শহীদ আবদুল মালেকের স্বপ্নের বাস্তবায়ন সময়ের অপরিহার্য দাবি
১২ আগস্ট ২০২৬ ১৯:১১
শহীদ আবদুল মালেক এদেশের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছেন পরম ভালোবাসা আর শ্রদ্ধায়। ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়ের প্রাণ রসায়ন বিভাগের মেধাবী ছাত্র এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র আন্দোলনের প্রথমসারির নেতা ছিলেন শহীদ আবদুল মালেক। ১৯৬৯ সালের ১২ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ (নিপা) আয়োজনে ছাত্র-শিক্ষক মিলনায়তন ভবনে (বর্তমান ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ) শিক্ষানীতির ওপর একটি সেমিনার আয়োজন করা হয়েছিলো। সেখানে আবদুল মালেক সেক্যুলার ও সমাজতান্ত্রিক শিক্ষাব্যবস্থার অসারতা তুলে ধরে ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার পক্ষে এক জোরালো ও যৌক্তিক বক্তব্য উপস্থাপন করেছিলেন। তার বক্তব্য উপস্থিত সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিলো। ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থার পক্ষে ছাত্র-জনতার সমর্থন বাড়ানোর কারণে আবদুল মালেকের এই আদর্শিক ও যৌক্তিক বিজয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিল প্রতিপক্ষ ধর্মনিরপেক্ষ ও বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীরা।
সেমিনার শেষে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এলাকায় তার ওপর লাঠি, লোহার রড ও ভারী অস্ত্র দিয়ে মারাত্মক ও নৃশংস হামলা চালানো হয়। হামলায় তার মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে। মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তিন দিন চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় অবশেষে ১৫ আগস্ট তিনি শাহাদাতবরণ করেন। এ ভূখণ্ডের ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাসে প্রথম শহীদের মর্যাদা লাভ করেন তিনি।
অবশ্য এর আগে ১৯৪৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে উগ্রপন্থী সাম্প্রদায়িক হিন্দুদের ছুরিকাঘাতে শাহাদাতবরণ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র নজির আহমদ। তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম শহীদ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মধ্যে প্রথম শহীদ। আবদুল মালেক ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের প্রথম শহীদ। শাহাদাতের সময় আবদুল মালেক তৎকালীন নিখিল পাকিস্তান ছাত্রসংঘের কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদ সদস্য ছিলেন। তার এই আত্মত্যাগের দিনটিকে স্মরণ করে প্রতি বছর ১৫ আগস্ট বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন ‘ইসলামী শিক্ষা দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছে। তাই এই দিনটি এলে প্রতি বছর ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার পক্ষে দাবি জোরালো হয়। এ দাবির পক্ষে সভা, সেমিনারের আয়োজন করা হয়। কিন্তু দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের প্রাণের দাবি ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা আজও অধরাই রয়ে গেছে।
আমরা বিশ্বাস করি, ২০২৪-এর জুলাই বিপ্লবের পর এ দাবির যৌক্তিকতা এবং এর পক্ষে ছাত্র-জনতার সমর্থন আরো বেড়েছে। আত্মা, মনন ও শরীরের সুসমন্বিত বিকাশ শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য। নিরপেক্ষভাবে বিচার করলে এ কথা মানতেই হবেÑ ইসলামী ও নৈতিক শিক্ষা ছাড়া তা সম্ভব নয়। বস্তুবাদী শিক্ষাব্যবস্থা মানুষকে দক্ষ ও যোগ্য যান্ত্রিক কর্মী করে গড়ে তুলতে পারলেও, মানবিক উন্নয়নের মাধ্যমে ঈমানদার, সৎ, দক্ষ ও যোগ্য মানুষ তৈরিতে অক্ষম- এ কথা আজ প্রমাণিত সত্য। অথচ আত্মা, মনন ও শরীরের সুসমন্বিত বিকশিত জনশক্তি ছাড়া ঘুষ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও বৈষম্যমুক্ত ইনসাফের বাংলাদেশ গড়া সম্ভব নয়। আমরা সবাই জানি, জুলাই বিপ্লব হয়েছে উল্লেখিত লক্ষ্য পূরণের মাধ্যমে একটি উন্নত, সমৃদ্ধ দেশ গড়ার জন্য।
তাই আমরা মনে করি, শহীদ আবদুল মালেকসহ ইনসাফের বাংলাদেশের জন্য যুগে যুগে যারা আত্মত্যাগ করেছেন, তাদের সেই স্বপ্ন পূরণ করার দায়িত্ব সরকার, বিরোধীদল, নাগরিক সমাজ; এককথায় আমাদের সবার।
শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আত্মিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক গোলামি থেকে মুক্তির যে স্বপ্ন নিয়ে শহীদ আবদুল মালেক জীবন উৎসর্গ করেছেন, তার শাহাদাতের অর্ধেক শতাব্দীরও বেশি সময় পার হলেও এ জাতি সেই কাক্সিক্ষত শিক্ষাব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ রূপ দেখতে পায়নি। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে সেই স্বপ্নের প্রাসঙ্গিকতা ও গুরুত্ব পুনরায় নতুন মাত্রা পেয়েছে, এতে সন্দেহ নেই। নতুন সময় এ বার্তাই ঘোষণা করছে।
তাই আমরা বিশ্বাস করি, এ সময়ের অপরিহার্য দাবি শহীদ আবদুল মালেকের স্বপ্নের ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তবায়ন। কারণ তাছাড়া নৈতিকভাবে বলীয়ান, প্রযুক্তিতে দক্ষ এবং নিজ বিশ্বাস, আদর্শ ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল এক নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন কোনোদিন পূরণ হবে না।