আজ শিক্ষাবিদ কাজী মোতাহার হোসেনের জন্মদিন

অনেকে শিখা গোষ্ঠীকে বাংলার মুসলিম নব জাগরনের উৎস ভেবে ভূল করেন


৩০ জুলাই ২০২৬ ১০:১৪

কাজী মোতাহার হোসেন

 শেখ নজরুল

আজ শিক্ষাবিদ কাজী মোতাহার হোসেনের জন্মদিন । সাতচল্লিশের পর এদেশে একদল মধ্যপন্থী-উদারপন্থী রাজনীতিবীদ ও চিন্তাবিদের আবির্ভাব হয় । যারা সমন্বয়পন্থী হিসাবেও পরিচিত। এ ধারার লেখক ও চিন্তাবিদেরাও পাকিস্তান আন্দোলন সমর্থন করেছিলেন। তারা মনে করেছিলেন মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে উপমহাদেশের সাম্প্রদায়িক সমস্যার সমাধান হবে। চিন্তা- চেতনায় এঁরা ছিলেন অনেকটা উদার এবং অসাম্প্রদায়িক। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সংখ্যালঘুদের প্রতি এঁরা সহনশীল মনোভাব পোষণ করেন এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পক্ষে ছিল তাঁদের অবস্থান। এ ধারার লেখক ও চিন্তাবিদেরা ভারতীয় সংস্কৃতি,রবীন্দ্র সাহিত্য, রবীন্দ্র সংগীত চর্চার পক্ষে ছিলেন। এ ধারার লেখক ও চিন্তাবিদদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, আবদুল ওদুদ, কাজী মোতাহার হোসেন, জসীমউদ্দীন, আহসান হাবীব, কমরুদ্দিন আহমেদ, সিকান্দর আবু জাফর, আবদুল গণি হাজারী, হাসান হাফিজুর রহমান, ফজল শাহাবুদ্দীন প্রমুখ।

তাজউদ্দীন আহমদকে এই ধারার রাজনৈতিক নেতা বলা যায়। তার নেতৃত্বে কলকাতায় বসে এই ধারাটি একাত্তরে বাংলাদেশ তৈরি করেছে।
‘মধ্যপন্থী’, ‘উদারপন্থী’ বা ‘সমন্বয়পন্থী’ হিসেবে এখানে যাদের কথা বলা হয়েছে, তারা মূলতঃ ছুপা-কমিউনিস্ট। সেই সময়টা তাদের প্রকাশ্যে আসার উপযুক্ত ছিল না। কুরআন, হাদিস, আল্লাহ্, রাসুল ও ইসলাম নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করলে, বিদ্বেষী মন্তব্য/কাজ করলে বর্তমানে যেমন এদেশে জামাই-আদর পাওয়া যায়, সেকালে পরিস্থিতি তেমন ছিল না। তখন এই ধরণের কিছু করলে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে পিঠের চামড়া তুলে নেয়ার ব্যবস্থা ছিল। তাই এইসব ছুপা’রা শিল্প-সংস্কৃতি-সাহিত্যের নামে কৌশলে মুুসলিম ও ইসলাম বিদ্বেষের বীজ বপন করে যান। বাঙালিত্বের নামে রবীন্দ্র সংগীত ও সাহিত্য চর্চা তথা সেক্যুলার সংস্কৃতির নামে হিন্দু সংস্কৃতি চালু করা তাদের বপন করা অনেকগুলো বীজের অন্যতম। এইসব বীজ আজ মহীরুহে পরিণত হয়েছে। তাইতো এদেশের মুুসলিমরা আজ স্বকীয়তা হারিয়ে বসেছে। দাড়ি-টুপি জঙ্গি’র প্রতীক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এদেরকে স্মরণীয় বরণীয় বা অনুসরণীয় মনে করা নিজ উদ্যোগে ইসলামি স্বকীয়তা বিসর্জন দেয়ার শামিল।

স্বাধীনতার পর মধ্যপন্থী ও কমিউনিস্ট ধারা অনেক কাছাকাছি হয় এবং তীব্র বাঙালি জাতীয়তাবাদী ধারার সূচনা করে, যা ক্রমে স্ফীত হয়ে একটি বৃহৎ অবয়ব ধারণ করেছিলো। এই সমন্বিত ধারার পথিকৃত ছিলেন কাজী মোতাহার হোসেন । তাঁর পুরো পরিবারই এদেশে ভারতীয় সংস্কৃতি বিস্তারের সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে । গত শতকের ত্রিশের দশকে ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে গঠিত হয় মুসলিম সাহিত্য সমাজ নামক একটি সংঘটন । এর সাথে জড়িত ছিলেন কাজী আবদুল ওদুদ,কাজী মোতাহার হোসেন,আবুল হুসেন,আবদুল কাদের আবুল ফজল প্রমুখ ।তাঁদের প্রচেষ্টার ফলশ্রুতিতে বাঙালি মুসলমানদের একাংশ ধর্মহীনতায় নিমজ্জিত হয়,হয় কমিউনিস্ট এবং জড়িয়ে যায় রাবীন্দ্রিক বৃত্তে । তাঁদের আদর্শ ছিল কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে তুরস্কের বুকে জন্ম নেওয়া নবজাগরণ।১৯২৯ সালে মুসলিম সাহিত্য সমাজের তৃতীয় বার্ষিক অধিবেশন শেষে গ্রহণ করা হয়েছিল সমাজ সংস্কারের পাঁচ দফা প্রস্তাব,তার একটা ছিল:এই সভা বাংগালী মুসলমান সমাজের নেতৃবৃন্দকে পর্দাপ্রথা দূরীকরণার্থে আদর্শ স্থাপন করিতে অনুরোধ জানাইতেছে। অথচ এই শিখা গোষ্ঠীকে বাংলার মুসলিম নব জাগরনের উৎস ভেবে ভূল করেন অনেকে। বেসিক্যালী এই গোষ্ঠীর আধুনিক সেক্যুলার চিন্তা কলকাতা কেন্দ্রিক সংস্কৃতির দ্বারা প্রভাবিত। এখনো বিভিন্ন বাংলা মিডিয়াম স্কুল কলেজের বইতে এদেরকে অনেক বেশী ফোকাস করা হয়। বাঙ্গালী মুসলিম বলতে এদেরকেই আদর্শ আকারে দেখানো হয়।
ইতিহাসে এই ব্যাপারটা ঘটে যাওয়ার পিছনে অন্যতম বড় কারন হচ্ছে, মুল মুসলিম সমাজের সংস্কৃতি এবং এর ধারক বাহক আলেমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের ফলে। সমাজের ক্ষমতা কেন্দ্র থেকে এবং জ্ঞানগত প্রক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়াটা শুধু এই ভারত উপমহাদেশে নয়, গোটা বিশ্ব জুড়ে উসমানী খিলাফতের পতনের পরে এমন বিচ্ছিন্নতা শুরু হয়।
আমাদের এই সময়টা খুব গুরুত্ত্বপূর্ন এই জন্যে যে, এই বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে উঠার জন্যে এখন আলেম-আধুনিক শিক্ষিত মিলে সামগ্রিক মুসলিম সচেতনতা তৈরি হচ্ছে বৈশ্বিক রাজনৈতিক ঘটনাবলীর প্রেক্ষাপটে। তাই এসব ঘোড়ারোগ কাটিয়ে উঠা সম্ভব। এসব প্রবনতা সঠিক ভাবে চিহ্নিত করন দরকার।

বিচারপতি আবদুল মওদুদ মধ্যবিত্ত সমাজের বিকাশ:সংস্কৃতির রূপান্তর গ্রন্থে মুসলিম সাহিত্য সমাজের মুখপত্র শিখা সম্পর্কে লিখেছেন:শিখার অধুনালব্ধ সংখ্যাগুলি পরীক্ষা করলে দেখা যায়,মুসলিম সাহিত্য সমাজের সাহিত্যচিন্তা বলতে প্রায় কিছুই ছিল না,কিন্তু সমাজ- চিন্তা ছিল ষোল আনা,এবং এ চিন্তাটা ছিল মুসলমান সমাজে জন্মলাভ করাটাই ভীষণ অপরাধ-বোধের মতো । দুঃস্থ অনগ্রসর সমাজের শোচনীয় অবস্থার কারণগুলি কি,সেসবের অনুসন্ধান এবং সেসব দূরীকরণমানসে বাস্তব কর্মপন্হা,অনুশীলনের উদ্যম এ সমাজের কারও ছিল না,ছিল সমাজটাকেই দায়ী করে তার নির্মম সমালোচনাতে মুখর হওয়ার প্রবণতা । এই সহানুভূতিহীন নির্মমতা ও মুসলমানের শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিদের,এমনকি বিশ্বনবীরও বিরুদ্ধে অশোভন,অসংযত ও অশ্রদ্ধ উক্তিসমূহের জন্যেই তৎকালীন ঢাকার মুসলমান সমাজ বিরূপ হয়ে উঠে ছিল সাহিত্য সমাজের প্রতি । তথ্যসূত্র: মধ্যবিত্ত সমাজের বিকাশ:সংস্কৃতির রূপান্তর-বিচারপতি আবদুল মওদুদ,পৃষ্ঠা৩২৭ । ( উৎস:  হোয়াটস অ্যাপ গ্রুপ.বাংলা সাহিত্য পরিষদ)

বাংলা সাহিত্য পরিষদ শিক্ষাবিদ কাজী মোতাহার হোসেন শেখ নজরুল

সম্পর্কিত খবর