সরকারি সেবায় দালালনির্ভরতা : উত্তরণ কোন পথে?


২৯ অক্টোবর ২০২৬ ১৬:০৭

॥ সৈয়দ খালিদ হোসেন ॥
সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে রোগীকে ছুটতে হয় বাইরের ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। পাসপোর্ট করতে গিয়ে কেউ খোঁজেন ‘পরিচিত লোক’, জমির নামজারি করতে গিয়ে কেউ ধরেন মুহুরি বা দালালের হাত। থানায় অভিযোগ, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে প্রশাসনিক সেবা কিংবা জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয়ে ফাইলের অগ্রগতি— বিভিন্ন ক্ষেত্রে সেবা পেতে তদবিরের লাগে, কখনো কখনো গুনতে হয় বাড়তি টাকা। অর্থাৎ সরকারি প্রায় সব দপ্তরে সেবা পেতে দালালনির্ভর হতে হচ্ছে নাগরিকদের। সরকারি সেবায় জটিলতা, তথ্যের ঘাটতি, জবাবদিহির দুর্বলতা এবং অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে প্রতিনিয়তই হয়রানি ও ভোগান্তিতে পড়েন সেবাগ্রহীতারা। কোথাও কোথাও সেবাগ্রহীতার অসহায়ত্বকে পুঁজি করে গড়ে উঠেছে অনিয়ম আর দালাল চক্রের নেটওয়ার্ক।
হাসপাতালে দালালের দৌরাত্ম্য
সরকারি হাসপাতালের বহির্বিভাগ, জরুরি বিভাগ কিংবা পরীক্ষাগারের আশপাশে রোগীর স্বজনদের লক্ষ করে একশ্রেণির মধ্যস্থতাকারী কাজ করে। তারা কখনো নিজেদের হাসপাতালের লোক, কখনো চিকিৎসকের সহকারী, আবার কখনো দ্রুত চিকিৎসা পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে পারেন বলে পরিচয় দেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগীকে বেসরকারি ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া এবং সেখানে চিকিৎসা করানোর বিনিময়ে কমিশন পাওয়ার ঘটনাও ঘটে অহরহ। এতে শুধু রোগীর অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, প্রয়োজনের অতিরিক্ত পরীক্ষা বা অনুপযুক্ত চিকিৎসার ঝুঁকিও তৈরি হয়।
সরেজমিন দেখা যায়, ঢাকার সবচেয়ে বড় চিকিৎসালয় বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (সাবেক পিজি হাসপাতাল)। সেখানে প্রতিদিনই নিয়ম করে ডিউটি করেন দালালরা। দালাল থেকে দূরে থাকতে পিজি হাসপাতালে নিয়োজিত আনসাররা যখন নিয়ম করে মাইকিং করেন, তখন আনসারদের আশপাশেই ঘোরাফেরা করে দালাল চক্র। তাদের একজনের নাম পলাশ। এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় এই তরুণ দালালের। তিনি জানান, অনেক রোগী লাইনে দাঁড়িয়ে ডাক্তার দেখানোর জন্য প্রথমে টিকিট নিতে হয় ত্রিশ টাকা দিয়ে। এতে অনেক সময় আধাঘণ্টা বা তার চেয়ে বেশি সময়ও লেগে যায়। কিন্তু আমরা সে কাজটি করে দিতে পারি মাত্র দুই/চার মিনিটের মধ্যে। এজন্য রোগী বা তার স্বজনের কাছ থেকে নিই একশ’ টাকা। এখানে আমাদের থাকে ৭০ টাকা। ত্রিশ টাকা অনলাইনে সরকারি ফান্ডে জমা দিতে হয়। রোগীরা চাইলে নিজেরাও অনলাইনে টিকিট নিতে পারেন। কিন্তু অনেকেই সেই নিয়ম জানেন না, ফলে সহজে টিকিট সংগ্রহ করতে আমাদের দ্বারস্থ হন। দিনে কী পরিমাণ রোগী আপনাদের কাছে আসে, এমন প্রশ্নের উত্তরে এই দালাল জানান, কত মানুষ আমাদের কাছে আসেন, তার হিসাব নেই। তবে একেকজনের কাছে একশ’র বেশি লোকও আসেন। দৈনিক একজন দালাল একশ’ রোগীকে টিকিট পাওয়ার সেবা দিয়ে দৈনিক তার আয় হয় সাত হাজার আর মাসে দুই লাখ ১০ হাজার টাকা। এভাবে পরীক্ষার রিসিট কাউন্টার, ব্যাংক কাউন্টার ও প্যাথলজির সিরিয়াল থেকে শুরু করে ডাক্তারের সিরিয়াল পর্যন্ত দালাল চক্র সক্রিয় রয়েছে। মাঝেমধ্যে সরকারি হাসপাতালে দালালবিরোধী অভিযান চালানো হয়, কিন্তু এরা নির্মূল হয় না। কয়েকদিন নীরব থেকে আবার ফিরে পূর্বের কর্মে।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে এ প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে পিজি হাসপাতালে দালাল চক্রের অপতৎপরতা প্রসঙ্গে কথা বলতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি তার ব্যক্তিগত ফোন রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দিলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি। তার সরকারি ফোন নম্বর ও পিএসের সরকারি নম্বরে কল দিয়েও কথা বলা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম ফরহাদ হোসেন বলেন, দালাল চক্র বন্ধে আপনাদের (সাংবাদিক) পরামর্শ দরকার।
জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. সাজ্জাদুর রহমান বলেন, সরকারি হাসপাতালে দালাল চক্র একটি ভয়াবহ সমস্যা। সরকারি হাসপাতাল থেকে দালালের মাধ্যমে রোগী বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়ার অভিযোগও এসেছে। এই দালাল চক্র ঠেকাতে হলে রোগীদের সচেতন করতে হবে। হাসপাতালের সক্ষমতা ও ডায়াগনস্টিক সুবিধা বাড়াতে হবে, গোপন নজরদারির পাশাপাশি দালালদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মির্জা জিয়াউল ইসলাম বলেন, হাসপাতাল থেকে দালালরা রোগী ভাগিয়ে নেওয়ার ঘটনায় কঠোর শাস্তি হওয়া উচিত। এক্ষেত্রে আইনের যথাযথ প্রয়োগ জরুরি। চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ডা. লিয়াকত আলী বলেন, বিকল্প ও মানসম্মত সরকারি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত না করলে দালালদের তৎপরতা বারবার ফিরে আসবে।
পাসপোর্ট অফিসে দালাল ছাড়া সেবা মেলে না কেন?
পাসপোর্ট অফিসে নিয়মিত দালালি করেন জুয়েল রানা। গত ২৭ অক্টোবর মঙ্গলবার সকালে জুয়েল রানার সাথে কথা বলেন এ প্রতিবেদক। এ সময় তিনি জানান, পাসপোর্ট অফিসে নিয়মিত কাজ করেন তিনি, ১০ বছর মেয়াদি ই-পাসপোর্ট করতে সরকারি ফি ৫৯০০ টাকা, তাকে দিতে হবে ৮৫০০ টাকা। সাথে আনতে হবে আগের পাসপোর্ট ও জাতীয় পরিচয়পত্র। ২১ দিনের মধ্যে পাসপোর্টের বই হাতে পাওয়ার কথা থাকলেও তার মাধ্যমে কাজ করালে আরও কম সময় লাগবে। পাসপোর্ট সেবায় দালালনির্ভরতা সবচেয়ে বেশি। আবেদনপত্র পূরণ, কাগজপত্র যাচাই, পুলিশি যাচাই কিংবা দ্রুত পাসপোর্ট পাওয়ার আশ্বাস দিয়ে বাড়তি অর্থ আদায় করেন দালালরা। অনুসন্ধানে জানা যায়, পাসপোর্ট অফিসের কিছু কর্মকর্তা, বাইরের দালাল এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পক্ষের যোগসাজশে একাধিক চক্র গড়ে উঠেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের অভিযানেও বিভিন্ন পাসপোর্ট কার্যালয়ে অনিয়ম ও দালালদের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। দালালরা ফরম পূরণ থেকে শুরু করে দ্রুত পাসপোর্ট তৈরি করে দেওয়ার প্রলোভনে টাকা নেয়। ফরম পূরণ প্রক্রিয়া, সম্ভাব্য ত্রুটি, সংশোধনের নিয়ম এবং আবেদন কোন পর্যায়ে আছে, এসব বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য না পেয়ে মধ্যস্থতাকারীর ওপর নির্ভর করেন অনেকে।
সচিবালয়ে ফাইলের গতি বাড়ায় তদবির বাণিজ্য
সচিবালয় ও বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে ফাইল নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে নিয়মিত প্রক্রিয়ার পাশাপাশি ব্যক্তিগত যোগাযোগ বা প্রভাব খাটানোর অভিযোগ দীর্ঘদিনের। কোনো অনুমোদন, পদায়ন, বরাদ্দ কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের জন্য সংশ্লিষ্ট শাখায় যোগাযোগ করা বৈধ কাজের অংশও হতে পারে। কিন্তু নিয়মের বাইরে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ দাবি বা প্রভাবশালী ব্যক্তির সুপারিশকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ঘটনা ঘটলে তা তদবির বাণিজ্যে পরিণত হয়। সচিবালয়ে অনেক সময়ই ফাইল আটকে থাকে দীর্ঘদিন। যারা জোরালো তদবির করতে পারেন তারা কার্যসম্পাদন করতে পারেন আর যারা তদবির করাতে না পারেন, তারা আটকে থাকেন দিন মাস বা বছরের পর বছরও। তেমনি একটি ঘটনার উদাহরণ তুলে ধরা যাক। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় অনলাইন নিউজ পোর্টালের নিবন্ধন দিয়ে থাকে। নিয়মত হচ্ছে মন্ত্রণালয়ের সরকারি ওয়েবসাইটে থাকা ফরণ পূরণ করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আবেদন করা। অবেদন করার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পাঠানো হয় নানা বিষয়ে তদন্ত করতে। তদন্ত শেষ হওয়ার পর সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে পুলিশের বিশেষ শাখা থেকে এনওসি (অনাপত্তিপত্র) দেওয়া হয়। সেই এনওসির আলোকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয়। সেই চিঠির আলোকে ওই নিউজ পোর্টালের ফাইলটি চূড়ান্ত করে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়। একচর স্বত্বাধিকারীকে ডেকে সনদ দেওয়ার নিয়ম। কিন্তু সব প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে এসে আর সনদ হয় না তদবির বা দালালের হস্তক্ষেপ না থাকলে। অনেকই লাখ লাখ টাকা খরচ দালালের মাধ্যমে এই সনদ হাতে পেয়েছেন। যারা টাকা ব্যয় করতে পারেনি তারা সনদ পায়নি। এই প্রতিবেদকের কাছে আসা অভিযোগে জানা গেছে, মাহফুজ আলম তথ্য উপদেষ্টা থাকার সময় একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালের ফাইল চূড়ান্ত অনুমোদন হয়েছে। কিন্তু সেটি আর আলোর মুখ দেখেনি। পোর্টালের মালিকপক্ষ উপদেষ্টার এক আত্মীয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলে জানা যায়, এতে মোটা অংকের টাকা লাগবে। পক্ষটি বাধ্য হয়ে দুই লাখ টাকা দিতে রাজিও হয়েছিলেন, কিন্তু এতে কাজ হয়নি— উপদেষ্টার কাছের লোকের পক্ষ থেকে তখন বলা হয় দুই লাখ টাকা উপদেষ্টার পিএসও খায় (এত কম টাকা নেন না) না। সেই ফাইল এখনো পড়ে আছে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে। অনেক মন্ত্রণালয়ের পরিস্থিতি প্রায় একই। ফলে তদবির করাতে না পারলে মাসের পর মাস পড়ে থাকে ফাইল। সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞরা বলছেন, সরকারি দপ্তরে ফাইলটি কার কাছে আছে, কতদিনে নিষ্পত্তি হওয়ার কথা এবং বিলম্বের কারণ কী— এসবের স্বচ্ছ রেকর্ড না থাকায় দালাল ও তদবিরবাজরা অনিয়ম করার সুযোগ পান।
থানায় সেবা পেতেও মধ্যস্থতাকারীর আশ্রয়
থানায় অভিযোগ গ্রহণ, সাধারণ ডায়েরি (জিডি), মামলা-সংক্রান্ত যোগাযোগ কিংবা তদন্তের অগ্রগতি জানতে গিয়ে হয়রানি ও অনানুষ্ঠানিক অর্থ লেনদেনের অভিযোগ পাওয়া যায়। ভুক্তভোগী যখন আইনগত অধিকার সম্পর্কে অনিশ্চিত থাকেন, তখন পরিচিত ব্যক্তি বা মধ্যস্থতাকারীর সহায়তা নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে ভোলা-৩ আসনের সংসদ সদস্য মেজর (অব.) জসিম উদ্দিনের ঘনিষ্ঠ একজন কর্মী লালমোহন থানার দালালি শুরু করেন। এমপির ঘনিষ্ঠ হওয়ায় তার কথায় তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সবকিছুই করতেন। একপর্যায়ে স্থানীয়রা তাকে লালমোহলের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলে ডাকতেন।
ইউএনও-ডিসি কার্যালয়ে দালালির বিস্তার
ইউএনও ও ডিসি কার্যালয়ে ভূমি প্রশাসন, বিভিন্ন প্রত্যয়ন, সরকারি সহায়তা এবং প্রশাসনিক আবেদন সংক্রান্ত সেবা দেওয়া হয়। এসব সেবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিয়ম জানা না থাকা, কাগজপত্রের জটিলতা এবং ফাইলের অগ্রগতি সম্পর্কে অনিশ্চয়তা মানুষকে বাইরের সহায়তা নিতে উৎসাহিত করে। ফলে এসব দপ্তরে দালাল চক্র গড়ে ওঠে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে কুমিল্লার তিতাস ইউএনও কার্যালয়ের এক কর্মচারীর ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ সংক্রান্ত ভিডিও ভাইরাল হয়। ২০২৬ সালের আগস্টে রাজবাড়ীর কালুখালী ইউএনও কার্যালয়ের এক প্রশাসনিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও টাকা নেওয়ার অভিযোগ প্রকাশিত হয়।
ভূমি ও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দালালনির্ভরতা
জমির নামজারি, খতিয়ান ও রেকর্ড সংগ্রহ, জরিপ এবং দলিল নিবন্ধন— প্রতিটি ধাপে কাগজপত্র ও আইনগত প্রক্রিয়া বুঝতে হয়। এই জটিলতাই অনেক ক্ষেত্রে মুহুরি, দলিল লেখক ও অন্যান্য মধ্যস্থতাকারীর ওপর নির্ভরতা বাড়ায়। তাদের মধ্যে বৈধ পেশাজীবী যেমন আছেন, তেমনি দালাল চক্রও রয়েছে। টিআইবির ২০২৩ সালের জাতীয় খানা জরিপে ভূমিসেবা নিতে গিয়ে দালালের মাধ্যমে সেবা নিতে বাধ্য হওয়ার কথা বলেছেন ৯ দশমিক ৭ শতাংশ সেবাগ্রহীতা পরিবার। একই জরিপে ভূমিসেবায় দুর্নীতির অভিজ্ঞতা, অননুমোদিত অর্থ প্রদানের বিষয় উঠে এসেছে। ২০২৬ সালের মে মাসে ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রেশন প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও ঘুষ-বাণিজ্যের অভিযোগ এনে আইন মন্ত্রণালয়ে লিখিত আবেদন করেন ভুক্তভোগীরা। নামজারি ও নিবন্ধনের নির্ধারিত ফি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, আবেদন নিষ্পত্তির সময় এবং আপিলের পদ্ধতি প্রতিটি কার্যালয়ে বোর্ডের মাধ্যমে প্রকাশ করা থাকলে অনিয়মের জায়গা সংকুচিত হবে।
দালাল তৈরি হয় কীভাবে : সরকারি সেবার দুর্বলতা কোথায়?
দালালনির্ভরতার পেছনে কয়েকটি সাধারণ কারণ কাজ করে। জটিল নিয়ম, অস্পষ্ট ফি, দীর্ঘসূত্রতা, তথ্যের অভাব এবং অভিযোগ করেও প্রতিকার না পাওয়ার আশঙ্কা। কোন সেবা পেতে কতদিন লাগবে, আবেদন কেন আটকে আছে কিংবা ভুল সংশোধনের নিয়ম কী— এসবের উত্তর না পেলে মানুষ এমন কাউকে খোঁজেন, যিনি ‘ভেতরের খবর’ জানেন। টিআইবির জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫ অনুযায়ী, ৫৩ দশমিক ৩ শতাংশ পরিবার দুর্নীতির অভিযোগ জানানোর পদ্ধতি সম্পর্কে জানত না। সরকারি অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থার (জিআরএস) বিষয়ে জানত মাত্র ১ দশমিক ৪ শতাংশ পরিবার। অর্থাৎ দালাল শুধু সেবার দুর্বলতা থেকে তৈরি হন না; জবাবদিহির ঘাটতি ও প্রতিকার পাওয়ার অনিশ্চয়তাও তার বাজার তৈরি করে।
দালাল চক্রের পেছনে কারা, অর্থের ভাগ যায় কোথায়?
দালাল চক্রের কার্যক্রমে বাইরের অসাধু কর্মচারী এবং সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশ থাকতে পারে। হাসপাতালের ক্ষেত্রে রোগী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পাঠানোর কমিশন, আর প্রশাসনিক সেবায় দ্রুত কাজ করিয়ে দেওয়ার নামে অর্থ আদায় করে দালালরা। অনেক ক্ষেত্রে অর্থের ভাগ পান সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
ডিজিটাল সেবা চালুর পরও দালালনির্ভরতা কেন?
অনলাইন আবেদন, ডিজিটাল পেমেন্ট ও আবেদন ট্র্যাকিং চালু হলেও পুরো প্রক্রিয়া ডিজিটাল না হলে মধ্যস্থতাকারীর প্রয়োজন থেকেই যায়। ফলে শুধু ওয়েবসাইট চালু নয়, আবেদন থেকে নিষ্পত্তি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের ডিজিটাল রেকর্ড, স্বয়ংক্রিয় সময়সীমা, নিরাপদ অভিযোগব্যবস্থা এবং নাগরিককে সরাসরি তথ্য দেওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
দালালনির্ভরতা থেকে মুক্তির পথ? কী পরিবর্তন জরুরি?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিটি সেবার খরচ, প্রয়োজনীয় নথি এবং নিষ্পত্তির সময় অফিসে ও অনলাইনে দৃশ্যমান রাখতে হবে। হাসপাতাল, পাসপোর্ট ও ভূমি অফিসে প্রশিক্ষিত কর্মীর মাধ্যমে আবেদন ও তথ্যসহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি এবং অভিযোগকারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু বাইরের দালাল নয়, প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, কর্মচারী ও সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। সেবার বিলম্ব, অননুমোদিত অর্থ আদায় এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির তথ্য প্রকাশ করে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক জবাবদিহি গড়ে তুলতে হবে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, সেবা খাতগুলোর মধ্যে পাসপোর্ট দুর্নীতি ও ঘুষে প্রথম এবং বিআরটিএ দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। পাসপোর্ট সেবায় সর্বোচ্চ ৮৪.৪ শতাংশ গ্রাহক দুর্নীতির এবং ৭৬.৬ শতাংশ ঘুষের শিকার হয়েছেন; অন্যদিকে বিআরটিএতে এই দুর্নীতির হার ৭৯.৩ শতাংশ। এ তালিকায় দুর্নীতি ও ঘুষে যথাক্রমে ষষ্ঠ ও অষ্টম অবস্থানে আছে স্বাস্থ্য খাত।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এ প্রসঙ্গে বলেন, সরকারি অফিসে দালালরা একা দুর্নীতি করতে পারে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এই দালাল চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকে। তিনি মনে করেন, কেবল মাঝে মাঝে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে বা দু-চারজন দালালকে আটক করে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন করা। পাশাপাশি নাগরিকদেরও সচেতন হওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।