সাংস্কৃতিক সংগ্রাম : আমাদের অস্তিত্বের রক্ষাকবচ


১৫ মে ২০২৬ ২১:১৮

॥ মুহাম্মদ আবুল হুসাইন ॥
সংস্কৃতি কোনো স্থবির জলাশয় নয়, বরং এটি একটি প্রবহমান নদী। বাঙালি সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এ কথাটি আরও বেশি সত্য। হাজার বছরের বিবর্তন, সংমিশ্রণ এবং সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে আমাদের এই অনন্য জীবনবোধ। কিন্তু বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাঙালি সংস্কৃতির স্বরূপ এবং এর রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে নতুন করে কাটাছেঁড়া করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা (Cultural Authenticity) রাজনৈতিক বা ভৌগোলিক স্বাধীনতার মূল ভিত্তি। এটি জনগণের মধ্যে ঐক্যচেতনা ও স্বাতন্ত্র্যবোধ জাগিয়ে তোলে, যা একটি জাতিরাষ্ট্রের আত্মপরিচয়ের ভিত্তিকে শক্তিশালী করে। স্বকীয়তা (Authenticity/Individuality) মানে নিজের বৈশিষ্ট্য, গুণ ও সত্তাকে চেনা ও প্রকাশ করা, যা আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদা বাড়ায়; অন্যদিকে হীনম্মন্যতা (Inferiority Complex) হলো নিজেকে অপরের চেয়ে কম যোগ্য, অপর্যাপ্ত বা অযোগ্য ভাবা, যা আত্মসম্মান কমিয়ে দেয় এবং অন্যদের অনুকরণে বাধ্য করে। বিশেষ করে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন যখন রাজনৈতিক আধিপত্যবাদের হাতিয়ার হয়ে উঠছে, তখন সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা বজায় রাখা রাজনৈতিক স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রয়োজনেই অপরিহার্য হয়ে ওঠে। কারণ আধিপত্যবাদী শক্তি সাংস্কৃতিক আগ্রাসনকে সবসময় হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করে। যখন সরাসরি রাজনৈতিক আগ্রাসন চালানো সম্ভব হয় না, তখনই কৌশল হিসেবে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনকে বেছে নেয়া হয়।
বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো একটি ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায়, যা তিন দিক থেকে এক বিশাল প্রতিবেশীর দ্বারা বেষ্টিত, সেখানে সংস্কৃতি কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়; বরং এটি আমাদের সার্বভৌমত্বের অতন্দ্রপ্রহরী।
আজকের প্রেক্ষাপটে বাংলা নববর্ষ উদযাপন এবং আমাদের সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের স্বরূপটি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
মানচিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, পূর্ব বাংলা বা বর্তমান বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে ভারতের বিশালত্বের ভেতরে অবস্থিত। কিন্তু বিস্ময়কর সত্য হলো, প্রাচীনকাল থেকেই এ অঞ্চলের অনার্য অধিবাসীরা উত্তর ভারতের পৌত্তলিক সংস্কৃতি বা বর্ণপ্রথাকে পুরোপুরি গ্রহণ করেনি। বরং তারা তাদের স্বতন্ত্র জীবনবোধ ও ধর্মীয় চেতনা নিয়ে টিকে আছে। এই টিকে থাকার মূল কারণ হলো আমাদের সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা। পূর্ববঙ্গের মানুষের এই স্বতন্ত্রবোধই বিশাল ভারতের পাশে থেকেও একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর নৈতিক শক্তি জুগিয়েছে।
পূর্ববঙ্গের মানুষের মানস গঠনে প্রাচীনকাল থেকেই একটি সূক্ষ্ম একেশ্বরবাদী চেতনা বিদ্যমান ছিল। পরবর্তীতে ইসলামের আগমনে সেই চেতনা পূর্ণতা পায়। আরবের মরুভূমি বা পারস্যের আভিজাত্য নয়, বরং এদেশের সুফি-সাধকদের মরমী দর্শনে সিক্ত ইসলাম বাঙালির প্রাণের ধর্মে পরিণত হয়েছে। এই একেশ্বরবাদী ও সাম্যবাদী চেতনা আমাদের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের বহুত্ববাদী পৌত্তলিক সংস্কৃতি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা একটি পরিচয় দান করেছে। এই স্বতন্ত্রবোধই আমাদের রক্ষাকবচ, যা আমাদের অন্য কোনো বৃহত্তর সাংস্কৃতিক বলয়ে লীন হয়ে যেতে বাধা দেয়।
বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ বাঙালির প্রাণের উৎসব। কিন্তু সাম্প্রতিক দশকগুলোয় এই উদযাপনের ধরনে এক ধরনের বিজাতীয় অনুপ্রবেশ লক্ষ করা যাচ্ছে। বিশেষ করে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ বা মূর্তিনির্ভর বিভিন্ন প্রতীকের বাড়াবাড়ি অনেক সময় সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম মানসের ঐতিহ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
নববর্ষের আদি রূপ ছিল হালখাতা, মেলা এবং সামাজিক সম্প্রীতি। সেখানে কোনো ধর্মীয় বিভেদ ছিল না, কিন্তু ছিল এক ধরনের লৌকিক পবিত্রতা। বর্তমানের যান্ত্রিক ও মূর্তিনির্ভর উদযাপন যদি আমাদের আদি একেশ্বরবাদী চেতনাকে আঘাত করে, তবে তা সাংস্কৃতিক স্বকীয়তাকে দুর্বল করে দিতে পারে। মনে রাখতে হবে, আমাদের উৎসবগুলো যদি পাশের দেশের কোনো বিশেষ অঞ্চলের উৎসবের কার্বন কপি হয়ে দাঁড়ায়, তবে আমরা আমাদের স্বতন্ত্র জাতিসত্তার আবেদন হারিয়ে ফেলব।
সাংস্কৃতিক লড়াই : হীনম্মন্যতা বনাম আত্মমর্যাদা
বর্তমান যুগের সবচেয়ে বড় যুদ্ধটি হচ্ছে ‘সাংস্কৃতিক যুদ্ধ’। আকাশ সংস্কৃতির মাধ্যমে ভিনদেশি রীতিনীতি যখন আমাদের ঘরে ঢুকে পড়ছে, তখন একশ্রেণির মানুষের মধ্যে এক ধরনের সাংস্কৃতিক হীনম্মন্যতা তৈরি হচ্ছে। তারা মনে করছেন, বিজাতীয় অনুকরণই বোধ হয় আধুনিকতা। কিন্তু সত্য হলো, অনুকরণে কখনো স্বাধীনতা থাকে না।
আমাদের লড়াইটা আজ সেই হীনম্মন্যতার বিরুদ্ধে। যদি আমরা আমাদের নিজস্ব ধর্মীয় মূল্যবোধ, ভাষা এবং স্বতন্ত্র লৌকিক ঐতিহ্যকে আধুনিকতার মোড়কে উপস্থাপন করতে না পারি, তবে আমাদের ভৌগোলিক স্বাধীনতাও অর্থহীন হয়ে পড়বে। ভারতের সাংস্কৃতিক আধিপত্য বা ‘সফট পাওয়ার’ থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হলো আমাদের নিজস্ব ‘সাংস্কৃতিক প্রতিরক্ষা’ দেয়ালটিকে মজবুত করা।
পূর্ব বাংলা ও পশ্চিমবঙ্গের ভাষা এক হলেও ধর্মবোধ ও জীবনদর্শন সম্পূর্ণ ভিন্ন। এ ভিন্নতাই বাংলাদেশ সৃষ্টির মূল কারণ। যে জাতি তার স্বতন্ত্রবোধ হারিয়ে ফেলে, মানচিত্র থেকে তার অস্তিত্ব মুছে যেতে সময় লাগে না। পহেলা বৈশাখ বা নবান্নের মতো উৎসবগুলো তখনই সার্থক হবে, যখন সেগুলো আমাদের জাতীয় সংহতিকে শক্তিশালী করবে এবং আমাদের স্বতন্ত্র পরিচয়কে বিশ্বদরবারে তুলে ধরবে।
বাঙালি সংস্কৃতি কোনো আমদানিকৃত পণ্য নয়, এটি এদেশের মাটির নির্যাস। আমাদের উৎসবগুলোয় যদি আমাদের ঈমানি চেতনা এবং লৌকিক ঐতিহ্যের প্রতিফলন ঘটে, তবেই তা সত্যিকারের উৎসবে পরিণত হবে। ভারতের বিশাল ভূখণ্ডের চাপে পিষ্ট না হয়ে আমরা যে আজও স্বাধীন, তার একমাত্র কারণ আমরা আমাদের স্বকীয়তা বিসর্জন দেইনি। এই সাংস্কৃতিক লড়াই জারি রাখাই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও সার্বভৌম বাংলাদেশ নিশ্চিত করার একমাত্র পথ।