কেমন আছে দেশের মানুষ
১৪ আগস্ট ২০২৫ ১৪:৫৬
॥ ফেরদৌস আহমদ ভূইয়া॥
আমাদের জন্মভূমির জনগণ বিগত ৭৫ বছর ধরে অব্যাহতভাবে উন্নয়ন আর বঞ্চনার গল্প শুনে আসছে। একসময় শোনানো হতো শুধু বঞ্চনা আর ঠকানোর গল্প। আর বিগত ৫৪ বছর ধরে শোনানো হচ্ছে উন্নয়ন হচ্ছে মাথাপিছু আয় বেড়েছে, দরিদ্রতা কমছে ইত্যাদি এবং উন্নয়নের মহাসড়কে আমাদের দেশ। ১৯৬০-এর দশকে বলা হয়েছিল, পাকিস্তানের পূর্ব অংশ শুধুই বঞ্চিত হচ্ছে, জনগণ ঠকছে, এখানে কোনো উন্নয়ন হচ্ছে না, এক দেশ দুই অর্থনীতি কত কী প্রচার প্রোপাগান্ডা করা হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। তারপর ১৯৭২ সালে সরকার বলল, আমাদের কিছুই নেই, তোমাদের কিছুই দিতে পারব না। এভাবে সাড়ে তিন বছর পার করা হলো। ১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অনেক সরকার ক্ষমতায় এলো। এ ৫৪ বছরে যারা ক্ষমতা গ্রহণ করেছিলেন, তারাও বিভিন্ন নীতি পরিকল্পনা কর্মসূচি বিভিন্ন দফা ঘোষণা করেছেন জনগণের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য। এভাবে বিগত ৫৪ বছরে কত রকমের সরকার দেশ পরিচালনা করল। সবাই কত উন্নয়নের গল্প বলল, কেউ বলল বাংলাদেশ এশিয়ান টাইগার, কেউ বলেছে উন্নয়নের মহাসড়কে বাংলাদেশ, ডিজিটাল বাংলাদেশ, স্মার্ট বাংলাদেশ ইত্যাদি কত কথা শুনেছি। কিন্তু বিগত ৫৪ বছরে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কতটুকু পরিবর্তন হয়েছে- এ প্রশ্ন আজ আপামর জনসাধারণের। এ প্রশ্ন করার অধিকার সাধারণ জনগণের আছেও বটে। কারণ রাজনৈতিক নেতারা সাধারণ জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি, স্বাধীনতা কত কী দাবি আদায়ের কথা বলে দেশ ও জাতিকে কতবার কতভাবে যে ব্যবহার করে পরিবর্তন করে দেশ ভাঙচুর করেছে, তার ইয়ত্তা নেই। শুধু কী তাই, রাজনৈতিক নেতাদের এসব মুক্তি ও স্বাধীনতার আহ্বানে কত মানুষ রক্ত দিয়েছে, জীবন দিয়েছে, কত মায়ের বুক খালি হয়েছে, কত বোন তার স্বামীকে হারিয়েছে, কত সন্তান তার বাপকে হারিয়েছে। কিন্তু বড় প্রশ্ন- জনগণ কি তাদের প্রকৃত স্বাধীনতা পেয়েছে এবং তাদের অর্থনৈতিক মুক্তি মিলেছে?
২০০৯ সাল থেকে টানা সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতায় ছিল ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ। ২০০৮ সালের নির্বাচনে ‘দিন বদলের সনদ’ শিরোনামে নির্বাচনী ইশতেহারে স্বপ্ন ছিল রূপকল্প ২০২১ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের। এরপর ২০১৪ সালের সরকার গঠন করে ‘এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ’ স্লোগানে ইশতেহার দিয়ে অনেক মেগা উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করে। ২০১৮ সালে ‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’ শিরোনামে ইশতেহার প্রণয়ন করে ২০৪১ সালের উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ এবং ২১০০ সালে ‘নিরাপদ ব-দ্বীপ’ প্রণয়নের রূপরেখা প্রদান করে। ২০২৪ সালের জানুয়ারির নির্বাচনের আগে যে ইশতেহার দেয় সেটার লক্ষ্য ছিল স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণ। কিন্তু ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে জনগণের ভাগ্য বদল করতে কি পেরেছিল। অথচ তাদের ২০০৮ সালে নির্বাচনের ইশতেহারের স্লোগান ছিল দিন বদলের সনদ। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ জনগণের ভাগ্য বদলের পরিবর্তে নিজেরা লাখকোটি টাকা লুট করে বিদেশে পাচার করেছে।
আজকের এ কলামে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন তথা জনগণের ভাগ্য বদলের কয়েকটি বাস্তব ঘটনার বিবরণ দিচ্ছি, যা লেখকের ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ। তা দিয়ে বাংলাদেশের জনগণের আর্থিক অবস্থা পুরোপুরি বোঝা না গেলেও আর্থসামাজিক অবস্থার একটি খণ্ডচিত্র উঠে আসবে মাত্র। বিগত সপ্তাহে এ দেশের ভূমিপুত্র বেশ কয়েকজনের সাথে কথা বলি, টার্গেট হচ্ছে তাদের আর্থিক অবস্থার বাস্তব চিত্র জানা।
গত ৮ আগস্ট শুক্রবার বিকেলে রাজধানী ঢাকার সবুজবাগ থানা এলাকার মাদারটেক বাজারে যাই কিছু সওদাপাতি কিনতে। এটাকে বাজার বললে ভুল হবে, বরং একটি রাস্তার দুই ধারে আধা কিলোমিটারের মধ্যে শতাধিক দোকান। এসব দোকানের মধ্যে রয়েছে মুদি দোকান, তরকারির দোকান, ফলের দোকান, ওষুধের দোকান, সেলুন ইত্যাকার। বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে ওঠা একটি অগোছালো বাজার। এখানেও রাষ্ট্র ও সরকারের ব্যর্থতা যে কয়েক লাখ লোকের বসবাসের এলাকায় রাষ্ট্র তথা স্থানীয় সরকার একটি বাজার গড়ে তুলতে পারেনি। বাজারের একটি পাইকারি দোকানে যাই কিছু ডিম কিনতে। দাম জানার পর কিছু সাধারণ ডিম আর কয়েকটা হাসের ডিম কিনলাম। সাধারণ ডিম ১৪০ টাকা ডজন আর হাসের ডিম ২৪০ টাকা ডজন। ডিম কেনার পর বিক্রেতা যুবকটির সাথে কিছু কথা বললাম। প্রথমে জিজ্ঞেস করলাম, দোকান কি তোমার নিজের, সে বলল না পাইকারি এ ডিমের দোকানে চাকরি করে। বাড়ি জিজ্ঞেস করলাম, সে জানালো বাড়ি মাগুড়া জেলায়। জিজ্ঞেস করলাম কতক্ষণ কাজ করতে হয়, জানালো সকাল ৮টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত ডিউটি করতে হয়। সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত দোকানে দোকানে ডিম পাইকারি বিক্রি করে। ১টা থেকে ৩টা পর্যন্ত দুই ঘণ্টা গোসল ও খাওয়ার বিরতি। ৩টা থেকে দোকানে রাত ১২টা পর্যন্ত ডিউটি করতে হয়। তারপর জিজ্ঞেস করলাম, বেতন কত টাকা, বলতে আমতা আমতা করছিল, তারপর বললো বেতন মাত্র ছয় হাজার টাকা। মালিক থাকার জায়গা দিয়েছে আর খাবার দেয়।
তারপর ঐ বাজারের এক মুদি দোকানদারের সাথে কথা হয় তার পুরো দিনের বেচাকেনা নিয়ে। দোকানদার মালিক সরদার সালাহউদ্দিন, অনেকটা স্মার্ট এবং একসময় এডভার্টাইজিং ব্যবসা করতেন। তিনি জানালেন, আজ শুক্রবার, ছুটির দিন বেচাকেনা বেশি হওয়ার কথা কিন্তু না, মাত্র দশ হাজার টাকা বিক্রি হয়েছে। বিগত সপ্তাহের শুক্রবারও মাত্র দশ হাজার টাকা বিক্রি হয়েছে। তিনি জানালেন, বিক্রির এ হার চলতে থাকলে ছয় মাস পর আর দোকান চালিয়ে টিকে থাকতে পারব না। দোকান বন্ধ করে দিতে হবে। তার বিক্রি এত কম কেন- এ প্রশ্নের উত্তর জানা দরকার, তবে এটা একটু জটিল ও কঠিন।
এর আগের দিন ৭ আগস্ট বৃহস্পতিবার এলাকার এক ছোট ভাইয়ের সাথে দেখা হয় তার অফিসে। সে বিগত এক বছর ধরে আমার সাথে সাক্ষাৎ করতে চাইছিল। আমিই ছুটে গেলাম তার ছোট অফিসে। সাবলেট নিয়ে একটি ছোট কক্ষের অফিস জানতে চাইলাম কীসের ব্যবসা, জানালো নির্মাণকাজের মালামাল পাথর, বালি ও ইট সরবরাহের ব্যবসা করে। কিন্তু বিগত বছরখানেক ধরে তার ব্যবসা ভালো যাচ্ছে না। কারণ দালান-কোঠা নির্মাণকাজ কম, তাই তার বিক্রিও কম। আর্থিক সংকটে তার সংসার চালাতে সমস্যা হচ্ছে।
তার অফিস থেকে গেলাম ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের একটি এজেন্টের কাছে। তিনি শেয়ার বেচাকেনার ব্যবসা করার পাশাপাশি ডিএসসির একটি এজেন্সি নিয়েছেন। ক্ষুদ্র মাঝারি ও বড় বিনিয়োগকারী ক্লায়েন্টের শেয়ার বেচাকেনার কাজটি করে থাকেন। তার জন্য উনি কমিশন পেয়ে থাকেন, যেটা তার মূল ইনকাম। উনার এজেন্সি অফিসটা রাজধানী ঢাকার কেন্দ্রস্থল পুরানা পল্টনে। একটি কর্পোরেট ভবনের আট তলায় উনার অফিস। আর তিনি এ ব্যবসাটা করছেন বিগত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করা ঐ ছাত্রনেতা বর্তমান সময়ে তার এজেন্সি চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। তার কারণ হচ্ছে শেয়ারবাজারে শেয়ার বেচাকেনা কমতে কমতে এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, এখন ক্রেতা বিক্রেতা শূন্যের পর্যায়ে পৌঁছেছে। তাই তিনি শেয়ার কেনাবেচার যে এজেন্সি রয়েছে, তার বিকল্প চিন্তা করে বিকল্প কাজ শুরু করেছেন। কারণ তার যে মূল আয় বেচাকেনার কমিশন, সেটা এখন নেই বললেই চলে।
এখানে চারটি ঘটনায় চারটি ভিন্ন ভিন্ন ধরনের কাজ ও ব্যবসার উল্লেখ করা হয়েছে। মুদি দোকানদার থেকে শুরু করে পুঁজিপতিদের শেয়ার ব্যবসা। ডিমের দোকানের কর্মচারী, মুদি দোকানদার, ঠিকাদার ও স্টক এক্সচেঞ্জের লাইসেন্সকৃত এজেন্ট সবাই তারা ভিন্ন ভিন্ন কাজ করেন। কিন্তু তাদের সাথে আলাপ করে যে বিষয়টি জানা গেছে, সেটি হচ্ছে একটি কমন সমস্যা তা হচ্ছে তারা সবাই আর্থিক সংকটে আছেন। এখানে নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদার কারণেই তিনজনের নাম পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। চারটি ঘটনার আর্থিক বিশ্লেষণ করলে আমার যে চিত্রটি পাই, তা হচ্ছে প্রত্যেকেরই আর্থিক অবস্থাটা ভালো নয়। এ চারজনই বলেছেন, তাদের আর্থিক অবস্থা চরম পর্র্যায়ে, তাদের সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। কিন্তু কেন? বিগত ৫৪ বছর পর বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের আর্থিক অবস্থা এমন থাকার কথা ছিল না। যে চারজনের কথা বললাম, তাদের সবাই রাজধানী ঢাকা শহরে থাকে। একসময় সারা দেশে একটি কথা প্রচলিত ছিল ঢাকায় টাকা ওড়ে, ধরতে জানলে হয়। কিন্তু যাদের কথা বললাম, তারা কিন্তু সুস্থ সবল এবং বুদ্ধিশুদ্ধিতে একটু অগ্রসরই বলতে হবে এবং ঢাকা শহরেই থাকেন। শেয়ারের এজেন্সির ব্যবসা যিনি করেন, তিনি তো দেশের অন্যতম শিক্ষাপীঠ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করেই ব্যবসা শুরু করেছেন। আর যে ব্যবসাটা করছেন, তা বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যবসা বটে। আর ডিমের পাইকারি সেলস করে যে যুবকটি, সেও মোটামুটি বুদ্ধিমান এবং মুদি দোকানদার তো স্মার্ট যুবক।
এদিকে সাধারণ মানুষের আর্থিক দুরবস্থার কথা প্রতিফলিত হয়েছে সিপিডির একটি সংলাপে। গত ১০ আগস্ট রোববার সিপিডি ঢাকায় ‘অন্তর্বর্তী সরকারের ৩৬৫ দিন’ শীর্ষক একটি সংলাপ করে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) মনে করে, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর দেশ বড় ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেয়েছে। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে দরিদ্র ও নিম্নআয় শ্রেণির মানুষ এখনো চরম ভোগান্তিতে রয়েছে।
রাজধানীর লেকশোর হোটেলে আয়োজিত ‘অন্তর্বর্তী সরকারের ৩৬৫ দিন’ শীর্ষক সংলাপে এসব মন্তব্য করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, এক বছরে অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংক খাতে সংস্কারসহ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। এসব উদ্যোগ রপ্তানি খাতকে ভালো অবস্থায় রেখেছে ও বড় ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে দেশকে রক্ষা করেছে। কিন্তু দেশে-বিদেশে বিনিয়োগ আসছে না। কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হচ্ছে না। রাজস্ব আহরণ বাড়ছে না। এগুলো উদ্বেগের বিষয়।
উপরে উল্লেখিত চারটি বাস্তব উদাহরণ ও সিপিডির পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে যে, বাংলাদেশের জনগণের অবস্থা খুব বেশি ভালো না। সিপিডির পর্যবেক্ষণটা কাগজে-কলমে তথা তাত্ত্বিক হতে পারে, কিন্তু উপরোল্লেখিত চারটি বাস্তব ঘটনার বিবরণ দেয়া হয়েছে প্রত্যক্ষভাবে পর্যবেক্ষণ করে। তাই সাধারণ জনগণের আর্থিক সমস্যাটাকে হালকাভাবে নেয়ার সুযোগ নেই।
বিগত ৫৪ বছর ধরে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সরকারে যে রাজনীতিকরা ক্ষমতা নিয়েছিলেন, তারা জনগণের ভাগ্যের উন্নয়ন ও কল্যাণের পরিবর্তে শুধু নিজেদের ক্ষমতা বাড়িয়েছেন মাত্র। আর তা বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের কর্মকাণ্ড দেখলে কোনো সচেতন নাগরিকের বুঝতে না পারার কথা নয়। এ বিষয়ে প্রাচীন ও আধুনিককালের বেশ কয়েকজন দার্শনিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী তাদের পর্যবেক্ষণে এটাই বলেছেন, রাজনীতিকরা জনগণের কল্যাণ নিয়ে কখনো ভাবেন না এবং প্রকৃত কল্যাণের জন্য কিছু করেন না। আর এটা বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা যা করছেন, রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা তাই যেন বলেছেন। আর রাজনীতিকদের এ ধরনের রাজনৈতিক ভূমিকার কারণে বাংলাদেশের জনগণের অবস্থাও এক শত বছর আগে যেই জায়গায় ছিল, সেই তিমিরেই রয়ে গেছে যুগ যুগ ধরে।
জনগণের অধিকার ও ক্ষমতা নিয়ে প্রখ্যাত লেখক আলবার্ট জে নক তার ‘আওয়ার এনিমি, দি স্টেট’ নামক বইয়ে বলেছেন, প্রতিটি রাষ্ট্র ক্রমান্বয়ে শক্তি বাড়ায়, জনগণের অধিকার ও ক্ষমতা খর্ব করে। তাই যখনই রাষ্ট্রের নামে সরকার জনকল্যাণের কোনো কর্মকাণ্ড গ্রহণ করেছে, তখনই জনগণের কিছু অধিকার এবং ক্ষমতা খর্ব হচ্ছে।
নেপোলিয়ন বোনাপার্ট বলেছেন, রাজনীতিতে মূর্খ বোকা স্থূলবুদ্ধিদের কোনো সমস্যা নেই। কারণ গ্রসো মার্কসের মন্তব্য অনুসারে ‘রাজনীতির কাজ হলো অশান্তি ঝঞ্ঝাট খুঁজে বের করা এবং তা সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়া। ভুলভাবে অশান্তি নির্ধারণ করে তার ভুল সমাধান দেয়া।’
মার্কিন অধ্যাপক জন কজি চমৎকার লিখেছেন, ‘সরকার কখনো দেশীয় বা আন্তর্জাতিক সমস্যা সমাধানে কাজ করেনি। সরকার এবং তার বিভিন্ন অঙ্গ শুধু তাদের অনুগ্রহভাজনদের জন্য কাজ করে।’
মার্কিন অধ্যাপক জন কজি যে কথা বলেছেন, তা যেন বাংলাদেশের সরকার ও তাদের প্রশাসনকে নিয়েই বলেছেন। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের যে আর্থিক সমস্যা রয়েছে, বর্তমান ও অতীতের সরকার ও প্রশাসন কি তা নিয়ে কোনো চিন্তা ও কাজ করেছে। তারা সবসময়ই ব্যস্ত থাকেন রাজনীতি, সরকার, জাতীয় সংসদ, বিচার বিভাগ ও প্রশাসন কী সমস্যায় আছে, তার জন্য নীতিমালা ও বিধিবিধান তৈরি ও তার সমাধান নিয়ে। সাধারণ জনগণ তাদের মৌলিক অধিকার পাচ্ছে কিনা, তাদের কী কী সমস্যা আছে, সেগুলো কীভাবে সমাধান হবে- এ নিয়ে চিন্তা ও কর্মসূচি আছে বলে মনে হয় না।
গ্রীক দার্শনিক অ্যারিস্টটল এ কথাই বলেছেন যে, রাজনীতিবিদরা জনকল্যাণ নিয়ে কখনো ভাবেন না। তার ভাষায় ‘রাজনীতিবিদরা রাজনৈতিক জীবনের বাইরে ক্ষমতা ও গৌরবের জন্য সবকিছু করছে। জনকল্যাণ নিয়ে ভাবনা তাদের নেই।’ বাংলাদেশে বিগত ৫৪ বছর ধরে তো আমরা তাই দেখছি, বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের জনগণের কল্যাণ নিয়ে কোনো ভাবনা আছে বলে মনে হয় না। আমি ১৯৭৬ সালে নারায়ণগঞ্জের রাজপথে শীতের রাতে গরিব মানুষকে ছালা মুুড়িয়ে শুয়ে থাকতে দেখেছি। আর এটা ছিল আমার জীবনে প্রথম দেখা যে মানুষ মধ্যরাতে, তাও শীতের রাতে ফুটপাতে ছালা মুড়িয়ে ঘুমায়। তার ৫০ বছর পর এখনো কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে শুরু করে রাজধানী ঢাকার রাজপথে লাখো বনি আদম তথা বাংলাদেশিকে রাতযাপন করতে দেখি। সর্বোপরি বলা যায়, বিগত পাঁচ দশকেও আমার জন্মভূমির সাধারণ জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি আসেনি। তারপরও আমরা আশায় বুক বেঁধেছি আমার জন্মভূমির সাধারণ জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি আসবে। তাদের মিনিমাম পাঁচটি মৌলিক চাহিদা অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত হবে।