প্রসঙ্গ : ঐক্যের প্রতীক খালেদা জিয়া, দুর্নীতির রানি হাসিনা
৮ জানুয়ারি ২০২৬ ১৩:৪৬
॥ একেএম রফিকুন্নবী ॥
মহান আল্লাহ তায়ালা মানুষকে বানিয়েছেন আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে। অর্থাৎ মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। মানুষকে আল্লাহ তায়ালা জ্ঞান-বুদ্ধি দিয়ে পাঠিয়েছেনÑ যাতে তারা দুনিয়ায় বসবাস করে আল্লাহর দেয়া নিয়ামত কাজে লাগিয়ে দুনিয়াকে আল্লাহর বাগান বানাতে; যাতে করে মানুষ ভালো কাজ করে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে জান্নাতের মেহমান হতে পারে। যুগে যুগে তাই তো মহান আল্লাহ তায়ালা নবী-রাসূল আ. পাঠিয়েছেন এবং তাদের চলার পাথের গাইডলাইন যুগোপযোগী জীবনবিধান পাঠিয়েছেন। যারা আল্লাহর দেয়া জীবনবিধান অনুযায়ী দুনিয়ায় চলবে এবং চালাবে, তারা নিয়ামতভরা জান্নাতের মেহমান হতে পারবে। আর যারা আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধে চলবে এবং চালাবে, তারা কাল কিয়ামতে অগ্নিকুণ্ডের জাহান্নামের মেহমান হবে এবং সেখানে তারা থাকবে চিরকাল, যার শেষ হবে না।
আমরা মহান আল্লাহর শেষ নবী ও রাসূল মুহাম্মদ সা.-এর উম্মত। আমাদের জীবনবিধান আল-কুরআন; যার মধ্যে কোনো ভুল নেই এবং জীবনে চলার প্রত্যেক দিক ও বিভাগ পরিচালনার নির্দেশনা রয়েছে। কুরআনের আলোকে আমরা দুনিয়া চালাতে এবং চলতে পারলে আমরাও পাব নিয়ামতভরা জান্নাতুল ফেরদাউস, ইনশাআল্লাহ।
৫৭টি মুসলিম দেশের মধ্যে আমরা বাংলাদেশি। বাংলাদেশে ব্যবসা করে ১৮ কোটি মানুষ। রয়েছে সমতল ভূমি, নদী-নালা, খাল-বিল, সমুদ্র আর আকাশপথে চলার ব্যবস্থা। আমাদের এ ভূখণ্ড একসময় খেলাফতের অংশ ছিল, যা প্রায় হাজার বছর শাসন করেছিল মুসলিম রাজা-বাদশাহরা। সিরাজ-উদ-দৌলার শাসনের অবসানের পর প্রথমে ব্রিটিশ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি পরে ইংল্যান্ডের উপনিবেশের অংশ হয়ে যায়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীন হয়ে পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান মিলে একটি রাষ্ট্র হয়, যার নাম ছিল পাকিস্তান। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা লাভ করে।
গত ৫৪ বছরে আমরা বিভিন্ন দলের শাসন দেখেছি, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে জনতার মতামতের প্রতিফলন ঘটেনি। তাই ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ ও আন্দোলনে ৫ আগস্ট ২০২৪ সালে আমরা একটি ভালো দেশ হিসেবে গড়ার সুযোগ পেয়েছি। প্রায় ২০০০ ছাত্র-জনতা শহীদ ও প্রায় ৩০ হাজার ছাত্র-জনতার আহত ও পঙ্গুত্ববরণের মাধ্যমে।
আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় দুজন মহিলা রাষ্ট্রনায়কের জীবনচরিত্র ও সময়কাল নিয়ে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের অস্বাভাবিক হত্যার কারণে তার সহধির্মণী বেগম খালেদা জিয়াকে গৃহবধূ থেকে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসতে হয়। তিনি সাধারণত শহীদ জিয়ার সাথে কখনো ক্ষমতার ভাগাভাগিতে জড়িত হতেন না বা রাষ্ট্রীয় কাজে অংশগ্রহণ করতেন না। তার দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকো। বেগম খালেদা জিয়া ৩ বারের প্রধানমন্ত্রী। তিনি শহীদ জিয়ার মতোই দেশের ভালো মানুষকে সাথে নিয়ে চলতেন। চার দলীয় জোট করে দেশ চালিয়েছেন। জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন আমীর শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ও সেক্রেটারি জেনারেল শহীদ আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ৫ বছর ৩টি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। তারা অত্যন্ত যোগ্যতার সাথে দুর্নীতিমুক্ত থেকে দেশের কাজ করেছিলেন। তারপরও দুর্নীতির রানি শেখ হাসিনা তাদের ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে। বেগম জিয়া অল্পভাষী ভালো মেজাজি মহিলা ছিলেন। নিয়মিত নামায আদায় করতেন। এমনকি বিভিন্ন প্রোগ্রামের ফাঁকেও নামায আদায় করে নিতেন। আমার দেখার সুযোগ হয়েছে হোটেল শেরাটনে মাগরিবের নামাযের সময় একটি পৃথক রুমে তিনি নামায আদায় করলেন। তার কাজের মেয়ে ফাতেমাকে তিনি খুবই ভালোবাসতেন। তাই তো তাকে মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তার কাছে থেকে সেবা করতে দেখা গেছে। বিদেশেও এই ফাতেমাকে তিনি তার সঙ্গী হিসেবে সাথে রাখতেন। সর্বশেষ তিনি সশস্ত্র বাহিনী দিবসে সেনাকুঞ্জের প্রোগ্রামে যোগ দিয়েছিলেন এবং হাসিমুখে সবার সাথে কুশল বিনিময় করে গেছেন দল-মত নির্বিশেষে। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো, এই মহীয়সী নারী ও ৩ বারের প্রধানমন্ত্রীকে শেখ হাসিনা তার স্বামীর সরকারি ভবন থেকে এক কাপড়ে উচ্ছেদ করেছিল জেদ আর ঈর্ষার কারণে। তাকে জেল খাটিয়েছে। নানা শারীরিক ও মানসিক কষ্ট দিয়েছে। তিনি শেষ বয়সে চিকিৎসার অভাবে দেশ ও বিদেশের লোকদের ভালোবাসায় মহান আল্লাহর কাছে চলে গেলেন ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ সালে। মহান আল্লাহই যে ইজ্জত দেয়ার মালিক, তা আবার স্বচক্ষে আমরা দেখলাম বেগম খালেদা জিয়ার জীবনে। আগের দিন সকাল ৬টায় তার মৃত্যুর ঘোষণা এলো। পরের দিন দুপুরের পর সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় জানাযা নামাযের ঘোষণা দেয়া হলো। সেদিন সরকারি ছুটি দেয়া হয়েছিল। দুনিয়ার ইতিহাসে এত লোকের উপস্থিতি, লাখ লাখ লোকের ভালোবাসা নিয়ে তিনি আল্লাহর কাছে চলে গেলেন। আমরাও জানাযায় উপস্থিত থেকে সরকারের প্রধান উপদেষ্টার আবেগঘন শ্রদ্ধা নিবেদন এবং ভারত, পাকিস্তানসহ প্রায় ৪০টি দেশের রাষ্ট্রদূত বা তাদের প্রতিনিধির উপস্থিতিতে তার প্রতি গভীর ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটে।
তার তিনবারের প্রধানমন্ত্রীকালে দেশে উন্নয়ন হয়েছে, দলে দলে এত বিভেদ ছিল না। নারীর কাজের পরিধি বেড়েছিল। মুসলিম দেশসহ আমেরিকা, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ রাশিয়া, চীনের সাথেও ভালো সম্পর্ক ছিল। আমরা তার মাগফিরাত কামনা করছি।
এবার আসা যাক দুর্নীতির রানি শেখ হাসিনার আমল নিয়ে আলোচনায়। দুর্নীতির রানি শেখ হাসিনা বার বার ক্ষমতায় এসেছে দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে। সবসময়ই দুর্নীতিপরায়ণ প্রশাসন, তাদের দলের লোক ও মাস্তান ব্যবহার করে ক্ষমতায় এসেছে। আবার সংসদে তাঁবেদার বিরোধীদল করেও দুর্নীতির রানি হওয়া গেছে। একজন নামে প্রধানমন্ত্রী হয়ে গর্বের সাথে বলতে শুনেছি, তার একজন পিয়নের ৪০০ কোটি টাকা এবং সে হেলিকপ্টারে চলাফেরা করে। কত লজ্জাজনক বিষয় একটি স্বাধীন দেশের জন্য।
দেশের প্রত্যেক বিভাগ, সামরিক ও বেসামরিক, স্থানীয় সরকার থেকে শুরু করে সেক্রেটারিয়েট পর্যন্ত দুর্নীতির আখড়া করে ফেলেছিল শেখ হাসিনা। তার দুর্নীতিগ্রস্তভাবে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার জন্য মানুষকে খুন, গুম, আয়নাঘর বানিয়ে নির্যাতনের জাঁতাকলে পুরে ক্ষমতায় টিকে থাকার অপকৌশল করেছিল। প্রতিবেশী দেশকে তার ক্ষমতার সিঁড়ি বানিয়ে ঐ দেশকে আমাদের দেশের সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দিয়ে ঐ দেশের একজন মুখ্যমন্ত্রীর ভূমিকা পালন করেছিল। আবার গর্বের সাথে আমরা বলতে শুনেছি, ভারতকে আমরা যা দিয়েছি, তা সারা জীবন তারা মনে রাখবে। মহান আল্লাহ যেহেতু সব দেখেন এবং বুঝেন। তাঁর চোখ ফাঁকি দেয়ার মতো দুনিয়ায় কেউ জন্মেইনি। তাই দুর্নীতির রানির কার্যকলাপ, পদক্ষেপ ছাত্র-জনতাকে ক্ষেপিয়ে তুলেছিল। ফলে সময় বুঝে দেশের ছাত্র-জনতা জুলাই ২০২৪ সালে গ্রাম-গঞ্জ থেকে শুরু করে শহর-বন্দরে জনতার ঢল নামিয়ে শেখ হাসিনাকে দেশ থেকে পালাতে বাধ্য করে। দুর্নীতির রানি শেখ হাসিনা দেশ থেকে পালানোর কারণে তার দোসররাও পালাতে বাধ্য হয়। বায়তুল মোকাররম মসজিদের ইমাম থেকে শুরু করে সামরিক-বেসামরিক আমলা-কামলা, গ্রামের মেম্বার থেকে এমপি-মন্ত্রী, বিচারপতি হাসিনার পথ ধরে পালিয়ে গেছে।
ইতোমধ্যেই হাসিনার করা ট্রাইব্যুনালেই স্বচ্ছ বিচারের মাধ্যমে তার ফাঁসির রায় হয়েছে। আরো কেস চলমান। তাকে তার দাদার দেশ থেকে ফেরানোর চেষ্টা চলছে। সব বিচার হবে স্বচ্ছভাবে বাংলাদেশের আইনে। হাসিনার দোসররা দেশের অর্থনীতি ভেঙে দিয়ে গেছে। ব্যাংকগুলো খালি করে সব টাকা লুট করেছে হাসিনার লোকেরা। সব বিচারের আওতায় এনে দুর্নীতির রানির ফাঁসি কার্যকর করতে হবে।
বেগম জিয়া যেমন তার কাজের ফল পেয়ে লাখ লাখ লোকের ভালোবাসা নিয়ে জানাযা হয়ে আবার তার স্বামী শহীদ জিয়ার পাশে কবরে যেতে পেরেছেন। শেখ হাসিনার কবর স্বামীর পাশে হবে বলে মনে হয় না। আবার তার বাপের মতো ১৭ জনের উপস্থিতিতে জানাযা হয় কিনা বা দেশের মাটিতে তার কবর হয় কিনা- ভবিষ্যৎই বলে দেবে।
আমরা যারা ১৮ কোটি বাংলাদেশি, তারা আর কোনো চাঁদাবাজ, দুর্নীতিবাজ, স্বৈরাচার, পাশের দেশের অনুগতদের দেশের সংসদে দেখতে চাই না। যারা সাধারণবেশে, রিকশায় চড়ে, হেঁটে মানুষের সাথে মিশতে পারবেন বা মানুষের সেবা দিতে পারবেন, তাদেরই এমপি-মন্ত্রী বানাতে চাই। ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম ইতোমধ্যে সরকারের দেয়া গানম্যান প্রত্যাখ্যান করেছেন। ছাত্রদের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচনী প্রতিনিধিরা ডাকসু, জাকসু, চাকসু ও রাকসুতে যোগ্যতার সাথে দায়িত্ব পালনের নজির স্থাপন করেছেন এবং করবেন।
আমরা বাংলাদেশের জনগণ ৫৪ বছরের সব গ্লানি মুছে ফেলে আগামী ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখে নির্বাচনে সৎ, যোগ্য, দুর্নীতিমুক্ত, চাঁদাবাজমুক্ত নেতা বানিয়ে সংসদকে কার্যকরী করে দেশকে একটি সুখী-সমৃদ্ধশালী বানানোর শপথ নিই। এক্ষেত্রে জামায়াত আমীরের ঘোষণা, ‘আমরা ফ্যাসিবাদ তাড়িয়েছি, দুর্নীতিও দেশ থেকে তাড়াবো।’ তাই আসুন ছাত্র-জনতা, ছোট-বড়, রিকশাওয়ালা, পান বিক্রেতা, সামরিক-বেসামরিক আমলা, কামলা, ব্যবসায়ী, আলেম, জনতা সবাই সত্য ও ন্যায়ের পথে থেকে সব ষড়যন্ত্র উপেক্ষা করে দুর্নীতি তাড়ানোর ডাকে সাড়া দিই। ভোটের দিন ভোটকেন্দ্রে সকাল সকাল গিয়ে ভোট দিতে হবে। হ্যাঁ ভোট দিতে হবে। আবার ভোটের ফল না পাওয়া পর্যন্ত ভোটকেন্দ্র পাহারা দিতে হবে। আর্মি, পুলিশ, র্যাবসহ সবাইকে সাহায্যের হাত বাড়াতে হবে। কারো দয়ায় নয়, আমরা স্বাধীনভাবে চলতে চাই। দুনিয়ার সব দেশের সাথে সম্পর্ক রাখতে চাই। কারো প্রভুত্ব মানতে চাই না।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।