প্রসঙ্গ : তোষামোদী সাংবাদিকতা এবং মির্জা ফখরুলের ক্ষোভ


২২ জুলাই ২০২৬ ২১:০৫

॥ আবু হামীম ॥
দেশে প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার অভাব নেই। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ মিডিয়ার পরিসংখ্যান তুলে ধরে গর্ব করে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বয়ান দিতেন। তার সেই বয়ান কতটা ভিত্তিহীন ছিলো, তা প্রমাণ হয়েছে হাসিনার পতন ও পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায়। প্রমাণ হয়েছে, সংখ্যা নয় প্রয়োজন ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার মতো সাহসী গণমাধ্যম। এ দেশের অধিকাংশ সাংবাদিকও ভুলে যান এ সত্য। তাই এ প্রসঙ্গ এবার সামনে আনলেন বিএনপি মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ভুলে যাওয়ার কারণ ফ্যাসিস্ট হাসিনার দেড় দশকের শাসনামলে বিভিন্ন প্রলোভনে সাংবাদিকদের একটি বড় অংশ ‘চেতনাসৈনিক’ পরিচয়ের আড়ালে ক্ষমতাসীনদের পা চেটেছে। সেই চাটার দল প্রশ্ন করার দায়িত্ব ভুলে যাওয়ায় হাসিনার সব অন্যায় পরিণত হয়েছিলো ‘চেতনা’ রক্ষার নামে বৈধ। শেষ পরিণতি গণঅভ্যুত্থানে দলবদল; এমনকি সাংবাদিকদের একটি বড় অংশও হয় দেশছাড়া, নয়তো আত্মগোপনে।
সরকার বদল হয়েছে, বিগত ফ্যাসিস্টের রুই-কাতলরাও নেই। কিন্তু জায়গা দখলরা নতুনরা যাদের অনেকেই বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে যারা বর্তমান ক্ষমতাসীদের সাথে ছিলেন তারা এবং ফ্যাসিস্টের রুই-কাতল সাংবাদিকদের সাথে থাকা বর্ণচোরা কিছু চুনোপুঁটি। দুঃখজনক হলেও সত্য, তাদের অনেকও এখন দলীয় কর্মীর মতো ব্যবহৃত হচ্ছেন। প্রশ্ন করা ভুলে তোষামোদী করছেন। বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে তোষামোদ করে অনেক মিডিয়া কর্মী প্রত্যাশার চেয়েও বেশি সুবিধা পেয়েছেন। সেই স্মৃতির নস্টালজিয়ায় হয়তো আক্রান্ত হচ্ছেন, ফ্যাসিস্ট আমলের লড়াকুদের ওপর তারই কুপ্রভাব পড়েছে। তারা সেই চাটার দলের শূন্যস্থান পূরণ করে নিজেরা ব্যস্ত খালি গদি দখলে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এর কারণ সেই লড়াকু সাংবাদিকরা আসলে যতটা সাংবাদিকতার স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছেন, তার চেয়ে বেশি তৎপর ছিলেন দলদাস হিসেবে। আসলে তারা বিভক্ত হয়েছেন ফ্যাসিস্ট দলের চেতনাজীবী এবং তার বিপরীত রাজনৈতিক শক্তির কর্মী পরিচয়ে। তাই দেশে সুস্থধারার প্রতিবাদী সাংবাদিকতার বিকাশ ঘটছে না।
সরকারের কাজের সমালোচনার মাধ্যমে সহযোগিতার বদলে অন্যায়কে সমর্থন করে আবার ডোবানোর আয়োজনে ব্যস্ত। সেই শঙ্কা থেকেই বিএনপি মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ক্ষোভ, ‘তোষামোদী সাংবাদিকতা আর সহ্য হচ্ছে না।’
কোথায় কবে কখন বলেছেন
সুস্থধারার সাংবাদিকতার কথা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একাধিকবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের বিভিন্ন আলোচনা সভায় বলেছেন। তবে সর্বশেষ তিনি গত ১৯ জুলাই রোববার রাজধানীর রমনার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের (আইইবি) সম্মেলনকক্ষে ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিল (এনইসি)-এর ‘জুলাই শহীদ সাংবাদিক সম্মাননা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এ মন্তব্য করেছেন।
তোষামোদীর রাজনীতি ও সমাজ বাস্তবতা মির্জা ফখরুল তাঁর বক্তব্যে আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমরা কেন জানি না, জাতিগতভাবে এই তোষামোদী, মোসাহেবি থেকে বেরিয়ে আসতে পারছি না। আমলাতন্ত্র ও রাজনীতিতেও একই ঘটনা ঘটছে। চাটুকারিতার সংস্কৃতি থেকে বের হতে হলে পুরো সমাজব্যবস্থায় একটি আমূল পরিবর্তন বা কাঠামোগত বিপ্লবের প্রয়োজন।’
সাংবাদিক নেতা ও সম্পাদকদের বক্তব্য
বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে মিডিয়ার অতিমাত্রায় ক্ষমতার তোষামোদীর তীব্র সমালোচনা করে এনইসির সভাপতি ও দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বলেন, মিডিয়ার এই চাটুকারিতার কারণেই ফ্যাসিবাদ দিন দিন আরও বেশি ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছিল। দেশে যেন ভবিষ্যতে আর কখনো কোনো স্বৈরাচারী বা ফ্যাসিবাদী শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে, সেজন্য গণমাধ্যম ও জনগণকে সর্বদা সতর্ক রাখা এই সংগঠনের মূল কাজ। যখন গণমাধ্যম সত্য আড়াল করে ক্ষমতার দালালি করে, তখন সাধারণ মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন হয়। তাই সাংবাদিকদের মূল দায়িত্ব হলো ক্ষমতাবানদের প্রশ্ন করা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা, তোষামোদী করা নয়।
ডেইলি ওয়েদার সম্পাদক শফিকুল আলম বলেন, যারা অতীতে ক্ষমতার দালালি করেছে, তারা এখনো খোলস পাল্টে একই কাজ করার চেষ্টা করছে, যা রুখে দিতে হবে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ও দৈনিক মানবকণ্ঠের সম্পাদক শহিদুল ইসলাম সাপ্তাহিক সোনার বাংলাকে বলেন, ‘তিনি সঙ্গত কারণেই এ মন্তব্য করেছেন। এ শ্রেণির সংবাদপত্র ও সংবাদকর্মী ফ্যাসিবাদী আমলের ধারা থেকে এখনো বের হয়ে আসতে পারেনি। তারা সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের দায়িত্ব কী, তা ভুলে গিয়ে সরকার ও প্রভাবশালীদের তোষামোদের মাধ্যমে নিজের স্বার্থ উদ্ধারে ব্যস্ত। কিন্তু গণতন্ত্র রক্ষা এবং দেশ ও জাতিকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে গঠনমূলক সমালোচনার বিকল্প নেই। গঠনমূলক সমালোচনা হলো অন্ধকার রাতে পথচলার টর্চ লাইটের আলোর মতো পথ সঠিক পথে চলতে সাহায্য করে। টর্চের আলো যেমন একজন পথিককে খানাখন্দ, বিপজ্জনক সাপ-বিচ্ছু ও অন্যান্য ক্ষতি থেকে বাঁচায় একজন সচেতন সাংবাদিকের গঠনমূলক সমালোচনাও সরকার ও রাষ্ট্রকে তেমনি করে বিপদ থেকে রক্ষা করে। দেশ ও জনগণের স্বার্থ রক্ষা ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় রোধ এবং নাগরিকদের মানবাধিকার ও ব্যক্তিগত সম্পদ, সম্মান রক্ষায় পদপেক্ষপ নিতে সরকারকে সাহায্য করে। অন্যদিকে তোষামোদী সাংবাদিকতা সেই সাংবাদিক ও সংবাদপত্রকে কিছুটা সুবিধা দেয়, কিন্তু গণতন্ত্র ধ্বংস করে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করে; যা সরকারকে আখেরে বিপদে ফেলে। এই উপলব্ধি থেকেই গণতন্ত্রমনস্ক প্রবীণ ও বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্পাদকদের উদ্দেশে এ বক্তব্য দিয়েছেন। আমি মনে করি, তার বক্তব্যকে আমলে নিয়ে আমাদের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার পক্ষে বলিষ্ঠভাবে কাজ করা সময়ের অনিবার্য দাবি। বিশেষ করে ৩৬ জুলাইয়ের পর যে পরিবেশ সাংবাদিকরা পেয়েছে তা কাজে লাগিয়ে পেশাগত দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে দেশ ও জনগণের সেবায় আত্মনিয়োগ করা উচিত।
পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, ক্ষমতার পটপরিবর্তন হলেও বাংলাদেশের সাংবাদিকতার মূল মনস্তত্ত্বে এখনো বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি। অতীতে যারা এক সরকারের গুণকীর্তন করত, তারা আজ নতুন ক্ষমতার কাছাকাছি যাওয়ার জন্য একই পথ বেছে নিচ্ছে। সাংবাদিকতা যখন তার ‘ওয়াচডগ’ (পাহারাদার) ভূমিকা হারিয়ে ‘ল্যাপডগ’ (পোষা জীব) হয়ে যায়, তখন গণতন্ত্রের ভিত দুর্বল হতে বাধ্য। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা শুধু সরকারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে না, বরং সাংবাদিকদের নিজস্ব পেশাদারিত্ব ও তোষামোদী বর্জনের সৎ সাহসের ওপর নির্ভর করে। চাটুকারিতার এই সংস্কৃতি বন্ধ না হলে গণমাধ্যম তার বিশ্বাসযোগ্যতা পুরোপুরি হারাবে, যা আমাদের কারো কাম্য নয়।

আবু হামীম মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর হারুন ইবনে শাহাদাত

সম্পর্কিত খবর