অর্থনীতির তিন সংকট
১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৬:২৩
কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি ও মজুরি বৃদ্ধি
॥ উসমান ফারুক॥
লুটপাট, লাগামহীন অর্থ পাচার ও দুর্নীতির কারণে ২০২০ সাল থেকেই বিনিয়োগ মন্দার কবলে চলে যায় দেশের অর্থনীতি। করোনা মহামারির পর থেকে রিজার্ভের সুউচ্চ ৪৮ বিলিয়ন ডলারেও ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের কুনজর পড়লে পরের এক বছরের মাথায় তলানিতে নামে ২০২২ সালে। রিজার্ভ সংকটে বিদেশি বিনিয়োগ প্রায় বন্ধ হতে চললে দেশি বিনিয়োগও থমকে যায়। ২০২৪ সালের আমি-ডামি নির্বাচনে গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকলে অর্থনীতি খাদের কিনারায় চলে যায়। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর অর্থনীতিকে সেখান থেকে টেনে তুললেও বিনিয়োগ মন্দার ফলে কর্মসংস্থান বাড়ছে না গত বছর পাঁচেক ধরে। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি না হওয়ায় সাধারণ মানুষের আয়ও বাড়ছে না সেভাবে। সরকারি হিসাবে বেকারের সংখ্যা ২৭ লাখ, যার ৮৭ শতাংশই উচ্চ শিক্ষিত। গত কয়েক বছরের মজুরি বৃদ্ধি সংক্রান্ত সরকারি তথ্য বলছে, মূল্যস্ফীতির প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৮ শতাংশ হলেও মজুরি বৃদ্ধির হার তার চেয়ে কমে হচ্ছে ৮ শতাংশ। মজুরি বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থানের মতো অর্থনীতির তিন পুরনো সমস্যার সমাধান হয়নি গত দেড় বছরেও। এতে চিড়েচ্যাপ্টা হয়ে থাকা দরিদ্র মানুষ হতদরিদ্রের জীবনযাপন করছে। মধ্যবিত্ত ও নির্ধারিত আয় তথা চাকরিজীবীরা কোনো মতে জীবন পার করছে। পুষ্টিকর খাবারের জোগান দিতে ব্যর্থ হচ্ছে আবার অর্থাভাবে চিকিৎসা নিতে পারছে না।
বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা এবং লুটপাটের অবসান ঘটে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে। স্বৈরাচারের পতন ঘটলেও প্রশাসনিক সংস্কারের কার্যক্রমটি শেষ হয়নি। খাদের কিনারা থেকে টেনে তোলার পর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন স্থিতিশীল হয়েছে। ডলারের বিপরীতে টাকার মান ধরে রাখতে পারছে। এখন অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার পরের ধাপে নিয়ে যেতে প্রয়োজন দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ। অর্থনীতিতে সেই প্রাণচাঞ্চল্য ফেরানো রাজনৈতিক সরকার ছাড়া সম্ভব না। রাজনৈতিক সরকার ছাড়া আন্তর্জাতিক সংস্থা আইএমএফও ঋণের পরের কিস্তি ছাড় করবে না জানিয়ে দিয়েছে।
দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক সরকার গঠিত হলে আস্থা পেয়ে দেশীয় উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে যাবেন। সেই বিনিয়োগের ধারাবাহিকতায় বিদেশি বিনিয়োগও আসতে শুরু করবে। তাতে উৎপাদনের চাকা ঘুরলে কর্মসংস্থান বেড়ে গিয়ে বৃদ্ধি পাবে মজুরি। এজন্য রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে অর্থনীতির এই তিন সংকট সমাধান দেখতে চায় ভোটাররা। যে দলের নির্বাচনী ইশতেহার জনগণকে এ বিষয়ে আশ্বস্ত করতে পারবে, তাদেরই ক্ষমতায় বসাবে জনগণ।
পাঁচ বছর ধরেই তলানিতে বিনিয়োগ
দেড় দশকের অর্থনৈতিক অচলাবস্থা, দুর্নীতি ও লুটপাটের চেপে ধরা ইতিহাস দৃশ্যমান হতে শুরু করে ২০২০ সালের দিকে। করোনা মহামারির পর তা ধরা দেয় সাধারণ নাগরিক জীবনেও। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী, এমপি, আমলাদের অর্থপাচার লাগামহীন হতে শুরু করলে বৈদেশিক মুদ্রার সুউচ্চ ৪৮ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ তলানিতে নামতে শুরু করে। বাধ্য হয়ে সরকার ২০২২ সালে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে ঋণ পেতে দ্বারস্থ হয়। যেকোনো দেশে বিদেশি বিনিয়োগ আসে তাদের বৈদেশিক মুদ্রার অবস্থা দেখে।
রিজার্ভ সন্তোষজনক না হলে বিদেশি বিনিয়োগ আসে না। বাংলাদেশের রিজার্ভের করুন অবস্থা দেখে ২০২০ সাল থেকেই বিদেশি বিনিয়োগ কমতে শুরু করে। সর্বশেষ পুঁজিবাজারের লুটপাটের কারণে সেখান থেকেও বিদেশি বিনিয়োগ সরে যেতে শুরু করে। তাতে বিনিয়োগ মন্দার প্রভাব পড়ে দেশি বিনিয়োগেও। নতুন বিনিয়োগের চেয়ে পুরনো বিনিয়োগ তুলে বিদেশে অর্থ পাচারের প্রতিযোগিতা শুরু করে আওয়ামী লীগ ও তাদের দোসর ব্যবসায়ীরা। অর্থনীতিতে বিনিয়োগের এমন মন্দার ফলে কর্মসংস্থান বাড়ছে না দেশে গত বছর পাঁচেক ধরে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের তথ্যানুযায়ী, ২০২০ সালে বাংলাদেশে নিট বিদেশি বিনিয়োগ ছিল এক দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলার। তারপরের বছরও খুব একটা বাড়েনি সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ। অথচ অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে সরকার এ সময়ে ঋণ করে ৭ বিলিয়ন ডলারের চেয়ে বেশি।
করোনা মহামারিতে দাতা সংস্থাগুলোর অর্থ অন্যান্য দেশ নিতে অনীহা প্রকাশ করলে অলস পড়ে থাকা অর্থ নিয়ে নেয় আওয়ামী লীগ সরকার। বিদেশি ঋণে শুরু করে ডজনের বেশি মেগা প্রকল্প। মূলত লুটপাট করতে এসব প্রকল্প নেওয়া হয়, যা পরবর্তীতে দৃশ্যমান হয়। সেই ঋণের ভারে টাকার মান পড়তে শুরু করে অর্থ পরিশোধ শুরু হলে। এভাবে ২০২৪ সালে বিদেশি বিনিয়োগ দেশে আসে ১ দশমিক ৭১ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে ঋণ নেয়ার পরিমাণ বাড়তে থাকায় গত পাঁচ বছরে বিদেশি ঋণের পরিমাণও বেড়ে যায় ৪২ শতাংশ।
বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে ২০২৪ সাল শেষে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ ছিল ১০ হাজার ৪৪৮ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। পাঁচ বছরে আগে অর্থাৎ ২০২০ সালে তা ছিল ৭ হাজার ৩৫৫ কোটি ডলার। ৫ বছরের ব্যবধানে ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ৪২ শতাংশ।
সেই ঋণের চাপ ও লাগামহীন অর্থ পাচারে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ক্ষয় হওয়ায় টাকার মানও কমে গিয়ে জিনিসপত্রের দাম আকাশচুম্বী হতে শুরু করে ২০২২ সাল থেকে। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে বাড়তে থাকা মূল্যস্ফীতি এক লাফে দুই অঙ্কের ঘরে গিয়ে ৯ দশমিক ৫২ শতাংশে ওঠে। এরপর টানা দুই অঙ্কের ঘরে থাকা মূল্যস্ফীতি সর্বোচ্চ ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশ হয় ২০২৪ সালের জুলাই মাসে। এর সঙ্গে রয়েছে বাজার ব্যবস্থাপনায় আওয়ামী সিন্ডিকেট থামাতে না পারা।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে মূল্যস্ফীতি কমতে শুরু করে। সর্বশেষ নভেম্বর মাসে তা সাড়ে ৮ শতাংশের নিচে নামে। যদিও এটি মজুরি বৃদ্ধি হারের তুলনায় কম। নভেম্বরে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ শতাংশ। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি না হওয়ায় সাধারণ মানুষের আয়ও বাড়ছে না সেভাবে। গত কয়েক বছরের মজুরি বৃদ্ধির সরকারি তথ্য বলছে, মূল্যস্ফীতির প্রবৃদ্ধির চেয়ে মজুরি বৃদ্ধির হারও কম। মজুরি বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থানের মতো অর্থনীতির তিন পুরনো সমস্যার সমাধান হয়নি গত দেড় বছরেও।
বাড়তে শুরু করেছে বিনিয়োগ
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুন শেষে, দেশে শিক্ষিত ও অশিক্ষিত মিলিয়ে প্রায় ২৫ থেকে ২৭ লাখ মানুষ বেকার, যেখানে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেশি। এর মধ্যে ৮৭ শতাংশই উচ্চ শিক্ষিত। অথচ দেশে কর্মক্ষমের সংখ্যা ৬২ লাখের ওপরে। এ হিসাবে কর্মক্ষমের প্রায় অর্থেকই বেকার হয়ে রয়েছে। এ অবস্থার মধ্যে প্রতি বছর কর্মজীবনে প্রবেশ করছে ২০ লাখের বেশি তরুণ।
এসবের মধ্যে আশার দিক হলো, আগের বছরগুলোয় যেখানে বিদেশি বিনিয়োগ দেড় বিলিয়ন ডলারের মতো হতো। জুলাই বিপ্লবের সরকারের প্রতি আস্থা বাড়ায় বিদেশি বিনিয়োগও বাড়তে শুরু করেছে। চলতি বছরের আট মাসে ১ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। আশা করা যাচ্ছে, বছর শেষে তা দুই বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হতে পারে। নতুন এ বিনিয়োগের সুফল মিলবে আগামী বছর।
বিনিয়োগ বেড়ে যাওয়ায় সামনের দিনে মজুরি বৃদ্ধি হবে বলে মনে করেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক মোস্তফা কে মুজেরি। তিনি বলেন, অর্থনীতি সচল করা লাগবে আগে। এখনো তো সচল হয়নি। কেবল একটা দুরবস্থা থেকে বেরিয়ে হাঁফ ছাড়ছে। নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিলে অর্থনীতির বড় সিদ্ধান্তগুলো আসবে। তখন বিনিয়োগের সুফল পাবে মানুষ। কর্মসংস্থান বেড়ে গিয়ে মানুষের আয়ও বাড়বে।
অন্যদিকে সংস্কারের পথে থাকা অর্থনীতি এখনো স্বাভাবিক জায়গায় যেতে পারেনি মন্তব্য করে বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট জাহিদ হোসেন বলেন, অর্থনীতি তো নড়বড় অবস্থান থেকে সংস্কারের কার্যক্রমে গেছে। তা বাস্তবায়ন ও নির্বাচিত সরকার না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করা লাগতে পারে।
বাজার ব্যবস্থাপনায় আওয়ামী সিন্ডিকেট
হঠাৎ করেই কোনো কারণ ছাড়া পেঁয়াজের দর বৃদ্ধি ও আমদানির সিদ্ধান্তের পর দরে নেমে আসার ঘটনা ঘটছে দেশে। সয়াবিন তেলের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে ব্যবসায়ীরা। সেখানে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করছে না। সবখানে সংস্কার হলেও বাজার ব্যবস্থাপনায় তার কোনো প্রভাব পড়ছে না। এমন অবস্থায় মূল্যস্ফীতি কমানো সম্ভব না বলে মনে করেন মোস্তফা মুজেরি। তিনি বলেন, পেঁয়াজ, সয়াবিনের মতো জরুরি পণ্যের দাম ঠিক করছে ব্যবসায়ীরা। সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ সেখানে দেখা যাচ্ছে না। বলা যায়, সরকারকে তারা মানছে না। রাজনৈতিক সরকার আসলে হয়তো এতটা বাড়াবাড়ি করবে না ব্যবসায়ীরা।
বিশ্লেষক, সাংবাদিক ও অর্থনীতিবিদদের মতে, সাধারণ মানুষের জন্য কল্যাণের জন্য কাজ করা সরকার গত ৫৪ বছরেও দেখেনি বাংলাদেশ। অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে যে স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল তার পুরো সুবিধা পেয়েছে কিছু রাজনৈতিক নেতা ও ব্যবসায়ী শ্রেণি। সাধারণ মানুষ বঞ্চিত থেকে গেছে। জুলাই বিপ্লবের পর বাংলাদেশের মানুষের সামনে নতুন এক আশা ধরা দিয়েছে। সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত এই তিন সংকট কাটাতে দরকার একটি কল্যাণমুখী সরকার। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যারা এটি করতে বাস্তবামুখী পরিকল্পনা জানাতে পারবে জনগণ তাকেই নির্বাচিত করবে।