সম্পাদকীয়

ঈদুল ফিতর হোক উম্মাহর নতুন শপথের দিন

প্রিন্ট ভার্সন
১৭ মার্চ ২০২৬ ১১:০০

সম্পাদকীয়

দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর খুশির সওগাত নিয়ে আমাদের মাঝে ফিরে এসেছে পবিত্র ঈদুল ফিতর। ‘সাপ্তাহিক সোনার বাংলা’র পক্ষ থেকে দেশ-বিদেশের সকল লেখক, সাংবাদিক, পাঠক, বিজ্ঞাপনদাতা, এজেন্ট ও শুভানুধ্যায়ীদের জানাই ঈদ মোবারক।
ঈদ উৎসবের আগে আমরা এক মাস সিয়াম পালনের মাধ্যমে আল্লাহভীতি অর্জনে সচেষ্ট ছিলাম। পবিত্র কুরআনের ভাষায়, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ওপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।’ সূরা বাকারা : ১৮৩।
এক্ষেত্রে আল্লাহর একজন বান্দা কতটা সফল হয়েছেন বা তার জীবনে আল্লাহর প্রত্যাশার বাস্তবায়ন ঘটাতে পেরেছে, তা প্রমাণ হবে বছরের বাকি ১১ মাস তার জীবনযাপনে। আল্লাহর নির্দেশের এক মাস সুবহে সাদিক থেকে নিয়ে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহারসহ অনেক হালাল কাজ থেকে বিরত থেকেছি। এর মাধ্যমে আত্মসংযম ও তাকওয়া (আল্লাহর ভয়ে তার নির্দেশ পালন এবং নিষেধ থেকে বিরত থাকার যোগ্যতা) কতটা অর্জিত হয়েছে, সেই পরীক্ষা শুরু হবে আজ থেকে। যারা এতে সফল হবেন, সিয়াম সাধনা বা রোজা পালনের পুরোপুরি সার্থকতা তাদের জন্য। মাহে রমজান আত্মসংযম ও ত্যাগের শিক্ষা দেয়। এর মাধ্যমে আত্মার উন্নতির সাথে সাথে শরীরও নতুন উদ্যম লাভ করে। জাপানি জীববিজ্ঞানী ইয়াশিনোরি ওহসুমি সিয়াম সাধনা নিয়ে গবেষণা করে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন মাহে রমজানে দিনের বেলায় যখন একজন মানুষ পানাহার থেকে বিরত থাকে, তখন শরীরে অটোফেজি প্রক্রিয়া শুরু হয়। এর মাধ্যমে শরীর অপ্রয়োজনীয় ও ক্ষতিকর কোষগুলো নিজেই নিজে ধ্বংস করে বা খেয়ে ফেলে। অনেকটা কম্পিউটারের রিসাইকেল বিনের মতো। কম্পিউটার যেমন রিসাইকেল বিনের পর নতুন গতি পায়, মানবশরীরও তেমন নতুন গতি লাভ করে। এভাবে শুধু শরীর দেহ নয়, মন এবং আত্মারও পরিশুদ্ধি ঘটে। আল্লাহর সাথে সম্পর্ক বাড়ে। দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ লাভের উপযোগী প্রশান্ত হয় মানবাত্মা।
ইসলামের দৃষ্টিতে ঈদের আনন্দ কেবল ব্যক্তিগত নয়, বরং তা সামষ্টিক। রমজানের প্রশিক্ষণ আমাদের যে ‘তাকওয়া’ বা খোদাভীতি শিখিয়েছে, তার প্রতিফলন ঘটাতে হবে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে। ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে বিত্তবানদের সম্পদে দরিদ্রের অধিকার রয়েছে; তাই ‘সাদকাতুল ফিতর’ আদায়ের মাধ্যমে সমাজের অসহায় মানুষকে আনন্দে শামিল করা আমাদের ঈমানী দায়িত্ব। আজকের এ ঈদ আনন্দের দিনে আমরা যেন ভুলে না যাই আমাদের চারপাশের দুর্বল ও দরিদ্র মানুষদের কথা। বিশেষ করে দরিদ্র আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীদের ঈদ আনন্দে শামিল করলেই ঈদে আমরা গড়তে পারব ইনসাফের সমাজ, দেশ ও বিশ্ব। ইসলামের শিক্ষা হলো- আনন্দ ভোগে নয়, ত্যাগে। ত্যাগের মহিমার মাঝে আছে শান্তি ও স্থিতিশীলতা। আমরা জানি, আল্লাহর রাসূল সা. বলেছেন, মুসলিম উম্মাহ একটি দেহের মতো। তাই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের নির্যাতিত মুসলমানদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের ঈমানী দায়িত্ব। আমাদের প্রতিবেশী মিয়ানমারের আরাকান আজ আর নেই। দখলদাররা তার নতুন নাম দিয়েছে রাখাইন। ভারতজুড়ে চলছে মুসলিম নির্যাতন, কাশ্মীর ফিলিস্তিন, চীনের উইঘুরের মুসলমানদের আর্তনাদ বন্ধে মুসলিম বিশ্বের ঐক্যের বিকল্প নেই। ইরানে আগ্রাসন চালাচ্ছে বিশ্বমোড়ল আমেরিকা। এমন এক সঙ্কটময় বিশ্বে এবার আমরা পালন করব ঈদুল ফিতর।
এমন প্রেক্ষাপটে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর নেতাদের উচিত ঈদুল ফিতরের শিক্ষার আলোকে ভেদাভেদ ভুলে সিসাঢালা প্রাচীরের মতো ঐক্যবদ্ধভাবে সঙ্কট সমাধানের শপথ নেয়া। আমরা আশা করি, এবারের ঈদুল ফিতর হবে মুসলিম উম্মাহর জাগরণের নতুন শপথের দিন। ইসলামের শিক্ষার আলোকে শান্তি, ন্যায় ও ইনসাফের পৃথিবী গড়ার তৌফিক আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের দান করুন। আমীন।

সম্পাদকীয়