দীর্ঘদিন পর নির্বাচিত সরকারি ও বিরোধীদলের কাছে জনগণের প্রত্যাশা
২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:৫২
॥ একেএম রফিকুন্নবী ॥
দীর্ঘ ৫৪ বছরে দেশের মানুষ স্বস্তিতে নিজেদের ভোট দিয়ে সরকারি ও বিরোধীদলের সংসদ সদস্য নির্বাচিত করতে পারেনি। এবারই প্রথম জনগণ উৎসবমুখর পরিবেশে তাদের ভোট দিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচন করে সংসদে পাঠিয়েছে। তবে নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিং হয়েছে অনেক আসনে। মানুষ ভোট ঠিকমতো দিলেও গণনা করতে গিয়ে এই ইঞ্জিনিয়ারিং করা হয়। কিছু সিট আগে থেকেই ঠিক করা হয় যে, এখানে জামায়াত জোটের প্রার্থীকে নির্বাচিত হতে দেয়া যাবে না। তাদের এলাকায় ভোটদানে বিরত রাখে অথবা নির্দিষ্ট মার্কায় ভোট দিতে বাধ্য করে। আবার একজনের ভোট আরেকজনের তালিকা লিখে, নষ্ট ভোট কারোটা ঠিক বলে চিহ্ন দেয়া, আবার কোনো মার্কার নষ্ট ভোট সঠিক করা। এমনো মিডিয়ায় এসেছে যে, ২০০ ভোটকে ১২০০ করে দেয়া হয়েছে। বিজিত ফল পরাজিতকে দেখানো হয়। এ ব্যাপারে ১১ দলীয় জোট জোট লিখিতভাবে নির্বাচন কমিশনকে অভিযোগ দিয়েছে, আবার আইনগতভাবেও দেখার প্রস্তুতি নিচ্ছে। জনগণের ভোটকে মূল্যায়ন করে সঠিক তালিকা প্রকাশ করা নির্বাচন কমিশনের কাজ। আমরা জনগণের পক্ষ থেকে এই দাবি করছি।
মাত্র কয়েকদিন পূর্বে নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন শহীদ জিয়া ও বেগম খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান। গঠন করেছেন ৫০ জনের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী নিয়ে মন্ত্রিপরিষদ। নির্বাচিত হয়েছেন বিরোধীদলের নেতা জামায়াতে ইসলামীর আমীর সদ্য নির্বাচিত সংসদ সদস্য ডা. শফিকুর রহমান। তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায় স্থান না পেলেও ১০ সিনিয়র নেতা মন্ত্রীর পদমর্যাদায় উপদেষ্টা হয়েছেন। বিরাট মন্ত্রিবহর। দেশের অর্থনীতি ভালো না। হাসিনা সরকারের আমলে তার দোসররা ব্যাংক খালি করে টাকা চুরি করে নিয়ে গেছে। টাকা দেশে থাকলেও কারো না কারো উপকার হতো। টাকা দিয়ে বিদেশের মাটিতে বেগমপাড়া, বাড়িঘর, ব্যবসা-বাণিজ্য গড়ে তুলেছে। দেশদরদি বলে কিছু নেই। তারপরও তারা কিন্তু সুখে-শান্তিতে আছে বলে মনে হয় না।
বর্তমান নতুন সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা খেয়েপরে মানুষ বাঁচতে চায়। অর্থনীতির চাকা সচল করে জনগণের বেকার সমস্যা সমাধান চায়। সড়কপথের চাঁদাবাজি বন্ধ দেখতে চায়। দলের লোকেরা গ্রামে-গঞ্জে বিরোধী নেতাকর্মীদের হয়রানি বন্ধ দেখতে চায়। রাস্তাঘাটে যানজট দেখতে চায় না। আইনাঙ্গনে সঠিক ও দ্রুতবিচার দেখতে চায়। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি বন্ধ দেখতে চায়। মাঠে-ঘাটে টেন্ডারবাজি, সিন্ডিকেটবাজি বন্ধ দেখতে চায়। পরদেশি নির্ভর বৈদেশিক নীতি দেখতে চায় না দেশের মানুষ। শহীদ জিয়া দেশকে প্রকৃত স্বাধীন দেশ হিসেবেই গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তার স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও কিন্তু একই ধারায় চলতে চেয়েছেন।
দীর্ঘ ১৬ বছর দুর্নীতির রানি হাসিনা দেশটাকে প্রতিবেশী দেশের করদরাজ্যে পরিণত করেছিলেন। করিডোরের নামে দেশের সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দিয়েছিলেন। দেশের মানুষের বেকারত্ব না ঘুচিয়ে পাশের দেশের লোকদের চাকরির ব্যবস্থা করেছিলেন, যা দেশের ছাত্র-যুবক-জনতা ভালোভাবে নেয়নি। বৈষম্যের আড়ালে দেশের ছাত্র-জনতা হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লেগেছিল। ফলে জুলাই ২০২৪ গোটা মাস শহর-বন্দর, গ্রাম-গঞ্জে হাসিনার বিরুদ্ধে জোর আন্দোলন চলে, যা শেষ দিকে বিপ্লবে পরিণত হয়। আগস্টের শুরুতেই মানুষ ঢাকামুখী হতে থাকে। সরকারও শক্ত হাতে এ বিপ্লব রোধ করার চেষ্টা করে। গুলি করে ছাত্র-জনতাকে হত্যা করে তার শেষ রক্ষার চেষ্টা করে। মহান আল্লাহর মেহেরবাণিতে আগস্টের ৫ দিনের মধ্যেই বিপ্লবের চূড়ান্ত ফল হয়ে যায়। সামরিক-বেসামরিক বাহিনী ছাত্র-জনতাকে গুলি করতে অপারগতা প্রকাশ করে। ফলে জনতা গণভবনমুখী অভিযান চালায়। গোটা রাজধানীতে ছাত্র-জনতার ঢল নামে। হাসিনা পালাতে বাধ্য হয়। দেশ রাহুমুক্ত হয়।
১৮ মাসের চেষ্টায় ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকার একটি নির্বাচনের আয়োজন করে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। সারা দিন নির্বাচন উৎসবমুখর ছিল। ভোটগণনার সময় পরিকল্পিতভাবে ভোট কারচুপির মাধ্যমে প্রায় ১০০ সিটে জামায়াত জোটকে হারিয়ে দেয়া হয়। বিএনপিকে ২০৯ সিটে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। অন্যদিকে জামায়াত জোটকে ৭৭ আসনে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। জামায়াত জোট ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে বিশৃঙ্খলা না করে ধৈর্যের সাথে পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে। তারেক জিয়া বুদ্ধিমত্তার সাথে বিজয়ী হয়েই ডা. শফিকুর রহমানের বাড়িতে দেখা করেন। অন্যান্য দলের নেতাদেরও বাড়িতে দেখা করেন। এটা ভালো লক্ষণ।
বিরোধীদলের নেতা জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলের জোটের প্রধান ডা. শফিকুর রহমান ঘোষণা দিয়েছেন, তারা দায়িত্বশীলতার সাথে বিরোধীদলে বসবে। ভালো কাজের সহযোগিতা করবে। মন্দ কাজ বা দেশের ক্ষতি হয় এমন কাজের বিরোধিতা করবে।
সরকারি দলের মন্ত্রী-এমপিরা ইতোমধ্যেই চাঁদাবাজি জায়েজ করার পদ্ধতি চালু করেছেন। সমঝোতার মাধমে টাকা নিলে চাঁদা হবে না। মিডিয়ায় প্রকাশ, বছরে চাঁদা আদায় শুধু পরিবহন খাতে ৩ হাজার কোটি টাকা, যা দিয়ে পথের শিশু ও যুবকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা সম্ভব। পুনর্বাসন করা সম্ভব। আমরা চাঁদাবাজির মূলোৎপাটন দেখতে চাই। সমাজ থেকে এ অভিশাপ কোনো মন্ত্রীর জন্য কাজে আসবে না। প্রধানমন্ত্রীকেও আহ্বান জানাতে চাই, এ চাঁদাবাজদের লাগাম ধরেন। দেশে কোনো বিশৃঙ্খলা আমরা দেখতে চাই না। বিরোধীদলের নেতার নেতৃত্বে ৭৭ জন এমপি মাঠে নামলে চাঁদাবাজি, দখলবাজি, সড়ক পথ, হাটঘাট, বাসস্ট্যান্ড, রিকশাস্ট্যান্ডের চাঁদাবাজি বন্ধ হতে বাধ্য। এক্ষেত্রে প্রশাসনের সহযোগিতা একান্ত জরুরি। আমরা নতুন সরকারের লোকদের সাবধান হওয়ার অনুরোধ করতে চাই- আসুন, আমরা সরকারি ও বিরোধীদলের লোকেরা ভালো কাজের উদাহরণ তৈরি করি।
সরকারের আরেক মন্ত্রীর জুলাই সনদের ব্যাখ্যা জনগণ মানে না। শতকরা ৬০ ভাগের বেশি মানুষের প্রত্যক্ষ ভোটে জুলাই সনদের পক্ষে হ্যাঁ দিয়ে জানান দিয়েছে, তারা জুলাই সনদের ভিত্তিতেই দেশ পরিচালনা দেখতে চায়। কারণ গত ৫৪ বছরের রাজনীতি দেখে ছাত্র-জনতা টের পেয়েছে যে, কীভাবে স্বৈরাচার তৈরি হয় এবং ছাত্র-জনতাকে শোষণ করার হাতিয়ার বানায় রাষ্ট্রক্ষমতাকে। জুলাই সনদ দীর্ঘ আলোচনা-পর্যালোচনা করে প্রকাশ্যে জনতাকে সাক্ষী রেখে সব দল এ জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছে। আবার গণভোটেও হ্যাঁ বিজয়ী হয়েছে। তাই এ সনদের ব্যতিক্রম করা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। আমরা আজ দেশটাকে বিপদে ফেলতে দিতে চাই না। সরকারপ্রধান তারেক জিয়াকেও অনুরোধ করব, জুলাই সনদের ভিত্তিতে দেশ চালান। ২-৪ জন ভারতীয় এজেন্টকে বিতাড়িত করেন। বাবা-মায়ের পথেই দেশ চালালে দেশের মানুষের উপকার হবে আপনার সরকারের সমর্থন বাড়বে। বিরোধীদলের সংসদ সদস্যদের অনুরোধ করব, তারা যেন তাদের এলাকা চাঁদামুক্ত করার কার্যকরী ব্যবস্থা নেন। ভোটের আগে যে সমস্ত ওয়াদা করা হয়েছে বা প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া। সরকার ও আমলাদের সাথে যোগাযোগ রেখে আগামী বাজেটের পূর্বেই এলাকার রাস্তাঘাট, পানির ব্যবস্থা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাসহ সব বিভাগের বাজেট তৈরির পূর্বেই আপনার এলাকার উন্নয়নে বাজেট যথাস্থানে পেশ করুন। বিরোধীদলের নেতা ডা. শফিকুর রহমানের উদাহরণ সামনে রেখে এলাকার রাস্তাঘাট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার উদ্যোগ নিন। প্রত্যেক এলাকায়ই পরিচ্ছনতাকর্মী রয়েছে। তাদের তদারকি করুন। দেখবেন আপনার শহর পরিষ্কার থাকবে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা ঈমানের অঙ্গ। তাই এ ব্যাপারে আমরা সচেতন হই। আমরা যদি আমাদের বাড়ির সামনের সড়ক নিজেরাই পরিষ্কার রাখি, তবে এলাকা ভালো থাকবে।
বিরোধীদলের দেশপ্রেমিক পদক্ষেপ সরকারি দলকেও প্রভাবিত করবে। নাই নাই রব সরকারি দলের কিছু লোকের থাকলেও তারা বাধ্য হবে পাশের এলাকার বিরোধীদলের সংসদ সদস্যের আচার-আচরণের ফলে। আমাদের দেশকে আমরা ভালো করতে চাই, মন্দ থেকে রক্ষা করতে চাই। মহান আল্লাহর নির্দেশ, ‘তোমরা ভালো কাজের আদেশ দাও, মন্দ কাজ থেকে বিরত থাক’। আল্লাহর এই বাণীকে আমরা সঠিকভাবে পালন করব, ইনশাআল্লাহ।
সরকারি ও বিরোধীদলের কাছে ছাত্র-জনতার প্রত্যাশা- তারা যেন তাদের দেয়া প্রতিশ্রুতি পালনে সচেষ্টা হয়। দেশ আমাদের সবার। তাই দেশকে এগিয়ে নেয়া আমাদের সবার কর্তব্য। যার যার কাজ যথাসময়ে করলেই দেশ এগিয়ে যাবে। বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা নয়, আবার সরকারি দলের মধ্যেই যেন অহঙ্কার না আসে বিরোধীদলকে উপেক্ষা করার।
প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যেই মিতব্যয়ী হওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন। তার গাড়িবহর কমিয়ে দিয়েছেন। শনিবারে অফিস করার ব্যবস্থা নিয়েছেন। শহীদ মিনারে দোয়ার ব্যবস্থা নিয়েছেন। করমুক্ত গাড়ি, সরকারি প্লট নেয়া থেকে বিরত থাকার ঘোষণা দিয়েছেন। বিরোধীদলের নেতারা অনেক পূর্বেই এ ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন। আমরা আবার বলতে চাই, সব ভালোর সাথে আমরা থাকবো, মন্দ থেকে দূরে থাকব। বৈদেশিক নীতি বাংলাদেশের জন্য হবে সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো শত্রুতা নয়। কারো প্রভুত্ব আমরা মানবো না। আমরা ৯২% মুসলমানের দেশ। তাই মুসলিম দেশগুলোর সাথে আমাদের বন্ধুত্ব বাড়াতে হবে। আমাদের জনশক্তি ঐ দেশগুলোয় প্রশিক্ষণ দিয়ে পাঠিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের চেষ্টা করতে হবে। বৈদেশিক বাণিজ্যের দিকে নজর দিতে হবে। টাকা ছাড়া ভালো দেশ গড়া যাবে না। তাই বৈধভাবে টাকা কামাইয়ের সব ব্যবস্থার প্রসার ঘটাতে হবে। বেকার যুবকদের কাজের ব্যবস্থা করতে হবে।
আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচন যাতে সুষ্ঠু হয়, তার ব্যবস্থা নিতে হবে। নির্বাচন কমিশন, অতিসত্বর স্বাধীনভাবে যেসমস্ত এলাকায় নির্বাচনের অভিযোগ আছে, তা মিটিয়ে ফেলতে হবে। সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা করেই স্থানীয় প্রশাসন মজবুত করতে হবে। সৎ, যোগ্য, দুর্নীতিমুক্ত লোক স্থানীয় নির্বাচনে জিতে এলে দেশকে আমরা ভালো পথে নিয়ে যেতে পারব। সরকারি দল ও বিরোধীদলের পারস্পরিক সম্পর্ক ভালো রেখেই একটি সুখী-সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যাশা রইল।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : rnabi1954@gmail.com