শাহজালাল বিমানবন্দরকাণ্ড ‘উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে’
৭ অক্টোবর ২০২৬ ২০:৫৬
॥ আবু জায়েদ আনসারী ॥
বিমানবন্দরে যাত্রীদের ভোগান্তির অভিযোগের অন্ত নেই। বিদেশফেরত যাত্রীরা প্রায়ই তাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা তুলে ধরছেন সামাজিকমাধ্যম কিংবা গণমাধ্যমে। এসবের সমাধানও সহসা হচ্ছে না। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক কী ব্যবস্থা নিচ্ছে এবং সেটি কতটুকু কার্যকরী হচ্ছে— তা নিয়েও রয়েছে ধোঁয়াশা। কারণ অভিযোগ ক্রমেই হচ্ছে পাহাড়সম। বিমানবন্দরে অনিয়মের অভিযোগগুলোর মধ্যে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে দায়িত্ব পালন করা জনবলের অদক্ষতা এবং যাত্রীসেবায় ব্যবহৃত ইকুইপমেন্টের অপ্রতুলতার বিষয়টি উঠে আসছে।
তথ্যমতে, বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন, কাস্টমস, এপিবিএন, এনএসআই ও ডিজিএফআইসহ প্রায় ২৬টি সংস্থা কাজ করে। এসব সংস্থা নিজস্ব কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা ও অধীনে কাজ করে এবং বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালকের কাছে তাদের সরাসরি জবাবদিহি নেই। ফলে কোনো অনিয়ম দেখা দিলে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষে তাৎক্ষণিক কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া বা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
বিমানবন্দরে লাগেজ ভাঙা এবং কেটে মূল্যবান মালামাল চুরির অভিযোগ পুরোনো হলেও সাম্প্রতিক সময়ে তা বেড়েছে। তবে এসব অভিযোগের সুরাহা হচ্ছে না বলেও অভিযোগ উঠছে এখন। সাধারণত যাত্রীদের লাগেজ বিমানে ওঠানো ও নামানো এবং যাত্রীদের কাছে হস্তান্তরে কাজ করে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের দায়িত্বে থাকা নির্ধারিত কর্মীরা। যারা চেকিং ও বোর্ডিং পাস করার দায়িত্বও পালন করেন। বিমানবন্দরের অভ্যন্তরে কীভাবে লাগেজ ভেঙে যাওয়া কিংবা কেটে মালামাল চুরির ঘটনা ঘটছে তার দায় দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের এড়ানোর সুযোগ নেই। যাত্রীদের এমন ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে রক্ষায় বিমানবন্দরে যাত্রীদের লাগেজ কেটে মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি ও লুটপাট স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে উড়োজাহাজের কার্গো হোল্ড থেকে ব্যাগেজ বেল্ট পর্যন্ত পুরো লাগেজ হ্যান্ডলিং কার্যক্রম লাইভ সিসিটিভির মাধ্যমে যাত্রীদের সামনে সম্প্রচারের দাবি জানিয়ে জনস্বার্থে গত ৫ অক্টোবর সোমবার একটি আইনি নোটিশ পাঠান বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের এডভোকেট মো. মাহমুদুল হাসান মামুন। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (সিএএবি) চেয়ারম্যান, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দরের পরিচালক ও ব্যবস্থাপককে নোটিশের প্রাপক করা হয়েছে।
প্রতিবাদ করে ভুক্তভোগী নাগরিক
চলতি অক্টোবরের শুরুতে শাহজালালে লাগেজ পেতে দেরি হওয়া ও নানা অব্যবস্থাপনার প্রতিবাদ জানান সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান। তবে তার প্রতিবাদের ফল ভালো হয়নি। তার বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধাদান এবং কর্মকর্তাদের মারধরের মামলা দিয়ে গ্রেফতার করা হয়েছে। দেয়া হয়েছে রিমান্ড, পাঠানো হয়েছে কারাগারে। আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে এমন পদক্ষেপকে ইতিবাচকভাবে দেখছে না কোনো মহল। জামায়াতে যোগ দেয়া বিএনপির সাবেক এ নেতার দাবি, তিনি বিমানবন্দরে জনগণের হয়রানি ও ভোগান্তি রোধে সোচ্চার হয়েছিলেন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা আখতারুজ্জামানের গ্রেফতার ও কারাগারে পাঠানোর তীব্র নিন্দা জানিয়ে নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেছে। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের দাবি, আখতারুজ্জামানের গ্রেফতারের বিষয় সাধারণ কোনো ঘটনা নয়, এর পেছনে উচ্চমহলের ইন্ধন আছে এবং তিনি জামায়াতে যোগ দেয়ার আক্রোশ থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। একই দিন শাহজালাল বিমানবন্দরের ভেতরে অব্যবস্থাপনার চিত্র তুলে ধরে ফেসবুক লাইভ করেছিলেন জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর ডা. ওরাকাতুল জান্নাত। কিন্তু তাকেও সরকার হয়রানি করছে। তার ব্যাংক হিসাব তলব করেছে অর্থনৈতিক ইন্টিলিজেন্ট ইউনিট বিএফআইইউ। দৃশ্যত; ‘উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে’।
শাহজালাল বিমানবন্দরের অব্যবস্থাপনার চিত্র
গত ৪ অক্টোবর সরেজমিন শাহজালাল বিমানবন্দরের অব্যবস্থাপনার চিত্র দেখার চেষ্টা করেন এ প্রতিবেদক। বিমানবন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রমের মধ্যে ট্রলি ব্যবস্থাপনা অন্যতম একটি কর্মযজ্ঞ। যাত্রীরা ট্রলির মাধ্যমে মালামাল ভেতের নিয়ে যান ও বের করেন। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্যানুযায়ী, ৪ হাজার ১৯০টি ট্রলি রয়েছে। এসব ট্রলি যাত্রীসেবার জন্য পিক আওয়ারে অন্তত আড়াই হাজার ট্রলি যুক্ত থাকে। বাকি ট্রলিগুলোর একটি অংশ বিদেশযাত্রীরা বিমানবন্দরে এসে লাগেজ রেখে বুকিং করে রাখার কাজে ব্যবহার করেন। দেখা যায়, অনেক যাত্রী দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিমানবন্দরে অনেক আগেই পৌঁছান। তারা ট্রলিতে লাগেজ মালপত্র রেখে অপেক্ষা করতে থাকেন দীর্ঘসময়। এছাড়া বিমানবন্দরের টার্মিনাল-২ তে মিডিয়া কর্ণার এলাকায় শতাধিক ট্রলি অকেজো হয়ে পড়ে রয়েছে। কোনোটির চাকা নেই, কোনোটি নোংরা আবার কোনোটি আংশিক ভেঙে গেছে। এসব কারণে ট্রলির সংখ্যা চার হাজারের অধিক হলেও যাত্রীরা সেবা সংকটে থাকেন।
বিমানবন্দরে ট্রলি সেবার মান বাড়ানোর জন্য ইতোমধ্যে একজন কর্মকর্তাকে যুক্ত করে পৃথকভাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগিব সামাদ।
এদিকে বিমানবন্দরে লাগেজ ব্যবস্থাপনার বিদ্যমান ত্রুটির বিষয়ে সরকার পদক্ষেপ নিয়েছে বলে জানিয়েছেন বিমানমন্ত্রী। গত ৬ সেপ্টেম্বর বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী শাহজালাল বিমানবন্দরে আকস্মিক পরিদর্শন করেন। এর আগে আগস্টের শেষ দিকে বিমানমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, লাগেজ সরবরাহের সময় কমিয়ে প্রথম লাগেজ ১৮ মিনিট এবং শেষ লাগেজ ৫৮ মিনিটের মধ্যে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে সেসময় বিমান বন্দরে অপ্রতুল ব্যাগেজ বেল্ট, ট্রলি রাখার সীমিত জায়গা, সংকীর্ণ চলাচলপথ, সীমিত বোর্ডিং ব্রিজ ও পুরোনো অবকাঠামোর কারণে লাগেজ ব্যবস্থাপনায় সমস্যা থাকার কথাও উঠে আসে। মন্ত্রীর এমন বক্তব্যের পরও ১ অক্টোবর বিমানবন্দরে জামায়াতের ৩৪ জন এমপি ও মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানকে লাগেজ পেতে ২ ঘণ্টার বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়। এতেই বাধে বিপত্তি।
বিমানবন্দরে শুধু লাগেজ ব্যবস্থাপনায় আরও চরম অব্যবস্থাপনার অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি নিউইয়র্ক ফেরত সিনিয়র সাংবাদিক আবুল কালাম নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন। তিনি জানান, তার দুটি লাগেজের মধ্যে একটি কাটা হয়েছে আরেকটি ভেঙে ফেলা হয়েছে। এটি কীভাবে ঘটেছে তার সদুত্তর তিনি পাননি। এমন অভিযোগ আরও অনেক যাত্রী সাধারণের।
তথ্যমতে, শাহজালাল বিমানবন্দরে এয়ারলাইন্সগুলোর চেকইন, বোর্ডিং, উড়োজাহাজে মালামাল ওঠানো-নামানো, যাত্রীসেবা, প্রকৌশল ও গ্রাউন্ড সার্ভিস ইকুইপমেন্টের (জিএসই) দায়িত্ব রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের। এসব সেবার জন্য প্রতিটি এয়ারলাইনস নির্ধারিত হারে ফি পরিশোধ করে। এরপরও সেবার মান ঠিক কোন কারণে বাড়ছে না, তারও স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না।
জনবল ও সরঞ্জাম সংকটে শাহজালাল
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জনবল ও সরঞ্জাম সংকট রয়েছে। উন্নতমানের সেবা প্রদানের জন্য এগুলোর আধুনিকায়ন যেমন জরুরি, তেমনি আরও বেশি দক্ষ জনবলের প্রয়োজন। এ বিমানবন্দরে প্রতিদিন ২৭টি এয়ারলাইন্সের ১১০-১১৫টি ফ্লাইট ওঠানামা করে। এসব ফ্লাইটে যাতায়াত করেন প্রায় ২০ হাজার যাত্রী। হাইলোডার, ট্রান্সপোর্টার, ডলি, ট্রলি, টোয়িং ট্রাক্টর, হুইলচেয়ারসহ ১৮ ধরনের দুই শতাধিক যন্ত্রপাতি আছে এ স্টেশনে। বিমানবন্দরে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবায় প্রায় ১ হাজার ২০০ জন কাজ করছেন। সেবার মানের দিক থেকে এ বিমানবন্দর বিশ্বের শীর্ষ ১০০টির মধ্যে নেই। যুক্তরাজ্যভিত্তিক জরিপ সংস্থা স্কাইট্র্যাক্সের বিশ্বসেরা ১০০ বিমানবন্দরের তালিকায় শাহজালাল বিমানবন্দর স্থান পায়নি। এছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার সেরা ১০ বিমানবন্দরের তালিকায়ও নেই এটি।
অভিযোগের পাহাড়
পরিবর্তিত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে এ বিমানবন্দরের সেবার মান উন্নত হয়নি, উল্টো জমা হয়েছে অভিযোগের পাহাড়। কর্তৃপক্ষের তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ সালের ২৮ জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় দেড় বছরে হটলাইন ও ওয়েবসাইটে ২০ হাজারের বেশি অভিযোগ ও জিজ্ঞাসা জমা পড়ে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৩০ শতাংশ হারানো জিনিস খোঁজার শাখা লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড সংক্রান্ত। সে হিসাবে সংখ্যাটা দাঁড়ায় প্রায় ছয় হাজারে। এছাড়া বিমানবন্দরে লাগেজ ভাঙার কারণের ব্যাখ্যায় একটি সূত্র জানায়, লাগেজ বিমান থেকে নামানোর ক্ষেত্রে বেল্টে দেয়ার সময় অসাবধানতা কিংবা অবহেলায় ধাক্কা খেয়ে ভেঙে যায়। একইভাবে লাগেজ ব্যবস্থাপনার জড়িতদের সাথে একটি সিন্ডিকেট চক্র। এছাড়া মেটাল ডিটেক্টর বা স্ক্যানিং মেশিন অনেক থাকলেও তার সবগুলো পুরোপুরি সচল না থাকায় লাগেজ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মগুলো রোধ হচ্ছে না বলে একটি সূত্র জানায়।