জুলাই সনদ ও সংস্কার গণভোট অস্বীকার : বাংলাদেশের রাজনীতিতে সম্ভাব্য অভিঘাত

রাষ্ট্র পুনর্গঠন বিতর্কে নতুন সংকট

প্রিন্ট ভার্সন
১৭ মার্চ ২০২৬ ১০:২৭

॥ ফারাহ মাসুম ॥
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘জুলাই সনদ’ এবং তা বাস্তবায়নের প্রশ্নে গণভোট একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মোড় তৈরি করেছে। ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল, তার পরবর্তী ধাপে রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারের একটি রূপরেখা হিসেবে জুলাই সনদ সামনে আসে। এই সনদের মূল লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্র পরিচালনায় ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্গঠন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা এবং দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা রাজনৈতিক সংকটের একটি কাঠামোগত সমাধান খোঁজা। সরকারের সংবিধানের দোহাই দিয়ে জুলাই দিয়ে সংবিধান সংস্কার কার্যকর করার পথ থেকে সরে আসার ফলে ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হলো।
আর বাস্তবতা হলো- এই সনদ বাস্তবায়নের জন্য যে গণভোটে ৭০ ভাগ মানুষ সম্মতি দেয়ার পর নবগঠিত সংসদে সরকার যে পদক্ষেপ নিল, তা ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে অনিশ্চয়তা এবং ফ্যাসিবাদ আবার ফিরে আসার আশঙ্কা সৃষ্টি করল। বিশেষ করে যদি ক্ষমতাসীন দল গণভোটের ফল কার্যকর করতে অস্বীকার করে, তাহলে তার প্রভাব কেবল একটি রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং তা বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামো, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন বিতর্ক
জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে বর্তমানে সরকার ও বিরোধীদলের মধ্যে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ক্ষমতাসীন বিএনপি বলছে, রাষ্ট্র পরিচালনা আবেগ দিয়ে নয়, সংবিধান ও আইনের কাঠামো অনুযায়ী চলতে হবে। তাদের মতে, সংবিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদ নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের উল্লেখ নেই; তাই এই পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার প্রশ্নও ওঠে না। বিএনপি জানিয়েছে, তারা জুলাই সনদের সংস্কার উদ্যোগের বিরোধী নয়, তবে তা বাস্তবায়নের পথ হওয়া উচিত সংসদীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে- যেখানে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেই সংবিধান সংশোধন করা সম্ভব।
অন্যদিকে প্রধান বিরোধীদল জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের জোটের শরিকরা বলছে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ার ফলে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এখন একটি রাজনৈতিক ও নৈতিক বাধ্যবাধকতা। তাদের দাবি, নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়েই দ্রুত সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করে সনদের ৪৮টি সাংবিধানিক সংস্কারসহ মোট ৮৪ দফা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। তা না হলে তারা রাজপথে আন্দোলনের কর্মসূচি দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে, কারণ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই অনুষ্ঠিত গণভোটে জুলাই সনদের পক্ষে প্রায় ৭০ ভাগ জনগণের রায় আসে। সেই অনুযায়ী নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সংসদ সদস্য হিসেবে এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দুটি শপথ নেওয়ার কথা থাকলেও বিএনপির সদস্যরা দ্বিতীয় শপথ নেননি। ফলে সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরুই হয়নি।
এদিকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান না হওয়ায় বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। একই সঙ্গে সংসদেও এ নিয়ে উত্তপ্ত বিতর্ক, বিক্ষোভ এবং ওয়াকআউটের ঘটনা ঘটেছে। সংবিধান বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, গণভোট ও সনদের কিছু প্রস্তাব বর্তমান সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে, ফলে তা আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আবার অন্যদিকে সুশাসন বিশ্লেষকদের মতে, গণভোটে জনগণ যেহেতু সনদের পক্ষে মত দিয়েছে, তাই রাজনৈতিক দলগুলোর তা বাস্তবায়নের নৈতিক দায় রয়েছে।
সব মিলিয়ে জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন এখন রাজনৈতিক, সাংবিধানিক ও আইনি জটিলতার মধ্যে পড়েছে। সরকারি ও বিরোধীদলের অনড় অবস্থানের কারণে এর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে- সনদটি কি সংসদীয় প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়িত হবে, নাকি সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমেÑ এ প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। ফলে জনমনে যেমন সংশয় তৈরি হয়েছে, তেমনি বেড়েছে রাজনৈতিক উত্তেজনাও।
আন্দোলন থেকে সংস্কারের পথে : জুলাই সনদের রাজনৈতিক পটভূমি
বাংলাদেশে বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইতিহাস সাধারণত আন্দোলনের মধ্য দিয়েই তৈরি হয়েছে। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৯০ সালের গণআন্দোলন কিংবা সাম্প্রতিক সময়ের ছাত্র-জনতার আন্দোলন- সব ক্ষেত্রেই দেখা যায় রাজনৈতিক সংকট শেষ পর্যন্ত একটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করেছে। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনও তেমন একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই আন্দোলনের ফলে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকা শাসনকাঠামোর পরিবর্তন ঘটে এবং একটি অন্তর্বর্তী রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের আলোচনা শুরু হয়।
এই আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে ‘জুলাই সনদ’- যা মূলত রাষ্ট্র সংস্কারের একটি নীতিগত কাঠামো। এতে যে বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে তার মধ্যে রয়েছে- প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণ; সংসদীয় কাঠামোয় সংস্কার; বিচার বিভাগের স্বাধীনতা জোরদার; নির্বাচন কমিশনের কাঠামোগত পরিবর্তন; প্রশাসনিক জবাবদিহি বৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ।
অর্থাৎ জুলাই সনদ কেবল একটি রাজনৈতিক ঘোষণা নয়; বরং এটি রাষ্ট্রকাঠামোর মৌলিক সংস্কারের একটি নীতিগত নকশা।
গণভোটের রায় কেন গুরুত্বপূর্ণ
জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে প্রধান বিতর্কের কেন্দ্র হলো গণভোট। বাংলাদেশের সংবিধানে গণভোটের বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। অতীতে কিছু গণভোট রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে বলে অনেকের মধ্যে এ নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় গণভোটকে জনগণের সরাসরি মতামত প্রকাশের একটি গণতান্ত্রিক পদ্ধতি হিসেবে দেখছেন। সংবিধানে বলা হয়েছে, সবকিছুর ঊর্ধ্বে হলো জনগণের অভিপ্রায়। সেই অভিপ্রায়ের আনুষ্ঠানিক প্রকাশ হয় গণভোটে। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, যেহেতু জুলাই সনদ একটি জনআন্দোলনের মধ্য দিয়ে এসেছে, তাই রাষ্ট্রকাঠামোর মৌলিক পরিবর্তনের প্রশ্নে জনগণের সরাসরি মতামত নেওয়ার বাইরে রাজনৈতিকভাবে বিকল্প কিছু ছিল না। গণবিপ্লবের মাধ্যমে যখন কোনো পরিবর্তন হয়, তখন ‘ডকড্রিন অব নেসেসিটি’ বিবেচ্য হিসাবে সামনে চলে আসে। সবকিছু সংবিধান নিয়ে বিবেচনা করতে হলে ফ্যাসিবাদের বিদায় বা অন্তর্বর্তী সরকারের গঠন বৈধ হয় না। সে সরকারের অধীনে নির্বাচনও বৈধ হয় না। আর এর মাধ্যমে গঠিত বর্তমান সরকারও বৈধ হয় না। ২০২৯ সালের আগে কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ও বৈধ হয় না। এ কারণে সংবিধান সংস্কার পরিষদকে ডকট্রিন অব নেসেসিটি বিবেচনায় কার্যকর করে সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন উদ্যোগ হতে পারতো জুলাই বিপ্লবের ধারাবাহিকতা।
সরকারি দল বিএনপি বলছে, সংবিধান পরিবর্তনের চূড়ান্ত ক্ষমতা সংসদের হাতেই থাকা উচিত। সংবিধানের বিধানের বাইরে গণভোটের সম্মতির কাঠামো ধরে সংবিধান সংশোধন সংসদীয় প্রক্রিয়াকে দুর্বল করতে পারে। সরকারি দলের এই অবস্থান বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির অবয়ব ঠিক করার ক্ষেত্রে একটি বড় নির্ণায়ক হয়ে উঠতে পারে।
সাংবিধানিক বৈধতার সম্ভাব্য সংকট
যদি গণভোটকে অস্বীকার করা হয় বা তার ফলাফলকে রাজনৈতিকভাবে গ্রহণ না করা হয়, তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি সাংবিধানিক বৈধতার সংকট তৈরি হতে পারে। কারণ এখানে দুটি আলাদা ধরনের বৈধতা মুখোমুখি দাঁড়াতে পারে- একদিকে সংসদীয় বৈধতা, যা সংবিধানের অধীনে প্রতিষ্ঠিত। অন্যদিকে জনমতের বৈধতা, যা গণভোটের মাধ্যমে প্রকাশিত হতে পারে।
এই দুই ধরনের বৈধতা নিয়ে সংঘাত সৃষ্টি রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি করতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেখা গেছে, যখন জনমত ও সংসদীয় সিদ্ধান্তের মধ্যে বড় ধরনের বিরোধ তৈরি হয়, তখন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়। বাংলাদেশেও এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে আদালত, সংসদ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি দ্বন্দ্ব শুরু হতে পারে।
দলীয় রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ
গণভোট অস্বীকারের আরেকটি বড় প্রভাব পড়তে পারে দলীয় রাজনীতিতে। বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে দুটি প্রধান শক্তিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। কিন্তু জুলাই আন্দোলনের পর রাজনৈতিক বাস্তবতা কিছুটা পরিবর্তিত হয়েছে। নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক শক্তি, নাগরিক সমাজ এবং বিভিন্ন সংস্কারপন্থী গোষ্ঠী রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
এই অবস্থায় গণভোট বাস্তবায়ন ইস্যু একটি নতুন রাজনৈতিক বিভাজন তৈরি করতে পারে। এই বিভাজনে তিন ধরনের রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি হতে পারে- ১. সংস্কারপন্থী শক্তি, যারা গণভোট ও রাষ্ট্র সংস্কারের বাস্তবায়নের পক্ষে; ২. সংসদকেন্দ্রিক রাজনৈতিক শক্তি, যারা গণভোটের পরিবর্তে সংসদীয় প্রক্রিয়াকে অগ্রাধিকার দেয়; ৩. ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক শক্তি, যারা সবকিছুকে জুলাই পূর্ববর্তী অবস্থায় নিয়ে যেতে চায়। এই বিভাজন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমীকরণকে একসময় নতুনভাবে গঠন করতে পারে।
রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কার প্রক্রিয়ায় অচলাবস্থা
জুলাই সনদের মূল লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। কিন্তু যদি গণভোটের প্রশ্নে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি না হয়, তাহলে সংস্কার প্রক্রিয়া থমকে যেতে পারে। এর ফলে কয়েকটি বড় সংস্কার প্রকল্প অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে- দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা; প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা নির্ধারণ; স্বাধীন নির্বাচন কমিশন; প্রশাসনিক জবাবদিহিকাঠামো ও বিচার বিভাগের স্বায়ত্তশাসন। এই সংস্কারগুলো বাস্তবায়নের জন্য রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রয়োজন। কিন্তু গণভোট বাস্তবায়ন নিয়ে দ্বন্দ্ব বাড়লে এই ঐকমত্য তৈরি হওয়া কঠিন হয়ে যেতে পারে।
রাজপথের রাজনীতির সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন
বাংলাদেশের ইতিহাসে রাজনৈতিক সংকটের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো- সংসদীয় সমাধান ব্যর্থ হলে আন্দোলন শুরু হয়। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৯০ সালের গণআন্দোলন কিংবা সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলন- সব ক্ষেত্রেই দেখা গেছে যে রাজপথ শেষ পর্যন্ত বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের ক্ষেত্র তৈরি করেছে। যদি গণভোট অস্বীকার করা হয় এবং রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়, তাহলে ছাত্র সমাজ, নাগরিক সমাজ ও বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন আবার আন্দোলনের পথে যেতে পারে। বিরোধী ১১ দল এরই মধ্যে এই হুমকি উচ্চারণ করেছে।
এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়তে পারে এবং রাষ্ট্র পরিচালনা আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
বিপ্লব বনাম সংসদীয় গণতন্ত্রের দ্বন্দ্ব
জুলাই সনদ ও গণভোট বিতর্কের পেছনে একটি গভীর রাজনৈতিক দর্শনের প্রশ্নও রয়েছে। এই প্রশ্নটি হলো- রাষ্ট্র পরিবর্তনের চূড়ান্ত বৈধতা কোথা থেকে আসে?
একটি মত হলো, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংসদই সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান। অন্য মত হলো, জনগণের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে রাজনৈতিক পরিবর্তন আসে, তার বৈধতা সংসদের চেয়েও শক্তিশালী হতে পারে।
এই দুই ধারণার দ্বন্দ্ব নতুন নয়। ইতিহাসে বহু দেশেই বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে এই প্রশ্ন সামনে এসেছে। বাংলাদেশও এখন এক ধরনের ‘পোস্ট-বিপ্লবী রাজনৈতিক রূপান্তর’ পর্যায়ে রয়েছে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব
বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক রাষ্ট্র। তাই দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আন্তর্জাতিক পর্যায়েও গুরুত্ব পায়। যদি গণভোট অস্বীকারের কারণে রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক অংশীদাররা সাধারণত স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য রাজনৈতিক পরিবেশকে গুরুত্ব দেয়। রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়লে অর্থনৈতিক পরিকল্পনাও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
রাজনৈতিক সংস্কৃতির দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন
জুলাই সনদ বিতর্ক বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। বাংলাদেশের রাজনীতি ঐতিহাসিকভাবে ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্ব ও দলীয় মেরুকরণের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে নাগরিক সমাজ ও তরুণ প্রজন্ম রাজনৈতিক আলোচনায় আরও সক্রিয় হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে জুলাই সনদকে অনেকেই একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা হিসেবে দেখছেন- যেখানে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রশ্নে নাগরিক অংশগ্রহণ বাড়তে পারে।
কিন্তু যদি গণভোট অস্বীকার করা হয়, তাহলে এই নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ দৃশ্যপট
বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সামনে কয়েকটি সম্ভাব্য রাজনৈতিক পথ খোলা রয়েছে।
প্রথম দৃশ্যপট : রাজনৈতিক ঐকমত্য- সব রাজনৈতিক শক্তি আলোচনার মাধ্যমে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে। এতে কিছু সংস্কার বাস্তবায়ন হতে পারে এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকতে পারে।
দ্বিতীয় দৃশ্যপট : আংশিক সংস্কার- কিছু সংস্কার বাস্তবায়িত হবে, কিন্তু মৌলিক পরিবর্তনগুলো স্থগিত থাকবে।
তৃতীয় দৃশ্যপট : দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকট- গণভোট ও সংসদীয় ক্ষমতার দ্বন্দ্ব তীব্র হলে রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে এবং আন্দোলন আবার শুরু হতে পারে।
জুলাই সনদ ও সংস্কার গণভোট নিয়ে বিতর্ক বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করেছে। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক মতবিরোধ নয়; বরং রাষ্ট্রকাঠামোর ভবিষ্যৎ, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
গণভোট অস্বীকার করা হলে তার প্রভাব পড়তে পারে কয়েকটি বড় ক্ষেত্রে- সাংবিধানিক বৈধতার প্রশ্ন; দলীয় রাজনীতির নতুন মেরুকরণ; রাষ্ট্র সংস্কার প্রক্রিয়ার অচলাবস্থা; আন্দোলনভিত্তিক রাজনীতির পুনরুত্থান এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক।
বাংলাদেশ এখন এমন একটি সময় পার করছে, যখন রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্ধারণের প্রশ্ন সামনে এসেছে। এই মুহূর্তে রাজনৈতিক ঐকমত্য, গণতান্ত্রিক সংলাপ এবং জনগণের আস্থাকে গুরুত্ব দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। কারণ ইতিহাস দেখায়- যেসব দেশে বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের মুহূর্তে ঐকমত্য তৈরি হয়, সেসব দেশ দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও জুলাই সনদ বিতর্কের সমাধান শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করতে পারে দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পথ কোন দিকে যাবে- সংঘাতের দিকে, নাকি একটি নতুন গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের দিকে।

 

ফারাহ মাসুম