দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় পরস্পর হাত ধরে চলার বিকল্প নেই

একলা চলো নীতিতে সঙ্কট বাড়বে

হারুন ইবনে শাহাদাত
৩০ জুলাই ২০২৬ ১০:১৩

সারজিস-পাটোয়ারীর ওপর হামলার প্রতিবাদে রাজধানীতে বিক্ষোভ

‘দেশটা কারো বাপের না’- এ স্লোগানের প্রতিফলন দেখতে চায় জনগণ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতার পাশাপাশি ছবি এবং একসাথে বৈঠক জাতির মনে আশা জাগায়। কিন্তু যখন মাঠে ভিন্ন চিত্র দেখে, তখন হতাশার কালো মেঘে ঢাকা পড়ে জনমনের আশার ফল্গুধারা। কারণ তারা পুরোনো ফ্যাসিবাদ নতুন করে কারো ঘাড়ে সওয়ার হয়ে ফিরে আসুক, তা চায় না। তারা সংসদীয় গণতান্ত্রিক ধারার বিকাশ চায়। জাতীয় সংসদ এবং সংসদের বাইরে গণতান্ত্রিক যৌক্তিক আলোচনা ও সমালোচনায় দেশ এগিয়ে যাবে। প্রতি পাঁচ বছর পরপর ভোটাধিকার প্রয়োগ করে নতুন নেতা নির্বাচিত হবে। পুরোনো কাসুন্দি ছড়িয়ে দুর্গন্ধ ছড়াবে না। পরস্পরের প্রতি থাকবে শ্রদ্ধা। রাজপথে মারামারি হানাহানি নয়, যার যার মতামত বিনা বাধায় ব্যক্ত করবে। পতিত ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সবাই থাকবে ঐক্যবদ্ধ। কিন্তু ক্ষমতাসীনদের কারো কারো আচরণে জনগণের এমন শুভ প্রত্যাশা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা।
পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, রাষ্ট্রক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি স্তরে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করার অপচেষ্টার কারণেই সরকার ও বিরোধীদলের দ্বন্দ্ব বাড়ে। সংবিধান ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে দেশ এগিয়ে নিতে যোগ্যতা ও দক্ষতার মূল্যায়ন সঙ্কট দূর করার একমাত্র উপায়।
যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও জ্যেষ্ঠতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোয় চলছে নজিরবিহীন দলীয়করণ। সিভিল প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ সচিবালয় পদ থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পদে কেবল দলীয় অনুগতদের বসানো হচ্ছে। যোগ্য ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের কৌশলে ‘ওএসডি’ (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) করে রাখা হয়েছে অথবা গুরুত্বহীন পদে বদলি করা হয়েছে। এ প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি গ্রহণ করলে। তা শুরু করতে হবে তৃণমূল থেকেই।
তৃণমূল পর্যায়ে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার অন্যতম হাতিয়ার হলো স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা। তবে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসেই এই ব্যবস্থাকে অকার্যকর করার পথে হাঁটছে। জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং উপজেলা পরিষদগুলোয় সুশাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পূর্ববর্তী আমলা তথা প্রশাসকদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেখানে নতুন কোনো নির্বাচনের ব্যবস্থা না করে সম্পূর্ণ একক সিদ্ধান্তে বিএনপির দলীয় নেতাকর্মীদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনে সরকারের এই অনীহা এবং গড়িমসি স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, তারা তৃণমূলের ক্ষমতাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে কুক্ষিগত করে রাখতে চায়। এর ফলে সাধারণ নাগরিকরা মৌলিক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে ইতিবাচক কাজে সুকৌশলে বাধা সৃষ্টি করছে সরকার। যেমনÑ যেসব আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা সংসদ সদস্য (এমপি) হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন, সেসব এলাকায় দলটিকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে কোণঠাসা করার নীতি বাস্তবায়ন করছে বিএনপি। সংসদীয় গণতন্ত্রের নিয়ম অনুযায়ী, নির্বাচিত এমপিরাই সংশ্লিষ্ট এলাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মূল সমন্বয়ক ও তদারককারী হওয়ার কথা। কিন্তু জামায়াত নিয়ন্ত্রিত আসনগুলোয় নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাজকে স্তব্ধ করতে সরকার এক অভিনব ও অগণতান্ত্রিক পথ বেছে নিয়েছে। বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের অনির্বাচিত মহিলা এমপিদের সেসব এলাকার উন্নয়নকাজের প্রধান তদারককারী হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এর ফলে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ক্ষমতা খর্ব হচ্ছে এবং সমান্তরাল একক শাসনব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, যা জনগণের ম্যান্ডেটের পরিপন্থী।
নির্বাচিত এমপিদের হেনস্তা ও হামলা
সরকারি দলের স্থানীয় নেতাকর্মী এবং প্রশাসনের বৈরী আচরণের কারণে মাঠপর্যায়ে বিরোধী ও শরিক দলের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন না। বেশ কয়েকজন নির্বাচিত এমপির ক্ষেত্রে এই বাধা, সহিংসতা ও অসৌজন্যমূলক আচরণ এখন চরমে পৌঁছেছে। জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচিত জনপ্রতিনিদের সাথে সম্প্রতি ঘটা কিছু ঘটনা জাতির জন অশনিসংকেত বলে মনে করেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা। যেমন- পাবনা-১ আসনের নির্বাচত সংসদ সদস্য নাজিব মোমেন নিজের এলাকায় একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়ে চরম লাঞ্ছনার শিকার হন। তিনি মসজিদে জুমার খুতবা দিতে দাঁড়ালে স্থানীয় বিএনপি ও ছাত্রদলের ক্যাডাররা তাকে জোরপূর্বক বাধা দেয় এবং মসজিদ প্রাঙ্গণ থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করে। এই ঘটনায় সাধারণ মুসল্লিদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
যশোর-৪ গোলাম রসুলের বাসভবনে একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী হামলা চালায়। হামলাকারীরা বাড়ির মূল ফটক ভেঙে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করে এবং ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। স্থানীয় বিএনপি নেতাদের ইশারাতেই এই হামলা হয়েছে এবং গোলাম রসুলের সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজগুলো বন্ধ করতেই এই ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ঢাকা-১৬ এর আব্দুল বাতেনের তার নির্বাচনী এলাকায় মাদক ও ফুটপাতে অবৈধ চাঁদাবাজি বন্ধ করতে গিয়ে সরকারি দলের রোষানলে পড়েছেন। স্থানীয় বিএনপির চিহ্নিত চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় প্রকাশ্য দিবালোকে আব্দুল বাতেনের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। প্রশাসন এই বিষয়ে কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেয়নি।
ঢাকা-৪ আসনের জয়নুল আবেদীনকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করতে তার পরিবারের ওপর আঘাত হানা হয়েছে। জয়নুল আবেদীনের আপন ভাগ্নে, যিনি পেশায় একজন প্রকৌশলী, তাকে সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে একটি ভুয়া ও সাজানো ছিনতাই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। স্থানীয় বিএনপি নেতাদের প্রভাবেই পুলিশ এই হয়রানিমূলক মামলা করেছে বলে এলাকাবাসী মনে করেন।
শরিকদের ওপর আক্রমণ
বর্তমান সরকারের বৈষম্যমূলক ও আক্রমণাত্মক নীতির শিকার কেবল জামায়াতে ইসলামীই নয়, বরং অন্যান্য শরিক দলও এর অন্তর্ভুক্ত। এর মধ্যে অন্যতম হলো জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির কেন্দ্রীয় অন্যতম শীর্ষনেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে বিভিন্ন জেলা সফরে গিয়ে বারবার বিএনপির স্থানীয় সন্ত্রাসীদের টার্গেটে পরিণত হচ্ছেন। সাম্প্রতিক সফরে তার গাড়িবহরে একাধিকবার হামলা চালানো হয়েছে, নেতা-কর্মীদের মারধর করা হয়েছে এবং তাকে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার এই মৌলিক অধিকার হরণ করায় শরিক দলগুলোর মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বিরোধীদলগুলোর মতে, বিএনপি এখন আর কোনো শরিক বা মিত্রের পরোয়া করছে না; বরং তারা একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করতে মরিয়া।
ভেঙে পড়েছে আইনশৃঙ্খলা
দেশের আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটেছে। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ রহস্যজনকভাবে নীরব। তিনি ব্যস্ত গণভোটের রায়ের আলোকে সংবিধান সংস্কার বাধাগ্রস্ত করতে বলে বিরোধীদলের একাধিক নেতা দাবি করেছেন।
গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসাবে, এ বছরের প্রথম সাড়ে পাঁচ মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক সহিংসতা ও কোন্দলে ৫৯ জন খুন হয়েছে। এর মধ্যে ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতাকর্মী রয়েছে ৪৫ জন। এর অর্থ হচ্ছে, বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের অসহিষ্ণুতা বৃদ্ধি পেয়েছে। যতই দিন যাবে, এই অসহিষ্ণুতা যে আরো বৃদ্ধি পাবে, তা আন্দাজ করা যায়। প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ ও খুনের ঘটনা ঘটছে। আবার তারা চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের দ্বারা হামলা ও খুনের শিকার হচ্ছে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি ড. এ. এইচ. এম. হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, আমাদের দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কে বোঝা মুশকিল। কারণ তিনি সর্ববিষয়ের মন্ত্রী। তার আসলে কাজের ব্যর্থতায় বর্তমানে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই এবং রাজনৈতিক সহিংসতার গ্রাফ দিন দিন ঊর্ধ্বমুখী। কিন্তু এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তথা পুলিশের ভূমিকা সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় ও উদাসীন। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশের চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছে। অপরাধীদের দমনের চেয়ে বিরোধী মতাদর্শের মানুষকে দমনেই পুলিশকে বেশি ব্যবহার করা হচ্ছে। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, দেশের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা যখন ভেঙে পড়ার মুখে, তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সম্পূর্ণ নীরব ভূমিকা পালন করছেন। তার এই রহস্যজনক নীরবতা অপরাধী ও ক্ষমতাসীন দলের সহিংস কর্মীদের আরও বেশি উৎসাহিত করছে বলে মনে করেন পর্যবেক্ষকরা।
সংলাপ গণতন্ত্রের প্রাণ
বিএনপির পুরোনো ফ্যাসিবাদের পুনরাবৃত্তির কারণে সংলাপ-আলোচনা নেই বললেই চলে। কিন্তু সংলাপ হলো গণতন্ত্রের প্রাণ। কিন্তু সরকার নিজেরাই একাই সিদ্ধান্ত দিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতার অপব্যবহার করছেন বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। যার ফলে গণতন্ত্রের প্রাণ শক্তি নিঃশেষ হচ্ছে। তারা মনে করেন, গণতন্ত্রের প্রাণ হলো সংলাপ এবং পরমতসহিষ্ণুতা। কিন্তু বর্তমান সংসদ ও রাজপথের কোথাও তার কোনো লক্ষণ নেই। বিএনপি সরকার সংসদে বা সংসদের বাইরে কোনো বিরোধীদলের সাথেই দেশের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুতে আলোচনা করছে না। বাজেট প্রণয়ন, আইন পাস বা নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তারা একলা চলো নীতি অনুসরণ করছে।
রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিগত স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী সরকারগুলো যেভাবে বিরোধী কণ্ঠকে দমন করে একদলীয় সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিত, বিএনপি আজ ঠিক একই কায়দায় দেশ চালাচ্ছে। ক্ষমতার এই অন্ধ অহংকার দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎকে আবারও অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
সংবিধান ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ
অনির্বাচিতদের দিয়ে এলাকা চালানো এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ওপর হামলা-মামলার এই সংস্কৃতিকে দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞরা সুশাসনের জন্য বড় হুমকি বলে মনে করছেন। সুপ্রিম কোর্টের প্রখ্যাত আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক এই প্রসঙ্গে বলেন, ‘বাংলাদেশের সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা হয়েছে, প্রশাসনের সকল পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের এলাকায় অনির্বাচিত কাউকে দিয়ে সমান্তরাল প্রশাসন চালানো সংবিধানের নজিরবিহীন অবমাননা। এছাড়া অপরাধমূলক কোনো ঘটনা না থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কারো প্রকৌশলী আত্মীয়কে ছিনতাই মামলায় জড়ানো আইনের শাসনের চরম বিচ্যুতি এবং এটি মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।’
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও সুজন (সুশাসনের জন্য নাগরিক) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘জেলা পরিষদ বা সিটি করপোরেশনে নির্বাচন না দিয়ে আমলাদের বাদ দিয়ে একক সিদ্ধান্তে দলীয় লোক বসানো স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে পকেটস্থ করার শামিল। যখন কোনো নির্বাচিত এমপি যেমন আব্দুল বাতেন চাঁদাবাজি বন্ধ করতে গিয়ে হামলার শিকার হন বা নাজিব মোমেন খুতবা দিতে গিয়ে বাধার মুখে পড়েন, তখন বুঝতে হবে মাঠপর্যায়ে কোনো জবাবদিহি নেই। এটি ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের মূল চেতনার পরিপন্থী এবং অরাজকতা সৃষ্টির অন্যতম কারণ।’
বিরোধীদল ও শরিক নেতাদের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া
সরকারের এই একলা চলো নীতি এবং বৈষম্যমূলক আচরণের বিরুদ্ধে বিরোধীদল ও শরিক দলগুলোর শীর্ষনেতারা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘আমরা দেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছি। কিন্তু আজ ক্ষমতায় গিয়ে তারা আমাদের নির্বাচিত এমপিদের ওপর আক্রমণ করছে। নাজিবে মোমেনের মতো একজন সম্মানিত আলেম ও নির্বাচিত প্রতিনিধিকে মসজিদে খুতবা দিতে বাধা দেওয়া এবং গোলাম রসুলের বাড়িতে হামলা চালানো কোনো গণতান্ত্রিক সরকারের কাজ হতে পারে না। ঢাকা-১৬ ও ঢাকা-৪ এর জনগণের ম্যান্ডেটকে অপমান করা হচ্ছে। অনতিবিলম্বে জয়নুল আবেদীনের ভাগ্নের মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার ও আব্দুল বাতেনের ওপর হামলাকারীদের গ্রেপ্তার করতে হবে।’
এনসিপির আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিপহুইপ নাহিদ ইসলাম তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমাদের শীর্ষনেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী দেশের বিভিন্ন জেলা সফরে গিয়ে বারবার বিএনপির চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের হাতে আক্রান্ত হচ্ছেন। আমরা কি এই স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশের জন্য জীবনবাজি রেখে আন্দোলন করেছিলাম? পুলিশ ও প্রশাসন নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই রহস্যজনক নীরবতা প্রমাণ করে সরকারের উচ্চমহলের গ্রিন সিগন্যাল পেয়েই শরিকদের ওপর এই নির্যাতন চালানো হচ্ছে।’
বিএনপির দাবি
ক্ষমতাসীন বিএনপি নেতারা অভিযোগের জবাবে আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলেন, এগুলো সবই সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘বিএনপি কখনোই একলা চলো নীতিতে বিশ্বাস করে না। আমরা বহুদলীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাসী।’
দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘সংরক্ষিত আসনের নারী এমপিরাও সংসদের বৈধ সদস্য, তাদেরও এলাকার উন্নয়নে ভূমিকা রাখার আইনি অধিকার রয়েছে। নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বা জামায়াত নেতাদের ওপর হামলার ঘটনার সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে দলগতভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, পুলিশ তার রুটিন দায়িত্ব পালন করছে। বিরোধীদলগুলো সস্তা রাজনৈতিক ফায়দা লোটার জন্য সরকারের বিরুদ্ধে ঢালাও অভিযোগ তুলছে।’
রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন, রাজনীতিতে ক্ষমতার পরিবর্তন আসে জনগণের ভাগ্যোন্নয়ন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার আশায়। কিন্তু বিএনপি যদি তাদের নির্বাচনী স্লোগান ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ ভুলে গিয়ে ‘সবার আগে দল’ নীতি বাস্তবায়নে লিপ্ত হয়, তবে তা দেশের জন্য এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে। শরিক ও বিরোধীদলগুলোকে বাইরে রেখে, প্রশাসনকে সম্পূর্ণ নিজের পকেটে পুরে এবং জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অবমূল্যায়ন করে কোনো সরকারই দীর্ঘস্থায়ী সুফল পায়নি। ইতিহাস সাক্ষী, ফ্যাসিবাদ ও একলা চলো নীতি পরিহার না করলে জনবিচ্ছিন্নতা অনিবার্য। বিএনপির নীতিনির্ধারকদের উচিত অবিলম্বে এই ভুলপথ থেকে ফিরে এসে সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া, আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার করা এবং সকল রাজনৈতিক দলের সাথে আলোচনার মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সত্যিকারের গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে মনোযোগী হওয়া। বিরোধীদলের দায়িত্ব ক্ষমতাসীন দলকে সঠিক পথে আনতে গণতান্ত্রিকপন্থায় সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো। দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় পরস্পর হাত ধরে চলা।

হারুন ইবনে শাহাদাত

সম্পর্কিত খবর