অস্থির নিত্যপণ্যের বাজার : হু-হু করে বাড়ছে দাম


২৯ জুলাই ২০২৬ ২১:১৮

॥ আবু হামীম ॥
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার চলছে পাগলঘোড়ার মতো। যার যেভাবে ইচ্ছে দাম হাঁকাচ্ছে, দাম বাড়াচ্ছে, ভোক্তাদের ঠকাচ্ছে। প্রশ্ন আছে মান নিয়েও। বিশেষ করে নিরাপদ খাদ্য যেন সোনার হরিণ। পুকুর ও মুক্ত পানিতে চাষ করা মাছেও মিলছে ক্ষতিকর লেড (বিষাক্ত সিসা) ও প্লাস্টিক। সাম্প্রতিক সময়ে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যবিষয়ক একাধিক গবেষণায় এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। মানুষ যে খাবার খাচ্ছে এবং দৈনিক যেসব প্রসাধন ও শিশুসামগ্রী ব্যবহার করছে, সেগুলোর একটি বড় অংশে মিলেছে ক্ষতিকর লেড (সিসা), ভারী ধাতু ও বিষাক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা।
খাদ্যপণ্যের জন্য ব্যয় হয়ে যাচ্ছে মাসিক আয়ের সিংহভাগ। কিন্তু বিনিময়ে নিজ হাতে মানুষ খাচ্ছে বিষ- এমন মন্তব্য করেছেন বিশ্লেষকরা।
সিংহভাগ ব্যয় হচ্ছে খাদ্যপণ্যে
রাজধানীর একেক বাজারে একই পণ্যের ভিন্ন দাম। গরিবের পুষ্টির পাওয়ার হাউসখ্যাত ডিমের বাজারে সরেজমিন এ প্রতিবেদক দেখেছেন, একই মান ও আকারের ডিম মগবাজার পিয়ারাবাগ বাজারের গত সপ্তাহে কয়েকটি দোকানে বিক্রি হয়েছে ১৩৫ টাকা ডজন, আবার কয়েক কদম হাঁটলেই সেই ডিমের দাম ১৪৫ টাকা এবং মহল্লার দোকানে ১৬০/১৬৫ টাকা। এছাড়া আরো দেখা গেছে, একেক বাজারে একই পণ্যের ভিন্ন ভিন্ন দাম হাঁকা হচ্ছে। বর্তমানে বাজারে আলু ছাড়া ৮০ টাকার নিচে কোনো প্রকার সবজি মিলছে না। বেগুন, পটোল, ঢ্যাঁড়শ, করলা থেকে শুরু করে সাধারণ কাঁচামরিচ সবকিছুর দামই এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। এমনকি খাদ্যপণ্য ও নিত্যপণ্যের নাম, মান এবং শ্রেণিবিন্যাস নিয়েও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের কার্যকর নজরদারি নেই; উল্টো রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ও স্থানীয় পর্যায়ে একশ্রেণির নেতাকর্মীদের দৌরাত্ম্য ও চাঁদাবাজি অব্যাহত রয়েছে- যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে সাধারণ ভোক্তার পকেটে।
দামের চরম বিশৃঙ্খলা ও সবজির বাজারে আগুন
রাজধানীর কারওয়ান বাজার, যাত্রাবাড়ী, মিরপুর এবং মহাখালীসহ বিভিন্ন খুচরা বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সবজি বাজারে আগুন জ্বলছে। বিক্রেতারা ইচ্ছেমতো দামে পণ্য বিক্রি করছেন। বাজারে বর্তমানে কেবল আলু ৫০ থেকে ৭০ টাকা কেজিতে বিক্রি হলেও অন্যান্য প্রায় সব সবজি বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে। পটোল, ঢ্যাঁড়শ বা চিচিঙ্গার মতো সাধারণ সবজিও ৮০ টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছে না। বেগুন বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১২০ টাকায়, গোল বেগুন ১৫০-১৬০ আর কাঁচামরিচের দাম ২০০ টাকা ছাড়িয়েছে।
একেক বাজারে একেক দর : একই দিনে কারওয়ান বাজারে যে শসা ৬০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে, মহাখালী বা মিরপুর বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ৯০ টাকায়। বড় মগবাজারে ৮০ থেকে ১২০ টাকা। কারণ জিজ্ঞাসা করলে আবুল কাশেম নামে এক সবজি বিক্রেতা জানান, আড়ত থেকে চড়া দামে কিনে আনি। এর সাথে যোগ হয় পরিবহন ও অন্যান্য খরচ। অবশ্য অন্যান্য খরচের ব্যাখ্যা দিতে তিনি রাজি হননি। শুধু দাম নয়, মান নিয়েও আছে প্রশ্ন।
মান নিয়ে প্রশ্ন
বাজারের অসাধু ব্যবসায়ীরা পণ্যের কৃত্রিম শ্রেণিবিন্যাস সৃষ্টি করে দাম বাড়াচ্ছেন। কিন্তু মান রক্ষার দিকে তাদের কোনো নজর নেই। বরং কৃত্রিমভাবে সুদর্শন করতে মেশানো হচ্ছে ক্ষতিকর নানা রাসায়নিক পদার্থ। খাদ্যপণ্য তৈরির সময় যথাযথ নিয়ম মানা হচ্ছে না। ‘অর্গানিক’, ‘দেশি’, ‘হাইব্রিড’ কিংবা ‘প্রিমিয়াম সেগমেন্ট’ এমন নানা নাম দিয়ে একই পণ্যকে ভিন্ন ভিন্ন দামে বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে বিশ্বস্ত হিসেবে পরিচিত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। প্যাকেটের গায়ে বিএসটিআই’র লোগোর অপব্যবহার হচ্ছে। অনুমোদন নেওয়ার সময় পরীক্ষা করা হলেও পরে আর মনিটরিং নেই। পণ্যের প্যাকেটে স্পষ্ট তথ্য না থাকা এবং মান নিয়ন্ত্রণে ঘাটতি থাকায় ভোক্তারা প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছেন।
রাজনৈতিক দলের নেতারা দেশের স্বার্থে সরকার ও সরকারি কর্মকর্তাদের পণ্যের মান ও দাম নিয়ন্ত্রণে সহযোগিতা করার কথা। কারণ তারাই ক্ষমতাবান স্বীকৃত জনগণের প্রতিনিধি এবং মানবাধিকার কর্মী। ৩৬ জুলাই ২০২৪ গণঅভ্যুত্থানের পর এমনটাই হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু ঘটছে তার উল্টো ঘটনা। ক্ষমতাসীন সরকার দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে পরিবহন খাত ও বাজারে চাঁদাবাজির অভিযোগ ওপনে সিক্রেট।
পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি ও দলীয় দৌরাত্ম্য
দেশের বিভিন্ন জেলা অর্থাৎ উৎপাদনস্থল থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পণ্য পৌঁছানোর প্রক্রিয়ায় অন্তহীন চাঁদাবাজির হয়। বিভিন্ন মিডিয়ায় এ-সংক্রান্ত সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশের পরও কোনো প্রতিকার নেই। বরং অভিযোগকারীই হয়রানির শিকার হচ্ছেন। দেশের বিভিন্ন জেলা যেমন রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া, যশোর, নরসিংদী, বরিশাল, ঝালকাঠি থেকে শাকসবজি বা অন্যান্য কৃষিপণ্য যখন ট্রাক ও ট্রলারে করে রাজধানীতে আসে, তখন পথিমধ্যে একাধিক পয়েন্টে চাঁদা দিতে হয়।
জেলা পর্যায়ের আড়ত, মহাসড়কের বিভিন্ন স্ট্যান্ড এবং রাজধানীর প্রবেশমুখে ট্রাকপ্রতি ৫০০ থেকে ১,৫০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বা দলীয় প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে স্থানীয় অসাধু সিন্ডিকেট ও নেতাকর্মীরা বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছেন। আড়তে জায়গা বরাদ্দ, ফুটপাত দখল এবং রসিদ ছাড়া তোলা তোলার এই অতিরিক্ত খরচ দিনশেষে যোগ হচ্ছে পণ্যের খুচরা মূল্যে।
সাধারণ ভোক্তাদের ক্ষোভ
এমন অব্যবস্থাপনার কারণে সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও হতাশা লক্ষ করা গেছে। আনিসুর রহমান নামে এক বেসরকারি চাকরিজীবী জানান, ‘মাস শেষে বেতন যা পাই, তার অর্ধেকের বেশি চলে যায় বাজার করতে। ৮০ টাকার নিচে কোনো সবজি নেই। আলু খেয়ে তো আর দিন চালানো যায় না। বাজারে কোনো শৃঙ্খলা নেই; এক দোকান থেকে অন্য দোকানে ৫-১০ টাকা পার্থক্য। সরকার বা তদারকি সংস্থার কোনো উপস্থিতি আমরা বাজারে দেখি না।’
কারওয়ান বাজারে আসা রোকেয়া বেগম নামে একজন জানান, ‘আগে তাও এক-দুইটা সবজি কমে পাওয়া যেত, এখন সবকিছুর দাম ১০০ ছুঁইছুঁই। শোনা যায় রাস্তায় নাকি মোড়ে মোড়ে চাঁদা দিতে হয়, আর সেই টাকা আমাদের পকেট থেকে যাচ্ছে। কোনো নেতা আসুক আর যাক, সাধারণ মানুষের কষ্ট কেউ দেখে না।’
জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকতারা এ প্রতিনিধিকে বলেন আমরা অসহায়। ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমরা নিয়মিত বাজার মনিটরিং ও অভিযান পরিচালনা করছি। মূল্যতালিকা টাঙানো ও পাকা রসিদ সংরক্ষণের বিষয়ে ব্যবসায়ীদের বাধ্য করার চেষ্টা চলছে। তবে শুধু বাজারে অভিযান চালিয়ে দাম নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। কারণ পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং পরিবহন খাতের চাঁদাবাজি বন্ধ করা অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের দায়িত্ব। উৎপাদকের কাছ থেকে খুচরা পর্যায়ে পৌঁছানো পর্যন্ত যে মধ্যস্বত্বভোগী ও চাঁদাবাজির চক্র রয়েছে, তা গোড়া থেকে উচ্ছেদ করতে হবে।’
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কাছে নিরাপদ খাদ্য করার ক্ষেত্রে তাদের জনবল সংকট ও ক্ষমতার সীমাবব্ধতার কথা বলেন।
নিরাপদ খাদ্য অধিদপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “আমরা পণ্যের গুণগতমান ও ভেজাল প্রতিরোধে কাজ করছি। বাজারে ‘অর্গানিক’ বা ‘বিশেষ মানের’ নামে যে বিভ্রান্তি তৈরি করা হয়, তার বিরুদ্ধে আমাদের মনিটরিং টিম কাজ করছে। তবে মূল্য নির্ধারণের প্রত্যক্ষ এখতিয়ার আমাদের নেই। বাজারে বিক্রয়যোগ্য খাদ্যপণ্য যেন মানসম্মত হয় এবং ভোক্তারা যাতে বিভ্রান্ত না হন, সে বিষয়ে আমরা শিগগিরই আরও কঠোর নীতিমালা ও ঝটিকা অভিযান জোরদার করব।”
বাজার স্থিতিশীল করতে- ১. পথিমধ্যে চাঁদাবাজি বন্ধ : মহাসড়ক ও আড়তগুলোয় চাঁদাবাজি সম্পূর্ণ বন্ধ করতে কঠোর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ব্যবস্থার প্রয়োগ।
২. মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য হ্রাস : কৃষক থেকে সরাসরি ভোক্তা পর্যায়ে পণ্য পৌঁছানোর জন্য ‘কৃষক বাজার’ বা সরকারি পরিবহন ব্যবস্থার পরিধি বাড়ানো। ৩. নিয়মিত দৃশ্যমান মনিটরিং : কেবল নামমাত্র জরিমানা না করে, বাজারে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের সার্বক্ষণিক উপস্থিতি নিশ্চিত করা। ৪. মূল্যতালিকার বাধ্যবাধকতা : প্রতিটি দোকানে মূল্যতালিকা দৃশ্যমান রাখা এবং কেনাবেচায় পাকা রসিদ বাধ্যতামূলক করা- দরকার বলে পরামর্শ পর্যবেক্ষকদের।
পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, তারা নিত্যপণ্যের বাজারে শৃঙ্খলার অভাব সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলছে। শুধু আশ্বাস বা সাময়িক অভিযানের মাধ্যমে এ সংকট মেটানো সম্ভব নয়। রাজনৈতিক প্রভাব ও চাঁদাবাজির চক্র ভেঙে কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ না নিলে সাধারণ ভোক্তাদের এই দুর্ভোগ কমবে না।

আবু হামীম হারুন ইবনে শাহাদাত

সম্পর্কিত খবর