নাগরিকবান্ধব ঢাকা মহানগরী গড়ে তোলাই আমার অঙ্গীকার
২৫ জুন ২০২৬ ০৯:৫৬
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমীর মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন সাপ্তাহিক সোনার বাংলার সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আধুনিক, পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও নাগরিকবান্ধব ঢাকা মহানগরী গড়ে তোলাই আমার অঙ্গীকার। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন হারুন ইবনে শাহাদাত ॥ ছবি আব্দুল আজিজ ফারুকী
সোনার বাংলা : আপনি বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। ইসলামী ছাত্রশিবিরের দাওয়াত পেয়েছিলেন কার মাধ্যমে?
মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন : আমি ইসলামী ছাত্রশিবিরের দাওয়াত পেয়েছি এলাকার আমার বড় ভাইদের নিকট থেকে। তাদের উত্তম চরিত্র মাধুর্য, সুন্দর আচরণ আমাকে আকৃষ্ট করে। শুভাকাক্সক্ষী হিসেবে তারা আমার লেখাপড়ার খোঁজখবর নেয়ার মাধ্যমে যোগাযোগ বাড়তে থাকে। তারা আমাকে পবিত্র কুরআন-হাদীস অধ্যয়ন, নামাজ পড়ার গুরুত্ব বুঝিয়েছেন।
ইনসেট
এই সময়ের তরুণ নেতা মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন ১৯৭৫ সালে পূর্ব সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার মুড়িয়া ইউনিয়নের আষ্টঘরী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনীতি সচেতন এবং মানবহিতৈষী ছিলেন। ছাত্র রাজনীতির নানা ধাপ অতিক্রম করে মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন ২০০৪ ও ২০০৫ সালে দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি থেকে ছাত্রসমাজের নেতৃত্ব দিয়েছেন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমীর হওয়ার সুবাদে মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব।
মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনের ডাইনামিক নেতৃত্বের সুবাদে বর্তমান ঢাকা মহানগরীর লাখ লাখ মানুষ তাঁর বিভিন্ন সেবামূলক প্রজেক্টের আওতায় উপকৃত হচ্ছেন। দৃশ্যমান প্রজেক্ট সমূহের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- শিক্ষাকার্যক্রম প্রকল্প, স্বাস্থ্যসেবা প্রকল্প, নারী কর্মসংস্থান প্রকল্প, শ্রমিক কল্যাণ প্রকল্প, জাকাত ও ফিতরা প্রদান প্রকল্প, কর্জে হাসানা প্রদান প্রকল্প, ব্যবসায় অনুদান প্রদান প্রকল্প, দক্ষ যুবশক্তি গঠন প্রকল্প ইত্যাদি।
জনদরদি নেতা মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন স্বৈরাচারী খুনি হাসিনার কারাগারে দীর্ঘদিন বন্দি ছিলেন। অনেকবার রিমান্ডের মুখোমুখি হয়েছেন। তারপরও দমে যাননি! বরং যখনই সুযোগ পেয়েছেন স্বৈরাচারী খুনি হাসিনার সকল রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে; এমনকি গুম হয়ে যাওয়ার সমূহ ঝুঁকি নিয়েও তিনি মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। ২০১৯ সালে করোনা ভাইরাসের সময় বিপর্যস্ত মানুষকে চিকিৎসা সহায়তার জন্য চিকিৎসকদের সমন্বয়ে ‘স্বেচ্ছাসেবক টিম’ গঠন করে চিকিৎসাসেবা প্রদান; এমনকি বাড়ি বাড়ি গিয়েও অক্সিজেন সাপোর্টের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচনের জন্য প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করেছে। গত ২৩ জুন মঙ্গলবার সাপ্তাহিক সোনার বাংলার সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি ঢাকা সিটির উন্নয়নের চিত্রকল্প তুলে ধরেছেন।
***********************************
এভাবেই ইসলামী আন্দোলনের সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছি। তারপর একদিন নিজেকে তাদের মাঝে আবিষ্কার করেছি।
সোনার বাংলা : সেই বড় ভাইদের বিশেষ কারো নাম কি এ মুহূর্তে আপনার মনে পড়ছে?
মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন : মনে পড়ছে বর্তমানে একটি প্রাইভেট ব্যাংকের বড় কর্মকর্তা গউছ উদ্দিন এবং মরহুম হাফেজ নিজাম উদ্দিন ভাইয়ের কথা।
সোনার বাংলা : দেশে অনেক ছাত্র সংগঠন আছে। আপনি কেন ইসলামী ছাত্রশিবিরে যোগ দিয়েছিলেন। দাওয়াত পাওয়ার পর জেনেবুঝে যোগ দিয়েছিলেন নাকি আবেগে?
মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন : আলহামদুলিল্লাহ। মহান আল্লাহ রাব্বুল আমিনের শতকোটি শুকরিয়া আদায় করছি- তিনি আমাকে পাঠিয়েছেন একটি সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। তাই পারিবারিকভাবেই আল্লাহ রাব্বুল আলামিন, রাসূলে কারীম সা. ও সুমহান আদর্শ জীবনবিধান ইসলামকে জানার ও বোঝার সুযোগ পেয়েছি। অবশ্যই এ আদর্শের প্রতি এক আবেগময় ভালোবাসা জন্মসূত্রেই মনের গহিনে পোষণ করেছি। ইসলামী আন্দোলনের দাওয়াত পাওয়ার পর সেই ভালোবাসা ও আবেগের সাথে যোগ হয়েছে বিবেকের ডাক, সঠিক বুঝ ও উপলব্ধি। পবিত্র কুরআন-হাদীস গভীরভাবে অধ্যয়নের পর বুঝতে পেরেছি, ইসলামী আদর্শের আলোকে নিজের জীবন, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র আলোকিত করার জন্য নিজে কাজ করা এবং সবাইকে এ কাজে শরিক করতে দাওয়াতি কাজ করা একজন মুমিনের জন্য অবশ্য কর্তব্য, অর্থাৎ ফরজ।
সোনার বাংলা : ছাত্রজীবন শেষ করে জামায়াতে ইসলামীর সর্বোচ্চ দায়িত্বপূর্ণ কমিটি নির্বাহী পরিষদ এবং দেশের সবচেয়ে বড় শাখা ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমীরের দায়িত্ব পালন করছেন। এতবড় দায়িত্ব এবং ব্যক্তিগত জীবন কীভাবে আপনি সমন্বয় করেন।
মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন : আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, কারো নিয়ত পরিশুদ্ধ হলে আল্লাহর দীনের কাজে তিনি তাকে সরাসরি সাহায্য করেন। একজন মুমিনের অন্তরে সবসময় একটা পেরেশানি কাজ করে। তাই তারা আল্লাহর দীনকে তার জমিনে বাস্তবায়নের জন্য ইসলামী আন্দোলনের কাজকে এক নম্বরে রাখে। কবি মতিউর রহমান মল্লিকের ভাষায়, ‘এখনো মানুষ মরে পথের পরে/এখনো আসেনি সুখ ঘরে ঘরে/কী করে তাহলে তুমি নেবে বিশ্রাম/কী করে তাহলে ছেড়ে দেবে সংগ্রাম ॥’
আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, আমরা মানবতার মুক্তির জন্য ইসলামী আন্দোলন করি। এ কাজের সাথে আমার দুনিয়া-আখিরাতের কল্যাণ ও মুক্তি নিহিত। কিন্তু দুনিয়ার সব তাগুতি শক্তি আমাদের বিরুদ্ধে। তাই সাহস, বুদ্ধিমত্তা এবং সময়োপযোগী সঠিক পরিকল্পনা না নিয়ে যারা এ পথে নামবেন, তাদের সাফল্য তো আসবেই না, বরং ক্ষতির আশঙ্কা আছে। তাই ঈমানী চেতনা জাগ্রত করে প্রতিটি কাজের ক্ষেত্রে ‘সময়জ্ঞান’ এবং ‘পরিমিতিবোধ’ বজায় রাখলে ব্যক্তিগত জীবন ও ইসলামী আন্দোলনের কাজের মাঝে চমৎকার ভারসাম্য তৈরি করা সম্ভব। আমি সেই চেষ্টাই করি এবং সবসময় আল্লাহর সাহায্য কামনা করি। তাই এক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হয় না। আর অবশ্যই একটা কথা মনে রাখবেন- একজন সাধারণ মানুষ; যার ইসলামী আদর্শ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে শরিক হওয়ার সৌভাগ্য হয়নি। যিনি শুধু ব্যক্তি ও পরিবার নিয়ে ব্যস্ত। তার জীবনের সাথে একটি বিপ্লবী আদর্শ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের শপথের কর্মীর পার্থক্য থাকবেই। আমি আমার কাজের আলোকে জীবনের ছক সাজিয়ে আল্লাহর কাছে প্রতিনিয়ত সাহায্য কামনা করে পথ চলছি। আলহামদুলিল্লাহ, কোনো সমস্যা হচ্ছে না। বরং আমার অন্তরে আমি সর্বদা আল্লাহ ও রাসূল সা. ভালোবাসায় সিক্ত ফল্গুধারার এক আত্মিক প্রশান্তি অনুভব করি।
সোনার বাংলা : ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে আপনার শুধু সক্রিয় অংশগ্রহণ নয়, নেতৃত্বে ছিলেন, সেই সময়ের কোন স্মৃতি আপনাকে সবচেয়ে বেশি আবেগতাড়িত করে।
মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন: নিঃসন্দেহে এদেশের ইতিহাসের কয়েক শতাব্দীর মধ্যে সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা ২০২৪-এর জুলাই বিপ্লব। আলহামদুলিল্লাহ। এ বিপ্লবে আমি সক্রিয়ভাবে ভূমিকা পালনের সুযোগ পেয়েছি। তবে কোনো দিনই আমি মনে করি না, এটি শুধু আমার বা আমাদের বিজয়। এ বিজয় শুধু আমরাই এনেছি- এ কথাও আমরা মনে করি না। আমাদের সম্মানিত দায়িত্বশীল জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমানের ভাষায় আমি আপনার এ প্রশ্নের উত্তরে বলতে চাই, ‘২৪-এর গণআন্দোলনে কোনো নেতাই মাস্টারমাইন্ড নন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে কোনো মাস্টারমাইন্ড মানি না। অনেকে আবার নিজেরা আন্দোলনের কৃতিত্ব দাবি করে বলে, আমি মাস্টারমাইন্ড, অমুক ভাই মাস্টারমাইন্ড, তমুক নেতা মাস্টারমাইন্ড। মহাপরিকল্পনাকারী মহান রাব্বুল আলামিনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়েছে। এখানে কোনো মাস্টারমাইন্ড আমরা বিশ্বাস করি না।’
কোন স্মৃতি আপনাকে সবচেয়ে বেশি আবেগতাড়িত করে? আপনার এ প্রশ্নের উত্তর এককথায় দেয়া সম্ভব নয়। কারণ জুলাই বিপ্লবের বীজ রোপিত আছে অনেক গভীরে। এর সূচনা হয়েছে ২০২৪-এর অনেক আগে। ২০২৪-এর জুলাইয়ে চূড়ান্ত পরিণতি বা বিজয় এসেছে। কিন্তু ইতিহাসের নিন্দিত ঘটনা এক-এগারোর অনেক আগেই সেই ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরে রাজধানীর পল্টনের রক্তাক্ত পথই এ বিপ্লবের রেখাচিত্রের প্রথম সিঁড়ি- এতে কোনো সন্দেহ নেই।
তাই কোনো একটি স্মৃতি বলা আমার জন্য কঠিন। ২৮ অক্টোবরের শহীদদের প্রত্যয়দীপ্ত মুখ, জুডিশিয়াল কিলিংয়ে শহীদ সাবেক আমীরে জামায়াত ও সাবেক মন্ত্রী মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লা, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, নির্বাহী পরিষদ সদস্য মীর কাসেম আলী এবং কারাগারে নির্যাতনে শহীদ ভাষাসৈনিক ডাকসুর সাবেক জিএস ও সাবেক আমীরে জামায়াত অধ্যাপক গোলাম আযম, বিশ্বখ্যাত কুরআনের পাখি মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, হাদীসবিশারদ সাবেক মন্ত্রী মাওলানা একেএম ইউসুফ, মাওলানা আবদুস সুবহান, অধ্যাপক নাজির আহমদ থেকে নিয়ে আবু সাঈদ, মুগ্ধ, আনাসসহ প্রায় দুই হাজার শহীদ এবং এখনো যারা পঙ্গুত্ব নিয়ে বেঁচে আছেন- এমন শত শত স্মৃতিই আমাকে আবেগতাড়িত করে, বিবেককে জাগিয়ে বলে- ‘ন্যায় ও ইনসাফ কায়েমের এ সংগ্রামে সেলিম তুমি এগিয়ে চলো, শহীদি ঈদগাহে তোমাকে প্রয়োজন। পেছনে পড়ে থাকার সময় ও সুযোগ কিছুই তোমার নেই।’ একটি বক্তব্য বা ঘটনা আমাকে বিশেষভাবে আবেগতাড়িত করে।
সোনার বাংলা : কী সেই ঘটনা?
মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন : ২০২৪-এর ১৭ জুলাই রাত ১টায় উত্তরায় বর্তমান সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার সাহেবের বাসায় আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান জুলাই আন্দোলন নিয়ে আমাদের যে তাৎপর্যপূর্ণ দিকনির্দেশনা ও গাইডলাইন দিয়েছেন, তা যুগ যুগ ধরে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি আমাদের সেদিন বলেছিলেন, ‘এ আন্দোলনের পরিণতি কী হবে, তা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনই ভালো জানেন। তবে যারা এখনো আহত হচ্ছেন এবং শহীদ হয়েছেন, সবাই আমাদের সম্পদ। তাদের দলীয় সংকীর্ণ পরিচয়ে দেখলে চলবে না।’ তিনি সেদিন তাদের চিকিৎসা ও পরিবারের পুনর্বাসনে দ্রুত পাশে দাঁড়ানোর জন্য আমাদের সবার প্রতি আহ্বান জানান। তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে দিকনির্দেশনার আলোকে আমরা আন্দোলন সফল করতে ঝাঁপিয়ে পড়ি। আরেকটি ঘটনা না বললেই নয়। কারণ আমি মনে করি, ২০২৪-এর আন্দোলনের বিজয়ের অন্যতম কারণ এ ঘটনা। সেদিন থেকেই আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়। দলে দলে সর্বস্তরের মানুষ তীব্র অথচ শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ শুরু করে। হাসিনা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। ৩৬ জুলাই বিপ্লব ধরা দেয় বিজয় নিশান উড়িয়ে।
সোনার বাংলা : আপনি কি মনে করেন জুলাই বিপ্লবের সুফল জাতি পাচ্ছে?
মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন : এ কথা মনে করার কী কোনো কারণ আছে। যেখানে জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
সোনার বাংলা : জুলাই বিপ্লবের ফসল ঘরে তুলতে আপনারা কতটা সফল হয়েছেন। শতভাগ ফসল তুলতে হলে কী করতে হবে। এ ব্যাপারে জনগণের উদ্দেশে আপনার মেসেজ কী?
মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন : আমাদের পক্ষ থেকে এবং দেশের ১৮ কোটি মানুষের পক্ষ থেকে আমীরে জামায়াত ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান ন্যায়-ইনসাফ ও বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার যে মেসেজ দিয়েছেন। জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমূল পরিবর্তন এবং নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে চিত্রকল্প জাতির সামনে তুলে ধরেছেন, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে জনগণকে সাথে নিয়ে আমাদের সবার কাজ করতে হবে। সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও সমৃদ্ধ দেশ গড়ায় আত্মনিয়োগ করতে হবে। আমাদের আরেকটি অনিবার্য বিপ্লবের প্রস্তুতি নিতে হবে।
সোনার বাংলা : বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আপনাকে ঢাকা মহানগরী উত্তরের মেয়রের পদে নমিনী করেছে। বিজয়ের ব্যাপারে আপনি কতটা আশাবাদী।
মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন : মহান আল্লাহ তায়ালার ফয়সালায় প্রিয় সংগঠনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও জনগণের রায়ে এ ধরনের দায়িত্ব আসলে আল্লাহর ওপর ভরসা করে শতভাগ আশাবাদী। আমাদের দায়িত্ব বিজয়ের প্রত্যাশা নিয়ে আন্তরিকতার সাথে কাজ করা। বিজয় দানের মালিক মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন।
সোনার বাংলা : ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আশঙ্কা করছেন কি?
মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন : এখনই নেতিবাচক চিন্তাকে প্রশ্রয় দিতে চাই না।
সোনার বাংলা : ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং মোকাবিলা করার উপায় কী?
মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন : প্রয়োজনের আলোকে ইনশাআল্লাহ সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেব।
সোনার বাংলা : আপনি নির্বাচিত হলে নগর উন্নয়নে কী কী উদ্যোগ নেবেন?
মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন : আমার পরিকল্পনা আমি ইতোমধ্যে নগরবাসীর সামনে তুলে ধরেছি। এতে পরিষ্কারভাবে বলেছি, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ ও প্রশাসন, শতভাগ আমানতদারি ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে সিটি করপোরেশন পরিচালনা করব। আধুনিক, পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও নাগরিকবান্ধব ঢাকা গড়ে তোলাই আমার অঙ্গীকার। আমি বিশ্বাস করি, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনকে একটি স্মার্ট, পরিবেশবান্ধব এবং সুশাসনভিত্তিক নগরীতে রূপান্তর করা সম্ভব। নগরবাসীর দৈনন্দিন সমস্যা সমাধান, নাগরিক সেবা সহজীকরণ এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করাই হবে আমার মূল লক্ষ্য।
আমার প্রাথমিক পরিকল্পনা হলো- ১. আধুনিক নগরায়ন : পরিকল্পিত ও টেকসই নগর উন্নয়নের মাধ্যমে ঢাকাকে বিশ্বমানের শহরে রূপান্তরিত করা। ২. বিশুদ্ধ পানি এবং নিরাপদ খাদ্য সরবরাহ : প্রতিটি পরিবারে নিরাপদ বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা। ৩. সাশ্রয়ী আবাসন : নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য সাশ্রয়ী ও মানসম্পন্ন আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করা। ৪. নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও আলো : সৌরশক্তিসহ নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে সকল এলাকায় নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা।
সোনার বাংলা : আপনি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নিয়ে আর কী ভাবছেন। এ সংক্রান্ত কিছু প্রশ্ন করতে চাই?
মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন : অবশ্যই।
সোনার বাংলা : আপনি মেয়র নির্বাচিত হলে প্রথম ১০০ দিনে কোন তিনটি কাজকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবেন?
মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন : প্রথমত, ডেঙ্গু ও মশাবাহিত রোগপ্রতিরোধে আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সমন্বিত মশকনিধন ক্র্যাশ প্রোগ্রাম চালু করা।
দ্বিতীয়ত, ঢাকার প্রধান সড়কগুলো থেকে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ করে ফুটপাত পথচারীবান্ধব করা এবং যানজট নিরসনে তাৎক্ষণিক ট্রাফিক ব্যবস্থার সংস্কার।
তৃতীয়ত, সিটি করপোরেশনের সেবাকে সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত করতে একটি শক্তিশালী ‘ডিজিটাল নাগরিক অভিযোগ ও জবাবদিহি সেল’ গঠন করা, যার মাধ্যমে নাগরিকরা সরাসরি মেয়রের কাছে জবাবদিহি চাইতে পারবেন।
সোনার বাংলা : ঢাকার ভয়াবহ যানজট কমাতে আপনার বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা কী?
মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন : ঢাকার যানজট নিরসনে আমরা দীর্ঘমেয়াদি এবং স্বল্পমেয়াদি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করব। প্রধান সড়কগুলোয় ‘রুট রেশনালাইজেশন’-এর মাধ্যমে ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক বাস সেবা চালু করা হবে।
আধুনিক ও স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থার প্রবর্তন, যত্রতত্র অবৈধ পার্কিং সম্পূর্ণ নিষিদ্ধকরণ এবং ঢাকার প্রবেশমুখগুলোয় মাল্টিলেভেল পার্কিং টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে। ফুটপাত হকারমুক্ত করে পথচারীদের হাঁটার উপযোগী করা হবে- যেন স্বল্প দূরত্বের জন্য মানুষকে যানবাহনের ওপর নির্ভর করতে না হয়।
সোনার বাংলা : তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সিটি করপোরেশনের ভূমিকা কী হতে পারে?
মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন : সিটি করপোরেশন সরাসরি ব্যবসা না করলেও কর্মসংস্থানের বিশাল ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। আমরা ঢাকা উত্তরের প্রতিটি জোনে আধুনিক ‘আইটি ও ফ্র্যাঞ্চাইজি ফ্রিল্যান্সিং হাব’ গড়ে তুলব। সেখানে তরুণদের জন্য উচ্চগতির ইন্টারনেট এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের ব্যবস্থা থাকবে।
কর্মমুখী কারিগরি প্রশিক্ষণের পরিধি বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা হবে।
সোনার বাংলা : ঢাকা উত্তরকে কীভাবে আরও নিরাপদ ও বাসযোগ্য শহরে পরিণত করবেন?
মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন : একটি নিরাপদ শহর গড়ার প্রধান শর্ত আইনের শাসন ও প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার। আমরা পুরো ঢাকা উত্তরকে সিসিটিভি ক্যামেরা নেটওয়ার্কের আওতায় নিয়ে আসব এবং প্রতিটি রাস্তায় পর্যাপ্ত আধুনিক স্ট্রিট লাইটের ব্যবস্থা করব।
পাড়া-মহল্লায় কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থা জোরদার করা হবে। মাদক, ছিনতাই ও অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় কঠোর অভিযান পরিচালনা করা হবে।
সোনার বাংলা : শিক্ষার্থীদের জন্য সাশ্রয়ী ও নিরাপদ গণপরিবহন নিশ্চিত করতে আপনার পরিকল্পনা কী?
মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন : শিক্ষার্থীদের জন্য আমরা বিআরটিসির সাথে সমন্বয় করে বিশেষ ‘স্টুডেন্ট বাস সার্ভিস’ চালু করার উদ্যোগ নেব। গণপরিবহনে শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ পাস (অর্ধেক ভাড়া) নিশ্চিতকরণে কঠোর মনিটরিং করা হবে। ছাত্রীদের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং ডেডিকেটেড পরিবহনের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হবে, যেখানে কোনো ধরনের হেনস্তা বা নিরাপত্তাঝুঁকি থাকবে না।
সোনার বাংলা : জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে আপনার রোডম্যাপ কী?
মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন : জলাবদ্ধতা ঢাকার একটি দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত। এর স্থায়ী সমাধানে আমাদের রোডম্যাপ হলো- ঢাকা উত্তরের আওতাধীন সবকটি মৃতপ্রায় খাল ও প্রাকৃতিক জলাশয় উদ্ধার করে সেগুলোকে একে অপরের সাথে সংযুক্ত করা। আধুনিক হাইড্রোলজিক্যাল সার্ভের মাধ্যমে ড্রেনেজ ব্যবস্থার আমূল সংস্কার। বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আধুনিকায়ন করা, যেন প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য ড্রেন ও নর্দমায় আটকে পানির প্রবাহ বন্ধ করতে না পারে।
সোনার বাংলা : ঢাকার খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থান ক্রমেই কমে যাচ্ছে। এ বিষয়ে আপনার উদ্যোগ কী হবে?
মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন : আমাদের শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশের জন্য মাঠ অপরিহার্য। ঢাকা উত্তরের প্রতিটি ওয়ার্ডে বিদ্যমান খেলার মাঠগুলো অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে মুক্ত করা হবে। নতুন মাস্টারপ্ল্যানে পার্ক ও সবুজ চত্বরের জন্য জায়গা বরাদ্দ রাখা হবে। বহুতল ভবনের অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে উন্মুক্ত জায়গার বাধ্যবাধকতা কঠোরভাবে কার্যকর করা হবে।
সোনার বাংলা : প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট সিটি গড়তে আপনি কী কী পদক্ষেপ নেবেন?
মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন : আমরা একটি সমন্বিত ‘নগর অ্যাপ’ চালু করব- যার মাধ্যমে হোল্ডিং ট্যাক্স, ট্রেড লাইসেন্স, জন্ম-মৃত্যুনিবন্ধনসহ সিটি করপোরেশনের যাবতীয় সেবা নাগরিকরা ঘরে বসেই পাবেন। সম্পূর্ণ প্রশাসনিক কার্যক্রমকে পেপারলেস ও ডিজিটাল করা হবে। ঢাকার প্রধান প্রধান পাবলিক প্লেস এবং পার্কগুলোয় ফ্রি ওয়াইফাই জোন প্রতিষ্ঠা করা হবে।
সোনার বাংলা : বায়ুদূষণ ও শব্দদূষণ কমাতে আপনার নির্দিষ্ট পরিকল্পনা কী?
মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন : বায়ুদূষণ রোধে ঢাকা উত্তর এলাকায় উন্মুক্ত স্থানে আবর্জনা পোড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হবে। নির্মাণাধীন ভবনগুলোয় শতভাগ সেফটি নেট ও পানি ছিটানোর নিয়ম বাধ্যতামূলক করা হবে। মেকানিক্যাল সুইপিং গাড়ির মাধ্যমে রাস্তা পরিষ্কারের ব্যবস্থা করা হবে। শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা এবং সাইলেন্ট জোন (হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে) কার্যকর করা হবে।
সোনার বাংলা : বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নে সিটি করপোরেশন কী করতে পারে?
মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন : আমরা ‘মেয়র্স স্কিল ডেভেলপমেন্ট একাডেমি’ প্রতিষ্ঠা করব। এর মাধ্যমে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য কোডিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (অও), ডাটা অ্যানালিটিক্স এবং গ্লোবাল ল্যাঙ্গুয়েজ কোর্স পরিচালনা করা হবে। শীর্ষস্থানীয় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে পার্টনারশিপের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপ ও বাস্তব কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ করে দেওয়া হবে।
সোনার বাংলা : সাপ্তাহিক সোনার বাংলাকে সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন : আপনাকেও ধন্যবাদ।