নারী অধিকার

সোনার বাংলা অনলাইন
১৩ ডিসেম্বর ২০২৫ ১১:৪১

ইসলামে-নারীর-অধিকার

মুসফিকা আন্জুম নাবা
ধর্ম, বিশ্বাস, ঐতিহ্য, মূল্যবোধ, চিন্তা ও আদর্শগত পার্থক্যের কারণে নারী অধিকার নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান ও বিস্তর মতপার্থক্যও লক্ষ করা যায়। এক পক্ষের কাছে যা অধিকার, অপরপক্ষের কাছে তা অনধিকার বলে বিবেচিত হয়। কেউ কেউ পুরুষের সমান্তরালীকরণকেই নারীর প্রকৃত অধিকার বলে মনে করেন। এদের পক্ষ থেকেই এসেছে উভলিঙ্গিক পোশাকের ধারণা। তাদের মতে, পুরুষ-নারী উভয়ই মনুষ্য প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত। তাই পুরুষ-নারীর মধ্যে কোনো পোশাকি পার্থক্য থাকা যৌক্তিক নয়। তাদের ভাষায়, যে পোশাক লিঙ্গ নির্দেশ করে, তা বৈষম্যমূলক ও মানবতার অপমান। আবার পক্ষ বিশেষ নারীর সমঅধিকারের পক্ষপাতী। তারা মনে করেন, পুরুষ-নারীকে কোনোভাবেই সমান্তরাল করা যাবে না। শুধু অধিকারের ক্ষেত্রে সমতা আনায় যুক্তিযুক্ত। কারণ সৃষ্টিগতভাবে উভয়ের মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে, তা সমান্তরালের ভাবনা বাতুলতা মাত্র।
তারা মনে করেন, পুরুষ যা পারে, নারীর পক্ষেও তা করা সম্ভব। তাই সব ক্ষেত্রেই পুরুষের পাশাপাশি নারীর সমান সুযোগ নিশ্চিত হওয়া দরকার। শিক্ষা-দীক্ষা, পেশা-কর্ম, রাজনীতি, ক্ষমতায়ন, সামাজিকতা, পারিবারিক জীবন, লোকাচার ও চলাফেরায় পুরুষরা যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন, নারীদের ক্ষেত্রে তা নিশ্চিত করতে হবে। আবার বিশেষ পক্ষ সমঅধিকার নয়, বরং নারীর ন্যায্য অধিকারের পক্ষে। তারা মনে করেন, নারী-পুরুষের মধ্যে সৃষ্টিগত যে পার্থক্য রয়েছে, তা কোনোভাবেই সমান করার সুযোগ নেই। খুব সঙ্গত কারণেই পুরুষ ও নারীর মধ্যে দায়িত্ব, কর্ম ও অধিকারগত ভিন্নতা রয়েছে। তাই ন্যায্য অধিকারের ধারণাটাই অধিকতর যুক্তিযুক্ত। সৃষ্টির আদিকাল থেকে চলে আসা নারী অধিকার বিষয়ক এসব মতপার্থক্যের বিষয়ে একবিংশ শতাব্দীতে এসেও কোনো একক ও অভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছা যায়নি। এটিকে সভ্যতার ব্যর্থতা বললেও অত্যুক্তি হবার কথা নয়।
প্রথমেই আলোচনায় আসা যায় নারীকে পুরুষের সমান্তরাল মনে করা এবং সমঅধিকার বিষয়ে। মূলত এ দুটি ধারণায় ত্রুটিপূর্ণ মনে করার যথেষ্ট উপাদান বিদ্যমান রয়েছে। কারণ মানুষে মানুষে সমান্তরাল হওয়ার সুযোগ নেই। কোনো পুরুষ যেমন অন্য পুরুষের সমান্তরাল নন, ঠিক তেমনিভাবে কোনো নারীও অন্য কোনো নারীর সমান্তরাল হতে পারেন না। আর নারীকে পুরুষের সমতুল্য বা পুরুষকে নারীর সমতুল্য করার চিন্তা করাকে এক ধরনের বিকারগ্রস্ততা বলা যায়। কারণ নারী-পুরুষ যে-ই হোন না কেন, তারা প্রত্যেকেই আলাদা আলাদা সত্তা। প্রত্যেকের অবয়ব, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, ব্যক্তিত্ব, মেধা, মনন, কর্মতৎপরতা, যোগ্যতা, প্রজ্ঞা, রুচি-অভিরুচি, শক্তি-সামর্থ্য ও কর্মপরিধিও ভিন্নতর। তাই এক মানবসত্তা অন্য মানবসত্তার সমান্তরাল হওয়া যুক্তিযুক্ত নয়। আর সমঅধিকারের ধারণা তো আরও বেশি ত্রুটিপূর্ণ।
বিদগ্ধজনরা বলছেন, মানুষের অধিকার কখনো সমান হয় না। চাই সে পুরুষ হোক বা নারী। পৃথিবীতে যত মানুষ, অধিকারও তত ধরনের। যে অধিকার পিতার রয়েছে, সে অধিকার সন্তানের নেই; পক্ষান্তরে যে অধিকার সন্তানের রয়েছে, সে অধিকার পিতার নেই। একইভাবে মা-মেয়ের অধিকারও সমান নয়। মূলত নারী-পুরুষ সমঅধিকার তো দূরের কথা, পুরুষে পুরুষেও তো অধিকার সমান নয়। সঙ্গত কারণেই কোনো পুরুষ অফিসের ডিসি, অন্য পুরুষ চাপরাশি। কেউ প্রধান শিক্ষক, কেউ সহকারী আর কেউ চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। এরা প্রত্যেকেই পুরুষ বা নারী হলেও অভিজ্ঞান ও পদমর্যাদার কারণেই কর্ম, অধিকার, দায়িত্ব ও মর্যাদায় এক ও অভিন্ন নন। এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, সমঅধিকারের ধারণাটা ইতর প্রাণীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারলেও মানুষের জন্য প্রযোজ্য নয়। কারণ পশুতে পশুতে কোনো স্তরবিন্যাস না থাকলেও মানুষে মানুষে স্তরবিন্যাস রয়েছে সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই। এটি অলঙ্ঘনীয় বাস্তবতা।
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, সমঅধিকারের ধারণাটাই বেশ ত্রুটিপূর্ণ। কারণ ব্যক্তিবিশেষে অধিকারের ভিন্নতা রয়েছে। মূলত তথাকথিত নারী অধিকারের ধারক-বাহকরা নারী ও পুরুষের সম্পর্ককে এমনভাবে উপস্থাপন করেন যে, মনে হয় নারী-পুরুষ ভিন্ন ভিন্ন গ্রহের বাসিন্দা; একে অপরের প্রতিপক্ষ। কিন্তু বাস্তবতা তা নয়। বস্তুত পুরুষ-নারীতে যে প্রীতির সম্পর্ক পুরুষে পুরুষে বা নারীতে নারীতে কল্পনা করাও সম্ভব নয়। নারী-পুরুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা ও প্রীতিই সভ্যতা এবং সৃষ্টির ধারাবাহিকতার রক্ষাকবজ। আর আমরা তো আমাদের পিতামাতার ভালোবাসার ফসল; যুদ্ধ-বিগ্রহের নয়। তাই সমঅধিকারের কথা বলে পুরুষ ও নারীকে পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড় করানো সমাজ-সভ্যতার জন্য মারাত্মক হুমকি। অবশ্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রমও রয়েছে। আর ব্যতিক্রম কখনো ঐতিহ্য নয়, হতে পারে না।
এ কথাও অস্বীকার করা যাবে না যে, আমাদের এ ক্ষয়িষ্ণু সমাজে কোনো কোনো ক্ষেত্রে নারীরা নানাবিধ বৈষম্য ও প্রতিবন্ধকতার শিকার হচ্ছেন। সামাজিক অন্যায়, উৎপীড়ন, লাঞ্ছনা ও বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন প্রতিনিয়ত। পারিবারিক পরিমণ্ডলে দৃশ্য-অদৃশ্য, প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য শত অবমাননা, নিপীড়ন-নির্যাতন ও বৈষম্যের শিকার হয়ে থাকেন। সীমিত পরিসরে হলেও পুরুষদের ক্ষেত্রেও এ ধরনের বৈষম্যের অভিযোগ রয়েছে। আর এসব সমস্যা নারী-পুরুষের সমঅধিকার থিওরির মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয়, বরং এজন্য আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনা দরকার।
মূলত পাশ্চাত্যে নারী প্রগতির প্রধান ধারণা এসেছিল রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও চার্চের পক্ষ থেকে। রেনেসাঁ-পরবর্তী ব্যক্তি স্বতন্ত্রবাদ, অষ্টাদশ শতাব্দীর যুক্তিবাদ এবং উদার নৈতিকতার পরিপ্রেক্ষিতে পাশ্চাত্য লোকাচারের প্রভাব ছিল কম। কিন্তু ভারতীয় উপমহাদেশে নারী প্রগতির প্রধান বাধা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান থেকে না এলেও এক্ষেত্রে রাজনৈতিক উদাসীনতাও কম দায়ী নয়। কেউ কেউ নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রধান অন্তরায় মনে করলেও বাস্তবতার সাথে তা মোটেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়, বরং ধর্মীয় জ্ঞানের অপ্রতুলতা, কুপমণ্ডুকতা, কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা, ধর্মের অপব্যাখ্যা ও অপ্রয়োগই এজন্য প্রধানত দায়ী করা যেতে পারে।
মূলত মাত্রাতিরিক্ত অবক্ষয়, মূল্যবোধের বিচ্যুতির কারণেই আমাদের সমাজে নারীরা অধিকার বঞ্চিত, অবহেলিত ও উপেক্ষিত। নারী-পুরুষের সমঅধিকারের পক্ষে কথা বলা হলেও এক্ষেত্রে ন্যায্য অধিকারের ধারণাটাই অধিক যুক্তিযুক্ত। তাই এ কথা বললে অত্যুক্তি হবার কথা নয় যে, নারী-পুরুষ কর্ম, দায়িত্ব ও অভিজ্ঞানে কেউই কারো সমকক্ষ নয়, বরং তারা নিজ নিজ ক্ষেত্রে একে অপরের চেয়ে শ্রেয়তর। নারী ও পুরুষের ক্ষেত্রে যে সৃষ্টিগত তফাৎ রয়েছে তা কোনোভাবেই সমান্তরাল করা যাবে না। কেউ কেউ নারী ও পুরুষকে পরস্পরের সমকক্ষ করার জন্য উভলিঙ্গিক পোশাকের দাবি তুলেছেন, তাও রীতিমতো হাস্যকর। আপেল-কমলা ফল হলেও ‘ফল’ শিরোনাম দিয়ে একই মোড়কে রাখলেও ফল দুটির স্বাদ, গন্ধ ও খাদ্যপ্রাণ এক ও অভিন্ন হয়ে যায় না। যেমনিভাবে উভলিঙ্গিক পোশাক দিয়ে নারী-পুরুষের সৃষ্টিগত তারতম্য একাকার করাও সম্ভব নয়, ঠিক তেমনিভাবে সমঅধিকারের কথা বলে ডাঙার প্রাণীকে পানিতে নামিয়ে, পানির মাছকে ডাঙায় তুলে বাঁচানোও সম্ভব নয়।
মহলবিশেষ ধর্ম ও ধর্মীয় মূল্যবোধকে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রধান অন্তরায় বলে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে আসছেন। কিন্তু নিরপেক্ষ বিশ্লেষণে তা যৌক্তিক বলে মনে হয় না। এক্ষেত্রে বিংশ শতকে ধর্মীয়; বিশেষ করে ইসলামিক স্কলারগণ নারী অধিকার নিয়ে ইসলামের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন এবং পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও নিজ নিজ ক্ষেত্রে সমান্তরাল এবং একে অপরের পরিপূরক ও সহায়ক তা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন।
এ কথা বলা ঠিক হবে না যে, নারীরা তাদের অধিকার যথাযথভাবে ভোগ করতে পারছেন। তবে নারীর ক্ষমতায়ন, রাজনীতি, চাকরি-বাকরিতে নারীরা ব্যাপকভাবে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন বলে যেসব অভিযোগ রয়েছে, তা পুরোপুরি সত্য নয়, বরং বিভিন্ন ক্ষেত্রে কোটা সংরক্ষণ ও নানাবিধ রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার কারণে তারা ক্ষেত্রবিশেষে পুরুষের চাইতে অধিক সুবিধাভোগী। কিন্তু প্রশ্ন রয়েছে পারিবারিক জীবন নিয়ে। অভিযোগ রয়েছে, নারীরা পারিবারিকভাবে নির্যাতন ও বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। দাম্পত্য সঙ্গীদের কাছে জবাবদিহি ও অধীনস্থতাকে মহলবিশেষে বৈষম্য বলে বিবেচনা করা হয়। এটিও কোনো যৌক্তিক কথা নয়। কারণ মানুষ কখনোই জবাবদিহির ঊর্ধ্বে নয়। একজন নারী শুধুু পারিবারিক পরিসরেই জবাবদিহি করেন। কিন্তু একজন পুরুষের জবাবদিহির ক্ষেত্র বহুমাত্রিক। আমাদের ঐতিহ্য অনুযায়ী পরিবারের অর্থনৈতিক দায়িত্ব থাকার কারণেই পুরুষ পরিবারপ্রধান। তিনি হন তার সঙ্গিনীর চেয়ে জ্যেষ্ঠ, অধিকতর যোগ্য ও দায়িত্ব পরায়ন। তাই পারিবারিক শৃঙ্খলা ও শিষ্টাচারের জন্য একজন পুরুষ নারীর চেয়ে প্রাধান্য পাওয়ার যোগ্য। অবশ্য তাও শুধুই প্রতীকি। প্রভু-ভৃত্য পর্যায়ের নয়।
আমাদের সমাজে নারীরা পরিপূর্ণ অধিকার ভোগ করছেÑ এ কথা বলা যাবে না। অনেক ক্ষেত্রেই তারা নানাবিধ বৈষম্য ও প্রতিকূলতার শিকার হয়ে থাকেন। এজন্য আমাদেরকে অবশ্যই দৃষ্টিভঙ্গী পাল্টাতে হবে। মনে রাখতে হবে নারীরা পুরুষের মতোই মানুষ; একই শ্রষ্টার সৃষ্টি। নারীদের পারিবারিক পরিসরে ক্রীতদাসী মনে করার সুযোগ নেই। পুরুষদের মাথা ব্যথা হলে কিছু একটা আশা করা হয়। কিন্তু সবাইকে এ কথাও স্মরণ রাখা দরকার নারীরা, কিন্তু মস্তকবিহীন মানবী নন। মাথাব্যথা তাদেরও হতে পারে। তাই আসুন, দৃষ্টিভঙ্গি বদলাই; বিশ্বই বদলে যাবে।
লেখক : শিক্ষার্থী, জয়পুরহাট সরকারি মহিলা কলেজ, জয়পুরহাট।

নারী অধিকার

সম্পর্কিত খবর