সম্পাদকীয় : ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধ নয়, প্রয়োজনীয় নীতিমালা তৈরি করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে
২৯ নভেম্বর ২০২৪ ০০:০০
‘আমাদের যুগে আমরা যখন খেলেছি পুতুল খেলা/তোমরা এ যুগে সেই বয়সেই লেখাপড়া কর মেলা।/আমরা যখন আকাশের তলে ওড়ায়েছি শুধু ঘুড়ি/তোমরা এখন কলের জাহাজ চালাও গগন জুড়ি।’ এ বাস্তবতা মেনে নিয়েই পথ চলতে হবে। জোর খাটিয়ে চলমান পরিবর্তন ঠেকানোর চেষ্টা করে লাভ নেই। বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সাথে যানবাহন থেকে নিয়ে সর্বত্র বিপ্লব ঘটেছে। এ বিপ্লবকে ধারণ করতে হবে। এর লাভজনক দিকগুলো কীভাবে বেশি বেশি কাজে লাগালো যায় এবং নেতিবাচক প্রভাব প্রতিহত করার বিষয়ে গবেষণা করে নীতিমালা তৈরি করতে হবে। ব্যাটারিচালিত রিকশা থাকবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। আদালত সরকারকে এ সংক্রান্ত একটি নির্দেশও দিয়েছেন। এ নির্দেশের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আদালতের নির্দেশনার পক্ষে অবশ্যই যুক্তি আছে। নীতিমালা ছাড়া যেকোনো যানবাহন এবং এমনকি একজন মানুষ পায়ে হেঁটে কীভাবে রাস্তায় চলবে- এ সংক্রান্ত আইন ও প্রচলিত নিয়ম আছে। সেই নিয়ম অমান্য করলে জেল-জরিমানাসহ শাস্তির বিধান আছে। ব্যাটারিচালিত রিকশা, অটোভ্যান সবই এ শতাব্দীর নতুন সংযোজন। এ বিষয়টি নিয়ে তেমন কোনো গবেষণা হয়নি। নেই কোনো নীতিমালাও। তাই দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা- এমন অভিযোগ তুলে এ যানবাহন বন্ধের পক্ষে একটি মহল জোর যুক্তি তুলে ধরছেন।
বিষয়টি মাথাব্যথা দূর করার সহজ সমাধান মাথা কেটে ফেলার মতোই। অথচ সড়ক দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, প্রথম কারণ হচ্ছে অপর্যাপ্ত সড়ক অবকাঠামো; সড়কগুলোর অবকাঠামো উন্নত না হওয়া, সঠিক সিগন্যাল ব্যবস্থা না থাকা, ওভারক্রাউডিং। দ্বিতীয় ফিটনেসবিহীন যানবাহন; তৃতীয় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং চরম উদ্বেগের বিষয় চালকদের অসতর্কতা। লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানো, গাড়ির স্পিডসীমা অতিক্রম করা, মদপান করে গাড়ি চালানো। গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ দুর্ঘটনার জন্য চালকদের অসতর্কতা, অদক্ষতা এবং সড়কের খারাপ অবস্থাই দায়ী। সড়ক দুর্ঘটনার বিগত দুই তিন বছরের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে। অথচ যত দোষ নন্দ ঘোষ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার। কই এজন্য তো রাস্তায় মোটরসাইকেল চালানো বন্ধ ঘোষণা করা হয়নি। তাহলে গরিবের বাহন অটোরিকশা বন্ধ করে বিত্তহীন মানুষের পেটে কেন লাথি মারা হচ্ছে। এর ফলে সমাজে চুরি-ডাকাতি, ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ বাড়বে, সেই চিন্তা কেন করা হচ্ছে না। অটোরিকশা বন্ধের আর একটি কারণ উল্লেখ করা হয়, বিদ্যুৎ সাশ্রয় ও বিদ্যুৎ চুরি বন্ধ। রিকশার গ্যারেজগুলোয় অবৈধভাবে বিদ্যুতের লাইন নিয়ে অসাধু বিদ্যুৎ কর্মচারীদের ম্যানেজ করে গাড়িগুলো চার্জ দেয়া হয়। বিষয়টি যেন চোরের ভয়ে না খেয়ে থাকার মতো। কিন্তু সরকারের দায়িত্ব চুরি বন্ধে ব্যবস্থা নেয়া, খাওয়া বন্ধ করা নয়।
আমরা মনে করি, বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করতে হবে। অটোরিকশা চলাচল ও চার্জ সংক্রান্ত একটি নীতিমালা তৈরি করতে হবে। দুর্ঘটনা রোধে রাস্তা নির্ধারণসহ চালকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। কেন এতদিন নীতি তৈরি হয়নি- এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে ভয়াবহ তথ্য বের হয়ে এসেছে। তা হলো, নীতি তৈরি করে অটোরিকশার মতো যানবাহনগুলো বৈধ করে দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অসাধু সদস্য, রাজনৈতিক নেতা-মাস্তান ও চাঁদাবাজদের অবৈধ আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাবে। গরিব অটোরিকশা চালকদের রাস্তায় আটকে হয়রানি করে ঘুষ ও চাঁদাবাজি করার স্বর্ণালী সুযোগ বন্ধ হয়ে যাবে। তাই অসাধু এ চক্রটি এ সংক্রান্ত নীতিমালা তৈরিতে বাধা সৃষ্টি করে বন্ধ-খোলার ইঁদুর-বিড়াল খেলা চালিয়ে দেশের জনগণ ও সরকারের বারোটা বাজাচ্ছে।
আমরা আশা করি, সরকার অটোরিকশা বন্ধ নয়, চলাচলের নীতিমালা তৈরি করে চালু রাখার ব্যবস্থা করবে। এক্ষেত্রে পুলিশি তৎপরতা বৃদ্ধি করে আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ এই আইনে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যে কঠোর নিয়মাবলি প্রণয়ন করা হয়েছে, তার সংস্কার করে মনিটরিং বাড়াতে হবে। নতুন সড়ক নির্মাণ এবং পুরনোগুলোর সংস্কার করতে হবে। লাইসেন্স ব্যবস্থাপনা সহজ ও সুলভ করতে হবে। লাইসেন্স প্রদান ও নবায়নের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। তাহলে আমরা আধুনিক জীবনের অনুষঙ্গ, পরিবেশদূষণমুক্ত ব্যাটারিচালিত যানবাহনে নিরাপদে চলাচল করতে পারবো। সরকারও এর মাধ্যমে বিপুল অর্থ সংগ্রহ করে বিদ্যুৎ খাত ও রাস্তাঘাটের অবকাঠামো নির্মাণ ও সংরক্ষণে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে।