সম্পাদকীয়

জামায়াতে ইসলামীর ইফতার মাহফিল ইতিবাচক রাজনীতির বার্তা

প্রিন্ট ভার্সন
৫ মার্চ ২০২৬ ২০:১২

দেশবাসী এক বিরল ঘটনার সাক্ষী হলো গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শনিবার বিকালে। রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান এমপির আমন্ত্রণে ইফতার মাহফিলে সমবেত হয়েছিলেন দেশের বিশিষ্টজনরা। তবে এ মিলনমেলার মূল আকর্ষণ ছিলেন নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান এমপি। কারণ দেশের রাজনীতিতে এমন সুস্থধারার অনুপস্থিতি ছিল অনেক দিন। এর মাধ্যমে সেই বন্ধ্যত্ব কাটলো।
২০০৮ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে হাসিনা ক্ষমতা দখলের পর দীর্ঘ দেড় দশকের দুঃশাসনে দেশের নির্বাচনব্যবস্থা ও সুস্থধারার রাজনীতি নির্বাসনে চলে গিয়েছিল। গৃহপালিত বিরোধীদল জাতীয় পার্টি (এরশাদ) এবং সরকারে থাকা ১৪ দল ছাড়া বাকি সবাইকে হাসিনার আওয়ামী লীগ মনে করতো শত্রু। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীকে শুধু শত্রু নয়, হত্যাযোগ্য অপরাধী মনে করতে মাফিয়াতন্ত্রের রানি হাসিনা। ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত একতরফা, রাতের ভোট, আমি-ডামি ইত্যাদি নব্যস্টাইলের নির্বাচনের নামে প্রহসনের মাধ্যমে ক্ষমতা চিরস্থায়ী করাই ছিল তাদের দুঃস্বপ্ন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বা ৩৬ জুলাই বিপ্লব দমন করতে প্রায় দুই হাজার মানুষকে হত্যা করেছে হাসিনা সরকার। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। অবশেষে হাসিনা তার সাঙ্গ-পাঙ্গ নিয়ে ভারতে পালাতে বাধ্য হয়েছেন। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে একটি নির্বাচনের পর জাতীয় সংসদের নবনির্বাচিত এমপিরা শপথগ্রহণ করেছেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী বিএনপি সরকার গঠন করেছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বিরোধীদলের আসনে বসেছে। জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান জাতির উদ্দেশে বলেছেন, তিনি এবং তার দল দায়িত্বশীল ও শক্তিশালী বিরোধীদল হিসেবে সংসদের ভেতরে এবং বাইরে যথাযথ ভূমিকা পালন করবে। ‘আমি-ডামির’ দিন শেষ। সরকারের কোনো কাজ দেশ-জাতির জন্য তাদের দৃষ্টিতে অন্যায্য ও ক্ষতিকর মনে হলে প্রথমে দৃষ্টি আকর্ষণ করবেন, তারপর গঠনমূলক আলোচনা-সমালোচনা এবং প্রয়োজনে রাজপথে নেমে জনগণকে সাথে নিয়ে সরকারের কাছে সঠিক বার্তা পৌঁছে দেবেন। জনগণের দাবিতে যেন সরকার ও বিরোধীদল উভয়ে বসে একসাথে সিদ্ধান্ত নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশকে এগিয়ে নিতে পারেন।
ইফতার মাহফিলেও উভয় নেতা ইতিবাচক বক্তব্য দিয়েছেন। বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আমীরে জামায়াত ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা গতানুগতিক বিরোধীদল হিসেবে এ সংসদে কাজ করতে চাই না। আমরা চাই এ সংসদ হোক অর্থবহ। জনগণের সমস্ত চাওয়া-পাওয়ার কেন্দ্র। সরকারি দলের সদস্যরাও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবেন, আমরাও বিরোধীদল হিসেবে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে চাই। সরকারের সকল সংগত পদক্ষেপে আমাদের পূর্ণ সমর্থন ও সহযোগিতা থাকবে। কিন্তু আমাদের বিবেচনায় আমরা যদি দেখি সরকার কোনো অসংগত সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ নিয়েছেন, আমরা প্রথমে দৃষ্টি আকর্ষণ করব। সরকার আমাদের পরামর্শ গ্রহণ করলে জাতি উপকৃত হবে, আমরা কৃতজ্ঞ হবো। সরকার পরামর্শ গ্রহণ না করলে বিরোধীদলের যে ভূমিকা, সেটিই আমরা পালন করব। আমরা জাতির অধিকারের পক্ষে দাঁড়াবো। আমরা এই সদিচ্ছা ও ধারণা রাখতে চাই যে, সরকার সংসদকে আগামীতে এগিয়ে যাওয়ার বাহনে পরিণত করবে। কোনো বাহন কখনো এক চাকায় চলে না, দুটি চাকা মিনিমাম লাগবে। সরকারি দল সামনের চাকা হলে বিরোধীদল হবে পেছনের চাকা।’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ অনেক প্রত্যাশা, আকাক্সক্ষা নিয়ে আমাদের সকলের দিকে তাকিয়ে আছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক দলগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। আগামী দিনে আমাদের কাজগুলো হবে এদেশের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য। আল্লাহর দরবারে রহমত কামনা করিÑ যাতে মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের তৌফিক দেন।’
একই দিন আরেকটি ইতিবাচক ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ইফতার মাহফিলেও উপস্থিত হয়েছিলেন বিএনপি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা। দেশের সাধারণ নাগরিকদের সাথে সাথে আমরাও বিষয়টি ইতিবাচক হিসেবে দেখছি। আমরা আশা করি, নেতৃবৃন্দ কেন্দ্রের এ বার্তা সরকার তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছে দেবেন। কারণ তৃণমূলপর্যায়ে এখনো কোনো কোনো ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের রেখে যাওয়া প্রতিহিংসার রাজনীতির পচাকালচার চলছে। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য সহনশীলতার বার্তা ভুলে তারা হামলা, সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে, যা আমাদের কারো কাম্য নয়। আমরা আশা করি, সরকার আইনের শাসন নিশ্চিত করবে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে কেউ যেন ফায়দা লুটতে না পারে, সেদিকে সরকার ও বিরোধীদের তীক্ষè দৃষ্টি রাখতে হবে। দলীয় নয়, খুনি, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, দখলবাজ, দুর্নীতিবাজদের পরিচয় হবে একটাইÑ তারা অপরাধী। পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা যেন রাজনৈতিক চাপ ও হয়রানিমুক্ত হয়ে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে হবে। তবেই দেশ এগিয়ে যাবে। আমরা পৃথিবীর মানচিত্রে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব।

সম্পাদকীয়