বালাকোট যুদ্ধ ও ইসলামী রাষ্ট্র : প্রেক্ষিত বর্তমান বিশ্ব
৬ মে ২০২৬ ১৮:১৭
॥ ফেরদৌস আহমদ ভূইয়া ॥
সৈয়দ আহমদ বেরলভী ও শাহ ইসমাইল শহীদ মুসলিম জাগরণ এবং ইসলামী আন্দোলনের দুই সিপাহসালার। মুসলিম বিশ্বের এ দুই নেতা তৎকালীন ব্রিটিশ-শাসিত ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল বালাকোট এলাকায় একটি স্বাধীন ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। এ ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সহায়তার জন্য তারা ভারতের মুসলিমদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। এ দুই মর্দে মুজাহিদের আহ্বানে বাংলা অঞ্চলসহ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজার হাজার মুজাহিদ বালাকোট গিয়েছিলেন। তিনি বালাকোটকে কেন্দ্র করে একটি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছিলেন। কিন্তু শিখ রাজা ও ব্রিটিশদের পাশাপাশি স্থানীয় গোত্রপ্রধানের বিরোধিতার কারণে তার এ ইসলামী রাষ্ট্র স্থায়ী হতে পারেনি।
সৈয়দ আহমদ বেরলভী যে অঞ্চলে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেটা হচ্ছে বর্তমান পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া সাবেক উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের পাহাড়ি অঞ্চল। তার এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল বালাকোট। বালাকোট বর্তমান পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের মানসেহরা জেলায় অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক শহর।
সৈয়দ আহমদ বেরলভী ১৮২৬ সালে রায়বেরেলি থেকে হাজার হাজার অনুসারী নিয়ে সীমান্ত প্রদেশের দিকে হিজরত করেন। সেখানে তিনি বেশকিছু যুদ্ধে জয়লাভ করেন এবং একটি ক্ষুদ্র অঞ্চল শাসনও করেন। ১৮২৭ সালে তিনি নিজেকে ‘আমীর-উল-মুমিনীন’ ঘোষণা করেন এবং পাঞ্জতারকে তার রাষ্ট্রের অস্থায়ী কেন্দ্র বা রাজধানী হিসেবে ব্যবহার করেন। তিনি কোনো নির্দিষ্ট সীমানা বা ‘বর্গমাইল’ হিসেবে তার রাষ্ট্রের সীমানা নির্ধারণ করেননি, কারণ এটি ছিল একটি চলমান সংগ্রাম। তবে তিনি খাইবার থেকে সিন্ধু নদ পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল একটি উপজাতীয় অঞ্চলে শাসন ব্যবস্থা কায়েম করতে চেয়েছিলেন।
১৮৩১ সালে তিনি যে বালাকোটের উপত্যকায় অবস্থান নেন। এটি ছিল প্রাকৃতিকভাবে সুরক্ষিত একটি এলাকা, যেখান থেকে তিনি শিখ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে আরো বড় অভিযান পরিচালনা করতে চেয়েছিলেন। সৈয়দ আহমদ বেরলভীর পরিচালিত ‘জিহাদ আন্দোলনে’র বিরুদ্ধে প্রধানত শিখ সাম্রাজ্য এবং পরবর্তীতে কিছু স্থানীয় মুসলিম গোষ্ঠী ও গোত্রপ্রধান অবস্থান নিয়েছিলেন।
তবে অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র এবং স্থানীয় কিছু উপজাতীয় নেতার অসহযোগিতার কারণে ১৮৩১ সালে মে মাসে বালাকোটের ময়দানে শিখ বাহিনীর সাথে এক অসম যুদ্ধে তিনি ও তার প্রধান সেনাপতি শাহ ইসমাইল শহীদসহ হাজার হাজার মুসলিম মুজাহিদ শাহাদাতবরণ করেন। যার ফলে তাই ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন অপূর্ণ থেকে যায়। এটি ইতিহাসে বালাকোটের যুদ্ধ নামে পরিচিত। বালাকোট প্রান্তরে এই যুদ্ধ ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামী পুনর্জাগরণ ও স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত আবেগপূর্ণ এবং গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
বালাকোটের অবস্থান
বালাকোট পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের মানশেরা জেলায় অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক শহর, যা রাজধানী ইসলামাবাদ থেকে উত্তর-পূর্ব দিকে প্রায় ১৬৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ভৌগোলিকভাবে এটি কুনহার নদীর তীরে এবং কাগান উপত্যকার প্রবেশপথে অবস্থিত। ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু-কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগর থেকে উত্তর-পশ্চিম দিকে সড়কপথে বালাকোটের দূরত্ব প্রায় ২২০ কিলোমিটারের আশপাশে। এটি পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মীরের সংলগ্ন, আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল থেকে সরাসরি পূর্ব দিকে অবস্থিত ।
কেন এ বালাকোট যুদ্ধ
ইমাম বেরলভী মুসলিমদের সব কুসংস্কার থেকে মুক্ত করে একটি সহিহ ইসলামী সমাজ গড়তে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। ইসলামী রাষ্ট্র গড়তে একটি নিরাপদ এলাকাকে বেছে নিয়েছিলেন। তবে কয়েক বছরের চেষ্টায় তিনি একটি ক্ষুদ্র অঞ্চল নিয়ন্ত্রণে নেন। তবে শিখদের বিরোধিতার মুখে তিনি খুব বেশিদিন টিকতে পারেননি। বালাকোটের যুদ্ধ হয়েছিল সৈয়দ আহমদ বেরলভীর নেতৃত্বাধীন মুসলিম মুজাহিদ বাহিনী এবং শিখ সাম্রাজ্যের মহারাজা রঞ্জিত সিংয়ের বাহিনীর মধ্যে। শিখ বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন সেনাপতি শের সিং। এ যুদ্ধের প্রধানতম কারণ ছিল একটি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন।
কে এই সৈয়দ আহমদ বেরলভী
সৈয়দ আহমদ বেরলভী (১৭৮৬-১৮৩১) ছিলেন ঊনবিংশ শতাব্দীর একজন ভারতীয় মুসলিম সংস্কারক, ইসলামী পণ্ডিত এবং যোদ্ধা। তিনি ভারতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন এবং শিখ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে সশস্ত্র জিহাদ ও সমাজ সংস্কারের জন্য পরিচিতি লাভ করেন।
তিনি ১৭৮৬ সালে ভারতের উত্তর প্রদেশের রায়বেরেলিতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি নিজেকে নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর আদর্শের অনুসারী হিসেবে দাবি করতেন। তিনি ইসলামের নামে কুসংস্কার ও বিদ’আত দূর করার জন্য কাজ করেছিলেন। তার এই আন্দোলন ‘তারিকাহ মুহাম্মাদিয়াহ’ বা ওহাবী আন্দোলনের একটি শাখা হিসেবে পরিচিত।
তিনি শিখ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মুজাহিদ সংগ্রহ করে ১৮২৬ সালে একটি সুসংগঠিত সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করেন। শিখ বাহিনীর সাথে যুদ্ধরত অবস্থায় তিনি অনেক অনুসারীসহ শহীদ হন।
শাহ ইসমাইল দেহলভী
শাহ ইসমাইল দেহলভী (রহ.) ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের একজন প্রখ্যাত ইসলামী সংস্কারক, চিন্তাবিদ এবং ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম অগ্রসেনানী। তিনি ‘শাহ ইসমাইল শহীদ’ নামেই অধিক পরিচিত। নিচে তার সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরা হলো:
শাহ ইসমাইল দেহলভী ছিলেন বিখ্যাত মুহাদ্দিস শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভীর পৌত্র এবং শাহ আবদুল গনির পুত্র। তিনি একটি অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত ও ইলমী (বিদ্বান) পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পূর্বপুরুষরা কয়েক প্রজন্ম ধরে ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামের প্রচার ও প্রসারে নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন। তিনি ১৭৭৯ খ্রিষ্টাব্দে (১২ই রবিউস সানি, ১১৯৩ হিজরি) জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বর্তমান ভারতের উত্তর প্রদেশের ফুলত নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। তবে তার জীবনের অধিকাংশ সময় অতিবাহিত হয়েছে দিল্লিতে।
তৎকালীন ভারতীয় মুসলিম সমাজে প্রচলিত নানা কুসংস্কার, বিদ’আত (নতুন উদ্ভাবিত ধর্মীয় রীতি) এবং শিরকের বিরুদ্ধে তিনি কঠোর অবস্থান নেন। তিনি তাওহিদের (একত্ববাদ) বাণী প্রচারের জন্য গ্রামগঞ্জ ও শহরে সফর করতেন। তার ওয়াজ ও নসিহত সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
শাহ ইসমাইল দেহলভী তার আধ্যাত্মিক গুরু সৈয়দ আহমদ বেরলভীর সাথে মিলে ‘তহরিকে মুজাহিদিন’ বা মুজাহিদ আন্দোলন শুরু করেন। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে একটি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা এবং শিখ ও ইংরেজদের আধিপত্য থেকে মুসলমানদের মুক্ত করা।
১৮৩১ খ্রিষ্টাব্দের ৬ মে পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের বালাকোট নামক স্থানে শিখ বাহিনীর সাথে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে সৈয়দ আহমদ বেরলভীর শাহাদাতবরণ করেন। এই যুদ্ধটি ভারতীয় মুসলমানদের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা।
বেরলভীর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
সৈয়দ আহমদ বেরলভীর আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল একটি আদর্শ সমাজ গঠন এবং পরাধীনতা থেকে মুক্তি; সর্বোপরি একটি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। তিনি ইসলাম থেকে কুসংস্কার, শিরক (অংশীবাদ) এবং বিদ’আত (নব উদ্ভাবিত প্রথা) দূর করতে কাজ করেন। তিনি মুসলমানদের ঈমানি শক্তি জাগ্রত করে ইসলামের আদি ও বিশুদ্ধ রূপ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন।
একটি স্বাধীন ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা
তার দীর্ঘমেয়াদি স্বপ্ন ছিল উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে (বর্তমান পাকিস্তান ও আফগানিস্তান সীমান্ত) একটি স্বাধীন ইসলামী রাষ্ট্র বা ‘দারুল ইসলাম’ প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে শরীয়াহ ভিত্তিক শাসনব্যবস্থা বিদ্যমান থাকবে। সৈয়দ আহমদের মিশন কেবল আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি বিশ্বাস করতেন, অত্যাচারী শাসক ও বিদেশি শক্তির কবল থেকে মুক্ত হতে হলে সশস্ত্র সংগ্রামের বিকল্প নেই।
তৎকালীন পাঞ্জাবে রঞ্জিত সিংয়ের শিখ শাসনে মুসলিমদের ওপর নানাবিধ নির্যাতনের প্রতিবাদে তিনি জিহাদ শুরু করেন। তিনি স্বাধীন ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভারত থেকে ব্রিটিশদের বিতাড়ন করা নিয়ে জনমত গঠন করেন। তিনি ভারতকে ‘দারুল হারব’ ঘোষণা করে একে স্বাধীন করার জন্য জনগণকে সংগঠিত করেছিলেন। তিনি সমাজের অবহেলিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তার আন্দোলনে কোনো জাতিভেদ বা আভিজাত্যের ভেদাভেদ ছিল না। সাধারণ মানুষকে নৈতিকভাবে উন্নত করা এবং মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ঐক্য স্থাপন করা ছিল তার মিশনের অন্যতম ভিত্তি।
আন্দোলনের পরিণতি ও তার কারণ
মুসলিম বাহিনী বীরত্বের সাথে লড়াই করলেও বেশকিছু কৌশলগত ও পারিপার্শ্বিক কারণে তারা পরাজিত হয় এবং সৈয়দ আহমদ বেরলভী ও শাহ ইসমাইল দেহলভী শাহাদাতবরণ করেন। পরাজয়ের প্রধান কারণগুলো ছিল, ভৌগোলিক কারণ, শিখ বাহিনীর কাছে উন্নত যুদ্ধাস্ত্র, মুজাহিদদের কাছে ভারী অস্ত্র না থাকা, স্থানীয়দের বিশ্বাসঘাতকতা ও অভ্যন্তরীণ বিরোধ ইত্যাদি।
ভৌগোলিক ও কৌশলগত অসুবিধা : শিখ বাহিনী সংখ্যায় অনেক বেশি ছিল এবং তাদের কাছে উন্নত কামান ও আগ্নেয়াস্ত্র ছিল। বিপরীতে মুজাহিদদের কাছে ভারী কোনো অস্ত্র ছিল না।
আকস্মিক আক্রমণ : শিখ বাহিনী দুর্গম পাহাড়ি পথ ব্যবহার করে এমন দিক থেকে আক্রমণ করেছিল, যা মুজাহিদদের কাছে অপ্রত্যাশিত ছিল। এই আচমকা হামলায় তারা নিজেদের গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ পায়নি।
অভ্যন্তরীণ কোন্দল : মুজাহিদ বাহিনীর মধ্যে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা যোদ্ধারা থাকলেও তাদের মধ্যে কিছু স্থানীয় সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক বিরোধ তৈরি হয়েছিল, যা সামগ্রিক ঐক্যে ফাটল ধরিয়েছিল। বিশেষ করে শিখ রাজা তার এই আন্দোলনের বিরুদ্ধে যারা সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত ছিল বা অসহযোগিতা করেছিল।
সৈয়দ আহমদ বেরলভীর মূল লক্ষ্য ছিল শিখদের হাত থেকে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ (বর্তমান খাইবার পাখতুনখোয়া) এবং পাঞ্জাব উদ্ধার করা। ফলে শিখ মহারাজা রঞ্জিত সিং ছিলেন তার প্রধান প্রতিপক্ষ। শিখ সেনাপতি হরি সিং নলওয়া এবং ফরাসি জেনারেলদের অধীনে থাকা শিখ বাহিনী বেরলভীর বিরুদ্ধে বড় বড় যুদ্ধ পরিচালনা করে।
১৮৩১ সালের বিখ্যাত বালাকোটের যুদ্ধে বেরলভীর বিরুদ্ধে মূল অবস্থান ছিল শিখদের। তবে ঐতিহাসিক তথ্যমতে, স্থানীয় কিছু লোক গুপ্তচর হিসেবে শিখ বাহিনীকে পাহাড়ি গোপন রাস্তার তথ্য দিয়ে সাহায্য করেছিল, যার ফলে শিখরা অতর্কিতে আক্রমণ করার সুযোগ পায়।
স্থানীয়দের বিশ্বাসঘাতকতা
স্থানীয় কিছু উপজাতীয় নেতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তি শিখদের কাছে মুজাহিদদের গোপন অবস্থানের তথ্য ফাঁস করে দিয়েছিল। যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে তারা সহায়তা না করে শিখদের সহযোগিতা করেছিল। আন্দোলনের প্রথম দিকে অনেক পাঠান গোত্র তাকে সমর্থন দিলেও পরবর্তীতে প্রশাসনিক ও সামাজিক সংস্কারের প্রশ্নে স্থানীয়দের সাথে তার বিরোধ দেখা দেয়। বিশেষ করে ইসলামী আইন প্রয়োগ, সামাজিক সংস্কার, আর্থিক বিষয়, রাজনৈতিক ও গোত্রীয় কর্তৃত্ব হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার ভয়ে তারা বেরলভীর পক্ষ ত্যাগ করে শত্রুপক্ষের সাথে গোপনে যোগসাজশ গড়ে তোলে।
পেশোয়ারের শাসক ইয়ার মুহাম্মদ খান এবং সুলতান মুহাম্মদ খান প্রথমে বেরলভীর আনুগত্য স্বীকার করলেও পরে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করেন। মূলত রাজনৈতিক ক্ষমতা হারানো এবং কর (উশর) আদায় নিয়ে তাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়।
স্থানীয় গোত্রীয় নেতৃবৃন্দ : বেরলভী যখন সীমান্ত এলাকায় কঠোর ইসলামী আইন এবং সামাজিক সংস্কার যেমন: নারীদের উত্তরাধিকার নিশ্চিত করা, জোরপূর্বক বিবাহ বন্ধ করতে চান, তখন স্থানীয় গোত্রীয় প্রধানরা তাদের দীর্ঘদিনের প্রথা ও ক্ষমতায় আঘাত আসায় ক্ষুব্ধ হন। অনেক স্থানীয় সর্দার শিখদের সাথে গোপন আঁতাত করেছিলেন এবং যুদ্ধের ময়দানে বেরলভীকে মাঝপথে ত্যাগ করেছিলেন।
আঞ্চলিক ও রাজনীতি ও আর্থিক কারণ : যুদ্ধের খরচ মেটানোর জন্য উশর বা কর সংগ্রহ করার বিষয়টি স্থানীয় সর্দাররা সহজে মেনে নিতে পারেননি। স্থানীয় পাঠান সর্দাররা মনে করেছিলেন, বেরলভী এবং তার উত্তর ভারতীয় মুজাহিদরা (যাদের তারা ‘হিন্দুস্তানি’ বলতেন) স্থানীয়দের ওপর কর্তৃত্ব স্থাপন করছেন।
ঐতিহাসিকদের মতে, অভ্যন্তরীণ বিভেদ ও বিশ্বাসঘাতকতাই শেষ পর্যন্ত ১৮৩১ সালে বালাকোটের যুদ্ধে সৈয়দ আহমদ বেরলভীর পরাজয় ও শাহাদাতের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বালাকোট যুদ্ধ ও মুসলিমদের শিক্ষণীয়
সৈয়দ আহমদ বেরলভী ১৮২৬ সালে রায়বেরেলি থেকে হাজার হাজার অনুসারী নিয়ে পাকিস্তানের সীমান্ত প্রদেশ তথা বর্তমান খাইবার পাখতুনখোয়ায় হিজরত করেন। পরবর্তীতেও অনেক মুসলিম তার এ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। তিনি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যদিও তার স্বাধীন ইসলামী রাষ্ট্রটি কুফুরি শক্তির বিরোধিতার মুখে টিকতে পারেনি। তবে তার এই আন্দোলন পরবর্তীকালে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে; বিশেষ করে ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহে ব্যাপক প্রেরণা জুগিয়েছিল। কিন্তু ইসলাম বিরোধী শক্তির প্রবল প্রতিরোধের পরও তিনি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন থেকে পিছপা হননি।
তৎকালীন বিশ্বের প্রবল পরাক্রমশালী সামাজ্য ব্রিটিশদের চোখরাঙানিকে উপেক্ষা করেই বালাকোট অঞ্চলে একটি স্বাধীন ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন শুরু করেন। প্রাথমিক সাফল্যও লাভ করেছিলেন। কিন্তু ইসলাম বিরোধী বহুমুখী বিরোধিতার পাশাপাশি নামধারী মুসলিমদের বিরোধিতা ও বিশ্বাসঘাতকতার কারণে তিনি টিকে থাকতে পারেননি। বালাকোট আন্দোলন ও সৈয়দ আহমদ বেরলভী থেকে মুসলিমদের জন্য মূল শিক্ষা হচ্ছে ইসলাম প্রচার ও প্রতিষ্ঠার জন্য সাধারণ জনগণকে আহ্বানের পাশাপাশি সুসংগঠিত করতে হবে। পাশাপাশি বিরোধী শক্তির মোকাবিলায় যথাযথ ও আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে নিজেদেরও গড়ে তুলতে হবে।
লেখক : বার্তা সম্পাদক, সাপ্তাহিক সোনার বাংলা