সাক্ষাৎকে গোপনবৈঠক প্র্রোপাগান্ডা

চাণক্যনীতির চক্কর এবং অপসাংবাদিকতা

প্রিন্ট ভার্সন
৭ জানুয়ারি ২০২৬ ১৭:৩৩

রয়টার্স

॥ হারুন ইবনে শাহাদাত ॥
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমানের একটি সাক্ষাৎকার আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স তাদের অনলাইনে ভিডিও এবং টেক্সট ভার্সন প্রকাশ করেছে। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণের সময় যারা উপস্থিত ছিলেন এবং ভিডিও ধারণ করেছেন, তাদের সাথে এ প্রতিবেদক কথা বলে জেনেছেন, বার্তা সংস্থাটি জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্যের সব কথা প্রকাশ করেনি। এ স্বাধীনতা অবশ্যই তাদের আছে, কিন্তু বিকৃতভাবে প্রকাশ করা অবশ্যই অপসাংবাদিকতা।
কিন্তু তার সাক্ষাৎকারটি দেশের কিছু সংবাদমাধ্যমে মিস কোট করা হয়েছে, যা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান অবশ্য বিভ্রান্তি নিরসনে অবহিত হওয়ার পরপরই তার বক্তব্য নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর প্রতিবাদ জানিয়েছেন এবং প্রকৃত ঘটনা সংক্ষেপে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আন্তর্জাতিক মিডিয়া রয়টার্সকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রয়টার্সের একজন সাংবাদিক আমাকে জিজ্ঞেস করেন, ভারত যেহেতু আপনাদের প্রতিবেশী দেশ, তাদের সঙ্গে আপনাদের কোনো যোগাযোগ আছে কি না, কোনো কথাবার্তা বা বৈঠক হয় কি না। আমি তখন বলেছিলাম, গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে আমি অসুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসা শেষে যখন বাসায় ফিরি, তখন দেশ-বিদেশের অনেকেই আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেন। অন্যান্য দেশের সম্মানিত কূটনৈতিকবৃন্দ যেমন এসেছেন, তেমনি তখন ভারতের দুজন কূটনীতিকও আমাকে দেখতে আমার বাসায় এসেছিলেন। অন্যদের মতো তাদের সঙ্গেও আমার কথা হয়েছে। আমরা তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার সময় বলেছিলাম, যত কূটনীতিক এখানে এসেছেন, তাদের সকলের বিষয়েই আমরা পাবলিসিটিতে দিয়েছি। আপনাদের এ সাক্ষাৎও আমরা পাবলিসিটিতে দিতে চাই। তখন তারা আমাকে এটি না দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। আমরা বলেছিলাম, পরবর্তীতে যখনই আপনাদের সঙ্গে দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে বৈঠক হবে, তা অবশ্যই পাবলিসিটিতে যাবে। এখানে গোপনীয়তার কিছু নেই।
আমি বিস্মিত যে, আমাদের কিছু দেশীয় মিডিয়া ভারতের সঙ্গে জামায়াত আমীরের গোপন বৈঠক হয়েছে বলে সংবাদ পরিবেশন করেছে। আমি এ ধরনের সংবাদের তীব্র নিন্দা জানাই এবং ভবিষ্যতে প্রকৃত বিষয় না জেনে এমন বিভ্রান্তিকর সংবাদ পরিবেশন করা থেকে বিরত থাকার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানাই।’
রয়টার্সের অনলাইনের টেক্সট ভার্সনে ডা. শফিকুর রহমান তার বক্তব্যে মিটিং হয়েছে এমন কথা বলেননি, ‘ভিজিট’ শব্দটি উল্লেখ করেছেন। প্রতিবেদকের সংগ্রহ করা ভিডিওক্লিপেও এর সত্যতা মিলেছে। (প্রতিবেদনের অনলাইন ভার্সনের সাথে ভিডিওক্লিপ আছে।) অথচ রয়টার্স তার প্রিন্ট ভার্সনে প্রকাশ করেছে,As New Delhi seeks to engage parties that could form the next government, Rahman confirmed meeting an Indian diplomat earlier this year after his bypass surgery. Unlike diplomats from other countries who made open courtesy visits to him, the Indian official asked that the meeting remain confidential, Rahman said. এখানে ‘সাক্ষাৎ’ visits শব্দটির পরের বাক্যে মিটিং লেখা হয়েছে। অথচ ভিডিওক্লিপটিতে শোনা যাচ্ছে তিনি বলেছেন, But they requested to us not to be make it publish.তিনি সাথে সাথে ভারতীয় সংশ্লিষ্ট কূটনীতিককে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘কেন? অনেক কূটনীতিক আমার সাথে দেখা করতে এসেছিলেন এবং এটি জনসমক্ষে প্রকাশিত হয়েছিল। সমস্যাটা কোথায়?’ তিনি তাদের এ অনুরোধ রক্ষা করলেও বিষয়টি যে মন থেকে মেনে নেননি, তা তার বক্তব্যে এসেছে। তিনি তাদের বলেছেন, So we must become open to all and open to each other. There is no alternative to develop our relationship.
‘অর্থাৎ আমাদের সম্পর্ক হতে হবে প্রকাশ্য এবং খোলামেলা। এছাড়া সম্পর্কোন্নয়ন অন্য কোনো উপায়ে হবে না।’
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের কিছু মিডিয়া এ সৌজন্য সাক্ষাৎকে অপপ্রচার চালাচ্ছে ‘গোপন মিটিং’ বলে। সাথে সাথে মিডিয়াকে না জানানোর দায় চাপাচ্ছে জামায়াতে ইসলামীর ওপর। বাহ! বিচিত্র এ দেশ। যিনি এ সাক্ষাতের কথা প্রকাশ করে প্রকাশ্য সম্পর্কের ওপর জোর দিলেন, অথচ বলা হচ্ছে তিনি ‘গোপন’ করেছেন।
বাস্তবতা হলো, তিনি এতদিন প্রকাশ করেননি কূটনীতিকদের অনুরোধে সৌজন্যতার খাতিরে। পরে আন্তর্জাতিক একটি মিডিয়ার একজন সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে সব দেশের সাথে সুম্পর্কের দুয়ার খোলা বোঝাতে বিষয়টি একটি উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তিনি প্রকাশের আগে বাংলাদেশে কোনো সাংবাদিক নিজস্ব অনুসন্ধানে বিষয়টি প্রকাশ করলে না হয় তাদের দাবি তর্কের খাতিরে হলেও মেনে নেয়া যেত। পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, কিন্তু হলো তা অপপ্রচার করা। মিডিয়াগুলো আসলে ‘উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে’ চাপানো ছাড়া কিছু নয়। তারা আসলে ভারতের চাণক্যনীতি বাস্তবায়নের এদেশীয় ক্রীড়নকÑ এমনটাই মনে করেন পর্যবেক্ষকরা।
ভারতকে চাণক্যনীতির চক্কর থেকে বের হতে হবে
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক চাণক্যনীতির চক্করে ঘুরপাক খাচ্ছে ব্রিটিশ শাসনের কবল থেকে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এ অঞ্চল মুক্ত হওয়ার পর থেকেই। নিখিল ভারত কংগ্রেস, ভারতীয় জনতা পার্টি কেউ এ নীতির বাইরে এসে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেছেÑ এমন নজির নেই। শুধু উজান-ভাটির খেলা মাঝে মাঝে দেখা গেছে। তবে নরেন্দ্র মোদির শাসনামলে রীতিমতো প্লাবন শুরু হয়েছে। ভারতের উগ্রহিন্দুত্ববাদ জঙ্গিরূপে আবির্ভূত হয়ে মুসলিম, খ্রিস্টান, দলিত হিন্দু সবার ওপর অত্যাচার-নির্যাতনের স্টিমরোলার চালাচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ চালিয়ে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা নষ্ট করছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের জনগণ এবং তাদের অনুগত আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্যদের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করতে ব্যর্থই শুধু হয়নি, শত্রু ভাবতে শুরু করেছিলো। বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও নির্বাচন ধ্বংস করে মূলত তাদের করদরাজ্যে পরিণত করেছিলো। সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করছে হাসিনার রাজত্ব টিকিয়ে রেখে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করে তাদের জবরদখল অব্যাহত রাখতে। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে হাসিনার পতন ঘটিয়েছে। হাসিনা ও তার দোসররা গণহত্যা চালিয়ে ভারতের আশ্রয়ে আছে। অথচ হাসিনাসহ তাদের অনেকেই সাজাপ্রাপ্ত আসামি। অভিযুক্ত আসামিদের ফেরত চায়। বাংলাদেশ স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। ভারতের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী তা মেনে নিতে পারছে না। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ চায় সমমর্যাদার ভিত্তিতে সুসম্পর্ক। ভারতের সাধারণ জনগণের সাথে বাংলাদেশের কোনো বিরোধ নেই।
রাজনীতি বিশ্লেষকরাও মনে করেন, ভারতের শাসকরা তাদের নীতি বদল করলে দুই দেশের সম্পর্কের জটিলতা কেটে যাবে। রয়টার্সের সাথে সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্যে বাংলাদেশের বিপ্লবী ছাত্র-জনতার কথারই প্রতিধ্বনিত হয়েছে।
ভারত প্রসঙ্গে আমীরে জামায়াতের বক্তব্য
রয়টার্স জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমানের কাছে পাকিস্তানের সাথে জামায়াতের ঐতিহাসিক ঘনিষ্ঠতা সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলো। উত্তরে তিনি বলেন, আমরা সকলের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখি। আমরা কখনোই কোনো একটি দেশের দিকে ঝুঁকে পড়তে আগ্রহী নই। বরং জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব দেশের সাথে সম্মানজনক ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কে বিশ্বাসী।
তিনি আরো বলেন, ঢাকা থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর হাসিনার ভারতে অব্যাহত অবস্থান উদ্বেগের বিষয়। কারণ তার পতনের পর থেকে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে।
নয়াদিল্লি পরবর্তী সরকার গঠন করতে পারে এমন দলগুলোকে সম্পৃক্ত করতে চাইছেÑ এমন অবস্থায় জামায়াতের অবস্থান কী হবেÑ সেই প্রশ্নের উত্তরে ডা. শফিকুর রহমান তার অপারেশনের পর দুজন ভারতীয় কূটনীতিকের সৌজন্য সাক্ষাতের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন, যারা বিনা নোটিশে এলেও তিনি দরজা থেকে তাদের ফিরিয়ে দেননি। এতে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, সম্মানের সাথে যে কেউ তার দিকে হাত বাড়ালে তাদের ফিরিয়ে দেবেন না। কিন্তু কারো আধিপত্যও মেনে নেবেন না।
ইতোপূর্বে তিনি একাধিকবার বলেছেন, আমরা যদি দেশ পরিচালনার সুযোগ পাই, তাহলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক হবে পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে। মানুষ নিজের জায়গা বদলাতে পারে, কিন্তু প্রতিবেশী বদলাতে পারে না। আমরা আমাদের প্রতিবেশীকে সম্মান করতে চাই এবং একইভাবে প্রতিবেশীর কাছ থেকেও সম্মান প্রত্যাশা করি। বাংলাদেশের চেয়ে ভারত আয়তনে ২৬ গুণ বড়। তাদের সম্পদ ও জনশক্তি আমাদের তুলনায় অনেক বেশি। আমরা তাদের অবস্থান বিবেচনায় সম্মান করি। তবে আমাদের ছোট ভূখণ্ড ও প্রায় ১৮ কোটি মানুষের অস্তিত্বকেও তাদের সম্মান করতে হবে- ‘দিস ইজ আওয়ার ডিমান্ড।’ যদি তা হয়, তাহলে দুই প্রতিবেশী শুধু ভালোই থাকব না, বরং এক প্রতিবেশীর কারণে অন্য প্রতিবেশীও বিশ্বদরবারে সম্মানিত হবে।’
তিনি মনে করেন, প্রতিবেশী বদলানো যায় না। তাই সুপ্রতিবেশী সবারই কাম্য। ভারত আয়তন ও লোকসংখ্যার দিকে থেকে বড় দেশ, কিন্তু তারা প্রতিবেশীর সাথে বড় মনের পরিচয় দিতে পারছে না। তিনি উদাহরণস্বরূপ শেখ হাসিনার সরকারকে অবৈধভাবে টিকিয়ে রাখতে ভারতের মদদ, ফারাক্কা ও তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা দিতে গড়িমসি, সীমান্ত হত্যা, মাদক নিয়ন্ত্রণে অসহযোহিতা, পুশইন এবং ভারতে অব্যাহতভাবে সংখ্যালঘু মুসলিম ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের কথা তুলে ধরেছেন। উল্লেখিত, সাক্ষাৎকারেও ভারত সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তরে তিনি পারস্পরিক আলোচনা ও সমঝোতার ভিত্তিতে সম্পর্কোন্নয়নের ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, কোনো দেশ ও জাতির প্রতিই তার এবং তার দল জামায়াতে ইসলামীর কোনো বিদ্বেষ নেই। বরং বন্ধুত্বের দুয়ার খোলা। তবে শর্ত হলোÑ হাত বাড়াতে হবে মুক্ত মন দিয়ে, আধিপত্যবাদ প্রতিষ্ঠার কুচিন্তা বাদ দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও জনগণের সম্মান ও মর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখে। এ নিয়ে বিভ্রান্তির কোনো সুযোগ নেই। এ কথাই তিনি বার বার ব্যক্ত করেছেন বলে আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন।  Print version ,09-01-026

Harun ibn shahadat চাণক্যনীতির চক্কর এবং অপসাংবাদিকতা

সম্পর্কিত খবর