জুলাই বিপ্লবের আলোকে নিরপেক্ষ নির্বাচন : জনগণের প্রত্যাশা
২৯ আগস্ট ২০২৫ ১৪:৪৪
॥ একেএম রফিকুন্নবী ॥
দীর্ঘ দেড় দশকের দুঃশাসনে স্বৈরাচার হাসিনা দেশটাকে প্রাইভেট কোম্পানিতে পরিণত করেছিল। মানুষের মধ্যে চাপা ক্ষোভ ও অশান্তি দুর্বিষহ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মানুষ খুঁজছিল কোন পথে লেডি হিটলার হাসিনাকে বিদায় করা যায়।
ছাত্রদের কোটা আন্দোলনের সময় হাসিনার লেডি হিটলার রূপ আরও সুস্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। ছাত্র-জনতার প্রথমে ৯ দফা পরে ১ দফায় হাসিনাকে তাড়ানোর পথ বের হয়ে যায়। ছাত্র-জনতা সবাই মিলেই ১ দফার দিকে আন্দোলন এগিয়ে যায়। ঐ সময়ে বিএনপি মহাসচিব খোলামেলাভাবে বক্তৃতায় বলেন, তারা ছাত্রদের আন্দোলনের সাথে নেই। তারপরও জামায়াতে ইসলামীসহ হাসিনাবিরোধী সব দলের লোকেরা ছাত্রদের ১ দফা দাবির সাথে একমত হয়ে মাঠে-ময়দানে মিটিং-মিছিল করতে থাকে। ইসলামী ছাত্রশিবিরের তৎকালীন ঢাবি সভাপতি সাদিক কায়েমের নেতৃত্বে অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের ছেলেরা একমত হয়ে হাসিনা তাড়ানোর আন্দোলনে মাঠে নামে এবং গোটা দেশ একাকার হয়ে তা চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যায়। গোটা দেশ; বিশেষ করে ঢাকার চতুর্দিক থেকে ছাত্র-জনতা ৫ আগস্ট হাসিনার গণভবনের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। উল্লেখ থাকে যে, শেখ হাসিনা গোয়েন্দা রিপোর্টের আলোকে আন্দোলনে অগ্রসরগামী জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে ১ আগস্ট-২০২৪। অন্য কোনো দলকে কিন্তু নিষিদ্ধ ঘোষণা করেনি। কারণ তাদের কর্মকাণ্ড হাসিনার কাছে আশঙ্কাজনক মনে হয়নি।
ইতোমধ্যেই বার বার দেশের সামরিক বাহিনীসহ বিভিন্ন দলমতের লোকদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা অব্যাহতভাবে চলতে থাকে। হাসিনা সবকিছু ফেলে ৫ তারিখ দুপুরের পরই তার প্রিয় মোদির কাছে চলে যায়। এখনো সেখান থেকে দেশবিরোধী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে।
৮ আগস্ট-২০২৪ ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করে এবং হাসিনার দোসর প্রেসিডেন্টের সামনে শপথ নেন, যা কোনোভাবেই সঠিক হয়নি। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের বিপ্লবী সরকার গঠন করা ছিল সময়ের দাবি। আমাদের কয়েকদিন পর সিরিয়ায় ১২ দিনের বিপ্লবে সে দেশের সরকার পতন হয় এবং বিপ্লবী সরকার গঠন করে সে দেশের শাসনতন্ত্র স্থগিত ঘোষণা এবং ৫ বছরের মধ্যে নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করে। আমরা এ ব্যাপারে ব্যর্থ হয়েছি। ফলে পদে পদে আমাদের জুলাই ৩৬-এর বিপ্লবের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ধাক্কা খাচ্ছে। কেউবা শহীদদের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের উপযুক্ত বিচার, আহতদের পুনর্বাসন চাচ্ছে। জুলাই বিপ্লবের সনদ ও ঘোষণাপত্র প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে জোর দিচ্ছে আবার কথিত বড় দল ও তাদের নেতারা নির্বাচন নির্বাচন করে জিকির করছে। অন্যদিকে ঐ দলের নেতাকর্মীরা গ্রামগঞ্জ, শহর-বন্দরে চাঁদাবাজির রেকর্ড করে ফেলেছে। বিএনপির একসময়ের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রকাশ্যে বলেই ফেলেছেন, আমাদের লোকেরা বাজারঘাট, নদীবন্দর দখলে ব্যস্ত আর জামায়াতে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আয়ত্তে নেয়ায় ব্যস্ত। আমরা কোনো দখল-বাণিজ্য, চাঁদাবাজি, দুর্নীতিতে কোনো খাতেই কাউকে দেখতে চাই না।
জুলাই বিপ্লবের সময়ের আলোকে যথাসময়ে নিরপেক্ষ অংশগ্রহণমূক নির্বাচন চাই। দল-মত নির্বিশেষে নির্বাচনে অংশ নিক। জনগণ যাকে ইচ্ছা ভোট দিয়ে নির্বাচিত সংসদ তৈরি করতে পারলে দেশ ভালোর দিকে যাবে। ইতোমধ্যে প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনের সম্ভাব্য সময় ঘোষণা করেছেন। রাজনৈতিক দলগুলোও তাদের মতামত পেশ করছে। প্রশ্ন এসেছে, কীসের ভিত্তিতে নির্বাচন হবে। বর্তমান সংবিধানের আলোকে নির্বাচন হতে হলে ২০২৯ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। আবার নির্বাচন কমিশন বলছে, জামায়াতে ইসলামীসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের দাবি অনুযায়ী পিআর পদ্ধতি সংবিধানে নেই। তবে অন্তর্বর্তী সরকারও তো সংবিধানে নেই, তাহলে ড. ইউনূস কীভাবে ক্ষমতায় আছেন? এসব আমলতান্ত্রিক কথা বাদ দিয়ে জুলাই সনদের সাংবিধানিক মর্যাদা দিয়ে নির্বাচন দিন। বিপ্লবের পর আগের সংবিধান কার্যকর থাকে না। শেখ হাসিনা সংবিধানের কোন ধারায় পালিয়ে গেছে?
আমরা জনগণ দেশের মালিক। তাই ছাত্র-জনতার বিপ্লবের ফলে হাসিনা পালিয়েছে তার কৃতকর্মের কারণে। বর্তমানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ছাত্র-জনতার আবেগের ফসল এবং কার্যকর। বিএনপি এক সময়ের সরকারে বড় দল। কিন্তু আওয়ামী দোসরদের পালানোর পর বিএনপি নেতাকর্মীরা যেভাবে দেশটা চাঁদাবাজির অভয়ারণ্য করে লুটপাট করছে, তা মিডিয়া খুললেই চোখে পড়ে। বিএনপি আর বেগম জিয়ার নিয়ন্ত্রণে নেই। রাজনীতি বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, ‘র’-এর খপ্পরে পড়ে গেছে। ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ড. রিপন, খায়রুল কবীর খোকনদের আর দলে খুব একটা মূল্যায়ন নেই। ভারতে ‘র’-এর তত্ত্বাবধানে নির্বাসনে থাকা এক নেতার কবলে পুরো বিএনপি ‘র’ এবং আওয়ামী বয়ানে পরিচালিত হচ্ছে। জনগণের মতামতের তোয়াক্কা করছে না।
বিএনপির ফজলুর রহমান জুলাই বিপ্লবকে অশুভ কালো শক্তির অভ্যুত্থান হিসেবে চিত্রিত করছে। এ কালো শক্তি নাকি জামায়াত-শিবির। প্রকারান্তরে ফজলু সত্য কথাই বলে ফেলেছেন। প্রকৃতপক্ষে তো জামায়াত-শিবিরের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় এবং মাঠে-ময়দানে তারা সাধারণ ছাত্র-জনতা ও স্বৈরাচারবিরোধী জনগোষ্ঠীকে সাথে নিয়ে গোটা দেশে স্বৈরাচার হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে নেমে পড়েছিল। ফলে ভারতীয় ‘র’ও হাসিনাকে রক্ষা করতে পারেনি। আমার বাল্যবন্ধু সাংবাদিক এমএ আজিজ তো ডাকসুতে শিবিরের উত্থানে পেরেশান হয়ে গেছেন। শিবিরের প্যানেল জিতলে নাকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেশের আন্দোলনের সুবিধা তাদের ঐতিহ্য হারাবে। আমার দোস্ত আজিজকে বলব, গত ৩৬ জুলাইয়ের দিনগুলো পর্যালোচনা করতে, ডাকসুতে ভিপি প্রার্থী সাদিক কায়েমের নেতৃত্বেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে গোটা দেশের জুলাই বিপ্লবের অভ্যুত্থান ঘটেছিল। এ সাদিক কায়েম ড. ইউনূসের উপদেষ্টা কমিটিতে আহ্বান পেয়েও দল ও দেশের চিন্তা করে তাতে যোগ দেননি। আবার আমার পরিচিত ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি বর্তমানে বিএনপি নেতা হাবিবুর রহমান হাবিব বিরোধীদের জিহ্বা কেটে নেয়ার যে অনৈতিক হুমকি দিচ্ছেন, তা দেশের রাজনৈতিক ময়দানের ভাষা নয়।
আমরা দেশের জনগণ ৫৪ বছরের বস্তাপচা দলীয়করণ স্বৈরাচারী আচরণ, দুর্নীতির আখড়া আর দেখতে চাই না। আমরা আর ব্যাংক খালি করা লুটেরাদের দেশের রাজনীতিতে দেখতে চাই না।
সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা বাংলাদেশ গড়তে চাই। দল-মত নির্বিশেষে সৎ, যোগ্য, দুর্নীতিমুক্ত, চাঁদাবাজমুক্ত লোকদের নেতা বানাতে চাই। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকদের ভোটের মূল্যায়ন করতে চাই। কোনোভাবে ২-৪টি ভোটের ব্যবধানে নির্বাচিত সংসদ চাই না। যারা অধিকাংশ ভোট পাবে, তারাই সরকার গঠন করবে, তাই আমরা পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন চাই।
দেশের বুদ্ধিজীবী সমাজ ইতোমধ্যেই মত দিতে শুরু করেছেন, জুলাই সনদ অনতিবিলম্বে ঘোষণা করা হোক। এ জুলাই সনদের ঘোষণা আইনের ভিত্তি দিয়ে তা অনতিবিলম্বে কার্যকর করা হোক।
স্থানীয় সরকারের নির্বাচন দ্রুত করার ব্যবস্থা করা হোক। সামরিক-বেসামরিক, আমলা, পুলিশ সর্বত্র থেকে আওয়ামী দোসরদের সরানোর ব্যবস্থা করা হোক। সেক্রেটারিয়েট থেকে যারা ‘ক্যু’ করার অসৎ পাঁয়তারা করছে, তাদের চিহ্নিত করে দ্রুত ভালো, চরিত্রবান, দুর্নীতিমুক্ত অফিসার নিয়োগ দেয়া হোক। যেমন সিলেটের ডিসি নিয়োগ দেয়া হয়েছে। দেশে ভালো লোকের অভাব আছে বলে আমি মনে করি না। মন্দের সাথে ভালো লোকও বিভিন্ন বিভাগে ছড়িয়ে আছে, তাদের অতিসত্বর পদায়ন করে প্রশাসনে সততার স্বাক্ষর রাখার উদ্যোগ নিতে হবে।
দেশকে আরেক ফ্যাসিস্টদের উদ্যানে দেশবাসী দেখতে চায় না। ২০০০ শহীদ আর ৩০ হাজার আহত পঙ্গু, আয়নাঘরের নির্যাতনভোগী লোকদের আর্তনাদে জনগণ সততা, নৈতিকতা, দুর্নীতিমুক্ত চাঁদাবাজমুক্ত দেশ দেখতে চায়। ছাত্র-জনতার বিপ্লবের ফল আমরা হারাতে দিতে চাই না। জনগণ এখন সচেতন, তাই সাহস করে ড. ইউনূস সাহেব পদক্ষেপ নিন। আপনারা ৩৬ জুলাই বিপ্লবের ফসল। আপনাদের ভূমিকা হতে হবে জনগণের পক্ষে, কাউকে পরোয়া করে না, তা দেশে হোক আর বিদেশের চোখ রাঙানি হোক। ১৮ কোটি মানুষের ভালোর চিন্তা করে সঠিকভাবে পদক্ষেপ নিন।
৫৪ বছরে বাংলাদেশ বিমানে লাভের মুখ দেখেছে। নির্মাণকাজে ৩০% টাকা সাশ্রয়ের বাণী আমরা দেখতে পাচ্ছি। দেশের সব অলাভজনক প্রকল্প বাদ দিয়ে হাসিনার দোসরদের ফেলে যাওয়া শিল্পগুলোকে বিশেষ ফর্মুলায় চালু করে দেশের জনশক্তির চাকরির ব্যবস্থা এবং উৎপাদিত দ্রব্য রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা বাড়ানোর জোর দাবি করছি।
প্রয়োজনে জাতীয় সরকার করা যেতে পারে। দেশের ভালো লোকদের পরামর্শ নেয়া যেতে পারে। সে যে দলেরই হোক। বৈদেশিক নীতি ইতোমধ্যেই ফল দিতে শুরু করেছে। পাকিস্তানের সাথে ৫৪ বছরের অমীমাংসিত বিষয়গুলো দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা মীমাংসা করতে সম্মত হয়েছে। খুবই ভালো উদ্যোগ। আমরা সমগ্র মুসলিম দেশের ভ্রাতৃবোধ সৃষ্টি করতে চাই, সহযোগিতা বাড়াতে চাই। প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে ভালো সম্পর্ক চাই। প্রভুত্ব চাই না। সদ্য স্বৈরাচারমুক্ত সিরিয়া, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপের উদাহরণ আমরা কাজে লাগাতে পারি। তারা যদি স্বৈরাচারমুক্ত হয়ে ভালো দেশ গড়ার কাজ করতে পারে, আমরাও পারব, ইনশাআল্লাহ। চাই ছাত্র-জনতার ঐক্যের মূল্যায়ন এবং ছাত্র-জনতাকেও পাহারার ভূমিকা পালন করার আহ্বান করে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে দেশের জন্য, জনগণের জন্য দেশদরদির ভূমিকায় অগ্রণী হওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করে শেষ করছি।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।