আধুনিক অর্থশাস্ত্রের একজন পূর্বসূরি ইবনে খালদুন
৯ এপ্রিল ২০২৬ ২২:৩৮
আঠারো শতকের বিখ্যাত ব্রিটিশ নৈতিক দার্শনিক ও সমাজবিজ্ঞানী অ্যাডাম স্মিথকে অর্থশাস্ত্রের পিতা বলা হয়। কিন্তু ইবনে খালদুন অ্যাডাম স্মিথের অনেক তত্ত্বের মৌলিক পূর্বচিন্তক ও আধুনিক অর্থশাস্ত্রের একজন অন্যতম পূর্বসূরি।
আঠারো শতকের বিখ্যাত ব্রিটিশ নৈতিক দার্শনিক ও সমাজবিজ্ঞানী অ্যাডাম স্মিথ অর্থশাস্ত্রের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান কিছু অবদান রেখে গেছেন। তার মধ্যে অন্যতম হলো, ‘অদৃশ্য হাত’-এর ধারণা, যা তিনি তার লেখা বই ‘The Theory of Moral Sentiments’-এ উপস্থাপন করেছেন।
আরো দুটো তিনি বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন তার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ‘The Wealth of Nations’-এ। এ দুটোর একটি হলো ‘Mercantilism’-এর ওপর তার আপত্তিসহ ‘Wealth of Nations -এর অভিনব ধারণা। তার তৃতীয় বড় কাজটি হলো ‘Physiocrat’-দের সমালোচনাসহ ‘শ্রম বিভাজন’ তত্ত্বের উপস্থাপনা। এছাড়া তিনি অর্থনীতির আরো বেশকিছু মৌলিক বিষয়ের ওপর তার জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য রেখেছেন। এসব কারণে তাকে অর্থশাস্ত্রের পিতা বলা হয়। ১৯৬৪ সালে চৌদ্দ শতকের আরব অর্থনীতিবিদ ইবনে খালদুনের ‘আল-মুকাদ্দিমা’র ওপর জোসেফ জে স্পেংলারের লেখা একটি যুগান্তকারী প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। ফলে ইংরেজিভাষী পাঠক, লেখক ও গবেষকদের মধ্যে বেশ সাড়া পড়ে যায় এবং ইবনে খালদুনের ওপর আরো অনেক লেখালেখি হয়েছে। এখন জানা যাচ্ছে অ্যাডাম স্মিথ, আর্থার ল্যাফার, আলফ্রেড মার্শাল, টমাস ম্যালথাস ও জন ম্যানার্ড কেইনসেরও শত শত বছর আগে তাদেরই কথা খালদুন তার ‘আল-মুকাদ্দিমা’য় বিশদভাবে ব্যাখ্যা করে গেছেন। তাই আমরা বলতে পারি, ইবনে খালদুন অ্যাডাম স্মিথের অনেক তত্ত্বের মৌলিক পূর্বচিন্তক ও আধুনিক অর্থশাস্ত্রের একজন অন্যতম পূর্বসূরি।
এ নিবন্ধের জন্য গবেষণা করতে গিয়ে দেখা গেছে, ৫০-৬০ বছরে ইবনে খালদুন ও অর্থশাস্ত্রে তার অনন্য অবদানের ওপর প্রচুর লেখালেখি হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। লেখকদের মধ্যে আরব-অনারব ও পাশ্চাত্য গবেষকরা তো আছেনই, তাদের সঙ্গে বিভিন্ন জাতি ও ভাষাভাষী সাংবাদিকও যোগ দিয়েছেন। প্রকাশনা যেমন হচ্ছে একাডেমিক জার্নালে, তেমনই হচ্ছে অনলাইন ব্লগে। এসব ঘাঁটাঘাঁটি করে সুশৃঙ্খলভাবে এ মনীষীর গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ কার্যাবলি গুছিয়ে উপস্থাপন করার কাজটি যত সহজ ভেবেছিলাম, বাস্তবে তেমনটি পাইনি। খালদুন ‘আল-মুকাদ্দিমা’য় অর্থনীতির যেসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন, সেগুলোকে প্রধানত পাঁচ ভাগে ভাগ করা যায়—1. Specialization and division of labor, 2. Taxation, Laffer curve and supply side economics, 3. Demand and supply analysis, 4. Labor theory of value, 5. Public expenditure & Keynesian economics। এবার আসুন এসব বিষয়ের আলোকে অর্থশাস্ত্রে চতুর্দশ শতাব্দীর অর্থনীতিবিদ ইবনে খালদুনের অবদান একটু খতিয়ে দেখা যাক।
শ্রম বিভাজন সম্পর্কে খালদুনের বক্তব্য
আলোচনাটি যার কথা দিয়ে শুরু করা যায় তিনি একজন সাংবাদিক। তার নাম অলিভিয়া গোল্ডহিল। তিনি ‘Quartz.com’ ব্লগের বিজ্ঞান প্রতিবেদক। ২০১৭ সালের ১৭ জুন তিনি একটি পোস্টে লিখেছেন, আজকাল ছাত্রছাত্রীরা যখন অর্থনীতি পড়তে যায়, তখন শুরুতেই তাদের শেখানো হয় ‘আধুনিক অর্থনীতির পিতা অ্যাডাম স্মিথ’। এটা পাশ্চাত্য জগতে একটি স্বাভাবিক ব্যাপার, কিন্তু বিষয়টি তিনি পছন্দ করেন না। কেন পছন্দ করেন না, সে কথা বলতে গিয়ে গোল্ডহিল সূত্র ধরিয়ে দিলেন ড্যানিয়েল ওলাহর। এভাবে এ হাঙ্গেরীয় অর্থনীতিবিদের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়।
ড্যানিয়েল ওলাহ তার দেশের জাতীয় অর্থনীতি মন্ত্রণালয়ের একজন তথ্যবিশ্লেষক ও পূর্বাভাসকারী। তিনি সম্প্রতি Review of Religions.org নামক Blog-এ একটি লম্বা সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সাক্ষাৎকারটি পোস্ট করা হয়েছে ১৩ এপ্রিল, ২০২১। এখানে ওলাহ বলছেন, ইবনে খালদুন উৎপাদন প্রক্রিয়ায় শ্রম বিভাজন প্রসঙ্গে যেসব কথা বলে গেছেন, আধুনিক অর্থনীতিবিদরা তার পুরোটাই প্রায় ভুলে বসে আছেন। এর প্রমাণ অর্থনীতির ইতিহাসের ওপর লিখিত প্রধান প্রধান পাঠ্যবইয়ে Screpanti and Zamagni (2005), Roncaglia (2005), Rothbard (2006), Blaug (1986), etc.) ইবনে খালদুনের অবদান তো দূরে থাক, তার নামও খুঁজে পাওয়া যায় না। এ কথা বলার পর তিনি আসল কথা তুলেছেন। তিনি খালদুন থেকে উদাহরণ দিয়েছেন এভাবে—
একাধিক মিস্ত্রি কারুকার্যখচিত কাঠের দরজা কিংবা চেয়ার বানানোর সময় আলাদাভাবে যার যার কাজ করেন। কাজ শেষ হলে তারা টুকরো টুকরো অংশ একত্র করে যখন দরজা ও চেয়ারের পূর্ণ অবয়ব দেন, তখন বোঝাই যায় না, জিনিসগুলোর অংশবিশেষ একাধিক ব্যক্তি দ্বারা পৃথক পৃথকভাবে বানানো হয়েছে। ‘The Wealth of Nations’-এ অ্যাডাম স্মিথ যেমন কারখানায় শ্রম বিভাজনের মাধ্যমে আলপিন উৎপাদনের বর্ণনা দিয়েছেন, খালদুন তার ‘আল-মুকাদ্দিমা’য় কাঠের কাজের উদাহরণে ওই একই কথা বলছেন, একই বিষয় বুঝিয়েছেন। তফাতটা হলো স্মিথ যা বলছেন ১৭৭৬ সালে, খালদুন তা বলে গেছেন তারও ৪০০ বছর আগে।
একই সাক্ষাৎকারে ওলাহ ঢালাওভাবে অর্থশাস্ত্রের রথী-মহারথীদের প্রতি একটি কঠিন ও তির্যক মন্তব্য ছুড়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘খালদুনের চিন্তাধারা আধুনিক অর্থনীতিবিদদের কাছে “অস্বস্তিকরভাবে জানা’’ একটি বিষয়!’ এখানে ‘অস্বস্তিকরভাবে জানা’ শব্দ দুটি ব্যবহার করে ওলাহ কী বোঝাতে চাইছেন, পাঠকরা নিশ্চয়ই ধরতে পেরেছেন। তিনি আরো বলছেন, শ্রম বিভাজনকে খালদুন সভ্য সমাজের একটি শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতেন। শুধু তা-ই নয়, মধ্যযুগের এ আরব মনীষী শ্রম বিভাজনের অন্তত তিন-তিনটি পৃথক পরিপ্রেক্ষিত সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত করে গিয়েছেন, প্রথমটি শিল্প, দ্বিতীয়টি সামাজিক ও শেষটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে।
এ তিন পর্যায়ের গভীর ব্যাখ্যা পাওয়া যায় অতি সাম্প্রতিককালের Turkish Journal of Islamic Economics-এ প্রকাশিত তুর্কি লেখক ও গবেষক ‘সিটি রিজকিয়া’ ও ‘আব্দুল কাদের শাচি’র প্রবন্ধে। এ দুজন খালদুনের কথা সংক্ষেপে এভাবে উপস্থাপন করেছেন। শিল্প পর্যায়ে একজন গমচাষীকে যদি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গম চাষের প্রতিটি উপাদানসহ গম ফলাতে বলা হয়, তাহলে তিনি তার নিজের বাঁচার জন্য ন্যূনতম পরিমাণ গম সারা দিন কাজ করেও উৎপন্ন করতে পারেন না, কিন্তু শ্রম বিভাজনের মাধ্যমে একাধিক শ্রমিক যদি যৌথভাবে একই কাজ করেন, তাহলে তাদের প্রত্যেকেই নিজের জন্য ন্যূনতম পরিমাণ কেন তার চেয়ে অনেক বেশি উদ্বৃত্ত ফসল ফলাতে পারেন। এ গবেষকদের ভাষায়, খালদুন মনে করতেন, এ রকম সুফল পেতে হলে শিল্প পর্যায়ে কর্মরত শ্রমিকদের মধ্যে একটি সহযোগিতা ও সমন্বয়ের সম্পর্ক থাকা খুবই জরুরি।
সামাজিক পর্যায়ে দার্শনিক-অর্থনীতিবিদ খালদুন সব শিল্প এবং জাতীয় অর্থনীতির সব খাতের মধ্যে একটি সহযোগিতা, সমন্বয় ও সহমর্মিতামূলক সম্পর্কের স্বপ্ন দেখে গেছেন। তিনি আশাবাদী মানুষ, তাই প্রত্যাশার কথাও শুনিয়েছেন, সমাজ ও অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে যার যার যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণ অনুযায়ী প্রতিটি শ্রমিক সবার সঙ্গে যোগাযোগ ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলে উৎপাদন বাড়ে এবং সবার জন্য উদ্বৃত্তও জমা হয়।
খালদুন এখানেই থেমে থাকেননি। তিনি তার দূরদৃষ্টিকে আরো প্রসারিত করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পৌঁছে দিয়েছেন, যেখানে আলাদা সমাজ ও রাষ্ট্র তাদের উদ্বৃত্ত পণ্য বাণিজ্যের মাধ্যমে হাতবদল করতে পারে এবং একসঙ্গে সবাই লাভবানও হতে পারে। তার মতে, এখানে আন্তর্জাতিক শ্রম বিভাজন ও বাণিজ্যের ভিত্তি প্রাকৃতিক সম্পদের মালিকানা নয়, বরং ভিত্তি হবে শ্রমিকের যোগ্যতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা এবং প্রশিক্ষণ। যেসব দেশ যত কার্যকরভাবে সফলতা ও দক্ষতার সঙ্গে তার শ্রমশক্তিকে দেশের অভ্যন্তরীণ প্রয়োজন মেটানোর কাজে লাগাতে পারে, তারাই তাদের শ্রমিকদের রফতানি পণ্য তৈরিতে তত বেশি সুফল পেতে পারে এবং তত বেশি মূল্যসংযোজনও করতে পারে।
কর, ল্যাফার রেখা এবং জোগানের দিকের অর্থনীতি
সরকারি করারোপ এবং রাজস্ব আহরণের ব্যাপারে ইবনে খালদুন বেশি রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে করের হার বাড়ানোর একদম পক্ষে ছিলেন না। কারণ করের হার বাড়লে স্বাভাবিকভাবে মানুষের কর্মোদ্যম ও কর্মপ্রেরণায় ভাটা পড়ে। কম কাজ মানে কম আয়, কম আয় মানে কর প্রদানে সক্ষমতা হ্রাস পাওয়া। এ অবস্থায় সরকারের জন্য বেশি রাজস্ব আহরণের সম্ভাবনা থাকে না। পক্ষান্তরে করের হার কম করে রাখলে লোকজনের কাজে উৎসাহ কমে না, বরং বাড়তি আয়ের আশায় তারা বেশি কাজ ও বেশি উপার্জন করে। এভাবে বেশি মানুষ বেশি কাজ করলে কর থেকে সরকারের রাজস্ব হয় অনেক বেশি। ১০টি উন্নত দেশ, ১০টি উন্নয়নশীল দেশ ও ১০টি স্বল্পোন্নত দেশের ওপর একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৬৫০ বছর আগে খালদুনের দেয়া করতত্ত্ব এখনো সঠিক ও বাস্তবসম্মত। বিস্তারিত জনতে হলে International Journal of Academic Research in Business and Social Sciences-এ ২০১৭ সালে প্রকাশিত আবু বকর জাফর এবং আব্দুল গাফার ইসমাইলের প্রবন্ধ পড়ে দেখতে পারেন। উইকিপিডিয়ায় খালদুনীয় অর্থশাস্ত্রের যে বিবরণ আছে তাতে দেখা যায়, তার করনীতিকে আধুনিক কালের ‘Laffer curve’-এর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। শুধু তফাত হলো Arthur Laffe যা সেদিন বলেছেন, ইবনে খালদুন তা বলেছেন ৫০০ বছর আগে। এখানে আরেকটা বিষয় লক্ষ করার মতো, ‘Laffer curve’-এর উদ্গাতা এমন দাবি করেননি যে তিনি এটা ষোল আনা স্বতন্ত্রভাবে একা একাই এঁকেছেন। উৎস: বণিক বার্তা সিল্করোড
[লেখাটি প্রথম প্রকাশ হয়েছে কলকাতা থেকে প্রকাশিত অর্থনীতিবিষয়ক ষাণ্মাসিক বাংলা জার্নাল ‘অর্থবিশ্লেষণ’-এ (ষষ্ঠ বর্ষ: প্রথম ও দ্বিতীয় যুগ্ম সংখ্যা: ২০২১-২২)]
লেখক: আবু এন এম ওয়াহিদ: অধ্যাপক, টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটি