বাংলা সাহিত্যে রোজা


১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:০৬

ওবায়েদ ইবনে গনি : বিশ্ব মুসলিমের জন্য ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম হচ্ছে রমজানের রোজা। আত্মশুদ্ধি ও তাকওয়া অর্জনের লক্ষ্যে প্রত্যেক সক্ষম মুসলমানের জন্য এটি ফরজ (ইবাদত) করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর; যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।’ (সূরা বাকারা : ১৮৩)।
বাংলা সাহিত্যে রোজা বা রমজান সংযম, আত্মশুদ্ধি এবং আধ্যাত্মিক আনন্দের প্রতীক হিসেবে চিত্রিত হয়েছে। কাজী নজরুল ইসলামের ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে’ গানটি এর অন্যতম সেরা উদাহরণ। এছাড়া কবি শাহাদাৎ হোসেনের রোজা-সংক্রান্ত কবিতায় পবিত্র রমজানের আগমনী বার্তা এবং মহান আল্লাহর রহমতের বর্ণনা পাওয়া যায়। রোজা রেখে মন ভালো রাখা ও সৎ জীবনের গুরুত্ব নিয়েও নজরুল ইসলাম খানের মতো আধুনিক কবিরা লিখেছেন। কবিরা রমজানের চাঁদ দেখা, সাহরি, ইফতার, তারাবি ও লাইলাতুল কদরের মাহাত্ম্য তুলে ধরেছেন।
রোজা বিশ্ব মুসলমানের জীবনে এক মাসের সংযম সাধনার মাধ্যমে জীবনচিত্র পাল্টে দেওয়ার একটি বিশেষ সময়। রোজা মিথ্যা, ছলচাতুরী বর্জন করে সৎপথ অনুসরণের শিক্ষা দেয়। বাংলা সাহিত্যে রোজা শুধু একটি উপবাস নয়, বরং এটি মানুষের আধ্যাত্মিক ও নৈতিক জীবনের উন্নতির একটি বার্তা। রমজানের বিশেষ ফজিলতের মধ্যে রয়েছে শবেকদর, যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। হাদিস অনুযায়ী, জান্নাতের আটটি দরজার মধ্যে রোজাদারদের জন্য নির্দিষ্ট রয়েছে ‘রাইয়ান’ নামক দরজা, যা দিয়ে শুধু রোজাদাররাই প্রবেশ করতে পারবেন।
বাংলা সাহিত্য বরাবরই ঋতুভিত্তিক ও ধর্মীয় ভাবধারার প্রভাব বহন করেছে। তবে অন্যান্য বিষয়; যেমন ঋতু, প্রকৃতি কিংবা সামাজিকতা নিয়ে সাহিত্যচর্চা যেমন বিস্তৃত হয়েছে, তেমনিভাবে রমজান ও সিয়াম নিয়ে সাহিত্যচর্চা তুলনামূলকভাবে কম। যদিও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, ফররুখ আহমদ, পল্লীকবি জসীমউদ্দীনসহ অনেক খ্যাতিমান কবি-সাহিত্যিক তাদের রচনায় রমজানের পবিত্রতা, তাৎপর্য ও মাহাত্ম্য তুলে ধরেছেন।
* কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় মাহে রমজান এক বিপ্লবী সুরে প্রতিফলিত হয়েছে-
‘মাহে রমজান এসেছে যখন আসিবে শবেকদর,
নামিবে রহমত এই ধূলির ধরার পর।
এই উপবাসী আত্মা, চিরকাল রোযা রাখিবে না-
আসে শুভ এফতার ক্ষণ।’
* কবি ফররুখ আহমদের কাব্যেও শবেকদরের মাহাত্ম্য উঠে এসেছে-
‘এখনো সে পুণ্য রাত্রি নামে পৃথিবীতে, কিন্তু প্রাণ
এক অন্ধকার ছেড়ে অন্য এক আঁধারে হারায়,
ঊর্ধ্বের ইঙ্গিত আসে লক্ষ মুখে, অজস্র ধারায়;
নর্দমার কীট শুধু পাপ-পঙ্কে খোঁজে পরিত্রাণ।…
আত্মার প্রশান্তি গ্রাস করে ছায়া উ™£ান্ত মতের;
সে আজ দেখাতে রাহা এ সংশয়ে,…
শবেকদরের/(কত অপলক দৃষ্টি জাগে আজও যে পথ-সন্ধানে);
জুলমাতের এলাকায় বলে দাও নিঃসঙ্গ খিজির।’
* পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের কবিতায় তারাবির নামাজের আমেজ পাওয়া যায়-
‘নামাজ পড়িতে যাইব মোল্লাবাড়িতে আজ,
মেনাজদ্দীন, কলিমদ্দীন, আয় তোরা করি সাজ।
চালের বাতায় গোঁজা ছিল সেই পুরাতন জুতা জোড়া,
ধুলাবালু আর রোদ লেগে তাহা হইয়াছে পাঁচ মোড়া।
তাহারি মধ্যে অবাধ্য এই চরণ দুখানি ঠেলে,
চল দেখি ভাই খলিলুদ্দীন, লুণ্ঠন-বাতি জ্বেলে।
ঢৈলারে ডাক, লস্কর কোথা, কিনুরে খবর দাও।
মোল্লাবাড়িতে একত্র হব মিলি আজ সার গাঁও।’
এ কথা স্বীকার্য যে, বাংলা ভাষার উৎকর্ষ ও বিকাশের এবং বাংলা ভাষায় সাহিত্যচর্চার মৌলিক পাঠ সূচিত হয় বাংলার সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতায়। মুসলিম কবিরা অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি ইসলামের বিধিবিধান সম্পর্কেও রচনা করেছেন কমবেশি। পরে রমজান ও রোজা বিষয়ে বেশকিছু কাব্য ও গদ্য রচিত হয়। রমজানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, রমজান সব ভেদাভেদ ভুলিয়ে দেয়। সবাইকে কল্যাণকামী ও সহমর্মী করে তোলে। রমজান মুসলমানের ইবাদতের ভরা বসন্ত। মুমিন-হৃদয়কে আলোড়িত ও আন্দোলিত করে। এর রং ছড়িয়ে পড়ে সবখানে। রমজান ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে দেয় নতুনমাত্রা।
রমজানের ফজিলত সম্পর্কে ইসলামী চিন্তাবিদদের ব্যাখ্যায়ও এর তাৎপর্য সুস্পষ্ট। অধ্যাপক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ তার লেখায় উল্লেখ করেন, ‘রোজা কেবল দেহের উপবাস নয়, এটি আত্মার সংযম। কাম, ক্রোধ, লোভের নিয়ন্ত্রণই রোজার মূল শিক্ষা। রোজা মানুষকে আল্লাহর নৈকট্যে পৌঁছাতে সহায়তা করে।’ রমজানের অন্যতম দিক হলো সিয়াম ও কিয়াম (তারাবি নামাজ)। এটি মুমিনের আত্মশুদ্ধির অন্যতম উপায়।
কবি আজিজুর রহমান তার রচনায় উল্লেখ করেন, ‘রোজা রেখে করো অনুভব, ক্ষুধার কেমন তাপ/দেহমনের সেই সাধনায়, পুড়িয়ে নে তোর পাপ।’ ‘ইসলামের মহাব্বত রোজা’ শীর্ষক প্রবন্ধে মুহাম্মদ বরকতুল্লাহ রোজার উদ্দেশ্য তুলে ধরেছেন এভাবে, ‘…রোজার উদ্দেশ্য শুধু অনাহারে থাকা নয়। দৈহিক ও মানসিক উভয়বিধ সংযম এবং সেই সংযমজনিত নিবৃত্তি ও প্রশান্তির স্নিগ্ধ পরিবেশে আল্লাহর দিকে মনের একাগ্রতা সাধনই ইসলামের নির্দেশিত রোজার মূল লক্ষ্য।’
রোজার মাহাত্ম্য তুলে ধরে ‘সিয়ামের তাৎপর্য’ শীর্ষক এক প্রবন্ধে দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ লিখেছেন, ‘কাম প্রবৃত্তির অসংযত সন্তোষ বিধানের ফলে মানুষ পশুত্বের চরম স্তরে নেমে যায়। ক্রোধ মানুষকে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য করে তোলে। লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য সামাজিক জীবনে বিশৃঙ্খলতার সৃষ্টি করে। এজন্য এগুলোর দাহনের জন্য এ দুনিয়ায় আল্লাহ সিয়ামের প্রবর্তন করেছেন। যাতে এ দাহনের ফলে মানুষ এ বিশ্বে তার প্রকৃত স্থান নির্দিষ্ট করতে পারে, সে যাতে আল্লাহর প্রতিনিধি বা খলিফা হিসেবে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারে।’
* রমজান বা রোজার মাহাত্ম্য নিয়ে কবি সাবির আহমদ চৌধুরী নিজের অনুভূতি তুলে ধরেছেন এভাবে-
‘একটি বছর পরে আবার/কুল মুসলিম বিশ্ব ধরায়
সিয়ামের মাস এলো রমজান/আব হায়াতের শান্তি সুধায়।
আত্ম অহং চিত্তদহন/বিনয় নম্র সংযমী মন।
কুল রোজাদার সব কে-খোদা/খাস রহমতের শিরনী বিলায়।’
* অন্য কবিতায় তিনি লিখেছেন-
‘মাগফিরাতের সওদা নিয়ে/এলো মাহে রমজান
সকল মাসের শ্রেষ্ঠ এ মাস/তৌহিদী ফরমান।’
* রমজান নিয়ে ফজল-এ-খোদা একটি কবিতায় লিখেছেন-
‘আল্লাহ তোমার হাজার শোকর/দিলে মাহে রমজান
অধম নাদান বান্দার তরে/তুমি যে মেহেরবান।
রমজানের এই রহমতী মাস/মিটায় প্রাণের বেহেশতী আশ
খোদা আমরা তোমার দাসানুদাস/চাই যে শান্তি সত্য জ্ঞান।’
* তিনি সাহরি নিয়েও লিখেছেন-
‘জাগো জাগো রোজাদাররা জাগো/জাগো রে এবার
লও সেরে লও থাকতে সময়/সাহরি তোমার।’
* সৈয়দ এমদাদ আলী লাইলাতুল কদর নামে একটি কবিতায় লিখেছেন-
‘বর্ষে বর্ষে আসে সে রজনী/ল’য়ে তার স্মৃতির সম্ভার,
বহাইতে মোসলেম অন্তরে/অনাবিল পুণ্যের পাথার।’
রমজানের মাহাত্ম্য নিয়ে সাহিত্যচর্চা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা অনেক আগেই অনুভূত হয়েছে। বাংলা সাহিত্যে এ নিয়ে আরো ব্যাপক আলোচনা ও গবেষণা হলে ইসলামী ভাবধারা আরো সুদৃঢ়ভাবে উপস্থাপিত হতে পারত। তবু সীমিত পরিসরে হলেও রমজান নিয়ে কবিতা, নিবন্ধ ও প্রবন্ধ বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। রমজান শুধু ইবাদতের মাসই নয়, বরং আত্মশুদ্ধি, সংযম ও সামাজিক সংহতির এক অনন্য নিদর্শন। তাই আমাদের উচিত এ মাসের প্রতিটি মুহূর্তকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো এবং সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি অর্জনে আত্মনিয়োগ করা।
পবিত্র রমজান সর্বাধিক বরকতময় মাস। এ মাসে বহু ফজিলতপূর্ণ ইবাদতের এক মহাসমাবেশ ঘটে থাকে। এ মাসে শয়তানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। এ মাসে দোজখের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং বেহেশতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়। এ মাসে রহমত, মাগফিরাত ও নাজাত লাভের অফুরন্ত সুযোগ আসে। এ সুযোগ লাভ থেকে আমরা যেন নিজেদের বঞ্চিত না করি। আমাদের সবার জীবনে মাহে রমজান মোবারক হোক। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সবাইকে পবিত্র মাহে রমজানের মহিমা, গুরুত্ব ও তাৎপর্য উপলব্ধি করে আত্মসংযমী হয়ে বরকতময় রোজ পালনের তাওফিক দান করুন। আমীন।
লেখক : সাংবাদিক।