জামায়াত আমীরের যুক্তরাষ্ট্র সফর

ভারতের সাথে সম্পর্ক হবে পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে : ডা. শফিকুর রহমান


৩০ অক্টোবর ২০২৫ ১৩:৫৩

গত ২৬ অক্টোবর রোববার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টায় কোয়ালিশন অব বাংলাদেশি আমেরিকান এসোসিয়েশন (কোবা) আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনায় বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান

সোনার বাংলা ডেস্ক : জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমানের যুক্তরাষ্ট্র সফর ৫ আগস্ট বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইতিবাচক সূচনা বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তিনি সেখানে বিভিন্ন নাগরিক সংবর্ধনাসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জামায়াতে ইসলামীর আমীরের এ সফর বেশ তাৎপর্যময়। বিশেষ করে গত বছরের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে অন্তর্বর্তী সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের এক ধরনের ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা বেশ কয়েকবার জামায়াতের আমীর ও দলটির নেতা-নেত্রীদের সঙ্গে সাক্ষাৎও করেছেন।
আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে হতে পারে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। অন্তর্বর্তী সরকারের এমন প্রতিশ্রুতিতে দৌড়ঝাঁপ বেড়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ ও তাদের জোটভুক্ত দলগুলো ছাড়া ভোটের মাঠে সরব বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও অন্য দলগুলো। মাঠ গরম করছে নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি)। আমীরে জামায়াতের এ সফর আরো যে কারণে তাৎপর্যময়, তা হলোÑ বিগত ১৭ বছর জামায়াতে ইসলামীকে প্রকাশ্য কোনো তৎপরতা চালাতে দেয়নি ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার। জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় অফিসে পুলিশ তালা লাগানোর পরও কয়েকবার বিভিন্ন দূতবাসের কর্মকর্তারা নেতাদের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে আসার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন। সাক্ষাতের স্থান হিসেবে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের কথাও বলা হয়েছিল, কিন্তু ফ্যাসিস্ট সরকার কোনো নিরাপত্তা দেবে না বলার পর তা সম্ভব হয়নি। বহির্বিশ্বে জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে অপপ্রচার মিশন খুলে জনগণের ট্যাক্সের টাকায় বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে। সেই দুর্দিন কাটিয়ে জামায়াতে ইসলামী কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে ইতিবাচক ইমেজ গড়তে সফল হয়েছে। এ সফর সেই সাফল্যের মুকুটে একটি পালক বলে মনে করে বিশ্লেষকরা।
ওমরাহ পালনের উদ্দেশে গত ১৯ অক্টোবর সৌদি আরব যান ডা. শফিকুর রহমান। এরপর সেখান থেকে ২২ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যান তিনি। ঐ দিনই নিউইয়র্কে এক মতবিনিময় সভায় যোগ দেন জামায়াত আমীর।
আমীরে জামায়াত হিসেবে প্রথম সফর
জামায়াতে ইসলামীর আমীর হিসেবে ডা. শফিকুর রহমানের এটি প্রথম যুক্তরাষ্ট্র সফর। জামায়াত আমীরের যুক্তরাষ্ট্র সফরের কারণ জানতে চাইলে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘এটা সম্পূর্ণ সাংগঠনিক সফর। যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন কিংবা কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে দেখা করার কোনো কর্মসূচি নেই। সাংগঠনিক কাজ শেষে তিনি ফিরে আসবেন।’
আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দলীয় কাজ ছাড়াও জামায়াতে ইসলামীর আমীরের যুক্তরাষ্ট্র সফরে দলের বিশেষ উদ্দেশ্য থাকতে পারে। বাংলাদেশে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এর কূটনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। এ সফরে জামায়াত হয়তো ওয়াশিংটন বা লন্ডনের নীতিনির্ধারক মহলে তাদের বার্তা পৌঁছাতে পারে। তখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে এর প্রভাব পড়তে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক মুহাম্মদ রুহুল আমীন বলেন, ফেব্রুয়ারিতে যেহেতু নির্বাচন হচ্ছে, তার আগে বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি দুটি দেশে একটি রাজনৈতিক দলের প্রধানের সফর অনেক গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে জামায়াতের সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক অত্যন্ত শক্তিশালী। সেখানে নির্বাচনের আগে তাদের সাংগঠনিক কাজ, পরিকল্পনা ও নির্বাচনকেন্দ্রিক কর্মসূচি তারা করতে পারে।
নিউইয়র্কে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় আমীরে জামায়াত
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা যদি দেশ পরিচালনার সুযোগ পাই, তাহলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক হবে পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে। তিনি বলেন, ‘মানুষ নিজের জায়গা বদলাতে পারে, কিন্তু প্রতিবেশী বদলাতে পারে না। আমরা আমাদের প্রতিবেশীকে সম্মান করতে চাই এবং একইভাবে প্রতিবেশীর কাছ থেকেও সম্মান প্রত্যাশা করি।’
গত ২২ অক্টোবর বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় জামায়াত আমীর সপ্তাহব্যাপী যুক্তরাষ্ট্র সফরের প্রথম দিনে নিউইয়র্কে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় অংশ নেন। সেখানে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। জামায়াতে ইসলামীর একটি সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে। এ সভায় নিউইয়র্কে অবস্থানরত বাংলাদেশি সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
মতবিনিময় সভায় ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের চেয়ে ভারত আয়তনে ২৬ গুণ বড়। তাদের সম্পদ ও জনশক্তি আমাদের তুলনায় অনেক বেশি। আমরা তাদের অবস্থান বিবেচনায় সম্মান করি। তবে আমাদের ছোট ভূখণ্ড ও প্রায় ১৮ কোটি মানুষের অস্তিত্বকেও তাদের সম্মান করতে হবেÑ ‘দিস ইজ আওয়ার ডিমান্ড।’ যদি তা হয়, তাহলে দুই প্রতিবেশী শুধু ভালোই থাকব না, বরং এক প্রতিবেশীর কারণে অন্য প্রতিবেশীও বিশ্বদরবারে সম্মানিত হবে।’
ভিন্ন ধর্মের মানুষের অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে জামায়াত আমীর বলেন, ‘গত প্রায় দেড় বছরে আমাদের কার্যক্রমের মধ্য দিয়েই আমরা এর জবাব দিয়েছি। একটা বিষয় পরিষ্কারভাবে বলতে চাই, গত ৫৪ বছরে বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের অভিবাসন ঘটেছে, মুসলমানদেরও। আমরা জোর করে কোনো কিছু বন্ধ করার পক্ষেও নই, আবার জোর করে কাউকে দেশ থেকে তাড়ানোর পক্ষেও নই।’
তিনি আরো বলেন, “আমরা ‘মেজরিটি’ ও ‘মাইনোরিটি’ ধারণায় বিশ্বাস করি না। আমরা বলি, ‘উই নিড ইউনিটি’। মেজরিটি-মাইনোরিটি বলা মানেই বিভাজন তৈরি করা, যা এক দলকে অন্য দলের মুখোমুখি দাঁড় করায়। গত ৫৪ বছর ধরে আমরা এর ভয়াবহতা দেখেছি। আমরা আর তা দেখতে চাই না।”
জামায়াত আমির বলেন, ‘আমাদের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও সভ্যতার ভিত্তিতে যুগের পর যুগ মিলেমিশে বসবাসের যে ঐতিহ্য আমরা গড়ে তুলেছি, সেটিকেই পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চাই। যে কয়েকটি কালো দাগ পড়েছে, সেগুলো উপড়ে ফেলব, ইনশাআল্লাহ। যাতে দল ও ধর্মের বিভাজনে জাতি আর বিভক্ত না হয়।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা অনুভব করি, কেউ যদি গত ৫৪ বছরে অন্য কারো সম্পত্তি অবৈধভাবে দখল করে থাকে এবং তার প্রমাণ থাকে, তবে আমরা সেই সম্পত্তি ফেরত দেওয়ার পক্ষে, এটিই আমাদের অবস্থান।’
জামায়াত ক্ষমতায় গেলে মায়েদের কর্মঘণ্টা হবে ৫
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে স্থানীয় সময় গত ২৬ অক্টোবর রোববার রাতে কোয়ালিশন অব বাংলাদেশি আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন নামক একটি সংগঠনের উদ্যোগে এক গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি নারীদের অনেক কঠিন দায়িত্ব পালন করতে হয় বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘জামায়াত ক্ষমতায় গেলে মায়েদের কর্মঘণ্টা কমানো হবে। পুরুষ বাইরে ৮ ঘণ্টা কাজ করলে, নারীদের জন্য তা ৫ ঘণ্টাই ইনসাফ।’
শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা যদি সুযোগ পাই, মায়েদের বাড়তি আরেকটু সম্মান করব, সেটা হবে তাদের প্রতি ইনসাফ। একজন মা সন্তান জন্ম দিচ্ছেন, লালন-পালন করছেন; আবার ক্ষেত্রবিশেষে তিনি একজন পেশাজীবী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। আমারও ৮ ঘণ্টা, তারও ৮ ঘণ্টা, এটা কি অবিচার নয়?’
তিনি বলেন, ‘আমরা ক্ষমতায় গেলে ইনশাআল্লাহ তাদের কর্মঘণ্টা কমিয়ে দেব। মা হিসেবে সন্তানের হক আদায় করার জন্য এবং মা হিসেবে তাকে সম্মান করার জন্য। আমরা যদি ৮ ঘণ্টার জায়গায় ৫ ঘণ্টা করি, তাহলে মায়েরা এতই কমিটেড যে; তারা চিন্তা করবে সরকার যে সম্মান আমাদের দিয়েছে, আমাদের উচিত ৮ ঘণ্টার কাজ ৫ ঘণ্টায় সেরে ফেলা।’ বর্তমান সরকারের কাছে তিনি দাবি জানান, ‘বিচার বিভাগের প্রতি আস্থা ফেরাতে দৃশ্যমান কয়েকটি রায় দিতে হবে।’ জামায়াত ক্ষমতায় গেলে বিচার অব্যাহত রাখবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কোনো নিরপরাধ মানুষ শাস্তি পাবেন না।’
শুধু রেমিট্যান্স নয়, দেশের উন্নয়নে প্রবাসী মেধাবীদেরও ফিরিয়ে আনতে হবেÑ প্রবাসীদের প্রতি এমন আহ্বানও জানান জামায়াত আমীর। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের তরুণরা বিভিন্ন দেশে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করছে। সে সমাজের উন্নয়নে তারা অভূতপূর্ব ভূমিকা রাখছে। আমরা এ মানুষগুলোর থেকে একটা অংশ অন্তত বাংলাদেশে ফেরত চাই।’