রিয়াদ বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলা, সানায় অভিযান, পাল্টা হুমকি
১৪ অক্টোবর ২০২৬ ২২:৩১
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সংঘাত নতুন বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করছে। গত কয়েকদিনে সৌদি আরবের রিয়াদ ও আভা বিমানবন্দরে ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা, রিয়াদে কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনালে প্রাণহানি, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের ইয়েমেনের রাজধানী সানায় সামরিক অভিযান এবং পাল্টা হামলার হুমকি পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে। গত ১০ অক্টোবর শনিবার রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলায় প্রাথমিক হিসাবে ১২ জন নিহত ও ৩০৯ জন আহত হন। পরদিন বিমানবন্দরের যাত্রী টার্মিনালে আরেকটি হামলায় একজন পাকিস্তানি নাগরিক নিহত এবং ১১ জন আহত হন। এদিকে হুথিরা সৌদি আরবের আরামকোর স্থাপনা ও বিমানবন্দরকে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু ঘোষণা করেছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশি নাগরিকের প্রাণহানি, আহত প্রবাসী, ফ্লাইট বাতিল ও যাত্রী ভোগান্তি বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে। গত ১৩ অক্টোবর মঙ্গলবার সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট সানার একটি তেল স্থাপনায় বিমান হামলা চালানোর পর পাল্টা আঘাতের হুঁশিয়ারি দিয়েছে হুথিরা। ফলে সংঘাত এখন আর শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ নয়; উপসাগরীয় নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলা, প্রাণহানি ও আকাশপথে বিপর্যয়
গত ১০ অক্টোবর রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল-৩-এ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বিভিন্ন দেশের যাত্রী হতাহত হন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, নিহতদের মধ্যে দুই বাংলাদেশি রয়েছেন। তারা হলেন বগুড়ার শাহজাহানপুরের মো. শাহেদ আহমেদ এবং কুমিল্লার নাঙ্গলকোটের নাসরুল্লাহ বাদরপুরী। প্রাথমিক হিসাবে হামলায় ১২ জন নিহত ও ৩০৯ জন আহত হন। পরদিন বিমানবন্দরের যাত্রী টার্মিনালে দ্বিতীয় হামলায় আরও একজন নিহত ও ১১ জন আহত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। হুথি বিদ্রোহীরা হামলাগুলোর দায় স্বীকার করেছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। ধারাবাহিক হামলার পর বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্থগিত করা হয় এবং একাধিক আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা রিয়াদ ও দাম্মামগামী ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত করে। রয়টার্সের গত ১৩ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাতার এয়ারওয়েজও নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে রিয়াদ ও দাম্মামে ফ্লাইট স্থগিত করেছে।
সানায় সৌদি জোটের অভিযান, পাল্টা হামলার হুমকি
গত ১৩ অক্টোবর সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ইয়েমেনের রাজধানী সানার পশ্চিমাঞ্চলে আল-সাবাহা এলাকায় ইয়েমেন পেট্রোলিয়াম কোম্পানির কেন্দ্রীয় স্টেশন খালি করার নির্দেশ দেয়। জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি জানান, সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের আগে বেসামরিক মানুষকে নিরাপদ দূরত্বে সরে যেতে হবে। পরে সানার ওই এলাকায় বিমান হামলা চালানো হয় বলে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস ও আনাদোলু এজেন্সি জানিয়েছে।
হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেন, ওই স্থাপনায় সামরিক গুরুত্বের কিছু নেই এবং সেখানে জ্বালানি মজুদও খালি ছিল। এর পরপরই সৌদি আরবকে পাল্টা আঘাতের হুঁশিয়ারি দেয় হুথিরা। তাদের ঘোষণায় দাম্মামে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর প্রধান কার্যালয়, রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং রাজধানীর একটি আরামকো শোধনাগারের নাম রয়েছে। এসব স্থাপনায় কর্মরত বিদেশি বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী ও শ্রমিকদের সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। বিমান সংস্থা, যাত্রী ও বিমানবন্দরের কর্মীদেরও সতর্ক করেছে গোষ্ঠীটি।
কেন সংঘাত আবার তীব্র হলো?
ইয়েমেনে হুথিদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাত দীর্ঘদিনের। ২০১৪ সালে হুথিরা রাজধানী সানা দখল করার পর ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন দিয়ে সামরিক অভিযান শুরু করে। ২০২২ সালে যুদ্ধবিরতির পর সহিংসতা কিছুটা কমলেও ২০২৬ সালে আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং ইয়েমেনের কৌশলগত উপকূলীয় অঞ্চলে নতুন লড়াই পরিস্থিতিকে আবার সংঘাতের দিকে ঠেলে দিয়েছে। রয়টার্সের গত ৭ অক্টোবরের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, লোহিত সাগর উপকূল ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিকে ঘিরে লড়াই নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বড় অংশের জাহাজ চলাচল করে। সেখানে হুথিদের প্রভাব বৃদ্ধি এবং সৌদি সমর্থিত বাহিনীর পাল্টা অভিযান আঞ্চলিক নিরাপত্তার পাশাপাশি বৈশ্বিক বাণিজ্যেও ঝুঁকি তৈরি করছে।
জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার আশঙ্কা
সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশ। দেশটির তেল শোধনাগার, উৎপাদনকেন্দ্র বা রপ্তানি অবকাঠামোয় হামলা হলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে পারে। একইসঙ্গে লোহিত সাগর ও আশপাশের সমুদ্রপথে নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়লে জাহাজ পরিবহন ও বিমানে ব্যয় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। গত ১৩ অক্টোবর রয়টার্সের প্রতিবেদনে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০৬ ডলারে লেনদেন হওয়ার কথা জানানো হয়। তবে তেলের দামের ওঠানামা শুধু সৌদি-হুথি সংঘাতের ওপর নির্ভরশীল নয়; যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত, বৈশ্বিক সরবরাহ এবং বাজারের প্রত্যাশাও এতে প্রভাব ফেলে।
বাংলাদেশের ওপর প্রভাব : প্রাণহানি, ফ্লাইট বাতিল ও রেমিট্যান্সের ঝুঁকি
সৌদি আরবে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী বসবাস করেন। রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলায় দুই বাংলাদেশি নিহত হওয়ার পাশাপাশি আহত বাংলাদেশির সংখ্যাও বেড়েছে। গত ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশি আহতের সংখ্যা ২৭ বলে জানা গেছে। তাদের মধ্যে সৌদিতে কর্মরত শ্রমিক ও ওমরাহ পালন করতে যাওয়া যাত্রী রয়েছেন। বাংলাদেশ দূতাবাস আহতদের চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সহায়তার বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। বিমান চলাচলেও বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেছে। বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের তথ্যানুযায়ী, সৌদি আরবের বিমানবন্দর বন্ধ ও ফ্লাইট স্থগিতের কারণে ঢাকা থেকে পরিচালিত ৬২টি সরাসরি ও ট্রানজিট ফ্লাইট প্রভাবিত হয়েছে। এতে ৯ হাজার ৬৭৪ জন যাত্রী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস রিয়াদ ও দাম্মামগামী ফ্লাইট ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত স্থগিত করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, অর্থনৈতিকভাবে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত বাংলাদেশের জন্য আরও চাপ তৈরি করতে পারে। সৌদি আরবে কর্মসংস্থান ব্যাহত হলে ভবিষ্যতে রেমিট্যান্সপ্রবাহে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দীর্ঘসময় বেশি থাকলে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয়, পরিবহন খরচ ও মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ বাড়তে পারে।
পরিণতি কোন দিকে?
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের অভিযান এবং হুথিদের পাল্টা হামলার হুমকি অব্যাহত থাকলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে সৌদি আরবের তেল স্থাপনা বা বিমানবন্দরে নতুন হামলা হলে বেসামরিক প্রাণহানি, বিমান চলাচলে বিঘ্ন এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাড়তে পারে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ঢাকার জন্য এখন জরুরি হলো সৌদি আরবে কর্মরত নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ফ্লাইট পরিস্থিতির নিয়মিত হালনাগাদ এবং জ্বালানি আমদানি ব্যয়ের সম্ভাব্য পরিবর্তনের দিকে নজর রাখা। একইসঙ্গে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে কূটনৈতিক উদ্যোগ ও উত্তেজনা প্রশমনের প্রচেষ্টা জোরদার করা। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপথ নির্ভর করবে সৌদি জোটের সামরিক পদক্ষেপ, হুথিদের প্রতিক্রিয়া এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর কূটনৈতিক অবস্থানের ওপর।