নতুন গণতান্ত্রিক বন্দোবস্ত বহুদূর


২২ অক্টোবর ২০২৬ ১৬:২০

বহুমুখী চ্যালেঞ্জে সরকার, বিরোধীদল ও সংস্কার

॥ ফারাহ মাসুম ॥

বাংলাদেশ এক গভীর ও বহুমুখী রাজনৈতিক ক্রান্তিকালের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী কাঠামোর পতন ঘটার পর যে নতুন গণতান্ত্রিক বন্দোবস্তের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, ২০২৬ ক্কালের বর্তমান বাস্তবতায় তা এক কঠিন পরীক্ষামূলক পর্বে প্রবেশ করেছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হয় এবং তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য সংসদে প্রধান বিরোধীদলের আসনে অবতীর্ণ হয়েছে।
তবে নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার মধ্য দিয়ে ক্ষমতার হাতবদল ঘটলেও রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কার, জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার ক্রমবর্ধমান অনাস্থা, ধারাবাহিক রাজনৈতিক সহিংসতা, অর্থনৈতিক চাপ এবং আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক সমীকরণের বহুমুখী প্রভাব বর্তমান রাজনীতিকে অত্যন্ত জটিল করে তুলেছে। অভ্যন্তরীণ এই ক্ষমতার বিন্যাসের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক মহাশক্তিগুলোর কৌশলগত প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ, যা অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও বৈদেশিক সম্পর্কের মাঝের রেখাটিকে ক্রমান্বয়ে ঝাপসা করে দিচ্ছে।
তারেক রহমান সরকারের অভ্যন্তরীণ ও ভূরাজনৈতিক কৌশলগত অবস্থান : বর্তমান সরকারের সামনে একযোগে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান— যার মধ্যে রয়েছে নির্বাচনী ইশতেহার ও জনগণের প্রত্যাশার বাস্তবায়ন, অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা রোধ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ভেঙে পড়া জনআস্থা পুনরুদ্ধার। ২০২৪-পরবর্তী বাংলাদেশে সাধারণ মানুষ মূলত আইনের শাসন, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং দ্রব্যমূল্যের লাগাম টেনে ধরার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছে।
তবে সরকারের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার বাইরেও আঞ্চলিক ভূরাজনীতির এক গভীর ছায়া এর ওপর পড়ছে। গত ২০ অক্টোবর মঙ্গলবার রাজশাহীতে অনুষ্ঠিত এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অভিযোগ করেন যে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের একটি অংশ বিদেশে নিরাপদ আশ্রয়ে থেকে এবং বিদেশি তহবিলের ওপর নির্ভর করে দেশের ভেতরে অস্থিতিশীলতা তৈরির ষড়যন্ত্র করছে। তিনি কলকারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ উসকে দেওয়ার প্রচেষ্টার কথাও উল্লেখ করেন। ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই ধরনের বক্তব্য কেবল অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি ইঙ্গিত দেয় যে, ক্ষমতাচ্যুত রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক কিছু লবির গোপন যোগাযোগ বা কূটনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার আশঙ্কাকে সরকার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটি বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখছে।
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার এই পর্বে সরকারের বৈদেশিক নীতি ও ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের প্রশ্নটিও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের ভূরাজনীতিতে ভারত, চীন এবং পশ্চিমা বিশ্বের (যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন) প্রভাব দৃশ্যমান। বর্তমান সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হলো এই পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে পারস্পরিক সার্বভৌমত্ব, সমতা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক বজায় রাখা। বিশেষ করে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, ট্রানজিট করিডোর এবং বঙ্গোপসাগরের ভূকৌশলগত গুরুত্বের কারণে বাহ্যিক শক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক স্বার্থ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকে নানাভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন ও সাংবিধানিক সংস্কারের জটিলতা : বর্তমান রাজনৈতিক অঙ্গনের সবচেয়ে সংবেদনশীল ও তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বটি আবর্তিত হচ্ছে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের অব্যবহিত পর রাষ্ট্রে ক্ষমতার ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে, একচ্ছত্র নির্বাহী ক্ষমতার অবসান ঘটাতে এবং বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে যে সংস্কার প্রস্তাবগুলো উত্থাপিত হয়েছিল, তা আজ রাজনৈতিক মতবিরোধের প্রধান ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
২০২৫ সালের অক্টোবরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদের রূপরেখা এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটের রায়কে সাংবিধানিক রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকার ও প্রধান বিরোধীদলের মধ্যে পদ্ধতিগত বিরোধ দেখা দিয়েছে। সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত সংসদীয় বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গত ১৩ অক্টোবর স্পষ্টভাবে জানান যে, বিরোধীদল সংসদীয় কমিটিতে প্রতিনিধি না পাঠালেও এবং আলোচনা থেকে দূরে থাকলেও জাতির প্রত্যাশা পূরণে সরকার জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের কাজ থামিয়ে রাখবে না।
অন্যদিকে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান গত ১৯ অক্টোবর সোমবার এক আলোচনায় অভিযোগ করেন যে, নির্বাচনের পর সরকার জুলাই সনদের মৌলিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসছে। তার মতে, সরকার যদি গণভোটের রায়কে যথাযথ সম্মান দিয়ে আগে থেকেই ঐকমত্যের ভিত্তিতে পথ চলত, তবে আজ রাজপথে বা সংসদের বাইরে আন্দোলন বা উত্তেজনার পরিস্থিতি তৈরি হতো না।
এই সাংবিধানিক ও কাঠামোগত দ্বন্দ্ব কেবল অভ্যন্তরীণ আইনি লড়াই নয়; এর পেছনে রয়েছে ভবিষ্যতের রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক ও আদর্শিক রূপরেখা। পশ্চিমা বা উদার গণতান্ত্রিক তাত্ত্বিকরা যেখানে একটি শক্তিশালী সংসদীয় চেক অ্যান্ড ভারসাম্য বা দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থার ওপর জোর দিচ্ছেন, সেখানে দেশীয় রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতর ক্ষমতার কেন্দ্রীভূতকরণের পুরোনো প্রবণতা সংস্কার প্রক্রিয়াকে মন্থর করে দিচ্ছে।
বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং বিরোধীদলের কৌশল
বাংলাদেশের বর্তমান সংসদীয় রাজনীতিতে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক একটি নতুন মোড় নিয়েছে। অতীতে ফ্যাসিবাদবিরোধী দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলনে এই দুই শক্তি একমঞ্চে বা সমান্তরাল ধারায় লড়াই করলেও, বর্তমান সরকারের ক্ষমতারোহণের পর তাদের মধ্যে দূরত্ব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান স্পষ্টভাবে ঘোষণা দিয়েছেন যে, বর্তমান সরকার বিগত স্বৈরাচারের পথ ধরেই হাঁটছে এবং গত সাত মাসে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণের বা নিষ্ক্রিয় করার পুরোনো সংস্কৃতিতে ফিরে গেছে। তিনি আরও ঘোষণা করেন যে, সরকারের কাছ থেকে কোনো ফলপ্রসূ সহযোগিতা বা সংলাপের আশা না পেয়ে তারা সরাসরি ‘দেশের ১৮ কোটি মানুষের অধিকার আদায়ের পাহারাদার’ হিসেবে রাজপথ ও সংসদের লড়াই চালিয়ে যাবেন।
ভূরাজনৈতিক এবং আদর্শিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তির এই দূরত্ব বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন মেরুকরণের জন্ম দিচ্ছে। পশ্চিমা বিশ্ব ও আন্তর্জাতিক সমীকরণে বিএনপির একটি দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ও লবিং নেটওয়ার্ক কাজ করলেও, জামায়াতের ইসলামপন্থি আদর্শ ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে তাদের নিজস্ব কূটনৈতিক সমীকরণ রয়েছে। এই দুই দলের মধ্যকার ক্ষমতার দ্বন্দ্ব দীর্ঘস্থায়ী হলে তা কেবল সংসদীয় কার্যকারিতাকে পঙ্গু করবে না, বরং অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে বিদেশি অপশক্তিগুলো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আরও বেশি নাক গলানোর সুযোগ পাবে।
শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং আন্তর্জাতিক ফ্যাক্টর
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে পতন ঘটার পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিচারব্যবস্থার বিষয় নয়, এটি আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও ভূরাজনীতির একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গত ১৯ অক্টোবর সোমবার প্রকাশিত হালনাগাদ বাংলাদেশবিষয়ক প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান, মানবাধিকার লঙ্ঘন, রাজনৈতিক সহিংসতার চিত্র এবং পরবর্তী রাজনৈতিক দলগুলোর নিরাপত্তা ও কার্যক্রম নিয়ে বিশদ মূল্যায়ন করা হয়েছে। এই আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনগুলো প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক বিচার প্রক্রিয়া বিশ্ব সম্প্রদায়ের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছে।
আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনর্বাসন বা তাদের বিচার প্রক্রিয়াকে ঘিরে দেশের অভ্যন্তরে যেমন তীব্র আবেগ কাজ করছে, তেমনি আন্তর্জাতিক মহল থেকেও আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখার তাগিদ রয়েছে। দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে গিয়ে অপরাধের ব্যক্তিগত দায় নিশ্চিত করা এবং ঢালাও মামলা বা বিচারবহির্ভূত প্রতিশোধের পরিবর্তে একটি স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা না গেলে, তা দেশের গণতান্ত্রিক ভাবমর্যাদাকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করবে। একইসঙ্গে এটি আঞ্চলিক কূটনীতিতে এক ধরনের অস্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পারে, যা বহুপক্ষীয় সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
রাজনৈতিক সহিংসতা, ‘মব জাস্টিস’ ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার সংকট
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং রাজনৈতিক সহিংসতা বর্তমান সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। মানবাধিকার সহায়তা সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর ২০২৬ সময়কালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে দেশে ১,০১৩টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৭৩ জন নিহত এবং ৬,৪৭৩ জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। এর পাশাপাশি ৩৯৮টি গণপিটুনি ও সংঘবদ্ধ জনতার সহিংসতা বা ‘মব জাস্টিস’-এর ঘটনায় ১৮৭ জন নিহত হয়েছেন।
প্রতিবেদনের অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো— এই রাজনৈতিক সহিংসতার প্রায় ৯১ শতাংশই ঘটেছে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের (বিশেষ করে জামায়াত বা সমমনা জোট) মধ্যকার সংঘর্ষের জেরে। এছাড়া নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা, সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন ও পেশাগত বাধাদান এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর হামলার ঘটনা প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রক্ষমতার পালাবদল ঘটলেও তৃণমূল পর্যায়ে রাজনৈতিক সংস্কৃতির মৌলিক কোনো পরিবর্তন ঘটেনি।
অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার এই ভঙ্গুরতা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে তলানিতে ঠেকিয়ে দিচ্ছে। কোনো রাষ্ট্রে যখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রাজনৈতিক চাপে বা অভ্যন্তরীণ কোন্দলে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হয়, তখন অপরাধের সংস্কৃতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। এটি কেবল সামাজিক শান্তিকেই ধ্বংস করে না, বরং রাষ্ট্রের সার্বভৌম নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ঠেলে দেয়।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ এবং ভূ-অর্থনৈতিক প্রভাব
রাজনীতির মূল ভিত্তি কেবল রাজনৈতিক স্লোগান বা সাংবিধানিক বিতর্ক নয়; সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এর সবচেয়ে বড় নির্ধারক। বর্তমান সরকারের সামনে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের স্থিতিশীলতা রক্ষা, ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ উদ্ধার এবং তরুণ সমাজের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাহাড়সম চাপ রয়েছে।
ভূ-অর্থনৈতিক (এবড়বপড়হড়সরপং) প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতি গভীরভাবে বিশ্ববাজার, তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি বাজার, প্রবাসী আয় এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর (যেমন আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক) ঋণনীতির ওপর নির্ভরশীল। দেশের ভেতরে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও লাগাতার সংঘাত বজায় থাকলে বিদেশি ক্রেতারা বিকল্প বাজারের সন্ধান করতে পারে, যা দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাতকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলবে।
সরকার যদি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে ব্যর্থ হয় এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারে, তবে জনগণের পুঞ্জীভূত অসন্তোষ যেকোনো সময় বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। ফলস্বরূপ রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে তা যেকোনো গণতান্ত্রিক সরকারকে দ্রুত অজনপ্রিয় করে তুলতে পারে।
ভূরাজনৈতিক সমীকরণ : ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে হওয়ায় এটি বর্তমান বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে এক অত্যন্ত সংবেদনশীল জংশন। ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি (আইপিএস ), ভারত মহাসাগরে আধিপত্য বিস্তার এবং চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার কৌশলগত স্নায়ুযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূকৌশলগত ক্ষেত্র।
বর্তমান সরকারের আমলে বৈদেশিক নীতিতে ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়টি অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে ভারতের সঙ্গে ভূরাজনৈতিক ও সীমান্ত নিরাপত্তা সংক্রান্ত বহুমুখী সম্পর্ক; অন্যদিকে চীনের সঙ্গে মেগাপ্রজেক্ট, বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব এবং ঋণ ব্যবস্থাপনার কূটনীতি— এই দুই মহাশক্তির টানাপড়েনের মাঝে স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখা সরকারের দূরদর্শিতার বড় পরীক্ষা। এছাড়া বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক নিরাপত্তা, রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক সমাধান এবং মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের জেরে বাংলাদেশ সীমান্তে যে কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলায় জাতীয় ঐকমত্যের বিকল্প নেই।
আগামী দিনের রাজনৈতিক গতি-প্রকৃতি ও ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস
আগামী দিনে বাংলাদেশের রাজনীতি কোন পথে পরিচালিত হবে, তা মূলত নিচের কয়েকটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে—
জাতীয় ঐকমত্য ও সংলাপের সংস্কৃতি : সরকার ও প্রধান বিরোধীদলগুলোর মধ্যে ন্যূনতম জাতীয় ইস্যুতে বিশেষ করে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে কোনো কার্যকর সমঝোতা বা সংসদীয় সংলাপ প্রতিষ্ঠিত হয় কি না।
সহিংসতা দমন ও আইনের শাসন : রাজনৈতিক দলগুলো তাদের অঙ্গ সংগঠনগুলোর সহিংসতা ও ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর হয় কি না এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোনো রাজনৈতিক প্রভাব ছাড়া নিরপেক্ষভাবে অপরাধ দমন করতে পারে কি না।
বিচারিক স্বচ্ছতা ও মানবাধিকার : বিগত সরকারের আমলের মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বর্তমান সময়ের অপরাধগুলোর বিচার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রেখে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড রক্ষা করা।
অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার : মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নিম্নআয়ের মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন।
বহিঃশক্তির প্রভাব মোকাবিলা : আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক চাপের মুখে জাতীয় স্বার্থকে অক্ষুণ্ন রেখে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখা।
শেষকথা
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা অত্যন্ত সম্ভাবনাময় অথচ চরম মাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে ঐতিহাসিক সুযোগ দেশের জনগণের ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে, তা বৃথা যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। নির্বাচিত সরকার এবং বিরোধীদল উভয়েরই ঐতিহাসিক দায়িত্ব হলো দলীয় সংকীর্ণতা, পারস্পরিক আক্রোশ এবং আধিপত্যের রাজনীতি পরিহার করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, গণতান্ত্রিক ও আইনের শাসনভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনে আত্মনিয়োগ করা।
যদি সরকার কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার অহংকারে বিরোধীদের পাশ কাটিয়ে এককভাবে দেশ পরিচালনা করতে চায় এবং বিরোধীদলও যদি গঠনমূলক সমালোচনার বদলে সংঘাতের পথ বেছে নেয়, তবে তা দিনশেষে দেশের সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেই ধ্বংস করে দেবে। ভূরাজনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ বহুমুখী চ্যালেঞ্জের এই সংকটময় মুহূর্তে বিচক্ষণতা, সংলাপ, সহনশীলতা এবং জনগণের মৌলিক অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমেই কেবল বাংলাদেশ একটি টেকসই গণতান্ত্রিক ও স্থিতিশীল ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে পারে।