প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফর, উদ্বেগ দিল্লির

প্রত্যাশা ও অর্জনে বিস্তর ফাঁক?


২৫ জুন ২০২৬ ০৯:৫৯

॥ ফারাহ মাসুম ॥
দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম সরকারি বিদেশ সফর হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীনকে বেছে নেয়া কেবল প্রথাগত কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার এবং আঞ্চলিক কৌশলগত অবস্থানের একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ। দেশ যখন রিজার্ভ সংকট, মূল্যস্ফীতি এবং কর্মসংস্থানের তীব্র চ্যালেঞ্জ পার করছে, তখন এই সফরের মূল লক্ষ্য ছিল বিনিয়োগ আকর্ষণ, থমকে থাকা শ্রমবাজার সচল করা এবং মেগা প্রকল্পের অর্থায়ন নিশ্চিত করা। তবে উচ্চপর্যায়ের এই দ্বিপাক্ষিক দৌড়ঝাঁপের পর প্রাপ্তির খতিয়ান মেলালে দেখা যায়, প্রাথমিক প্রত্যাশার সাথে বাস্তব অর্জনের মধ্যে এখনো এক বিস্তর ফাঁক রয়ে গেছে।
বহুমাত্রিক সংকটের পটভূমি : সফরের প্রধান এজেন্ডা : নতুন সরকারের জন্য এই জোড়া সফর ছিল অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে স্বস্তি ফেরানো এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণের এক বড় পরীক্ষা। সফরের নেপথ্যে মূল চালিকাশক্তি ছিল চারটি প্রধান খাত-
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের অচলাবস্থা দূরীকরণ : ২০২৪ সালের মে মাসের পর সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় এবং শ্রমিক শোষণের অভিযোগে মালয়েশিয়া বাংলাদেশ থেকে নতুন কর্মী নিয়োগ স্থগিত করে। এই অচলাবস্থা ভাঙা ছিল সফরের সবচেয়ে জরুরি এজেন্ডা।
রিজার্ভ সংকট ও চীনা বিনিয়োগ : বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চলমান চাপ কমাতে চীনের কাছ থেকে বড় অঙ্কের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই), বিশেষায়িত শিল্প পার্ক স্থাপন এবং উৎপাদনমুখী খাতে সহযোগিতা নিশ্চিত করা ছিল অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
তিস্তা মহাপরিকল্পনার ভূরাজনৈতিক সমীকরণ : দীর্ঘদিনের ঝুলে থাকা তিস্তা মহাপরিকল্পনা এই সফরের একটি অন্যতম স্পর্শকাতর ও কৌশলগত ইস্যু। নীতিনির্ধারকদের আশা ছিল, চীনের প্রযুক্তি ও অর্থায়নে এই প্রকল্পের কাজ দ্রুত গতি পাবে।
নব্য পররাষ্ট্রনীতির ভারসাম্য পরীক্ষা : দিল্লি, বেইজিং, ওয়াশিংটন এবং মুসলিম বিশ্বের সাথে সমদূরত্ব ও সমান অংশীদারিত্বের এক নতুন ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ প্রদর্শন করাও ছিল এই সফরের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক লক্ষ্য।
মালয়েশিয়া সফর : আলোচনার টেবিল বনাম বাস্তব প্রাপ্তি : মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের বৈঠকটিতে অভিবাসন খাত সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পায়। নতুন কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করা, ডাটাবেজ তৈরি করে সিন্ডিকেট ভাঙা এবং অবৈধ অবস্থানকারীদের বৈধতা দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হয়।
অর্জনের সীমাবদ্ধতা : সফরের পর দুই দেশের সদিচ্ছার কথা জানানো হলেও শ্রমবাজার ঠিক কবে এবং কী প্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণ উন্মুক্ত হবে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট তারিখ বা যৌথ ঘোষণা আসেনি। ফলে তাৎক্ষণিক রেমিট্যান্সপ্রবাহ বৃদ্ধির যে প্রত্যাশা ছিল, তা এখনো আলোচনার টেবিলেই বন্দি রয়ে গেছে।
তবে ইতিবাচক দিক হলো, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পথ সুগম করতে দুই দেশের মধ্যে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও নিরাপত্তা সহযোগিতার বেশকিছু সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে। একইসাথে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বাড়াতে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) দ্রুত সই করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
চীন সফর : সমঝোতার খতিয়ান ও ঋণের শর্তের চ্যালেঞ্জ
বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াংয়ের সাথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠকটি নতুন সরকারের প্রতি চীনের ভূরাজনৈতিক আস্থার একটি বড় বহিঃপ্রকাশ। এই সফরে দুই দেশের সম্পর্ককে ‘কৌশলগত অংশীদারিত্ব’ থেকে আরও উচ্চ ধাপে নেওয়ার বার্তা দেওয়া হয়।
দিল্লির কৌশলগত উদ্বেগ ও কূটনৈতিক চাপ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফরকে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও সংবেদনশীল ভূরাজনৈতিক লেন্স দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেছে নয়াদিল্লি। নতুন সরকারের প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে বেইজিংকে বেছে নেওয়া এবং চীনের সাথে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা ভারতের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এক ধরনের কৌশলগত অস্বস্তি তৈরি করেছে।
তিস্তা প্রকল্পের ‘লালরেখা’ : ভারতের শঙ্কার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তিস্তা মহাপরিকল্পনা। শিলিগুড়ি করিডোর বা ভারতের ‘চিকেন নেক’-এর অতি সন্নিকটে তিস্তা প্রকল্পে চীনা অর্থায়ন, কারিগরি উপস্থিতি এবং তাদের প্রকৌশলীদের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানকে নয়াদিল্লি তাদের নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি বলে মনে করে। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, সফরের আগেই ভারতের পক্ষ থেকে এই প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততা সীমিত রাখার জন্য ঢাকার ওপর এক ধরনের অদৃশ্য মনস্তাত্ত্বিক ও কূটনৈতিক চাপ ছিল।
ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আধিপত্যের লড়াই : বঙ্গোপসাগরে চীনের সম্ভাব্য ভূকৌশলগত প্রবেশ বা নৌ-উপস্থিতির বিষয়ে ভারতের দীর্ঘদিনের উদ্বেগ রয়েছে। ঢাকা যাতে বেইজিংয়ের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই) বা অন্য কোনো মেগা প্রকল্পের আড়ালে ভারতের নিরাপত্তা বলয়কে বিঘ্নিত না করে, সে বিষয়ে নয়াদিল্লির তরফ থেকে কড়া নজরদারি ও কূটনৈতিক বার্তা দেওয়া হয়েছে। ফলে বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক সুবিধা নেওয়ার পাশাপাশি দিল্লির এই ভূরাজনৈতিক চাপ সামলানো ছিল ঢাকার জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ।
চীন-বাংলাদেশ নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সমীকরণ
অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য আলোচনার সমান্তরালে এই সফরের অন্যতম একটি নিভৃত, কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় ছিল চীনের সাথে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা। বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকীকরণের প্রধান উৎসই হলো চীন। ফলে নতুন সরকারের আমলেও এই সামরিক সম্পর্কের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা কৌশলগতভাবে জরুরি ছিল।
সহযোগিতার পরিধি : সফরে দুই দেশের মধ্যে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির আধুনিকীকরণ এবং সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে উচ্চপর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, সাইবার নিরাপত্তা ও কাউন্টার টেররিজম বা সন্ত্রাসবাদ দমনে যৌথ সক্ষমতা বাড়াতে একটি প্রটোকল ও অ্যাকশন প্ল্যানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
তবে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে বেইজিংয়ের সাথে সম্পর্কের গভীরতা বাড়াতে গিয়ে ঢাকাকে এক ধরনের কঠোর ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়েছে। চীন থেকে সামরিক লজিস্টিকস বা প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি নেওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের সংবেদনশীলতা এবং আমেরিকার ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজির (আইপিএস) যে নিরাপত্তা সমীকরণ রয়েছে, তা যেন ক্ষুণ্ন না হয়- সেদিকে সতর্ক নজর রাখতে হয়েছে। ফলে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে সহযোগিতার বার্তা থাকলেও কোনো বড় ধরনের কৌশলগত সামরিক জোট বা চুক্তির মতো সাড়াজাগানো পদক্ষেপ থেকে ঢাকা বিরত ছিল।
প্রত্যাশা ও অর্জনের ‘বিস্তর ফাঁক’ : একটি গভীর বিশ্লেষণ
সফর দুটির রাজনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম হলেও গভীর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বিশ্লেষণে তিনটি বড় ঘাটতি বা ‘ফাঁক’ স্পষ্ট হয়ে ওঠে-
১. শ্রমবাজারের সুনির্দিষ্ট রূপরেখার অভাব : মালয়েশিয়ার বাজারে অতীতে বারবার সিন্ডিকেটের কারণে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। এবারের সফরেও বাজার খোলার কোনো সুনির্দিষ্ট ‘টাইমলাইন’ বা যৌথ ইশতেহার না আসাটা কূটনৈতিক স্তরে এক ধরনের ধোঁয়াশা তৈরি করে।
২. চুক্তি বনাম অর্থছাড়ের অভিজ্ঞতা : চীনের সাথে অতীতেও বিলিয়ন ডলারের মেগা চুক্তি হয়েছিল, যার অনেকগুলোই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং ঋণের কঠোর শর্তের কারণে আজও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। এবারও স্বাক্ষরিত এমওইউগুলো কত দ্রুত বাস্তব অর্থছাড়ে রূপ নেবে, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে সংশয় রয়েছে।
৩. ভূরাজনৈতিক চাপের মুখে তিস্তা প্রকল্পের স্থবিরতা : তিস্তা মহাপরিকল্পনায় চীনের সম্পৃক্ততার বিষয়ে এই সফরে বিস্তারিত আলোচনা এবং নথিপত্র বিনিময় হলেও কোনো চূড়ান্ত বা বড় আর্থিক ঘোষণা এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। স্পষ্টতই দিল্লির কৌশলগত চাপ ও আপত্তির মুখে বাংলাদেশ এখানে অত্যন্ত সাবধানে পা ফেলছে। ফলে উত্তরবঙ্গের মানুষের যে তাৎক্ষণিক দৃশ্যমান অগ্রগতির প্রত্যাশা ছিল, তা পূরণে বড় ফাঁক রয়ে গেল।
ভূরাজনৈতিক বার্তা : কোনো একক অক্ষের ওপর নির্ভরতা নয়
এই সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে- নতুন বাংলাদেশ কোনো একক পরাশক্তির অক্ষের দিকে হেলে পড়বে না। একদিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রভাবশালী মুসলিম দেশ মালয়েশিয়ার সাথে সম্পর্ক জোরদার করা; অন্যদিকে বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার চীনের সাথে অর্থনৈতিক সমীকরণ বজায় রাখা পররাষ্ট্রনীতিতে ঢাকার পরিপক্বতারই পরিচয় দেয়ার চেষ্টা করে। বিশেষ করে চীন-ভারত প্রতিযোগিতার এই অঞ্চলে বাংলাদেশ যে নিজের জাতীয় স্বার্থকে সবার ওপরে রেখে ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়’ নীতির বাস্তব প্রয়োগ করতে চাইছে। কিন্তু এক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত কতটা সাফল্য আসে, সিটিই দেখার বিষয়।
শেষ কথা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে নতুন সরকারের প্রথম বৈদেশিক নীতিনির্ধারণী ‘অ্যাসিড টেস্ট’ বলা চলে। কূটনৈতিক দিক থেকে এই সফর বেইজিং ও কুয়ালালামপুরের সাথে সম্পর্কের এক নতুন যুগের সূচনা করেছে ঠিকই, কিন্তু সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক প্রত্যাশা ও ভূরাজনৈতিক জটিলতা উত্তরণের ক্ষেত্রে অগ্রগতি এখনো প্রাথমিক স্তরে।
কাগজে-কলমে হওয়া চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক কখনো দেশের রিজার্ভ বাড়াতে পারে না, যদি না তা মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়িত হয়। একইসাথে দিল্লির কৌশলগত চাপ সামলে চীনের সাথে প্রতিরক্ষা ও মেগা প্রকল্পের ভারসাম্য বজায় রাখা ঢাকার আমলাতান্ত্রিক ও কূটনৈতিক দক্ষতার আসল পরীক্ষা হবে। সেই পরীক্ষায় পাস করলেই কেবল প্রত্যাশা ও অর্জনের এই বিস্তর ফাঁক মুছে ফেলা সম্ভব হবে।