ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা নওয়াব আলী চৌধুরী
১৯ এপ্রিল ২০২৬ ১২:১০
অ্যাডভোকেট সুলতান মাহমুদ হোসাইনী
গত ১৭ এপ্রিল ছিল সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরীর মৃত্যুবার্ষিকী। তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। নওয়াব আলী চৌধুরী ১৭ এপ্রিল ১৯২৯ (১ বৈশাখ, ১৩৩৬ বাংলা) দার্জিলিংয়ের (বর্তমানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে) ইডেন ক্যাসেলে মৃত্যুবরণ করেন। বিংশ শতাব্দীর প্রথম পর্বে যাঁদের ঐতিহাসিক অবদানের কারণে আজ আমরা এখানে,এই পর্যায়ে পৌছেছি,তাঁদের মধ্যে নওয়াব আলী চৌধুরী ছিলেন অন্যতম । বাঙালি মুসলমানের তৎকালের দূরদর্শী নেতাদের মধ্যে তিনি ছিলেন অগ্রগামী । পূর্ব বাংলার মানুষের উন্নতিকল্পে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় যে তিনজন মনীষীর অবদান সবচেয়ে বেশি তারা হলেন নবাব সলিমুল্লাহ,ধনবাড়ীর জমিদার সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী ও শেরেবাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক ।
১৯১১ সালে ২৯ আগস্ট ঢাকার কার্জন হলে ল্যান্সলট হেয়ারের বিদায় এবং চার্লস বেইলির যোগদান উপলক্ষে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে পৃথক দুটি মানপত্রে নবাব সলিমুল্লাহ ও নওয়াব আলী চৌধুরী ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানান। ১৯১২ সালের ৩১ জানুয়ারি লর্ড হার্ডিঞ্জের ঢাকায় অবস্থানকালে নওয়াব সলিমুল্লাহ ও নওয়াব আলীসহ ১৯ জন সদস্য বিশিষ্ট একটি প্রতিনিধি দল তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে মুসলমানদের যে সমূহ ক্ষতি হচ্ছে সে কথা তুলে ধরেন। এ লক্ষ্যে ১৩ সদস্য বিশিষ্ট নাথান কমিটি গঠিত হলে নওয়াব আলী চৌধুরী এর অন্যতম সদস্য হন।
১৯২০ সালের মার্চ ১৮ ভারতীয় আইনসভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিল অ্যাক্টে পরিণত হয় এবং ২৩ মার্চ তা গভর্নর জেনারেলের অনুমোদন লাভ করে। লর্ড হার্ডিঞ্জ কর্তৃক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার নয় বছর পর ১৯২১ সালের জুলাই মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যথারীতি ক্লাস শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকালে অর্থাভাব দেখা গেলে সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী নিজ জমিদারীর একাংশ বন্ধক রেখে এককালীন ৩৫,০০০ টাকা প্রদান করেন।
অধ্যাপক আবদুল গফুর লিখেছেন:শুধু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা কলিকাতা কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবীরাই নন, খোদ ঢাকা শহরের নেতৃস্থানীয় হিন্দুরাও সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে আন্দোলনে মেতে উঠে ছিলেন। ১৯১২ সালের ৩১ জানুয়ারী লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ঘোষণা প্রদান করায় এখানকার হিন্দু আইনজীবীগণ ১৯১২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারী ও ১০ ফেব্রুয়ারী ঢাকা বার লাইব্রেরীতে পর পর দুটি প্রতিবাদ সভা করে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেন। এসব প্রতিবাদ সভায় সভাপতিত্ব করেন বাবু ত্রৈলোক্যনাথ বসু। এসব সভায় গৃহীত প্রস্তাবে বলা হয়, ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় হলে শিক্ষার অবনতি হবে। তাই প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন প্রয়োজন নেই।বিদ্বেষপরায়ণ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে তারা বহুদিন পর্যন্ত ‘মক্কা বিশ্ববিদ্যালয়’ বলে উপহাস করতেন। নওয়াব আলী চৌধুরী ছিলেন অবিভক্ত বাংলার প্রথম মুসলমান মন্ত্রী। শিক্ষাবিস্তারে তার আন্তরিকতার জন্য সে সময় তাকে শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। ১৯২৯ সালের ১৭ এপ্রিল মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। এদেশে নওয়াব আলী চৌধুরী ৩৮টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনে জমি ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন।
তিনি মুসলিম স্বার্থরক্ষায় হিন্দুদের বিরোধিতাকে যেমন মোকাবিলা করেছেন,তেমনি তিনি অবাঙালি মুসলমানদের অবহেলা থেকে বাঙালি মুসলমানদের স্বার্থরক্ষার ব্যাপারেও সমান সোচ্চার ছিলেন । বাংলা ভাষার মর্যাদার প্রশ্নেও তিনি সচেতন ছিলেন । বাঙালি মুসলমানের জাতিসত্তা নির্মাণে তাঁর ভূমিকা ঐতিহাসিক এবং স্বীকৃত । নওয়াব আলী চৌধুরী সম্পর্কে আমাদের তরুণ প্রজন্ম খুবই কম জানে,যা আমাদের জন্য লজ্জার কথা ।
আরো কিছু কথা
নওয়াব আলী চৌধুরী ১৮৬৩ খ্রিষ্টাব্দে টাঙ্গাইল জেলার বিখ্যাত ধনবাড়ি জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তারও আড়াইশ বছর আগে নওয়াব বাহাদুর সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরীর প্রপিতামহ শাহ সৈয়দ খোদা বক্স বর্তমান টাঙ্গাইল জেলার ধনবাড়ীতে বসতি স্থাপন করেন। নওয়াব আলী চৌধুরী শৈশবে গৃহ শিক্ষকের কাছে আরবি, ফার্সি, ও বাংলায় বিশেষ শিক্ষা লাভ করেন। তার আনুষ্ঠানিক লেখাপড়া শুরু হয় রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলে এবং পরবর্তীতে তিনি কলকাতার বিখ্যাত সেন্ট জোভিয়ার্স কলেজ থেকে এফএ পাস করেন।
১৮৯৫ থেকে ১৯০৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত নওয়াব সাহেবের কর্মতৎপরতা ছিলো প্রধানত সাহিত্য ও সংস্কৃতি কেন্দ্রিক। ১৮৯৫ খ্রিষ্টাব্দে মিহির ও সুধাকর পত্রিকা একত্রিত হয়ে সাপ্তাহিক মিহির-সুধাকর নামে আত্মপ্রকাশ করে। এর মালিক ছিলেন নওয়াব আলী চৌধুরী। এজন্য একটি প্রেস ক্রয় করে তিনি কলকাতায় তার নিজ বাসভবনে স্থাপন করেন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, পণ্ডিত রেয়াজউদ্দিন আহমদ আল মাশহাদী, কবি মোজাম্মেল হকের সাহিত্য প্রকাশনায় নওয়াব আলী চৌধুরীর দান ছিলো অপরিসীম।
১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন থেকে নওয়াব আলী চৌধুরী রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ অক্টোবর হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রবর্তকদের প্রবল বাধার মুখে বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হয়ে পূর্ব বাংলা ও আসাম নামক একটি মুসলিম প্রধান প্রদেশ জন্ম লাভ করলে নওয়াব আলী চৌধুরী একটা সর্বভারতীয় মুসলিম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গঠন করার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। তিনি মুসলমানদের অনগ্রসরতার জন্য অশিক্ষাকে দায়ী করেন। ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দের বঙ্গভঙ্গ কার্যকরের দিন ঢাকার নর্থব্রুক হলে তার ও ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহর উদ্যোগে প্রাদেশিক রাজনৈতিক সংগঠন গঠিত হয়।
১৯১১ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ আগস্ট ঢাকার কার্জন হলে ল্যান্সলট হেয়ারের বিদায় এবং চার্লস বেইলির যোগদান উপলক্ষে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে পৃথক দুটি মানপত্রে নবাব সলিমুল্লাহ ও নওয়াব আলী চৌধুরী ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানান। ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দের ৩১ জানুয়ারি লর্ড হার্ডিঞ্জের ঢাকায় অবস্থানকালে নওয়াব সলিমুল্লাহ ও নওয়াব আলীসহ ১৯ সদস্য বিশিষ্ট একটি প্রতিনিধি দল তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে মুসলমানদের যে সমূহ ক্ষতি হচ্ছে সে কথা তুলে ধরেন। এ লক্ষ্যে ১৩ সদস্য বিশিষ্ট নাথান কমিটি গঠিত হলে নওয়াব আলী চৌধুরী এর অন্যতম সদস্য হন। এর অধীনে ছয়টি সাব কমিটি গঠিত হলে তিনি ৬ টি বিভাগের সদস্য নিযুক্ত হন। ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে আর্থিক সংকটের কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাজ চাপা পড়ে যায়। সে সময় নওয়াব আলী চৌধুরী ইম্পেরিয়াল কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন। ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দের ৭ মার্চ ইম্পেরিয়াল কাউন্সিলের সভায় তিনি বিষয়টিকে আবার উপস্থাপন করেন। ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ মার্চ ভারতীয় আইনসভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিল অ্যাক্টে পরিণত হয় এবং ২৩ মার্চ তা গভর্নর জেনারেলের অনুমোদন লাভ করে। লর্ড হার্ডিঞ্জ কর্তৃক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার নয় মাস পর ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যথারীতি ক্লাস শুরু হয়। ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি শিক্ষার্থীদের বৃত্তি বাবদ ১৬ হাজার টাকার একটি তহবিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদান করেন।
২০০৩ খ্রিষ্টাব্দের ৯ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এস.এম.এ ফায়েজের সভাপতিত্বে সিন্ডিকেটের এক সভায় সর্বসম্মতিক্রমে সিনেট ভবনের নাম ‘সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবন’ করা হয়।
নওয়াব আলী চৌধুরী ছিলেন অবিভক্ত বাংলার প্রথম মুসলমান মন্ত্রী। শিক্ষাবিস্তারে তার আন্তরিকতার জন্য সে সময় তাকে শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো। ১৯১০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি নিজ এলাকা ধনবাড়ীতে নওয়াব ইনস্টিটিউট নামের একটি হাই স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়া সোনাতলা, কোদালিয়া, গফরগাঁও, পিংনা, জঙ্গলবাড়ি, হয়বতনগরসহ বিভিন্ন স্থানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনে সহায়তা করেন। নওয়াব আলী চৌধুরী ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দে রংপুর অধিবেশনে মাতৃভাষা বাংলার পক্ষে প্রথম সোচ্চার হয়ে বলেছিলেন, ‘বাংলা আমাদের মাতৃভাষা, মাতৃস্তনের ন্যায়, জন্মভূমির শান্তি নিকেতনের ন্যায় বাংলা ভাষা। বাংলাভাষা আমাদের নিকট প্রিয়, কিন্তু হতভাগ্য আমরা, প্রিয় মাতৃভাষার উন্নতিকল্পে আমরা উদাসীন। অধঃপতন আমাদের হবে না – তো কার হবে?’ ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা ভাষাকে প্রদেশের সরকারি ভাষা করার জন্য লিখিত প্রস্তাব পেশ করেন। তার এই অবদান অনেক শিক্ষার মান উন্নয়ন করেছে। ১৮৯৬ খ্রিষ্টাব্দে খান বাহাদুর, ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দে নওয়াব, ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দে কমান্ডার অব দি ইন্ডিয়ান এম্পায়ার (সিআইই) এবং ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দে নওয়াব বাহাদুর পদবি লাভ করেন।
তথ্য সূত্র: ইন্টারনেট ও বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকা।