দুর্জয় নারী : বীরত্ব ও সাহসের অপর এক নাম খাওলা বিনতে আল-আজওয়ার
১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:০৮
॥ শাহানারা স্বপ্না ॥
ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে রয়েছে প্রচুর সাহসী নারীর আলোকিত অধ্যায়। খাওলা বিনতে আল-আজওয়ার ছিলেন তেমনি একজন অসীম সাহসী নারী যোদ্ধা। বীরত্ব, ক্ষিপ্রতা ও ইস্পাতকঠিন ঈমানী মনোবলে তিনি ছিলেন অপরাজেয় এক শক্তি। আজও তিনি ইতিহাসে এক বিস্ময়কর নারীর অভিধায় ভূষিত। অসাধারণ বীরত্ব ও সাহসিকতার জন্য তাঁকে মুসলিম বিশ্ববীর খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)-এর সাথে তুলনা করা হয়। তাঁকে ইতিহাসে নারী সৈনিকদের সর্বশ্রেষ্ঠদের একজন হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি ছিলেন রাসূল (সা.)-এর একজন প্রিয়ভাজন সাহাবী।
খলিফা আবু বকর (রা.)-এর সময়ে ইসলামের ঝান্ডা উড়তে শুরু করলো দিকে দিকে। ইসলামের শৌর্যে-বীর্য ও চিরন্তন আবেদনে আকৃষ্ট নারী-পুরুষরা দলে দলে আসতে লাগলো দীনের পথে। সফল করে তুলেছিল ইসলামের জয়জয়কার। মার্শাল জি হাডসন তাঁর ‘রিথিংকিং ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রি’তে উল্লেখ করেছেন ‘ষোলো শতকে মঙ্গলগ্রহ থেকে কোনো দর্শনার্থী পৃথিবীতে এলে নিঃসন্দেহে ভাবতো মানব-পৃথিবী মুসলিম হওয়ার দ্বারপ্রান্তে।… সারা বিশ্ব তখন শাসন করছিল তিনটি সাম্রাজ্য- বলকান ও আনাতোলিয়াকেন্দ্রিক ওসমানী সাম্রাজ্য, ফার্টাইল ক্রিসেন্ট এবং ইরানের উচ্চভূমিজুড়ে বিস্তৃত সাফাভি সাম্রাজ্য এবং ভারতের মোগল সাম্রাজ্য’। নীলনদ আর অক্সাস অঞ্চলের বহু জাতি, বহু জনগোষ্ঠীর অবদানে সমৃদ্ধ থেকে সমৃদ্ধতর হয়ে বিশ্বে সমাদৃত হয়েছিল অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত। বিশ্বজুড়ে ইসলামের এ অবিশ্বাস্য অগ্রযাত্রায় পুরুষের পাশাপাশি নারীদেরও রয়েছে ব্যাপক শক্তিশালী ভূমিকা।
আবদুল হালীম আবু শুককাহ্ তাঁর ‘রাসূল (সা.)-এর যুগে নারী স্বাধীনতা’-১ম খণ্ডে বলেছেন, ‘মুসলিম পুরুষ ও নারীর পারস্পরিক সহযোগিতায় গড়ে ওঠে ইসলামী সমাজ। এখানে নারীকে পুরুষের বা পুরুষকে নারীর গোলামে পরিণত করা হয়নি। দুটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বতন্ত্র সত্তা। দুনিয়ায়ও স্বাধীন স্বতন্ত্র এবং কিয়ামতেও আল্লাহর সামনে সম্পূর্ণ স্বাধীন-স্বতন্ত্র সত্তা ও ব্যক্তি হিসেবে জবাবদিহি করার দায়িত্ব লাভ করবে।’ সর্বজনীন ব্যক্তিত্ব বিকাশ লাভের ধারাবাহিকতায় ইসলাম প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসেন নারীরা। তাঁরা প্রয়োজনে যুদ্ধ করেছেন, প্রশাসনিক কাজ করেছেন, চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন, হিজরত করেছেন সর্বোপরি ইসলামী সমাজ বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেছেন। যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী অসংখ্য মুসলিম নারী ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে রয়েছেন স্বমহিমায়। এদেরই একজন খাওলা বিনতে আল-আজওয়ার।
প্রারম্ভিক জীবন
খাওলা বিনতে আল-আজওয়ার ছিলেন আরবের খুব প্রভাবশালী বনু আসাদ গোত্রের আজওয়ার পরিবারের সন্তান। আজওয়ার পরিবার ব্যবসা-বাণিজ্যে যেমন সম্পদশালী, তেমনি বীরযোদ্ধা হিসেবেও বিখ্যাত। ইসলাম কবুল করার পর রাসূল (সা.)-এর মহব্বতে তাঁদের পরিবার ইসলামের খেদমতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। খাওলা বিনতে আল-আজওয়ার ছিলেন তাঁর পিতা ও ভাইয়েদের মতোই দুর্ধর্ষ যোদ্ধা ও কবি। তিনি সিরিয়া, জর্ডান, ফিলিস্তিন ও তুরস্কেও অধিকাংশ অঞ্চল জয়ে যুদ্ধে অংশ নেন এবং মুসলিম বিজয়ে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। ৬৩৪ খ্রিস্টাব্দের ‘সানিতা উল উকাব’ যুদ্ধ, ৬৩৬ সালে ‘বাইজানটাইন যুদ্ধ’সহ অসংখ্য যুদ্ধে সম্মুখ সমরে লড়াই করেন বীরত্বের সাথে। আল্লামা ইবনে কাসির, আল্লামা জারকানি (রহ.) গবেষক আইমান জাগুল ও আল্লামা ওয়াকেদি উল্লেখ করেছেন সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী খাওলা বিনতে আজওয়াজার এর নাম।
সামরিক প্রশিক্ষণ
খাওলা বিনতে আজওয়ার ভাই দিরার বিন আল-আজওয়ার ছিলেন বনু আসাদ গোত্রের একজন বিখ্যাত সেনাপতি। খাওলা তাঁর ভাইয়ের কাছে পারিবারিক পরিবেশেই শেখেন অস্ত্র চালনা, সমরবিদ্যা। বিভিন্ন যুদ্ধে ভাইয়ের সাথেই সামরিক প্রশিক্ষণ ও যুদ্ধের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। ৬৩৪ সালে সানিতা উল উকাবের যুদ্ধে দামেস্ক অবরোধের সময় মুসলিম বাহিনীর পরিচালক খালেদ বিন ওয়ালিদ। দামেস্ক ছিল বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর এরবং পরিচিত ছিল ‘সিরিয়র বেহেশত’ হিসেবে। ছয়টি মজবুত প্রতিরক্ষা গেট দিয়ে শহরটি ছিলো সুরক্ষিত… বাব শারকি, বাব তামা, বাব আল জাবিয়া, বাব আল ফারদিস, বাব কিসান এবং ছোট গেট বাব আল সাগির। দেয়ালের উত্তর পাশ দিয়ে প্রবাহিত হতো বারাদা নদী। খালেদ বিন ওয়ালিদ সৈন্যবাহিনীকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে চার-পাঁচ হাজার সৈন্যের কমান্ডার নিযুক্ত করেন। খাওলার ভাই দিরার বিন আল আজওয়ার চার হাজার অশ্বারোহী নিয়ে গেটগুলোর মধ্যবর্তী স্থানে টহল দেন এবং বাইজান্টাইন সৈন্যদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত থাকেন। যুদ্ধের এক পর্যায়ে সেনাপতি দিরার বিন আল-আজওয়ার বাইজান্টান সেনাবাহিনীর হাতে আহত ও বন্দী হন। খালিদ বিন ওয়ালিদ তাঁকে উদ্ধার করার জন্য নিজ বাহিনী নিয়ে অগ্রসর হন। এ সময়ে প্রত্যক্ষ করেন, ঝড়ের গতিতে বাইজান্টান বাহিনীকে তীব্র আক্রমণে পর্যুদস্ত করে দিচ্ছে এক উষ্ট্র-সরোয়ার, সঙ্গে তার অনুগত বাহিনী। যুদ্ধ-সৈনিকের পোশাকে থাকায় তাকে নারী বলে কেউ বুঝতে পারেনি। তিনি বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে ভাই দিরার বিন আল-আজওয়ারকে উদ্ধার করেন। এই যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী বিজয় লাভ করে। খাওলা (রা.)-এর অসাধারণ যুদ্ধ নৈপুণ্য ও সাহস সকলকে অবাক করে। যুদ্ধ শেষে খালিদ খাওলাকে রক্তাক্ত অবস্থায় খুঁজে পান এবং তাঁর পরিচয় জানতে চান। প্রথমে অসম্মতি জানালেও শেষ পর্যন্ত তিনি নিজের পরিচয় প্রকাশ করেন। খালিদ (রা.) পৌঁছানোর পূর্বে মুসলিম সৈন্যরা তাঁকেই সেনাপতি খালেদ (রা.) ভেবেছিলেন। দুর্ধর্ষ যোদ্ধা হিসেবে তাঁর সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। সেনাপতি শুরাহবিল ইবনে হাসানা খাওলা (রা.) সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘এই যোদ্ধা খালিদ বিন ওয়ালিদের মতোই যুদ্ধ করে; কিন্তু আমি নিশ্চিত যে সে খালিদ নয়। ৬৩৬ খ্রিস্টাব্দে ইয়ারমুকের যুদ্ধ হয় বর্তমান সিরিয়া-জর্ডান সীমান্তে। ঐতিহাসিক বিবরণ অনুসারে এ যুদ্ধেও খাওলা (রা.) অংশগ্রহণ করেন এবং বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেন [ফুতুহ আল-শাম]। পুরুষদের মতোই তিনি যুদ্ধবর্ম পরে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করেন এবং তলোয়ার হাতে বহু শত্রুকে পরাস্ত করেন।
অসাধারণ সাহস ও দূরদর্শিতা
খাওলা আজওয়ার যুদ্ধপরিচালনায় দূরদর্শিতার স্বাক্ষর রেখেছিলেন। অকুতোভয় এ সেনাপতির মতোই তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্যদের উদ্দেশ্যে অনুপ্রেরণামূলক ভাষণ দিতেন। যেমনÑ ‘হে মুসলিম সৈনারা! মৃত্যুকে ভয় করো না, বিজয় আল্লাহর হাতে।’ রাসূল (সা.) তাঁর প্রশংসা করে বলেছেন, ‘তিনি আরব নারীদের মধ্যে অন্যতম সাহসী’। [ইবনে কাসীর, আল-বিদায়াওয়ান নিহায়া, খণ্ড ০৭, আল-যাহাবি]।
খলিফা উমর (রা.) খাওলা (রা.) এর সহসিকতা ও দক্ষতার প্রশংসা করেছেন। ইতিহাসবিদ আল যাহাবি তাঁর নেতৃত্বের প্রশংসা করে ‘আরবের জেনারেল’ উপাধি দিয়েছেন। খাওলা (রা.) ছিলেন অশ্বারোহন, তীরন্দাজি ও তলোয়ার চালনায় সুদক্ষ। মুসলিম বাহিনীর বিজয় এনে দিতে তিনি জান কুরবান করে লড়তেন। ইসলামের প্রাথমিক বিস্তারে তাঁর ভূমিকার কথা সব ইতিহাসবিদগণ উল্লেখ করেছেন।
ইয়ারমুক যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে খাওলা (রা.)সহ বহু মুসলিম নারী রোমানদের হাতে বন্দি হন। তাঁকে অন্য বন্দিদের সঙ্গে শত্রুদের তাঁবুতে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর তাঁকে রোমান সেনাপতির তাঁবুতে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করা হয়। তখন তিনি বন্দি সব নারীদের সংগঠিত করে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। নারী বন্দিরা তাঁবুর খুঁটিগুলো অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে রোমান সৈন্যদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। আল ওয়াকিদির মতে, তাঁরা ৩০ জন রোমান সেনাকে হত্যা করেন। এক খ্রিস্টান অধিনায়ক খাওলা (রা.)-কে বন্দি অবস্থায় বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল। তিনি তাকেসহ মোট পাঁচজন সেনাকে পিটিয়ে একাই হত্যা করেন। খাওলা বিনতে আজওয়ার মুসলিম সামরিক বীর নারীরূপে ইতিহাসে স্মরণীয় ও বরনীয়। মধ্যযুগের আরব সাহিত্যে ও লোক-গাথায় খাওলা নারী-বীরত্বের প্রতীক হয়ে ওঠেন।
সৌদি আরব সরকার তাকে আখ্যায়িত করেছেন ‘জাতীয় বীর’ হিসেবে। ‘জাতীয় বীর’ নারী হিসেবে তিনি অতুলনীয় মর্যাদায় সমাদৃত। তার নামাঙ্কিত বহু প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সৌদি আরবে খাওলা বিনতে আজওয়ার (রা.)-এর নামে স্কুল, কলেজ, রাস্তা, ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে নারীদের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘খাওলা বিনতে আল আজওয়ার সামরিক ট্রেনিং কলেজ।’
অসাধারণ সাহস, রাজনীতিক প্রজ্ঞা ও মেধায় ইসলামের প্রাথমিক যুগে নারীরা রাষ্ট্রে, সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আরব ও তুর্কিরা যোদ্ধা জাতি। তাদের নারীরাও সমানতালে যুদ্ধ ও অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ নিতো। আবার হৃদয়াবেগেও তারা অতুলনীয়। প্রায় প্রত্যেকেই নিজেদের বংশ গরিমার শ্লোক, কাব্য ইত্যাদি মুখে মুখে রচনা করতেন। খাওলা বিনতে আজওয়ার ছিলেন গুণী কবি। যেকোনো সামাজিক অনুষ্ঠান উপলক্ষে তারা সামাজিক কবিতা চর্চার আয়োজন করতেন। যুদ্ধে, শত্রু দমনে উদ্দীপনমূলক কবিতা রচনা করে তা স্লোগান দিতেন। যুগ যুগ ধরে সমাজ বিনির্মাণে বীর খাওলা রা.-এর মতো মহীয়সী নারীরা রেখেছেন অসামান্য অবদান।
তথ্যসূচি :
১. মার্শাল জি হাডসন : রিথিংকিং ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রি, পৃষ্ঠা-১৫৩, ১৫৫ , ভাষান্তর : রাকিবুল হাসান, ইলহাম প্রকাশনা, ২০২৩ ।
২. আবদুল হালীম আবু শুককাহ্ : ’রাসূলের (সা.) যুগে নারী স্বাধীনতা’, অনুবাদ : (কয়েকজন ) ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-প্রসঙ্গ কথা, সম্পাদনা : আবদুল মান্নান তালিব, ২য় সংস্করণ, বিআইআইটি—২০১১।
৩. ইবনে কাসীর, আল-বিদায়াওয়ান নিহায়া, খণ্ড ৭, আল-যাহাবি।