া হাভার্ডে নিউরোলজির ওপরে ট্রেনিংপ্রাপ্ত ছিলেন এবং বাল্টিমোরের সিনান হাসপাতালে কাজ করার পাশাপাশি পাকিস্তানে ফিরে আসার পূর্ব পর্যন্ত তিনি জন হপকিন্স ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা করছিলেন।
আফিয়া আট বছর বয়স পর্যন্ত জাম্বিয়া স্কুলে লেখাপড়া করেন এবং তিনি তার প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি স্কুলের লেখাপড়া করাচিতে শেষ করেন।
উপস্নাতক শিক্ষা (Undergraduate education)
ছাত্র ভিসায় ১৯৯০ সালে সিদ্দিকী হাউস্টন, টেক্সাস, ইউএস গমন করেন এবং তার আর্কিটেক্চারে অধ্যয়নরত ভাইয়ের সাথে যোগ দেন। তিনি হাউস্টন ইউনিভার্সিটিতে যোগ দিলে তার পরিবারবর্গ ও আত্মীয়-স্বজনরা তাকে ধর্ম ও দর্শন চর্চায় ডুবে থাকেন বলে জানান। তিনি মুভি দেখা, নভেলস চর্চা এবং সংবাদ শোনা ব্যতীত টেলিভিশন দেখা পরিত্যাগ করেন। তিনি তিন সেমিস্টার শেষ করে ‘ম্যাসেচুয়েটস ইনিস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে যোগ দেন।
১৯৯২ সালে সিদ্দিকী Islamization in Pakistan and its Effects on Women (পাকিস্তানকে ইসলামীকরণ এবং মহিলাদের পর তার প্রভাব) রিসার্স প্রোপোজালের জন্য ৫০০০ (পাঁচ হাজার) ডলার সমমানের Carroll L. Wilson পুরস্কার লাভ করেন। তিনি তার পরিবারের ধর্মীয় উপদেষ্টা তাকী উসমানিসহ Architects of the Islamization and the Hudood Laws পর্যালোচনার জন্য পাকিস্তানে আসেন। জুনিয়র বা কনিষ্ঠ বিবেচনায় Cambridge elementary school playgrounds পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ব্যাপারে MIT কর্তৃক গৃহীত এক অনুষ্ঠানে ১২০০ ডলার ‘সিটি ডেজ ফেলোশিপ’ অর্জন করেন। প্রথমে তিনি Cambridge elementary school playgrounds তিনটি মুখ্য বিষয় প্রাথমিকভাবে ট্রিপল মেজর থাকাকালীন, তিনি ১৯৯৫ সালে জীববিজ্ঞানে বিএসসিসহ স্নাতক হন।
Massachusetts Institute of Technology-তে অবস্থানকালে সিদ্দিকী সর্ব-মহিলা ম্যাককরমিক হলে থাকতেন। তিনি দাতব্য কাজ এবং ইসলাম প্রচারের কাজে সক্রিয় ছিলেন। তার সহপাঠী এমআইটি ছাত্ররা তাকে ধার্মিক বলে বর্ণনা করেছিল, যেটি সেই সময়ে অস্বাভাবিক ছিল না, কিন্তু ধার্মিক মনে করলেও মৌলবাদী ভাবতেন না। তাদের একজন বলেছিল যে, সে ‘শুধু সুন্দর এবং মৃদুভাষী।’
গ্রেফতারের অভিযোগ ও বন্দিজীবন
আল-কায়েদার সাথে যোগাযোগ থাকার অভিযোগে তার তিন সন্তান আহমদ, সোলাইমান ও মারিয়ামকেসহ তাকে গ্রেফতার করা হয়। আফগানিস্তানে বন্দিকালে তার ওপর অমানবিক নির্যাতন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়। তাকে মানসিক, যৌন ও শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হতো এবং ধর্ষণ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়। বাগরাম কারাগার থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত বন্দিরা অভিযোগ করেছে, ‘নির্যাতনের সময় আফিয়ার আর্তচিৎকার অন্য বন্দির পক্ষে সহ্য করাও কঠিন ছিল। ওই নারীর ওপর নির্যাতন বন্ধ করার জন্য অন্য বন্দিরা অনশন পর্যন্ত করেছিল।
২০০৮ সালে তাকে স্থানান্তর করা হয় নিউয়র্কের এক গোপন কারাগারে। বর্তমানে তিনি পুরুষদের সাথে ওই কারাগারে বন্দি। কারাবন্দি নম্বর ৬৫০। চলমান নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। পাকিস্তানের তেহরিক-ই-ইনসাফ দলের চেয়ারম্যান ও সাবেক ক্রিকেটার ইমরান খান দাবি করে বলেন, ‘তার দু’সন্তান ইতোমধেই মার্কিন নিয়ন্ত্রিত আফগান কারাগারে মারা গেছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘পাকিস্তানের কর্তৃপক্ষের মধ্যে যারা ড. আফিয়া সিদ্দিকীকে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের হাতে তুলে দিয়েছে, তাদের অবশ্যই বিচারের সম্মুখীন করতে হবে।’ (Jagonews24.com)
দেশ-বিদেশে প্রতিক্রিয়া
মিসেস সিদ্দিকীর মুক্তির দাবিতে সমাবেশ কান্নায় পরিণত হয়। তারা পাকিস্তান সরকার ও সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে তাকে রক্ষা করার ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগ করেন।
পাকিস্তানের নজরে সিদ্দিকীর বিচার
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় পাকিস্তানে এ মামলাটি বিশেষভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। সিদ্দিকী অপরাধী বিবেচিত হলে তিনি তার আইনজীবীর মাধ্যমে একটি বার্তা পাঠিয়েছিলেন, তিনি ‘এই রায় নিয়ে পাকিস্তানে সহিংস প্রতিবাদ বা সহিংস প্রতিশোধ চান না।’ পাকিস্তানে ছাত্র-জনতা রাজনৈতিক কর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষ বিক্ষোভ করেছে। রাস্তায় আমেরিকার পতাকা এবং বারাক ওবামার কুশপুত্তলিকা পোড়ানোর সময় অনেকে আমেরিকাবিরোধী স্লোগান দেয়। তার ওপর চালালো নির্যাতনের অমানবিক অবস্থা দেখে অনেকে মনে করেন যে, তাকে অন্যায়ভাবে করাচিতে আটক করা হয়েছিল; তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সবগুলো বানোয়াট ও মিথ্যা।
আগস্ট ২০০৯ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানী সিদ্দিকীর বোনের বাসভবনে তার সাথে দেখা করে আশ্বস্ত করেন যে, পাকিস্তান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে সিদ্দিকীর মুক্তি চাইবে।
পাকিস্তান সরকার সিদ্দিকীর বিচারের সময় তার পক্ষে নিযুক্ত তিনজন আইনজীবীকে পারিতোষিক বাবদ দুই মিলিয়ন ডলার প্রদান করেছিলেন। (Dawn staff(20 January 2 010. over 800 Pakistanis in Inia Jails,Senate informed).
মামলা চলাকালীন সিদ্দিকীর প্রচুর সমর্থক কোর্টে উপস্থিত ছিলেন এবং আদালতের বাইরে কয়েক ডজন লোক তার মুক্তি দাবিতে সমাবেশ করেছিলেন। অনেক পাকিস্তানির সমর্থনের অভিব্যক্তির সাথে তাদের দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস জন্মেছিল যে, যাদের আমেরিকানবিরোধী মনে হয়, সাথে সংবাদমাধ্যম দ্বারা যারা আমেরিকানবিরোধী চিহ্নিত হয়েছিল, তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক নিপীড়িত হয়েছিল। অবস্থাটা ছিল গ্রেফতারিত ‘মুক্ত ডা. আফিয়া হাজির, এমনকি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে’ প্রতিটি মানুষের হৃদয়ের গভীরে।
ওয়াশিংটন ডিসিতে পাকিস্তানি দূতাবাস তার পক্ষে তীব্র কূটনৈতিক এবং আইনি প্রচেষ্টা চালাবার পরও কামিয়াব না হওয়ায় রায়ে হতাশা প্রকাশ করেছে। প্রধানমন্ত্রী গিলানী মিসেস সিদ্দিকীকে জাতির কন্যা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ১৮ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি আসিফ আলী জারদারি আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে মার্কিন বিশেষ দূত রিচার্ড হলব্রককে অনুরোধ করেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান বন্দিবিনিময় চুক্তির অধীনে সিদ্দিকীকে পাকিস্তানে ফেরত পাঠানো হোক। ২২ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানি সিনেট তার অবিলম্বে মুক্তির জন্য সরকারকে অনুরোধ করে। পাকিস্তানি সংবাদপত্র দ্য নেশনের সম্পাদক শিরীন মাজারি লিখেছেন যে, এই রায় ৯/১১-এর পরে মার্কিন জনগণের প্রতিশোধমূলক মানসিকতার পরিচয় লাভ করে, বিশ্ব তাদের ধিক্কার জানিয়েছে।
সেপ্টেম্বর ২০১০ সালে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রেহমান মালিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেলকে সিদ্দকীকে পাকিস্তানে ফেরত পাঠাবার জন্য আহ্বান জানান। তিনি এও বলেছিলেন যে, আফিয়া সিদ্দিকীর এ মামলাটি পাকিস্তানে জনসাধরণের জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।
মার্কিন পর্যবেক্ষকরা পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়া লক্ষ করেছে। সন্ত্রাস বিশেষজ্ঞ ও হার্ভার্ড ল’ স্কুলের প্রভাষক জেসিকা ইভস্টার্ন বলেছেন, ‘সত্য যাই হোক না কেন, এ মামলাটি অত্যন্ত রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ।’ নিউইয়র্ক টাইমস অনুসারে সন্দেহ নেই যে, একজন অতি রক্ষণশীল উচ্চশিক্ষিত মধ্যবিত্ত মহিলার ঘটনা, যিনি পশ্চিমাদের ভ্রান্তপথ পরিহার করেছিলেন এবং আমেরিকাকে অবজ্ঞার সাথে পরিহার করেছিলেন। গোটা বিশ্বের মানুষসহ পাকিস্তানের জনগণের কাছে তিনি অনুপ্রেরণার বাতিঘররূপে চিরঅম্লান হয়ে থাকবেন।
আল-কায়েদা এবং নিষিদ্ধ জিহাদি গ্রুপ জইশ-ই-মুহাম্মদ-এর সাথে সিদ্দিকীর সম্পর্ক থাকার ভিত্তিহীন অভিযোগ করা হয়। পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম ব্যাপকভাবে তার বিচারকে একটি প্রহসন বলে আখ্যায়িত এবং পশ্চিমা গোষ্ঠীসহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের ওপর যে নির্যাতন ও অবিচার করছে, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ আফিয়া সিদ্দিকী বলে উল্লেখ করেছে।