আলোকে তিমিরে

উপনিবেশবাদের লিগাসি

প্রিন্ট ভার্সন
৫ মার্চ ২০২৬ ২১:৪২

মাহবুবুল হক

॥ মাহবুবুল হক ॥
মাত্র দুই সপ্তাহ হয়েছে জাতীয় নির্বাচন ২০২৬ সম্পন্ন হওয়ার। দ্রুততার সাথে সরকার গঠিত হয়েছে। নির্বাচন নিয়ে এখনো নানা অভিযোগ রয়েছে। কিছু সরকারের কাছে আবার কিছু নির্বাচন কমিশনের কাছে। যে সরকারের কাছে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছিল, তারা তো আর এখন নেই। নির্বাচন শেষ হওয়ার সাথে সাথে তারা চলে গেছে। জবাবদিহি করার জন্য তারা বসে থাকেনি। ক্ষমতা হস্তান্তর করে হাত ধুয়ে তারা পাততাড়ি গুটিয়েছে। এমন হবে দেশবাসী তা ভাবতে পারেননি। দেশবাসী ভেবেছিল বা আশা করেছিল, সময় নিয়ে সুন্দরভাবে সবকিছু ঠিকঠাক করা হবে। যেমনÑ গত সরকারকে একটা বিদায় সংবর্ধনা এবং নতুন সরকারকে বরণ সংবর্ধনা প্রদান করা হবে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, কোনোটাই করা হয়নি। সেলিব্রেশন বলতে যা বোঝায়, তা কিন্তু হয়নি। মনে করা হয়েছিল, বিদেশি সরকারের পক্ষ থেকে উঁচু মার্গের প্রতিনিধিরা মেহমান হিসেবে আসবেন, তাও সে মাত্রায় হয়নি। একটা নিরানন্দ ও খুব সাদামাটাভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়টি হয়ে গেছে।
দেশবাসী, দেশের সরকার, দেশের নির্বাচন কমিশন এসব তো আর এখন স্বাধীন বা সার্বভৌম, ইউনিট বা ইনস্টিটিউশন নয়। বহুল ব্যবহৃত শব্দ ডিপস্টেট এখন সবকিছুর মালিক। বলা হচ্ছে, এখন সবকিছু নিয়ন্ত্রণের অর্থাৎ সরকার এবং বিরোধীদলসমূহের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণকারী এই ডিপস্টেট। এই অপশক্তির সাথে আছে পরাশক্তি। এই পরাশক্তি পূর্বে কাঠামোগত কিছু নিয়ন্ত্রণ করত। বড় ভাইয়েরা যেমন ছোট ভাইদের উপদেশ বা পরামর্শ দেয়, সেভাবেই বিষয়গুলো আওতাধীন ছিল। ৯/১১-এর পর সবকিছু পৃথক হয়ে গেছে। এখন রাজনীতি, অর্থনীতি, সভ্যতা, সংস্কৃতি, যুদ্ধ, সুনীতি সবকিছুই নিয়ন্ত্রণের ভার নিয়েছে এরা। হয়তো তাদের পরামর্শ নয়, নির্দেশে এই তাড়াহুড়োর বিষয়টি সম্পন্ন হয়েছে।
যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শুরু থেকেই গড়ে উঠেছে বিদেশিদের নিয়ে অর্থাৎ ইউরোপ, আফ্রিকাসহ নানা দেশের মানুষ বিভিন্ন সূত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এসে সমবেত হয়েছে। প্রবাসীরা এসে অভিবাসী হয়েছে। সেই অভিবাসীরা আফ্রিকা, ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশ থেকে বিভিন্ন অবলিগেশনের কারণে তালাশ করে করে অভিবাসী নিয়ে বিশাল দেশ গঠন করেছে। এখন নিজেদের স্বার্থে তাদের আবার ছিন্নমূল করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। একসময় বিভিন্ন সভ্যতা ও সংস্কৃতির মানুষকে সংগ্রহ করে নিজেদের দেশকে মাল্টিন্যাশনাল বানিয়ে গর্ব অনুভব করেছে। তারাই এখন আবার তথাকথিত ন্যাশনাল হওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করছে। একসময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ভিন্ন দেশের রাষ্ট্র, সরকার ও জনগণ আধিপত্যবাদী ও সম্প্রসারণবাদী বলে গালাগালি করত বা চিহ্নিত করত। যখন রাশিয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতি-নৈতিকতা অবলম্বন করে সোভিয়েত ইউনিয়নে পরিণত হলো তারপর ধীরে ধীরে কমিউনিস্ট, সমাজতন্ত্রীরাও আর আধিপত্যবাদ, সম্প্রসারণবাদ চিহ্নিত করার প্রবণতাকে আর বাড়তে দিল না। মুখ রক্ষার একটা বিষয় ছিল। নিজেরা আধিপত্যবাদী বা সম্প্রসারণবাদী হয়ে অন্যকে তো আর সে বিষয়ে বাস্তব প্রেক্ষাপটে তুল্যমূল্য করা যায় না।
তারও আগে আরেক রকম পরিবর্তন ছিল। সারা পৃথিবীতে উপনিবেশ গড়েছে। নিজেদের সভ্যতা ও সংস্কৃতি পরাভূত স্থানগুলোয় নির্মমভাবে বিস্তার করেছে। এই ভেবে যে, আমরা রাজা ওরা প্রজা। ওদের দমন ও নিষ্পেষণ করে ওদের মাধ্যমে নিজেদের উন্নতি করতে হবে। দুই ধরনের দমন ও পীড়ন তারা করেছে। একদিকে নিজেদের ধর্ম, সংস্কৃতি ও সভ্যতা বিস্তার ও প্রতিষ্ঠা করেছে; অন্যদিকে যারা তথাকথিত রাজাদের মান্য করেনি বা বিদ্রোহী হয়েছে, তাদের আসামি করে তাদের দেশে আমদানি করেছে। এভাবেই ট্রেন, বৃহৎ শিল্পকারখানা, রাস্তা-ঘাট, পুল-ব্রিজ, লঞ্চঘাট, দুর্গ, ন্যায়-সভ্যতা ইত্যাদি গড়ে তুলেছে। শিল্পবিপ্লবের ভেতরের গোপন ইতিহাস তো এটাই।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নির্যাতিত, নিষ্পেষিত, মজলুম জনগণ মরিয়া হয়ে উপনেবিশবাদীদের বিরুদ্ধে আন্দোলন, অভ্যুত্থান, বিপ্লব, স্বাধীনতা আন্দোলন এসব করে করে লাখ লাখ জীবন ও সম্পদের বিনিময়ে জাতীয়তাবাদী অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে। বহু দেশ তথাকথিত স্বাধীনতা লাভ করেছে। যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ, ইউরোপের রাজতান্ত্রিক দেশসমূহসহ পাকিস্তান, আরাকান, বার্মা, বলতে গেলে ফ্রান্স এবং ব্রিটেন বাধ্য হয়ে উপনিবেশগুলোকে তথাকথিত স্বাধীনতা দিতে বাধ্য হয়েছিল। এসব ইতিহাসের একেকটা মোড় বা বাঁক।
এসব পরিবর্তনের লেগাসি অনেকটা থেকেই যায়। উপনিবেশবাদীরা উপনিবেশ ছেড়ে দিয়েও ছাড়েনি। আবার উপনিবেশবাদীদের বিতাড়িত করেও করেনি। এমন ধরনের অবস্থাও তো চলেছে বেশ কিছুকাল। ব্রিটেন কমনওয়েলথের নামে ফ্রান্স অন্য একটা ভিন্ন নামে উপনিবেশগুলোর সাথে যোগাযোগ ও সংযোগ রক্ষা করেছে। কিছুটা নিজেদের স্বার্থে। অপরদিকে উপনিবেশবাসীদের শিক্ষা-দীক্ষা, বিজ্ঞান, রাজনীতি, সংস্কৃতি, ধর্ম, আইনকানুন, বিধান, ব্যবসা-বাণিজ্য, চিকিৎসা-স্বাস্থ্য, নারী স্বাধীনতা, নগর সভ্যতা অর্থাৎ সমৃদ্ধ হওয়ার প্রয়োজনে বা উন্নতি বিধানের জন্য উপনিবেশবাদীদের সাথে একটা যোগাযোগ সবসময় রাখার চেষ্টা করেছে। ইতিহাসে এ ধরনের ব্যবস্থাকে নানারকমভাবে চিহ্নিত করেছে। একদিকে বলা হয়েছে, এ এক উপনিবেশবাদীদের চক্রান্ত। আবার অন্যদিকে বলা হয়েছে নতুন নামে সাম্রাজ্যবাদীদের অধীনতা স্বীকার করে নেয়া। একে নব্য উপনিবেশবাদ বা পরিবর্তিত উপনিবেশবাদ বলে আখ্যায়িত করেছে। এসবের সিনথিসিসে বলা যায়, এ এক অনিবার্য বাধ্যবাধকতা।
কোনো সভ্যতা ও সংস্কৃতি যদি শক্তিশালী হয় বা কোনো দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে দুর্বল, অল্প-শিক্ষিত মানুষ বেঁচে থাকার প্রয়োজনে এ লেগাসিকে অস্বীকার করতে পারে না। যেমন পারেনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশসহ পাকিস্তান, ভারত ইত্যাদি। যে দেশের মানুষ মুসলিম হয়েও সেক্যুলার হয়েছে বা থেকেছে তার পেছনে এসবই মূল কারণ। রক্তের মধ্যে বা চিন্তা-চেতনার মধ্যে একবার যখন দুনিয়ার সমৃদ্ধি ঢুকে যায়, তখন আর বোধ ও বিশ্বাসের মধ্যে আখিরাত থাকে না। ধর্মের নাম কিছু রিচুয়াল থাকে। কিছু অনুষ্ঠান থাকে। বাস্তবে অন্তর্গত দিক থেকে আল্লাহর ওপর সমস্ত আস্থা ও বিশ্বাস থাকে না।
যত দেশে উপনিবেশ কায়েম বা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, প্রায় সব দেশে একই অবস্থা। উদাহরণ হিসেবে পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশকে চিহ্নিত করা যায়। আমাদের কারো অন্তরে দুনিয়া (সেক্যুলারিজম) বাইরে আখিরাত (ইসলাম)। আবার উল্টোটাও রয়েছে। অন্তরে আখিরাত (ইসলাম) বাইরে দুনিয়া (সেক্যুলারিজম)। এ দু’মুখো অবস্থানের মধ্যেই আমরা প্রায় ৮০ বছর কাটিয়ে দিয়েছি। অথচ আমাদের দীন বলছে, ‘রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাও, ওয়াফিল আখিরাতি হাসানাতাও ওয়াকিনা আজাবান্নার।’ অর্থ : হে আমাদের প্রতিপালক! দুনিয়ায় আমাদের কল্যাণ দান করুন এবং আখিরাতেও আমাদের কল্যাণ দান করুন। আর আমাদের আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন। Ñ সূরা বাকারা : ২০১।
আসলে আমরা মোনাজাত ও দোয়ার সময় এসব পড়ি। কিন্তু আমাদের আমলে এসব পরিপূর্ণভাবে নেই।
বলছিলাম পরিবর্তনের কথা। সব কথা বলার অবকাশ ক্ষুদ্র নিবন্ধে সম্ভব নয়। সব দেশের জন্য, সব জাতির জন্য, সবকালের জন্য, সবসময়ের জন্য একই প্রেসক্রিপশন চলে না। আমাদের দেশে জ¦র ও ব্যথার কারণে আমরা একই প্যারাসিটামল খাই। কিন্তু উন্নত দেশে প্যারাসিটামল বিভিন্ন প্রকারের পুরুষের জন্য একরকম, নারীদের জন্য অন্যরকম এবং শিশুদের জন্য আরেকরকম। আবার রাতের জন্য বয়স ভেদে প্যারাসিটামল আলাদা আলাদা। হয়তো কিছু বছর পর যখন এ ব্যবস্থা উন্নত দেশে থাকার প্রয়োজন হবে না। তখন ধীরে ধীরে তা চলে আসবে আমাদের দেশে। ব্যবসাটা চালু রাখতে হবে তো! বলা হয়ে থাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এমআইটিতে আজ যে গবেষণার সুফল সে দেশের জনগণ ভোগ করছে, তা আমাদের দেশের জনগণ ভোগ করার সুযোগ পাবে অন্তত ৩০-৪০ বছর পর। যখন বক্ষমান গবেষণা, উৎকৃষ্ট ও উন্নত গবেষণা বাজারে এসে যাবে। তারপরও আমরা বিশ্বায়নের কথা বলছি। মুহূর্তের সব জ্ঞান ও প্রযুক্তি আমরা একসাথে পাচ্ছি বা পাব বলে গল্প-স্বল্প করছি।
তথাকথিত উন্নত বিশ্ব থেকে দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশে কোনো উন্নত গবেষণা চট করে এসে যায় না। এ প্রক্রিয়ার সাথে শুধু আর্থিক লেনদেন যুক্ত থাকে না, সভ্যতা ও সংস্কৃতি যুক্ত থাকে। এইড শিরোনামে যা কিছু তৃতীয় বিশ্ব পায়, তারও অনেক উপশিরোনাম থাকে। যেমনÑ ‘ওমেন এমপাওয়ারমেন্ট’, ‘ফ্রিডম ফর ওমেন’, ‘হিউম্যান রাইটস’Ñ এসব শুনতে যতটা মসৃণ ও গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়, বাস্তবে তৃতীয় বিশ্বে যা চালু করা হয়, তা হলো তৃতীয় বিশ্বের ঐতিহ্য, কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও সভ্যতাকে নির্মূল করে পাশ্চাত্যের সভ্যতার আবেদনকে প্রতিষ্ঠা করা। বহু যুগ ধরে প্রচ্ছন্নভাবে এ কাজই চলছে। মাঝখানে আরব বসন্ত নামে নানা ছলাকলায় এসবই চলছিল। মধ্যপ্রাচ্যের রাজতন্ত্রকে উচ্ছেদ করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পেছনে বা অন্ধকারকে অপমৃত করে মানবাধিকার এর তথাকথিত আলো বিচ্ছুরণ করার প্রচেষ্টাও চলেছিল। যার ফলে সৌদি আরব বহুকালের সমাজ ব্যবস্থাকে উৎপাটন করে উন্নত বিশ্বের সেক্যুলার ‘লাইফস্টাইল’ সেখানে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সেখানকার ইসলামী জীবন এখন নির্মূল হওয়ার পথে। রিয়াদ, জেদ্দায় যে পরিস্থিতি এখন বিরাজ করছে, তা দেখে মুসলিম বিশ্বের বিবেকসম্পন্ন মানুষ স্তম্ভিত হচ্ছে। ধীরে ধীরে সারা বিশ্বে এখন যে আন্দোলন চলছে, তা হলো মুসলিম সংস্কৃতি ও সভ্যতা সেক্যুলার লাইভ স্টাইলকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। মুসলিমরা রাস্তাঘাট দখল করে সালাত আদায় করছে। সেক্যুলার ‘ড্রেস কোড’ ধীরে ধীরে অপসারিত হচ্ছে। সেক্যুলার বিশ্বের সবচেয়ে বড় অভিযোগ মুসলিমরা উন্নত বিশ্বের যেখানেই প্রবাসী বা অভিভাসী হিসেবে প্রবেশ করেছে, সেখানেই তাদের লাইফস্টাইল প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছে। সামনে এমন দিন হয়তো আসবে, যেখানে সেক্যুলাররা বা সেক্যুলার লাইফস্টাইল পালন ও উদযাপন করতে পারবেন না।
সুতরাং ট্রাম্পের বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্ররোচনায় ও প্রণোদনায় এবং ধনকুবেরদের অর্থে মুসলিম ঠেকাও, ইসলাম ঠেকাওÑ এসবের প্রকাশ্যে আন্দোলন চলছে। মুসলিমদের যার যার দেশে ফিরে যাওয়ার হুমকি দেয়া হচ্ছে। বিশেষ করে গোটা ইউরোপজুড়ে হিজাবধারীদের ওপর প্রকাশ্য দিবালোকে নানারকম আক্রমণ চলছে। এ বছরের প্রথম ৩ মাস পরে দ্বিতীয় ৩ মাসে গোটা ইউরোপজুড়ে ইসলাম ধর্ম, সংস্কৃতি ও সভ্যতার বিরুদ্ধে শত শত সমাবেশ, মিছিল, প্রতিবাদ, আক্রমণ, পোস্টারিং, বিলবোর্ড ও সংবাদপত্র-মিডিয়ায় একই বিষয়ে সমানতালে পরিচর্যা অব্যাহত আছে। দেশে দেশে মুসলিম সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সক্রিয় আন্দোলন পরিচালনা করার পর বিশাল আকারে ব্রিটেনের লন্ডন শহরে লাখো লাখো মানুষের প্রতিবাদ সমাবেশ ও মিছিল সম্পন্ন করা হয়েছে।
শিক্ষায়তনগুলোয় ছাত্র ভর্তির পথে নানারকমভাবে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে। যে আন্দোলন এখন পরিচালনা করা হচ্ছে গত ৩০ বছরেও এত বিপুল ও ব্যাপকভাবে ইসলামের বিরোধতা করা হয়নি। জঙ্গি বিষয়ে নানারকম ষড়যন্ত্র করা হয়েছে এটা ঠিক, কিন্তু মুসলিম প্রবাসী বা অভিবাসী হওয়ার বিরুদ্ধে কোনো আন্দোলন সেভাবে উচ্চকিত হয়নি।
একদিকে নানারকম এইড ও সহযোগিতার নামে তৃতীয় বিশ্বে প্রথম ও দ্বিতীয় নং বিশ্ব তাদের সেক্যুলার সংস্কৃতি ও সভ্যতা প্রতিষ্ঠার প্রচ্ছন্ন প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। অপরদিকে ১ ও ২ নং বিশ্ব তাদের দেশে যাতে নতুন করে ইসলাম অনুপ্রবেশ করতে না পারে, সেই পরিকল্পনাকে মজবুতভাবে এগিয়ে নিচ্ছে।
অন্যদিকে মুসলিম নির্মূল করার শতাব্দীব্যাপী আয়োজন তো ইসরাইলের মাধ্যমে চলছেই। ইতোমধ্যে ফিলিস্তিন, গাজা, লেবানন ইত্যাদি দেশের প্রায় ২-৩ লাখ (শিশুসহ) মানুষকে নির্বিচারে হতাহত করা হয়েছে। তাদের বাড়িঘর সম্পূর্ণভাবে ভেঙে ফেলা হয়েছে। শিক্ষালয়, হাসপাতাল, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ সব ধরনের স্টাবলিস্টমেন্ট নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে। ইতোপূর্বে গত শতাব্দীতে বেশ কয়েকটি মুসলিম দেশ ইরাক, লিবিয়, আফগানিস্তান থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের আশপাশের দেশগুলোয় নানারকমভাবে হামলা পরিচালনা করা হয়েছে। এতে কুয়েত, কাতার বিপুলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইয়েমেনকে অকার্যকর দেশে পরিণত করা হয়েছে। গোটা আফ্রিকার কথা বললে এ নিবন্ধ আবার অন্ধকার বিশ্বের অন্ধকারকে আরো প্রজ্জ্বলিত করবে। যে শক্তিসম্পন্ন মানুষগুলোকে পাশ্চাত্য সভ্যতা একদিন নিজেদের প্রয়োজনে অভিবাসী বানিয়েছিল, তাদের এখন নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর মহাষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। যেসব দেশে ইসলাম ও মুসলিম সংস্কৃতি প্রসারিত হয়েছে শতাব্দীব্যাপী, সেসব ধ্বংস করার অমানবিক ও নিষ্ঠুর প্রয়াস এখনো অব্যাহত আছে। জাতি জাতিতে গৃহযুদ্ধ লাগিয়ে দেশগুলোকে ক্রমাগতভাবে দুর্বল থেকে দুর্বলতম অধ্যায়ে পৌঁছে দিয়েছে। আলজেরিয়া, সুদান, তিউনিশিয়া, সোমালিয়া, নাইজেরিয়া, মরক্কোসহ আফ্রিকার বহু দেশে ইসলামের জয়যাত্রাকে নিদারুণভাবে শুধু ঠেকিয়ে দেয়নি। এসব দেশে পাশ্চাত্য সভ্যতার বীজ নতুনভাবে রোপণ করা হচ্ছে।
এতকিছুর পরও মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো শুধু নিজেদের রাজত্ব বজায় রাখার জন্য তলে তলে ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নানা ধরনের চুক্তি করে শুধু বসে নেই, নানারকম পারমাণবিক অস্ত্র ক্রয়সহ বাণিজ্যিক সম্পর্ক উত্তরোত্তর বাড়িয়েছে। একমাত্র ইরান ছিল এক্ষেত্রে অনেকটা ব্যতিক্রম। ১৯৭৯ সালে রাজতন্ত্র উৎখাত করার পর তারা যে ইসলাম সেখানে চালু করেছিল, তার উত্তরোত্তর বিকাশ থাকাকালেও ইদানীংকালে ‘নারী স্বাধীনতার’ নামে সেখানেও নানা বিভক্তির সৃষ্টি করেছে। ইরানের পারমাণবিক শক্তি ধ্বংস করার জন্য প্রায় ৫০ বছর ধরে যে ষড়যন্ত্র পাশ্চাত্যজগৎ করে এসেছিল। তা এখন তীব্রতর আকারে পরিণত হয়েছে। একদিকে ইসরাইল একের পর এক ইরানের বিভিন্ন এলাকায় বিমান হামলা, মিসাইল, পারমাণবিক অস্ত্র হামলা করছে। বিপরীতে ইরানও ইসরাইলের ওপর হামলা করে তাদের জীবন ও সম্পদ ধ্বংস করার প্রয়াস পেয়েছে। ইরান ক্ষেপে গিয়ে শুধু ইসরাইলের ওপর আক্রমণ করছে না, বরং মধ্যপ্রাচ্যের বিশ্বাসঘাতক দেশগুলোর ওপর আক্রমণ শুরু করে দিয়েছে। এ আক্রমণ ও প্রতি আক্রমণের পরিণতি নতুন বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
আমাদের এ নিবন্ধ সাধারণভাবে সকলকে সচেতন করার বিষয় হলেও বিশেষভাবে আমাদের প্রধান প্রচেষ্টা হলো বাংলাদেশের নবতর সরকারের আশু দৃষ্টি আকর্ষণ করা।
বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের উচিত অদৃশ্য অপশক্তিকে প্রশ্রয় না দেয়া। পাশ্চাত্য সভ্যতার বিপরীতে এমন একটি সময় আগত, যখন নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনে পৃথক একটি শক্তিকেন্দ্র তৈরি করাÑ যেখানে অংশগ্রহণ করবে মুসলিম দেশসমূহসহ তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহ। এটা যুদ্ধের জন্য নয়। দুনিয়াকে ধ্বংস করার জন্য নয়। শুধু নিজেদের ধর্ম, কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যসমূহকে সংরক্ষণ করে প্রাগ্রসর হওয়া।
এ লেখা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খবর পেলাম ইরানের আধ্যাতিক নেতা ইমাম খামিনি আয়াতুল্লাহ আলী শাহাদাতবরণ করেছেন, (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। আশা করি, এ মহান কুরবানি কোনো সুফল বয়ে আনবে, ইনশাআল্লাহ।