পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দিল্লি সফরে ভারত-বাংলাদেশ নতুন সমীকরণ

গণপ্রত্যাশা সম্মানজনক মিত্রতা

প্রিন্ট ভার্সন
৯ এপ্রিল ২০২৬ ১০:১৮

॥ ফারাহ মাসুম ॥
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান গত ৭ এপ্রিল মঙ্গলবার ঢাকা ত্যাগ করে দিল্লি পৌঁছেছেন। তিনি ইন্ডিয়ান ওশান কনফারেন্সে অংশগ্রহণের জন্য সেখান থেকে মরিশাসে যাবেন। এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে ১০-১২ এপ্রিল ২০২৬। সফরের পথে তিনি নয়াদিল্লিতে স্টপওভার করেছেন এবং সেখানে ভারতের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক আলোচনার সূচনা হবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়েছে।
নয়াদিল্লিতে ড. রহমানের ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার কথা। আলোচনার মূল বিষয় দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন, যেখানে জোর থাকছে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা এবং যৌথ কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থের ওপর।
সাক্ষাৎকারগুলোয় পানিবণ্টন চুক্তি, বাণিজ্য, জ্বালানি সহযোগিতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তাসহ ভারত মহাসাগরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও আলোচনা হতে পারে। এই সংলাপ দুই দেশের সহযোগিতা শক্তিশালী করতে এবং দীর্ঘমেয়াদি, টেকসই অংশীদারিত্বের ভিত্তি স্থাপন করতে সহায়ক হবে বলে বিশ্লেষকরা বলছেন। এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত সফরের আউটকাম সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
দিল্লি থেকে একই বিমানে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের সাথে মরিশাস যাবার কথা ড. খলিলের। সেখানে দুই মন্ত্রীর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হতে পারে। ড. রহমানের সঙ্গে এই মরিশাস কনফারেন্স এবং দিল্লি সফরে থাকবেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা মি. হুমায়ুন কবির, যা বাংলাদেশের কূটনৈতিক উদ্যোগে ধারাবাহিকতা এবং কৌশলগত সমন্বয় নিশ্চিত করবে বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। পর্যবেক্ষকরা ড. খলিলকে আমেরিকান লবি এবং হুমায়ুন কবিরকে ভারতীয় লবির ঘনিষ্ঠ হিসেবে বিবেচনা করেন।
পররাষ্ট্র সম্পর্ক নির্ধারণের শীর্ষ দুই নীতিপ্রণেতার এই শুভেচ্ছা সফর বাংলাদেশের ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও গভীর ও সক্রিয় করার প্রতিশ্রুতি প্রদর্শন বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, উচ্চপর্যায়ের সংলাপ পারস্পরিক আস্থা, কৌশলগত সমন্বয় এবং সহযোগিতামূলক সমস্যা সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ড. খলিলুর রহমানের সফরের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং কৌশলগত সহযোগিতা আরও মজবুত হবে এবং ভবিষ্যতে উভয় দেশের জন্য সাফল্যময় ও স্থিতিশীল ফলাফল নিশ্চিত হবে বলে ভারতীয় গণমাধ্যম আশা ব্যক্ত করেছে।
দিল্লি সফরের তাৎপর্য
বাংলাদেশে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার মার্চ‑এপ্রিল ২০২৬-এ ক্ষমতা নেওয়ার পর প্রথম বড় রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক ইস্যুগুলোর একটি হলো ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরায় স্থাপনা ও সমন্বয়। এর আগে গত প্রায় ১৮ মাসে দুই দেশের সম্পর্ক ছিল কিছুটা ‘স্ট্রেনড’ বা উত্তেজনাপূর্ণ; বিশেষ করে যখন দেশটিতে হাসিনা সরকারের পতনের পর স্থিতিশীলতার প্রশ্ন উঠেছিল এবং নয়া সরকারের কূটনৈতিক অগ্রাধিকার নিয়ে যথেষ্ট অনিশ্চয়তা ছিল।
এই অবস্থায় দিল্লিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সফরকে শুধু ‘গুডউইল স্টপওভার’ নয়, বরং একটি নতুন সমীকরণের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে- যেখানে বিশ্বাস, সমঝোতা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা হবে একত্রে।
ড. খলিলুর রহমানের নয়াদিল্লিতে তিনদিনের সফর করেছেন- এটি নতুন সরকার গঠনের পর ভারতের সঙ্গে প্রথম উচ্চপর্যায়ের অফিসিয়াল যোগাযোগ। নানা কারণে এই সফর গুরুত্বপূর্ণ।
(ক) সম্পর্কের ‘রিসেট’ : বাংলাদেশ সরকার চাইছে সম্পর্ককে ‘মিউচুয়াল রেসপেক্ট ও মিউচুয়াল গেইনস’‑এর ভিত্তিতে সাজাতে, যেখানে দুই দেশের স্বার্থ ও অহংকার সমানভাবে বিবেচিত হবে।
(খ) অধিকতর কাঠামোগত সংলাপ : দিল্লিতে বৈঠকগুলোয় বহুমাত্রিক বিষয়ে আলোচনা হবার কথা : সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও প্রাণহানির ঘটনা কমানো; ভিসা পরিষেবা ও বাণিজ্য সহজীকরণ; পানিবণ্টন ও নদী সমস্যা (বিশেষত গঙ্গা/তিস্তা); উর্ধ্বমুখী বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা এবং শক্তি ও জ্বালানি সমস্যার অংশীদারিত্ব। এগুলো আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মৌলিক বিষয়।
(গ) ঐতিহাসিক/রাজনৈতিক ইস্যু : বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এছাড়া কিছু সংবেদনশীল ইস্যুও আলোচনা হবার কথা যেমন : প্রত্যর্পণের অনুরোধ (উচ্চ রাজনীতির ইস্যু হিসেবে), ভিসা ও পাসপোর্ট সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান ইত্যাদি।
এখন পর্যন্ত এটি ‘গুডউইল’ সফর বলা হলেও দুই দেশের মধ্যে বিশ্বাস তৈরি ও আলোচনা পুনরায় ত্বরান্বিত করা এটিকে বেশি তাৎপর্যমণ্ডিত করেছে।
জটিল ও বহুস্তরীয় দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে আশাবাদ যাই করা হোক না কেন, বাস্তবতা হলো- বাংলাদেশ-ভারত-চীন সম্পর্ক এখন দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতির একটি জটিল ও বহুস্তরীয় অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব এবং এরপরের রাজনৈতিক পরিবর্তন, যেভাবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নতুন দিগন্তে প্রবাহিত হয়েছে, তা কেবল দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নয়, সমগ্র আঞ্চলিক কৌশলগত সমীকরণকেও প্রভাবিত করছে। ২০২৬ সালের প্রথম দিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের দিল্লি সফর নতুন দ্বিপাক্ষিক সংলাপের সূচনা করেছে, যা ভারত এবং চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে দেখা হয়। তবে এখন নতুন বাস্তবতা এবং নতুন সরকার।
এখনকার বাস্তবতায় তিনটি গুরুত্বপূর্ণ স্তরের বিশ্লেষণ জরুরি- (১) ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের পুনঃসংজ্ঞা এবং কূটনৈতিক রিসেট, (২) তিস্তা ও গঙ্গার পানি বিতরণ চুক্তি সম্পাদন ও নবায়ন এবং পানি-নীতির জটিলতা, (৩) বাংলাদেশের ত্রিমুখী ভূরাজনৈতিক অবস্থান এবং চীন-ভারত-বাংলাদেশ ত্রিভুজের কৌশলগত জটিলতা।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের নতুন সমীকরণ
২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তন করেছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নতুন দিগন্তে প্রবাহিত হয়েছে। পূর্ববর্তী সময়ে সম্পর্ক কিছুটা উত্তেজনাপূর্ণ ছিল; বিশেষত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অনিশ্চয়তার কারণে। ড. খলিলুর রহমানের দিল্লি সফর এই সম্পর্ক পুনরায় স্থাপন ও সমন্বয়ের জন্য প্রথম উচ্চপর্যায়ের উদ্যোগ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
সফরের মূল উদ্দেশ্য হলো- দ্বিপাক্ষিক বিশ্বাস পুনঃস্থাপন; বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা ত্বরান্বিত করা; সীমান্ত নিরাপত্তা ও পানিবণ্টন ইস্যুতে সমাধান সূচনা; শক্তি, জ্বালানি ও অবকাঠামোগত সহযোগিতা বৃদ্ধি। ড. খলিলুর রহমানের সফর কেবল শাস্ত্রীয় কূটনৈতিক সফর নয়, এটি দুই দেশের কৌশলগত ও রাজনৈতিক পুনরায় সমীকরণের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বের কৌশল এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা উন্নয়ন করা যায়, সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক চাপের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। এর সাথে রয়েছে অর্থনৈতিক ও মানবসম্পর্কের সংহতি, সীমান্তে বাণিজ্য সহজীকরণ এবং জনগণভিত্তিক যোগাযোগের উন্নয়ন।
পানিবণ্টন ও নদী কূটনীতি : তিস্তা ও গঙ্গা
তিস্তা ও গঙ্গা নদীর পানিবণ্টন নিয়ে যুক্তি ও চুক্তির নবায়ন এখন সরকারের সামনে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। তিস্তা নদী ভারতের সিকিম থেকে উৎপন্ন হয়ে পশ্চিমবঙ্গের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে প্রবেশ করে। নদীটি কৃষি, পানীয় পানি সরবরাহ এবং পরিবেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৮৩ সালে অস্থায়ী পানিবণ্টন চুক্তি হলেও বাস্তবায়ন হয়নি এবং ২০১১ সালে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি অসমাপ্ত রয়ে গেছে।
এর পেছনে রয়েছে ভারতের রাজনৈতিক বাধা। ভারতের রাজ্য রাজনীতি এবং বাংলাদেশের প্রত্যাশার মধ্যেও রয়েছে দ্বন্দ্ব। খরা, বন্যা এবং মৌসুমি পানিস্তর পরিবর্তনের মতো প্রাকৃতিক ওঠানামার ইস্যুও সামনে আনা হয়। আবার আন্তর্জাতিক ও রাজ্য স্বার্থের সংঘাতও রয়েছে। পানি চুক্তি কেবল দ্বিপাক্ষিক নয়, এটি চীনের কৌশলগত প্রকল্পের প্রভাবেও প্রভাবিত।
নতুন সমীকরণ : কী পরিবর্তন করছে?
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নতুন সমীকরণকে বোঝার জন্য কিছু মূল দিক রয়েছে : (ক) নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও কূটনৈতিক এজেন্ডা : বাংলাদেশে শাসনতান্ত্রিক পরিবর্তনের পর (বিএনপি‑ নেতৃত্বে) দিল্লি‑ঢাকার সম্পর্ক পুনরায় সমন্বিত হতে শুরু করেছে। পূর্ববর্তী সরকারের পরিপ্রেক্ষিতগুলো থেকে এগিয়ে ঢাকায় নতুন রাজনৈতিক অগ্রাধিকার ও নীতিগত দক্ষতা তৈরি হচ্ছে।
(খ) আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও কৌশলগত পুনঃক্রমাঙ্কন : দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এখন শুধু ব্যবসা বা আঞ্চলিক উন্নয়ন নয়, দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা স্থিতিশীলতা, চীন‑পাকিস্তান‑ভারত ত্রিভুজ এবং রাশিয়া‑যুক্তরাষ্ট্রের ভূ‑রাজনৈতিক চাপের মাঝে সমন্বয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তাই দিল্লি সফর শুধু রূপান্তর নয়, বৃহত্তর কৌশলগত পুনঃক্রমাঙ্কন (Recalibration) বলেও প্রতিফলিত হচ্ছে।
(গ) পিপল‑টু‑পিপল সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক ইন্টিগ্রেশন : নারিকেল, পণ্য আমদানি‑রপ্তানি, বাণিজ্য সহজীকরণ এবং সীমান্ত যোগাযোগে পরিবর্তন আনা দুই দেশের মধ্যে মানবসম্পর্ক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে শক্তিশালী করবে- যেটা ভবিষ্যতের স্থিতিশীল রাজনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তি।
কী ঘটতে পারে আগামীতে?
ইতিবাচকভাবে দেখলে আগামীতে কিছু পরিবর্তন দেখা যেতে পারে, যার মধ্যে থাকতে পারে বিশ্বাসভিত্তিক রাজনৈতিক সংলাপ বৃদ্ধি এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ‘নতুন অধ্যায়’ শুরু। এছাড়া ট্রেড, শক্তি, পানি ও সীমান্ত বিষয়গুলোর সংগঠিত সরলীকরণ ঘটতে পারে এবং দক্ষিণ এশিয়ার অঞ্চলে স্থিতিশীল ভূ‑রাজনৈতিক অবস্থা উজ্জ্বল হবার সম্ভাবনা দেখা যেতে পারে।
সংক্ষেপে বলা যায় খলিলুর রহমানের দিল্লি সফর এটা কেবল কূটনৈতিক ভ্রমণ নয়, এটা রাজনৈতিক সম্পর্কের পুনঃরূপায়ণ এর প্রথম বড় ধাপ। নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে দু’পক্ষই আগের উত্তেজনা কাটিয়ে এগিয়ে যেতে দৃঢ় ইচ্ছা প্রকাশ করছে। সম্পর্ক এখন দ্বিপাক্ষিক স্বার্থ, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক ও সামাজিক যোগাযোগকে কেন্দ্র করে সাজানোর চেষ্টা চলছে।
তিস্তা নদীর পানি‑বিতর্ক
তিস্তা নদী ভারতের সিকিম থেকে উৎপন্ন হয়ে পশ্চিমবঙ্গের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে এসে ব্রহ্মপুত্র (যমুনা)‑তে মিলিত হয়। এটি স্থানীয় কৃষি, উপজীবিকা, পানি সরবরাহ ও পরিবেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৮৩ সালে প্রথম এক অস্থায়ী পানিবণ্টন চুক্তি হয়েছিল, যেখানে বাংলাদেশকে ৩৬%, ভারতকে ৩৯% পানির প্রবাহ বরাদ্দ করা হয়েছিল কিন্তু তা চুক্তিবদ্ধ হয়নি।
২০১১ সালে প্রায় দীর্ঘমেয়াদি পানিবণ্টন চুক্তিতে পৌঁছানোর উদ্যোগ হয়েছিল- যেখানে বাংলাদেশকে শুষ্ক মৌসুমে প্রায় ৩৭.৫% পানি দেওয়া হবে- কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারের (মমতা ব্যানার্জি) রাজনৈতিক বিরোধিতার কারণে তা বাস্তবে আর হয়নি।
ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারই চুক্তি করতে চাইলেও রাজ্য‑রাজনৈতিক বাধা (বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের কৃষিকামী হিসেব ও রাজ্য স্বার্থ) প্রায়ই চুক্তি বাধাগ্রস্ত করে। শুষ্ক মৌসুমে খরা ও পানি সঙ্কট, বর্ষায় বন্যা এই প্রাকৃতিক ওঠানামার মাঝে নির্দিষ্ট অঙ্কে পানি বরাদ্দ ও সুষ্ঠু নিয়ন্ত্রণ খুবই জটিল হয়।
রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে পানি দাবি‑প্রতিদাবি অতিরিক্ত গরম হয়ে ওঠে, যা দুই দেশের মাঝে বিশ্বাস‑হীনতা তৈরি করে।
তিস্তা পানিবণ্টনের ইস্যু একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত বাধা হিসেবে দুই দেশের সম্পর্ককে প্রভাবিত করে। বাংলাদেশের কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা ও উপজীবিকার ওপর এর সরাসরি প্রভাব থাকে।
একই সময়ে ভারতের পাশে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারের রাজনীতি ও কেন্দ্র ও রাজ্যের স্বার্থের টানাপড়েন এটিকে কেবল আন্তর্জাতিক দ্বিপাক্ষিক চুক্তির বাইরে ঘনিষ্ঠ ভৌগোলিক‑রাজনৈতিক কৌশলগত ইস্যু হিসেবে তুলে ধরে। কারণ রাজ্য‑মানমন্দসহ ভারতীয় রাজনীতিতে ওয়াটার রিসোর্সকে কেন্দ্রীয় কূটনীতি হিসেবে দেখা হয়।
এটি আর শুধু একটি টেকনিক্যাল পানি‑চুক্তি নয়, বরং এটি রাজনৈতিক ইচ্ছা, আন্তর্জাতিক বিশ্বাস ও অভ্যন্তরীণ স্বার্থের টানাপড়েনের সমন্বয়। বাংলাদেশের কৃষকদের চাহিদা ও ভারতের রাজ্য‑অর্থনৈতিক চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে বের করাই মূল চ্যালেঞ্জ।
তিস্তার মতো নদী ইস্যুতে শুধু বাংলাদেশ‑ভারত নয়, বাইরের রাষ্ট্র যেমন : চীনও সরাসরি বা পরোক্ষভাবে জড়িত হচ্ছে- যেমন, চীনা কোম্পানির দ্বারা তিস্তার মাস্টার প্লানের অংশীদারিত্ব নিয়ে আলোচনায় অংশগ্রহণ বা বিনিয়োগ‑সম্ভাবনা তৈরি।
এই ধরনের বহুপাক্ষিক যোগাযোগ- এতে টেকনিক্যাল অংশীদারিত্ব, অর্থনৈতিক প্রভাব ও রাজনৈতিক পারিপার্শ্বিকতা একসাথে কাজ করে। ফলে পানি‑চুক্তি কেবল দ্বিপাক্ষিক ইস্যু না থেকে বৃহত্তর দক্ষিণ এশিয়া কৌশলগত সত্তায় পরিণত হয়।
তিস্তা ইস্যুর পাশাপাশি ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি‑চুক্তি ২০২৬ সালে নবায়ন হতে যাচ্ছে এবং এর পরিবেশ, হাসিনা‑শাসনের সময় ভারতের সাথে আলোচনা ইত্যাদি পুরোনো বিচ্ছিন্ন ইস্যুগুলোর সাথে জড়িত যথেষ্ট রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রেক্ষাপট তৈরি করছে। জুনের মধ্যে এ বিষয়ে একটি সমঝোতায় উন্নীত হতে হবে।
সম্পর্কের দিন শেষের অর্থ : কৌশলগত পথ
তিস্তা পানিবণ্টন সমস্যার এমন জটিলতা ও দীর্ঘমেয়াদি টানাপড়েন থাকার পরেও, নয়াদিল্লি সফরের আলোকে বোঝা যায় যে দুই দেশ সম্পর্কের এজেন্ডা আরও বাস্তববাদী, রাজনৈতিক বাস্তবতার সাথে খাপ খাওয়ানো ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল দিয়ে সাজানো হয়েছে তা শুধুই পানি নয়, অনন্য কৌশলগত ইস্যুগুলোও সংলাপে নিয়ে আসছে।
বাংলাদেশ এখন প্রান্তিক বা একদিক‑নির্ভর সুলভ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে এসে স্বাধীন, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমন্বিত কৌশলগত অবস্থান নিতে চাইছে- যাতে পানি, বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্বার্থের ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করা হয়।
তিস্তা পানিবণ্টন সমস্যা কেবল পানিসম্পদ নয়, বরং রাজনৈতিক ও কৌশলগত ইস্যু, যা দুই দেশের সম্পর্কের গভীরতা ও প্রতিক্রিয়া উভয়েই প্রভাবিত করে।
এই ইস্যুতে রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতার সংমিশ্রণ, রাজ্য‑রাজ্য রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক কৌশলগত হাড্ডাহাড্ডি প্রতিযোগিতা একটি জটিল কূটনৈতিক চিত্র সৃষ্টি করেছে।
নয়াদিল্লি সফর ও সম্পর্কের সমীকরণে এই সমস্যাটি সমাধানের প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ও সমঝোতা ছাড়া স্থায়ী সমাধান আসা কঠিন।
বাংলাদেশ‑ভারত‑চীন ভূরাজনীতির ত্রিমুখী জটিলতা
বাংলাদেশ‑ভারত‑চীন ভূরাজনীতির ত্রিমুখী জটিলতার গভীর ও সমন্বিত বিশ্লেষণ দক্ষিণ ও দক্ষিণ‑পূর্ব এশিয়ার সামগ্রিক কৌশলগত মানচিত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং বাংলাদেশের অবস্থান সেখানে এক ধরনের ‘স্থিতিস্থাপক কেন্দ্র’ হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশ ভারত দ্বারা তিন দিকে ঘেরা (পূর্ব, উত্তর, পশ্চিম) এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর আছে। এই স্থানের কৌশলগত গুরুত্ব খুব বেশি; বিশেষত ভারতের সিলিগুড়ি করিডোর (কখনো কখনো ‘চিকেন নেক’ বলা হয়)‑এর কাছে, যা ভারতের উত্তর‑পূর্বকে মূল ভূখণ্ডের সাথে সংযুক্ত করে। এই করিডোরের নিরাপত্তা ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, আর বাংলাদেশ যদি কৌশলে সে বন্দরের রাজনীতি বদলায়, তাহলে ভারতের নিরাপত্তা কৌশলও বদলাতে পারে।
চীন এবং বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী। ১৯৭৬ থেকে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকলেও ২০০০-এর দশক থেকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং অবকাঠামো প্রকল্পে সম্পর্ক গভীর হয়েছে। ২০২৪ সালে ব্যাপক কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারিত্বে ঢুকেছে দু’দেশের সম্পর্কও।
চীন বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ, বন্দর, রেল ও অবকাঠামো প্রকল্প দিয়ে আসছে; বিশেষত বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পের মাধ্যমে। এছাড়া সামরিক সহযোগিতা, অস্ত্র কেনা‑বেচা এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরও চলছে।
চীনের উদ্দেশ্য- বঙ্গোপসাগর ও এর দক্ষিণাঞ্চলে প্রভাব তৈরি। ভারতের প্রভাব কমিয়ে দেওয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ার নেভাল/সামরিক কৌশলগত অবস্থান উন্নত করা। শিপিং ও বাণিজ্য পথ নিয়ন্ত্রণে থাকা।
অন্যদিকে ১৯৭১ সালে ভারত বাংলাদেশের স্বাধীন যুদ্ধের সময় সরাসরি সমর্থন করেছিল। তাই ঢাকা‑নয়াদিল্লির সম্পর্কে ঐতিহাসিকভাবে একটি বিশেষ মাত্রা রয়েছে। তবে সম্পর্ক সবসময় সমঝোতামূলক ছিল না। ভারত বাংলাদেশের ওপর কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে চায়, যেটি বাংলাদেশের মানুষ মেনে নিতে চায় না।
তিস্তা ও গঙ্গা পানিবণ্টন ইস্যুতে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি এবং ঢাকার প্রত্যাশার মধ্যে ব্যবধানের কারণে দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতা হয়নি। সীমান্তে নিরাপত্তা ও বর্ডার কিলিংও সম্পর্ককে প্রভাবিত করে। অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারণে কখনো কখনো দুই দেশের কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা হয়ে যায়।
ভারতের লক্ষ্য হলো বাংলাদেশের সাথে এমন নিরাপত্তা বন্ধন তৈরি করা যাতে সিলিগুড়ি করিডোর হুমকিতে না পড়ে। এর সাথে রয়েছে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় চীনা প্রভাব কমিয়ে দেওয়া।
এখান থেকে শুরু হয় চীন‑ভারত দ্বন্দ্ব। আর চীন আর ভারতের মধ্যে ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত‑প্রশান্ত অঞ্চলে বহু বছর ধরে চলেছে। এখানে মূল ইস্যুগুলো হলো: সীমান্ত গোলমাল- ভারত‑চীন সীমান্ত সংঘাত (যেমন গালওয়ান ভ্যালি) ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে, যা সামগ্রিকভাবেই এই অঞ্চলে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে তীব্র করে তোলে।
এক্ষেত্রে চীন প্রভাবশালী মডেল অনুসরণ করতে চায়। চীন বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্প, সামরিক ও বাণিজ্যিক চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশসহ অন্যান্য দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় প্রভাব বৃদ্ধি করছে। বাংলাদেশ একটি ছোট দেশ হলেও ‘হেজিং’ Hedging Strategy অর্থাৎ ক্ষতি কমানোর আর্থিক ব্যবস্থাপনা কৌশল অবলম্বন করছে। অর্থাৎ ভারত ও চীনের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে কোনো এক পক্ষের প্রতি নির্ভরশীল না হওয়ার চেষ্টা করছে।
কীভাবে ত্রিমুখী ভূরাজনীতি কাজ করছে?
বাংলাদেশ বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় এই কৌশল কাজে লাগাচ্ছে।
(ক) প্রতিযোগিতামূলক সহাবস্থান : বাংলাদেশের কৌশল হলো- ভারতের সাথে ঐতিহ্যবাহী সম্পর্ক বজায় রাখা, আর চীনের সাথে অর্থনৈতিক‑সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা, একই সময়ে কোনো এক পক্ষের ওপর অধিক নির্ভরশীল না হওয়া।
(খ) অর্থনৈতিক সুবিধার নেটওয়ার্কিং : চীনের বিনিয়োগ ও অবকাঠামো প্রকল্পের সুযোগ নেওয়া, এবং ভারতের সাথে বাণিজ্য ও লগ্নি‑সংযোগ বজায় রাখা- এটা বাংলাদেশকে রাজনীতিকভাবে শক্তিশালী অবস্থায় রাখে এবং বিকল্প পৃষ্ঠপোষকতা তৈরির সুযোগ দেয়।
বিপরীতে বাংলাদেশের জন্য প্রধান জটিলতা ও ভবিষ্যৎ শঙ্কার মধ্যে রয়েছে- (ক) নিরাপত্তা: ভারতের দৃষ্টিতে চীনের সামরিক উপস্থিতি বা ড্রোন/প্রযুক্তি সহযোগিতা সীমান্ত সংলগ্ন অঞ্চলে জটিলতা বাড়াতে পারে। (খ) রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা: এর পরিবর্তন হলে (যেমন ২০২৪-২৫‑এর রাজনৈতিক রীতি) ভারতের সাথে সম্পর্ক আরো চাপের মধ্যে পড়তে পারে। (গ) আন্তর্জাতিক ধাক্কা: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানও দক্ষিণ এশিয়ার ভূ‑রাজনীতিতে সক্রিয়, ফলে ত্রিমুখী খেলাটি শুধু ভারত‑চীন‑বাংলাদেশের মধ্যে নয়, আরো বৃহত্তর আন্তর্জাতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ঢুকে পড়ছে।
বাংলাদেশ‑ভারত‑চীন ভূরাজনীতি একটি জটিল, বহুস্তরীয় কৌশলগত ত্রিভুজ। এখানে বাংলাদেশ কৌশলগত হেজিং করছে: ভারত ও চীনের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে কোনো একক শক্তির প্রতি নির্ভরশীল না হবার চেষ্টা করছে। চীন অর্থনীতি ও নিরাপত্তায় ঢাকাকে আকৃষ্ট করছে। ভারত বাংলাদেশকে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার অংশ হিসেবে দেখে বিশেষত সিলিগুড়ি করিডোরের কারণে। এই ত্রিমুখী সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর ভূরাজনীতিকে পুনরায় সাজাচ্ছে, যেখানে বাংলাদেশ এখন ‘নিরপেক্ষ অথচ সক্রিয় ভূমিকা’ রাখতে চাইছে।
বাংলাদেশ-ভারত-চীন সম্পর্ক এখন কেবল দ্বিপাক্ষিক বা ত্রিপাক্ষিক কূটনীতি নয়, বরং এটি দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা ও ভূরাজনীতির মূল কৌশলগত স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ড. খলিলুর রহমানের দিল্লি সফর, চিস্তা ও গঙ্গা নদীর পানি-নীতি এবং চীন-ভারত-বাংলাদেশ ত্রিমুখী কৌশল বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থানকে একটি সক্রিয়, ভারসাম্যপূর্ণ এবং বহুস্তরীয় কৌশলগত কেন্দ্রে পরিণত করেছে। ভবিষ্যতের দিক থেকে দেখা যায়, বাংলাদেশের কৌশলগত হেজিং এবং সম্পর্কের স্থিতিশীলতা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক মানচিত্রে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে। তবে এদেশের মানুষ ভারতের সাথে সম্পর্ক অধীনতামূলক চায় না, তারা চায় সম্মানজনক সমমর্যাদার প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক।

ফারাহ মাসুম