যেখানেই ফ্যাসিবাদ সেখানেই প্রতিবাদ প্রতিরোধ- বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান
২৮ জুন ২০২৬ ১৪:৫৩
গত ২৬ জুন শুক্রবার কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার অধিবেশনে বক্তব্য রাখেন আমীরে জামায়াত ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান
আমীরে জামায়াত ও বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আমাদের লড়াই হবে সকল অন্যায় ও অপশক্তির বিরুদ্ধে। নতুন, পুরাতন ফ্যাসিবাদ বুঝি না, যেখানেই ফ্যাসিবাদ সেখানেই প্রতিরোধ, সেখানেই প্রতিবাদ করা হবে। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই অব্যাহত থাকবে।
গত ২৬ জুন শুক্রবার সকাল সাড়ে ৯টায় রাজধানীর আল ফালাহ মিলনায়তনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার অধিবেশনে প্রধান অথিতির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
তিনি আরও বলেন, চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি সাধারণ নির্বাচন ও সংস্কারের জন্য সংস্কার পরিষদ গঠনের লক্ষ্যে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। জনগণ একই দিনে দুটি ভোট দিলেও একটি ভোটের মূল্যায়ন করা হলো। আরেকটি ফেলে দেয়া হলো। অথচ কোনোটিই অগুরুত্বপূর্ণ নয়।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, শাসনের যে ধারা অতীতে শাসকদের ফ্যাসিবাদী করে তুলেছিল জনগণ চেয়েছিল সেই ধারার পরিবর্তন হোক। এই পরিবর্তনের জন্য ব্যাপক সংস্কার অপরিহার্য। দীর্ঘদিন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে গুরুত্বপূর্ণ ৩১টি রাজনৈতিক দল একত্রিত হয়ে মাসের পর মাস সংলাপের পর জুলাই সনদ তৈরি করল। তার ভিত্তিতেই গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। আফসোস! বর্তমান সরকারি দল প্রায় ৭০ ভাগ মানুষের রায়কে অগ্রাহ্য করল। ফলে কোনো পরিবর্তন আসল না।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সরকার ইতোমধ্যেই সকল মৌলিক বিষয়কে অগ্রাহ্য করেছে। তারা স্বাধীন বিচার বিভাগ, স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন, স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন, স্বাধীন গুম কমিশন ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশন চাচ্ছেন না। ফলে যে জায়গাগুলোর কারণে ফ্যাসিবাদ কায়েম হয়েছিল- সেসব আগের জায়গায় থেকে গেল!
তিনি আরও বলেন, জনগণ আজ শুধু হতাশ নয়, ক্ষুব্ধও। তাদের ভোটের মূল্যায়ন কেন করা হলো না? নির্বাচনের আগে বর্তমান সরকারি ও বিরোধী দল বলেছে- আমরা গণভোট মানি আপনার গণভোটে হ্যাঁ বলুন। যারা এ আহ্বানে সাড়া দিয়েছেন, তাদের প্রায় ৭০ ভাগ ভোট অগ্রাহ্য হবে কেন? প্রশ্ন রাখেন আমীরে জামায়াত।
দেশবাসীর উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, আপনারা অনেক ত্যাগ ও কুরবানি স্বীকার করেছেন। হয়তো আরও ত্যাগ কুরবানির জন্য আমাদের প্রস্তুত হতে হবে। কেউ যদি আমাদের ন্যায্য অধিকার না দেয়, আমরা চুপ করে বসে থাকব না। সেই অধিকার আদায়ে আমাদের লড়াই চলবে। যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা ন্যায় ও কল্যাণের উপরে দেশের স্বার্থে, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের পক্ষে আমাদের ভূমিকা থাকবে, দেশবাসী ততদিন আমাদের দোয়া ও সহযোগিতা করবেন এবং পাশে থাকবেন। প্রয়োজনে সমালোচনা ও প্রতিবাদও করবেন, আমরা স্বাগত জানাবো।
আমীরে জামায়াত বলেন, আমাদের সীমান্তে কিছু সমস্যা আছে। আমাদের দেশবাসী ঐক্যবদ্ধ, বিজিবির পাশে আমাদের গোটা দেশবাসী আছেন। আমরা সকল ধরনের আধিপত্যবাদকে রুখে দিতে পারব। শুধু প্রয়োজন জাতীয় ঐক্যের। জাতীয় স্বার্থের জায়গায় সরকারি দল কিংবা বিরোধী দল ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ আয়তনে একটি ছোট্ট ভূখণ্ড। বর্তমানে আমাদের দেশে প্রায় ১৮ থেকে ২০ কোটি মানুষের বসবাস। আমরা আমাদের জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করতে পারিনি। কারণ সুশিক্ষার অভাব। আমাদের সমাজে যাদের উচ্চ শিক্ষিত দেখতে পাই; কার্যত তাদের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ আমানতের খেয়ানত করে চলেছে। তারা অবৈধ পথে মানুষের সম্পদ ও ইজ্জত গ্রাস করে ফেলছে। সমাজ এমনি এমনি চলে না, কাঠামো লাগে। কাঠামোর মূল দায়িত্ব যারা পালন করেন বা যারা শাসন ব্যবস্থা পরিচালনা করেন- তাদের মনস্তত্ত্ব ও আচরণের উপর নির্ভর করে সমাজ কতটুকু ভালো থাকবে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ দুইবার স্বাধীন হয়েছে। ১৯৪৭ সালে একবার ১৯৭১ সালে আরেকবার। বিপুল প্রত্যাশা নিয়ে এ স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল। কিন্তু সে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। দেশ পরিচালনার দায়িত্বে যারা ছিল- তাদের ব্যর্থতার কারণে আজও কোনো সামাজিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
আমীরে জামায়াত বলেন, বহু ত্যাগ তিতিক্ষা, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষ বড় আশাবাদী হয়েছিলেন। অনেকগুলো জীবনের বিনিময়ে আমরা একটি পরিবর্তন পেয়েছি। বাংলাদেশ আগামীতে সঠিক পথে পরিচালিত হবে।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, জনগণের দেয়া রায় সরকারি দল অগ্রাহ্য করলেও আমরা বিরোধী দল অগ্রাহ্য করব না। এজন্য বিষয়টি নিয়ে জনগণের কাছে এসেছি। ইতোমধ্যে ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। এ দাবি কোনো দলের জন্য নয়, জনগণের জন্য। এ রায় দিয়েছে জনগণ, জনগণের স্বার্থেই এ রায় বাস্তবায়ন করতে হবে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, মৌলিক সংস্কারগুলো করতে হবে। ক্ষমতায় ভারসাম্য আনতে হবে যাতে কেউ দুর্দান্ত ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠতে না পারে। জনগণের সম্পদ, ইজ্জত নিয়ে যাতে কেউ খেলতে না পারে- তার ওয়ারেন্টির জন্যই এ পরিবর্তন বা সংস্কার অপরিহার্য।
দেশবাসীর উদ্দেশে তিনি বলেন, নিজের অধিকার আদায়ে অনড় থাকুন। আমরা আপনাদের সাথে আছি। আপনারাও আমাদের সাথে থাকবেন, ইনশাআল্লাহ।
আমীরে জামায়াত বলেন, সমাজ ভালো নেই। ৫-৭ বছরের মেয়ে শিশুদের ধর্ষণ করা হচ্ছে, হত্যা করা হচ্ছে। গতকালও মা-মেয়েসহ চারজনকে খুন করা হয়েছে। গত ২১ জুন গাইবান্ধার সাঘাটায় স্কুলের কমিটি গঠন করার লালসা পূরণ করার জন্য ইসলামী ছাত্রশিবিরের স্থানীয় ইউনিয়ন দায়িত্বশীল সাইফুল্লাহ বারীকে দিনের বেলায় আপসের কথা বলে ডেকে নিয়ে খুন করা হয়েছে। তার সঙ্গী সালাউদ্দিনকে কুপিয়ে স্পাইনাল কড কেটে দেয়া হয়েছে। সে আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে না। তার বেঁচে থাকাই দুঃসহ যন্ত্রণার বিষয়। মানুষ অল্প স্বার্থের জন্য কতটা নির্মম ও বেপরোয়া হতে পারে- এটি তার সর্বশেষ উদাহরণ।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভূমিকার সমালোচনা করে তিনি বলেন, আমাদের দেশে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রয়েছে, তাদের অধীনে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা আছেন। তারপরও অহরহ এগুলো ঘটে যাচ্ছে। সাড়ে ১৫ বছরের কষ্ট ও এতোগুলো জীবন ত্যাগের পরে একটি সরকার গঠিত হয়েছে। এই সরকারের কাছে মানুষ ভিন্ন কিছু আশা করে।
আমীরে জামায়াত বলেন, আমরা জাতিকে কথা দিচ্ছি- জাতির স্বার্থে সংসদের ভিতরে আমাদের ভূমিকা পরিচালিত হবে। সরকার ভালো উদ্যোগ নিলে সহযোগিতা করব, গণবিরোধী যাই গ্রহণ করবে তার প্রতিবাদ করব, সামর্থ থাকলে আমরা প্রতিহত করব, ইনশাআল্লাহ। আমাদের এই প্রয়াস সংসদের ভিতরে ও বাইরে সমানতালে চলবে।
তিনি বলেন, আমরা একটি মানবিক সমাজ চাই। মানুষের বসবাসযোগ্য একটি বাংলাদেশ চাই। আমার শিশুর নিরাপত্তা চাই, সন্তানের নিরাপত্তা চাই, মা-বোন-মেয়ের ইজ্জতের নিরাপত্তা চাই। কোনো আধিপত্যবাদের কাছে মাথানত করতে চাই না। মাথা সোজা করা জাতি হিসেবে আমরা দাঁড়াতে চাই। এজন্য আমাদের সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।
মজলিসে শূরার অধিবেশনে সংগঠনের ২০২৫ সালের বার্ষিক রিপোর্ট, রাজনৈতিক রিপোর্ট ও প্রস্তাবনা, স্থানীয় নির্বাচনসহ বিভিন্ন বিষয়াদি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা ও পর্যালোচনাক্রমে কতিপয় সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সর্বস্তরের দায়িত্বশীলদের সর্বোত্তম নৈতিক মান ও জ্ঞান অর্জন করে সাংগঠনিক ও সামাজিক দায়িত্ব পালন করতে হবে। এর মাধ্যমে নৈতিকতা সম্পন্ন একটি সমাজ ও রাষ্ট্র বিনির্মাণের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। একই সঙ্গে জনশক্তি ও দায়িত্বশীলদের শপথের গুরুত্ব ও মর্যাদার অনুভূতি সহকারে আল্লাহর পথে সৈনিকের ভূমিকা রাখতে হবে।
তিনি আরও বলেন, জামায়াতের সংসদ সদস্যবৃন্দ এবং দাায়িত্বশীলগণ ব্যক্তিগত সুযোগ সুবিধা নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও জনগণের কল্যাণে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাবেন। পরিশেষে আগামী দিনের সকল প্রকার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে একটি মানবিক সমাজ ও দেশ গড়ার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান আমীরে জামায়াত।
আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে ও সেক্রেটারি জেনারেল এবং সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ারের সঞ্চালনায় মজলিসে শূরার অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর এটিএম আজহারুল ইসলাম এমপি, অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি, সাবেক এমপি মাওলানা আ ন ম শামসুল ইসলাম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলবৃন্দ, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্যবৃন্দ, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের (পুরুষ ও মহিলা) সদস্যবৃন্দসহ প্রায় ৪০০ জন কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার (পুরুষ ও মহিলা) সদস্য।
মজলিসে শূরায় গৃহীত প্রস্তাবনাসমূহ
দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি, সীমান্তে ভারত কর্তৃক অবৈধ পুশইন ও বাংলাদেশি নারিকদের হত্যা এবং সার্বভৌমত্বকে ক্ষুণ্ন করার অপপ্রয়াস, প্রবাসী বাংলাদেশিদের নানা সমস্যা এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চলমান সংঘাতময় পরিস্থিতি গভীর উদ্বেগের সাথে পর্যালোচনা করে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ, রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণ এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সর্বসম্মতিক্রমে নিম্নোক্ত প্রস্তাবসমূহ গ্রহণ করছে-
অবিলম্বে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন : সকল রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রণীত ও স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদ এবং চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটে সংবিধান সংস্কারের লক্ষ্যে ‘হ্যাঁ’ -এর পক্ষে দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষের গণরায় একটি বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের মৌলিক রূপরেখা। কিন্তু গণভোটের রায় সরকার কর্তৃক অসম্মান ও অগ্রাহ্য করায় জনগণের মধ্যে চরম হতাশা, ক্ষোভ বিরাজ করছে এবং সরকারের প্রতি অনাস্থা সৃষ্টি হয়েছে, যা রাষ্ট্রের জন্য একটি অশুভ সংকেত।
এ প্রেক্ষিতে কেন্দ্র্রীয় মজলিসে শূরা জোরালোভাবে প্রস্তাব করছে যে, ক) গণভোটের গণরায় অবিলম্বে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে। যার মাধ্যমে জনগণের আকাক্সক্ষার প্রতিফলনের পথ প্রশস্ত হবে। খ) চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে এমন সকল রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও অংশীজনদের সম্পৃক্ত করে জাতীয় ঐকমত্য বজায় রাখতে পদক্ষেপ নিতে হবে।
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও সিন্ডিকেট ভাঙতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ : দ্রব্যমূল্যের ক্রমবৃদ্ধির ফলে দেশের প্রান্তিক শ্রেণি থেকে শুরু করে নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ নিত্যপণ্য ক্রয়ের সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। ফলে নাগরিকদের ভোগান্তি বেড়েছে।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে মজলিসে শূরা প্রস্তাব করছে যে, ক) নাগরিকদের ক্রয় ক্ষমতা বিবেচনায় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও বাজার সিন্ডিকেট ভাঙতে সরকারকে নিয়মিত বাজার মনিটরিং, ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম পরিচালনা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত তদারকি জোরদার করতে হবে। খ) ভর্তুকি ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে দরিদ্র ও নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীকে সহায়তা প্রদান করতে হবে। গ) দেশের উৎপাদন খাতকে নিরাপদ ও সাশ্রয়ী রাখতে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত কোনো ভোগান্তি না হয়। ঘ) জ্বালানি খাতের স্থিতিশীলতার জন্য দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে।
আইনশৃঙ্খলা, চাঁদাবাজি, হত্যাকাণ্ড ও দখলবাজি বন্ধ এবং সন্ত্রাস নির্মূলে জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন : আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতিতে দেশব্যাপী হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিস্তার ও জননিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য এবং দেশি ও বিদেশি (এফডিআই) বিনিয়োগের পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতা ব্যাহত হবে। এছাড়াও বাংলাদেশের সীমান্তে অস্থিরতার জন্য প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত অশুভ পরিকল্পনা অব্যাহত রেখেছে। যার কারণে সাম্প্রতিক সময়ে পুশইন চেষ্টা, আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইনকে বৃদ্ধাঙ্গলি দেখিয়ে বাংলাদেশি নাগরিকদের অন্যায়ভাবে গুলি করে হত্যা করছে ভারতীয় বাহিনী বিএসএফ।
এ প্রেক্ষিতে মজলিসে শূরা প্রস্তাব করছে যে, ক) অপরাধীদের দলীয় পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনা না করে তাদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনতে হবে এবং শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। খ) আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নকল্পে অবশ্যই অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করতে হবে। খ) আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে তাদের পেশাদারিত্ব, দক্ষতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। নিম্ন আদালত ও উচ্চ আদালতের বিচার ব্যবস্থাকে নিরপেক্ষ, দ্রুত, কার্যকর ও সময়োপযোগী করতে হবে। গ) দেশে ধর্ষণ রোধ ও ধর্ষকদের শাস্তি নিশ্চিতে সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সমাজের সর্বস্তরের জনগণকে সচেতন করে সামাজিক প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। ঘ) ভারত কর্তৃক অবৈধ পুশইন ঠেকাতে সরকারের দৃঢ় ও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে বিজিবিকে সক্রিয় রাখা। একই সঙ্গে সীমান্তবর্তী নাগরিকদের সতর্ক রাখতে স্থানীয় সরকার ও প্রশাসনের মাধ্যমে ব্যবস্থা নিতে হবে। ঙ) সীমান্ত হত্যা বন্ধে ও পুশইন ঠেকাতে কূটনৈতিক চ্যানেলে তীব্র প্রতিবাদ জানানো ও আলোচনায় মাধ্যমে সীমান্তের যেকোনো সমাধানের পন্থা নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য আন্তর্জাতিক লবি, মানবাধিকার সংগঠনগুলোকে কাজে লাগাতে হবে। চ) ভারতের পানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক চ্যানেলে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। ছ) সরকারকে ভারতীয় হাইকশিনারের বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও অখন্ডতা বিরোধী বক্তব্যের প্রতিবাদ করতে হবে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন দ্রুত অনুষ্ঠান : গণতন্ত্রকে অর্থবহ করতে ও রাষ্ট্রের সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার জন্য স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা, শৃঙ্খলা এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় দ্রুত নির্বাচনের বিকল্প নেই। এমতাবস্থায় মজলিসে শূরা প্রস্তাব করছে যে, স্থানীয় পর্যায়ের সকল স্তরে দ্রুত নির্বাচন দেয়ার লক্ষ্যে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পাওয়া সরকার দলীয় নেতাদের অতি দ্রুত অপসারণ করতে হবে।
রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক কাঠামোতে দলীয়করণমুক্ত ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা : রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানসমূহে দলীয়করণ, পক্ষপাতিত্ব ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের ফলে সুশাসন, জবাবদিহিতা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ব্যাহত হচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা নিম্নোক্ত প্রস্তাবসমূহ উপস্থাপন করছে- ক) প্রশাসন, বিচার বিভাগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সকল ধরনের দলীয় ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে সংবিধান ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে পরিচালনা নিশ্চিত করতে হবে। খ) রাষ্ট্রের সকল পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীর নিয়োগ, পদোন্নতি, পদায়ন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে মেধা, যোগ্যতা, দক্ষতা, সততা এবং কর্মদক্ষতাকে একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যাতে জনগণ দক্ষ, নিরপেক্ষ ও মানসম্মত সেবা লাভ করতে পারে। গ) নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও জনআস্থা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি শক্তিশালী, স্বাধীন, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে সকল নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনার ব্যবস্থা করতে হবে।
বেসরকারি স্কুল ও মাদরাসার শিক্ষকদের বেতন-ভাতা এবং অবসর সুবিধা নিশ্চিতকরণ : কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা নিম্নোক্ত প্রস্তাবসমূহ পেশ করছে- ক) বেসরকারি স্কুল ও মাদ্রাসার শিক্ষকদের বেতন-ভাতা সময়োপযোগী করতে হবে এবং মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তা পুনর্র্নিধারণ ও নিয়মিত পরিশোধ নিশ্চিত করতে হবে। খ) অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকগণের অবসরকালীন ভাতা ও অন্যান্য প্রাপ্য সুবিধা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রদানের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, যাতে তাঁরা আর্থিক অনিশ্চয়তা ও দুর্ভোগ থেকে মুক্ত থাকতে পারেন।
জুলাই গণহত্যাকারীদের বিচার দ্রুত সম্পন্নকরণ : বর্তমান সরকারের সময়ে পতিত ফ্যাসিবাদী শাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সহযোগীদের বিরুদ্ধে চলমান বিচার কার্যক্রমে ধীরগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। একই সঙ্গে অভিযুক্তদের মধ্যে অনেকের জামিনে মুক্তি জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এতে নির্যাতিত ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ন্যায়বিচার প্রাপ্তি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এ প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা প্রস্তাব করছে- ক) ফ্যাসিবাদী শাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে চলমান বিচার কার্যক্রম দ্রুত, স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও আইনসম্মতভাবে সম্পন্ন করে দেশে ন্যায়বিচার, আইনের শাসন এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, উপরোক্ত প্রস্তাবসমূহ আন্তরিকতা, স্বচ্ছতা ও কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হলে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, সামাজিক নিরাপত্তা, সুশাসন এবং আইনের শাসন সুদৃঢ় হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতা আরও বৃদ্ধি পাবে।
এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সকল রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ, নীতিনির্ধারক, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং সচেতন নাগরিকদের প্রতি এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নে সম্মিলিত, দায়িত্বশীল ও আন্তরিক উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানানো হচ্ছে।