দার্শনিক- বিজ্ঞানী আল-বিরুনী
১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১২:৩৬
আলম শামস
মধ্যযুগের বিশ্বখ্যাত দার্শনিক, শিক্ষাবিদ, গবেষক ও বিজ্ঞানী আবু রায়হান আল বিরুনী বা আবু রায়হান মোহাম্মদ ইবনে আহমদ আল বিরুনী (৯৭৩- ১০৪৮)। তিনি অত্যন্ত ধীমান, মৌলিক ও গভীর চিন্তাশীল ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। তিনি উজবেকিস্তানের খোয়ারিজম নামক এলাকায় অতি সাধারণ ইরানি পরিবারে ৫ সেপ্টেম্বর ৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন।
তিনি গণিতশাস্ত্র আবু নাসের ইবন আলি ইবন ইরাক জিলানি এবং তদ্রƒপ আরো কিছু বিদ্বান ব্যক্তির কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেন। অধ্যয়নকালেই তিনি তার কিছু প্রাথমিক রচনা প্রকাশ করেন এবং প্রখ্যাত দার্শনিক ও চিকিৎসাশাস্ত্রজ্ঞ ইবনে সিনার সাথে পত্র বিনিময় করেন। আল বিরুনীর মাতৃভাষা ছিল খাওয়ারিজিম আঞ্চলিক ইরানি ভাষা। কিন্তু তিনি তার রচনাবলি আরবিতে লিখে গেছেন। আরবি ভাষায় তার অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল। তিনি আরবিতে কিছু কবিতাও রচনা করেন। অবশ্য শেষের দিকে কিছু গ্রন্থ ফার্সিতে অথবা আরবি ও ফার্সি উভয় ভাষাতেই রচনা করেন। তিনি গ্রিক ভাষাও জানতেন। হিব্রু ও সিরীয় ভাষায়ও তার জ্ঞান ছিল।
তার গবেষণার মূল ক্ষেত্র ছিল পদার্থবিজ্ঞান, নৃবিজ্ঞান, Comparative sociology, জ্যোতির্বিজ্ঞান, জ্যোতিষশাস্ত্র, রসায়ন, ইতিহাস, ভূগোল, গণিত, চিকিৎসা বিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, দর্শনশাস্ত্র, ধর্মতত্ত্ব।
আল বিরুনীর জন্মস্থান শহরটি বর্তমানে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এখন এ স্থানটি আল-বিরুনী শহর নামে পরিচিত। তিনি ছিলেন গণিত, জ্যোতিঃপদার্থবিদ, রসায়ন ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে পারদর্শী। অধিকন্তু ভূগোলবিদ, ঐতিহাসিক, পঞ্জিকাবিদ, দার্শনিক এবং চিকিৎসা বিজ্ঞান, ভাষাতত্ত্ববিদ ও ধর্মতত্ত্বের নিরপেক্ষ বিশ্লেষক। স্বাধীন চিন্তা, মুক্তবুদ্ধি, সাহসিকতা, নির্ভীক সমালোচক ও সঠিক মতামতের জন্য যুগশ্রেষ্ঠ বলে স্বীকৃত। হিজরী চতুর্থ শতাব্দীর শেষার্ধ ও পঞ্চম শতাব্দীর প্রথমার্ধকে আল-বেরুনির কাল বলে উল্লেখ করা হয়। তিনি সর্বপ্রথম প্রাচ্যের জ্ঞানবিজ্ঞান; বিশেষ করে ভারতের জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতি মুসলিম মনীষীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। অধ্যাপক মাপা বলেন, ‘আল-বিরুনী শুধু মুসলিম বিশ্বেরই নয়, বরং তিনি ছিলেন সমগ্র বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী ব্যক্তিদের একজন।’
তিনি ১০০৮ খ্রিস্টাব্দে নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন করেন এবং শাহ আবুল হাসান আলি ইবনে মামুন কর্তৃক সম্মানে ভূষিত হন। তিনি আলি ইবনে মামুনের ইন্তেকালের পর তার ভ্রাতার পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন এবং অনেক নাজুক রাজনৈতিক কার্যকলাপ ছাড়াও রাজকীয় দৌত্যকার্যের দায়িত্বেও নিয়োজিত থাকেন। মামুন তার সৈন্যবাহিনী কর্তৃক ১০১৬-১৭ খ্রিস্টাব্দে নিহিত হওয়ার পর সুলতান মাহমুদ খাওয়ারিজম দখল করে নেন। গণিতবিদ আবু নাসের মানসুর ইবন আলি ও চিকিৎসক আবুল খায়ের আল-হুসায়ন ইবনে বাবা আল-খাম্মার আল-বাগ দাদদির সাথে গজনি চলে যান। এখানেই তার জ্ঞানচর্চার স্বর্ণযুগের সূচনা হয়। তখন হতে তিনি গজনি শাহী দরবারে সম্ভবত রাজ জ্যোতির্বিদ হিসেবে অবস্থান করতে থাকেন। তিনি কয়েকবার সুলতান মাহমুদের সাথে উত্তর-পশ্চিম ভারতে গমন করেছিলেন। গজনির সুলতানের পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি ভারতে প্রায় ১২ বছর অবস্থান করেন। এখানে সংস্কৃত ভাষা শেখেন এবং হিন্দু ধর্ম, ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতি, দেশাচার, সামাজিক প্রথা, রাতিনীতি, কুসংস্কার ইত্যাদি বিষয়ে গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। তিনি ভারতীয় কিছু আঞ্চলিক ভাষাও জ্ঞান লাভ করেছিলেন। তিনি এ এক যুগের অধ্যায় ও অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান দ্বারা রচনা করেন তার বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ কিতাবুল তারিকিল-হিন্দ।
ফলিত বিজ্ঞানী এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান
আল-বিরুনী যে কত বড় ফলিত বিজ্ঞানী এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানে তিনি যে কত উচ্চস্তরে স্থান লাভ করেছিলেন, এ সম্বন্ধে একটি ঘটনা উল্লেখই যথেষ্ট। একদিন সুলতান মাহমুদ গজনিতে তার হাজার বৃক্ষের বাগানে গ্রীষ্মবাসের ছাদে বসে আল-বিরুনীকে বললন, এ বাড়ির চার দরজার কোন দরজাটি দিয়ে আমি বের হবো, আপনি তা গুনে ঠিক করে একটি কাগজে লিখে আমার কম্বলের নিচে রেখে দিন। আল-বিরুনী তার আস্তারলব যন্ত্রের সাহায্যে অঙ্ক কষে তার অভিমত একটি কাগজে লিখে সুলতান মাহমুদের কম্বলের নিচে রেখে দিলেন। তখন সুলতান রাজমিস্ত্রির সাহায্যে একটি নতুন দরজা সৃষ্টি করে বেরিয়ে গিয়ে আবার ফিরে এসে দেখেন আল-বিরুনীর কাগজে অনুরূপ কথাই লেখা, ‘আপনি পূর্ব দিকের দেয়াল কেটে একটি নতুন দরজা করে বেরিয়ে যাবেন’। কাগজের লেখা পাঠ করে সুলতান রেগে গিয়ে ছাদ থেকে আল-বিরুনীকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দেয়ার জন্য আদেশ দিলেন। নিচে মশামাছি প্রতিরোধের জন্য জাল পাতা ছিল। সুলতানের আদেশ কার্যকর হওয়ার পর আল-বিরুনী সেই জালে আটকে গিয়ে মাটিতে আস্তে পড়ার ফলে বেশি আঘাত পেলেন না। সুলতান আল-বিরুনীকে আবার ডেকে আনলেন এবং তার চাকরের কাছ থেকে আল বিরুনীর দৈনিক ভাগ্য গণনার ডায়েরিটা নিয়ে সুলতান দেখলেন, তাতে লিখা আছে, ‘আমি আজ উঁচু জায়গা থেকে নিচে পড়ে গেলেও বিশেষ আঘাত পাব না’। এ দেখে সুলতান আরো রেগে গিয়ে আল-বিরুনীকে জেলে পাঠালেন। এর পর আল-বিরুনীকে কারগার থেকে মুক্তির সুপারিশ করতে কেউ সাহস পেলেন না। ছয় মাস পর সুলতানের মনমর্জি বুঝে প্রধানমন্ত্রী আহমদ হাসান একদিন আল-বিরুনীর প্রতি সুলতানের নেক নজর আকর্ষণ করলেন। সুলতান মাহমুদের এ কথা স্বরণই ছিল না। তিনি তৎক্ষণাৎ তাকে মুক্তি দিলেন।
সুলতান মাসউদের আনুকূল্য লাভ
ইউর্পোীয় পণ্ডিতদের মতে, আল-বিরুনী ছিলেন স্বয়ং বিশ্বকোষ, তার প্রত্যেকটি গ্রন্থ ছিল জ্ঞানের আধার। ভারতীয় পণ্ডিতরা আল-বিরুনীকে বলতেন জ্ঞানের সমুদ্র। কোনো অবস্থাতেই তার এসব অমূল্য গ্রন্থের পরিচয় কম কথায় দেয়া সম্ভব নয়। আল-বিরুনীর ভারত থেকে গজনি প্রত্যাবর্তন করার কিছু দিন পর সুলতান মাহমুদ ইন্তেকাল করেন। অতঃপর পুত্র সুলতান মাসউদ ১০৩০ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনি ১০৩০-১০৪১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সিংহাসনে ছিলেন। সুলতান মাসউদ আল-বিরুনীকে খুব সম্মান করতেন। আল-বিরুনী তার অনুরক্ত হয়ে সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থের নাম সুলতানের নামানুসারে রাখেন, কানুন মাসুউদী এবং তা সুলতানের নামে উৎসর্গ করেন। সুবিশাল গ্রন্থখানা সর্বমোট ১১ খণ্ডে সমাপ্ত। গ্রন্থটির গুরুত্ব উপলব্ধি করে সুলতান মাসউদ অত্যন্ত খুশি হয়ে একটি হাতির ওজনের পরিমাণ রৌপ্য বৈজ্ঞানিক আল-বিরুনীকে উপহার করেন। কিন্তু তিনি তা গ্রহণ না করে বাহ্যিক সন্তোষ প্রকাশ করে সব রৌপ্যই রাজকোষে ফিরিয়ে দেন। মন্তব্য করেন, তার এত ধনসম্পদের কোনো প্রয়োজন নেই।
কানুন মাসুউদী এর বিষয়
গ্রন্থটির প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ডে জ্যোতির্বিজ্ঞান, তৃতীয় খণ্ডে ত্রিকোণমিতি। এতে দুটি তালিকা দেয়া হয়েছে। এখানে জ্যোতির্বিজ্ঞান আলোচনার সাথে ত্রিকোণমিতিকে উচ্চস্তরে উন্নীত করার প্রচেষ্টায় তিনি যে সফলতা লাভ করেছেন, তা প্রশংসনীয়। মাসউদীর অনুরোধে অতি সরল পদ্ধিতে সাধারণের বোধগম্য ভাষায় দিবারাত্রির পরিমাণবিষয়ক একটি পুস্তকও তিনি প্রণয়ন করেন। চতুর্থ খণ্ডে গোলাকার জ্যোতির্বিদ্যা (Spherical Astronomy) ; পঞ্চম খণ্ডে চন্দ্র, সূর্যের মাপ, গ্রহ এবং দ্রাঘিমা; ষষ্ঠ খণ্ডে সূর্যের গতি প্রকৃতি; সপ্তম খণ্ডে চন্দ্রের গতি প্রকৃতি; অষ্টম খণ্ডে চন্দ্রের দৃশ্যমান ও গ্রহণ; নবম খণ্ডে স্থির নহ্মত্র; দশম খণ্ডে পাঁচটি গ্রহ নিয়ে এবং একাদশে জ্যোতিষবিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে এবং এখানে তিনি মূল্যবান অর্থ উপস্থাপন করেন।
ইন্তেকাল
আল-বিরুনী ৬৩ বছর বয়সে গুরুতর রোগে আক্রান্ত হন। তার পরও তিনি ১২ বছর বেঁচেছিলেন। ৭৫ বছর বয়সে আফগানিস্তানের গজনি এলাকায় ১৩ ডিসেম্বর ১০৪৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি ইন্তেকাল করেন।
গ্রন্থ
আল-বিরুনীর সর্বমোট ১১৩টি গ্রন্থের উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে ১০৩টি গ্রন্থ সম্পূর্ণ হয়েছে এবং ১০টি অসম্পূর্ণ গ্রন্থের উল্লেখ রয়েছে। আবু নাসের মানসুর ১২টি, আবু সাহল আ-মাসিহি ১২টি, আবু সাহল আল-মাসিহি ১২টি, আবু আলি আল-হাসন ইবনে আলি আল-জিলি একটি পুস্তক তার নামে আরোপিত করে উল্লেখ করেছেন। ফলে মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ১৩৮। উল্লিাখিত রচনার পরও তিনি আরো কিছু গ্রন্থ রচনা করেছেন। বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য হতে প্রতীয়মান হয়, তার রচিত গ্রন্থের সর্বমোট সংখ্যা ১৮০। এগুলো তথ্য, তত্ত্ব ও পরিসরের দিক থেকে বিভিন্ন। কোনোটি পুস্তক, কোনোটি গবেষণামূলক সন্দর্ভ আবার কোনোটি বৃহদাকার গ্রন্থ, যাতে জ্ঞানের বিশাল ভাণ্ডার বিধৃত ধারণ করা হয়েছে।
লেখক : কবি ও সাংবাদিক